মেসি-নেইমারদের নতুন গুরু হতে যাচ্ছেন আর্নেস্তো ভালভার্দে

মৌসুম শেষেই বার্সা কোচ লুইস এনরিকে ক্লাব ছাড়ছেন, এ কথা বহু আগে থেকেই জানা ছিল। সামনের ২৯ মে কোপা দেল রে এর ফাইনালের পরেই যে নতুন কোচের নাম ঘোষণা করবে বার্সেলোনা, সেটাও তারা কয়েকদিন আগেই টুইটারে ঘোষণা করে দিয়েছে। লুইস এনরিকের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে উঠে এসেছে আর্নেস্তো ভালভার্দে, হুয়ান কার্লোস উনজুয়ে, রোনাল্ড ক্যোম্যান, ইউসেবিও স্যাকরিস্টান, হোর্হে সাম্পাওলি সহ আরো অনেক কোচের নাম। কিন্তু সবাইকে বাদ দিয়ে অবশেষে ক্লাবের সাবেক খেলোয়াড়, অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বর্তমান কোচ আর্নেস্ট ভালভার্দের দিকেই হাত বাড়াচ্ছে বার্সেলোনা, মোটামুটি এটা নিশ্চিত।

ভালভার্দের মধ্যে কিরকম কোচ পেতে যাচ্ছে বার্সেলোনা?

এ কথা না মানার কোন কারণ নেই, অন্যান্য ক্লাবের মত বার্সা শুধুমাত্র ট্রফি জয়ী বা সময়ের সবচেয়ে ‘হটকেক’ কোচের পিছনে কখনই ছোটে না। পেপ গার্দিওলা, লুইস এনরিকে, জেরার্ডো মার্টিনো, টিটো ভিয়ানোভা, ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড – বার্সার কোচ আগে যেই-ই হয়েছেন, কেউই কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোন ম্যানেজার ছিলেন না। বলতে গেলে বার্সার দায়িত্ব নেওয়ার আগে কেউ চিনতই না তাদের। বার্সা সবসময় এমন কাউকেই কোচ হিসেবে চেয়েছে, বার্সার ইতিহাস-স্টাইল-সংস্কৃতি সম্বন্ধে আগে থেকেই সম্যক ধারণা আছে যাদের। এবারও যে বিষয়টার ব্যত্যয় ঘটছেনা, এ কথা বলেই দেওয়া যায়।

বার্সেলোনার খেলোয়াড় ছিলেন যখন

সদ্য সাবেক হওয়া অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের ম্যানেজার আর্নেস্তো ভালভার্দে স্পেইন ও গ্রিসে ভালো ম্যানেজার হিসেবে অত্যন্ত সমাদৃত। ছিলেন বার্সার সাবেক খেলোয়াড়ও। ক্রুইফের ড্রিম টিমে ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দুইবছর স্ট্রাইকার হিসেবেও খেলে গেছেন তিনি, বার্সার হয়ে জিতেছেন কোপা দেল রে ও কাপ উইনার্স কাপ। হয়তো বার্সার হয়ে অত বেশীদিন খেলা হয়নি তার, কিন্তু তিনি মূলত সেই সময়টাতেইও বার্সার খেলোয়াড় ছিলেন, যখন ইয়োহান ক্রুইফ তাঁর যুগান্তকারী দর্শন দিয়ে বার্সাকে বানাচ্ছিলেন “ড্রিম টিম”। সে সময় ভালভার্দে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন রোনাল্ড ক্যোম্যান, তসিকি বেজিরিস্টিয়ান, আলবার্ত ফেরার, ইউসেবিও স্যাকরিস্টান, গ্যারি লিনেকার, মাইকেল লাউড্রপদের। আর পেপ গার্দিওলা বলে একজন তখন খেলতেন বার্সার যুবদলে। ফলে বার্সার দর্শনটা তার আত্মস্থ করা আছে আছে ভালোমতই। তাছাড়া বিলবাওয়ের মত একটা দলকে নিয়ে, যেখানে কিনা মূলত নিজেদের অঞ্চলের খেলোয়াড়দেরই সুযোগ দেওয়া হয় ও দলবদলের বাজারে যাদের সওদাপাতি নেই বললেই চলে, সেই দলে সব যুবদলের খেলোয়াড়দের ছোট থেকে গড়ে তুলে তুলে দলকে শক্তিশালী করেছেন এই ভালভার্দে, তাই তরুণ খেলোয়াড় পরিচর্যা করার বিষয়টাও তার ভালোই জানা আছে, যেটা কিনা বার্সার দর্শনেরও অন্যতম অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। এখনকার অ্যান্ডার হেরেরা থেকে শুরু করে স্প্যানিশ মেসি খ্যাত ইকার মুনিয়াইন, বেনাট, আয়মেরিক লাপোর্তে, অ্যান্ডার ইতুরাস্পে, মিকেল স্যান হোসে, ফার্নান্দো ইয়োরেন্তে, ইনাকি উইলিয়ামস, মার্কেল সুসায়েতা – এসব খেলোয়াড়দের উত্থানও ভালভার্দের হাত ধরেই। এমনকি বর্ষীয়ান স্টড়াইকার আরিতজ আদুরিজকেই দেখুন, এই ভালভার্দের অধীনেই ক্যারিয়ারের সুসময়টা পার করেছেন এই বিলবাও স্ট্রাইকার। নিজে একজন খেলোয়াড় ছিলেন, তাই খেলোয়াড়দের চাহিদাটাও ভালোভাবেই বোঝেন তিনি, হয়ে যেতে পারেন খেলোয়াড়দের অনেক কাছের একজন মানুষ। এই কাছের মানুষ হয়ে, আন্তরিকতার আড়ালেই খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার মন্ত্রটাও তাঁর ভালোই জানা আছে। ২০১৫ সালের কোপা দেল রে তে দুই লেগে বার্সাকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল যে বিলবাও দল, তার পেছনের কলকাঠিও নেড়েছিলেন এই ভালভার্দেই। এমনকি গত মৌসুমেও কোপা দেল রে এর ফাইনালে একেবারে শেষ মুহূর্তে লিওনেল মেসির একটা গোল লেগেছিল বিলবাওকে হারানোর জন্য!

সাধারণত ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে দলকে খেলাতে পছন্দ করা ভালভার্দে অন্যান্য বার্সা কোচদের মত অতটা পজেশানভিত্তিক ফুটবল খেলাতে পছন্দ করেননা। তার দলের খেলাগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় দলগুলো মোটামুটি উইং নির্ভরশীল, সরাসরি অ্যাপ্রোচে খেলতে পছন্দ করে, ক্রসের উপর নির্ভর করেই খেলতে পছন্দ করে। ফলে তাঁর সিসটেমে ইয়োরেন্তে বা আদুরিজের মত স্ট্রাইকার/টার্গেটম্যানরা অনেক ভালো খেলতে পারেন। ঝামেলাটা হতে পারে এখানেই, কেননা লিওনেল মেসি বা নেইমার কিংবা লুইস সুয়ারেজ, কেউই প্রথাগত টার্গেটম্যান না। তারা আরো বেশী কিছু। তাই বার্সাতে এসে হয়তোবা নিজের স্টাইলটা একটু হলেও পরিবর্তন করতে পারেন ভালভার্দে। তবে নিজের দলকে হাই প্রেসিং ফুটবল খেলাতে পছন্দ করেন তিনি।

তবে নিজে স্ট্রাইকার ছিলেন দেখে যে একেবারে তাঁর দলকে অল-অ্যাটাক ফুটবল খেলাতেই পছন্দ করেন তিনি তা কিন্তু না। তিনি বুঝেন ডিফেন্সের মর্মটাও। যে দলকেই কোচিং করিয়েছেন, প্রত্যেকটা দলকেই আস্তে আস্তে রক্ষণের দিক দিয়ে শক্তিশালী করেছেন। অলিম্পিয়াকোসের যখন দায়িত্ব নিলেন, তাঁর অধীনে দল মাত্র ১৪টা গোল খেল, যে অলিম্পিয়াকোস তাঁর আসার আগের মৌসুমে খেয়েছিল ২৭ গোল! তাঁর আসার আগে মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে যে বিলবাও দলটা ৬৫ গোল খেয়েছিল পুরো মৌসুমে, ভালভার্দে আসার পর সে দলটাই হজম করেছে মাত্র ৩৯ গোল, ফলে উন্নতি দেখা গেল বিলবাওয়ের লিজ পজিশানেও – একেবারে ১২তম থেকে ৪র্থ হল লা লিগায় তারা! আর এ জিনিসটাই এখন বার্সার মূলত সবচেয়ে বেশী দরকার। কারণ আক্রমণে বার্সার ক্ষমতা সম্বন্ধে কারোর সন্দেহ না থাকলেও রক্ষণের ক্ষেত্রে বার্সা এখনো বেশ দুর্বল।

বাকীটা এখন সময়ের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে দেখার জন্য কিরকম কোচ হবেন ভাল্ভার্দে, বার্সার জন্য!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

sixteen − eleven =