বলবয় থেকে রোমান সম্রাট : এক ফ্র্যান্সেসকো টট্টির সাতকাহন

“আমার বিপক্ষে টট্টির কিছু কিছু গোল এমনই অসাধারণ ছিল যে আমি যদি কোনভাবে গোলগুলো সেইভ করতে পারতাম, তাহলে সুন্দর একটা মাস্টারপিসকে নষ্ট করা হত…”

প্রিয় বন্ধু জিয়ানলুইজি বুফনের এই একটা কথা দিয়েই তাঁর জাজ্বল্যমান প্রতিভার ব্যাপারে আংশিক ধারণা পাওয়া যায় ; যে অদম্য প্রতিভাবলেই রোমের অন্তত অর্ধেক মানুষের কাছে দেবতাতুল্য মর্যাদা পেয়ে যাচ্ছেন এতদিন ধরে।

শুধুই কি অর্ধেক মানুষ? শুধুই কি রোমার সমর্থকদের কাছেই ফ্র্যানসেস্কো টট্টি রোমান সম্রাট হিসেবে ভাস্বর? রোম শহরের অপরপ্রান্ত যেখানে আকাশী, সেখানেও কি তিনি সম্রাট নন? গত রবিবারে স্টাডিও অলিম্পিকোতে লাৎসিওর সাথে খেলতে এসেছিল ইন্টার মিলান, দুই দলের কারোর সাথেই টট্টির সংশ্লিষ্টতা নেই – একই শহরের চিরবৈরী ক্লাব হবার কারণে এএস রোমা আর লাৎসিওর শত্রুতার ইতিহাস যেখানে কিংবদন্তীতুল্য, সেখানে ইন্টারের সাথে লাৎসিওর ম্যাচে না থেকেও যেন ছিলেন টট্টি, গত বৃহস্পতিবারেই নিজের অবসরের কথা জানানো টট্টির জন্য চিরবৈরী লাৎসিওর “আল্ট্রা” বা উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকরাও পর্যন্ত নিজের দলকে সমর্থনের বিষয়টা দূরে রেখে ইন্টারের বিপক্ষে ম্যাচটায় প্রায় পুরোটা সময় ধরেই টট্টির নামে শ্লোগান তুলেছে, বিশাল ব্যানার নিয়ে গেছে। “তোমার আজন্ম শত্রুরাও তোমাকে বিদায় জানাচ্ছে” ব্যানারে এই লেখাটা লিখে এনেছিল সেই দলের সবচেয়ে ভায়োলেন্ট, সবচেয়ে উগ্র সমর্থকগোষ্ঠী, যে দলকে গত দুই দশকেরও বেশী সময় ধরে এই টট্টিই দাবিয়ে রেখেছিলেন রোমের সবচেয়ে সফল ক্লাবের তকমাটা অর্জন করা থেকে।

“১৯৯৪ সালে সর্বপ্রথম আমরা আমাদের শত্রুপক্ষের মধ্যে ফ্র্যানসেস্কো টট্টি নামের একজনের আবির্ভাব দেখেছিলাম। জিওভান্নি পিচান্তিনির জায়গায় মাঠে নামানো হল তোমাকে, মাঠে নেমে একটা পেনাল্টিও আদায় করলে, যেটা থেকে জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনি গোল করতে পারল না। অনেক কম বয়স ছিল তোমার, কিন্তু সেই কম বয়সেই রোমার হয়ে তোমার কিছু করে দেখানোর ইচ্ছাটা, সেই জিগীষাটা পরিস্ফুটিত হচ্ছিল চোখেমুখে। আজ এত বছর পরেও তুমি এমন অনেক কিছুই অর্জন করেছ যার জন্য তোমার নিজের ক্লাবের সমর্থকেরা বা কর্তাব্যাক্তিরা হয়ত তোমাকে সে সম্মানটা দিচ্ছেনা, কিন্তু আমরা সেরকম করব না। শেষবেলায় নিজ ক্লাবের পক্ষ থেকে যে অবহেলাটা পাচ্ছ তুমি, তার জন্য আমরাই তোমার কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আজ তুমি আমাদের হয়ে খেললে হয়তোবা তোমার এরকম বিদায় আমরা কখনই হতে দিতাম না। এতদিন ধরে আমাদের লক্ষ্য করে তোমার সকল তাচ্ছিল্য, সকল তীর্যক মন্তব্য, সকল ভালো পারফরম্যান্স, সকল গোল – কোনকিছু নিয়েই আমাদের কোন গাত্রদাহ নেই বিশ্বাস কর, বরং এই বিদায়বেলায় তোমার মত একজন খেলোয়াড়ের সাথে হাত মিলিয়েই ঘোষণা করতে চাই রোমা ও লাৎসিওর ইতিহাসে তুমিই আমাদের সবচেয়ে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলে…”

অথচ এই লাৎসিওকে কি কম জ্বালিয়েছেন টট্টি পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে? এগারো গোল করে রোম ডার্বির সবচেয়ে বেশী গোলদাতা এই টট্টিই। আর লাৎসিওর বিপক্ষে একেকটা গোল যেন তাঁর ভেতরের বাচ্চাটাকে বের করে আনত। একেকটা গোল করে অভিনব কায়দায় উদযাপন করে লাৎসিও সমর্থকদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়ে দিতেন তিনি, একবার ত গোল করে জার্সিটাই খুলে ফেললেন, দেখা গেলো জার্সির নিচে গেঞ্জিতে লেখা আছে “ভি হো পুর্গাতো আঙ্কোরা”, বাংলা করলে যা দাঁড়ায় “আবারও তোমাদের ডুবিয়ে দিলাম”। আরেকবার গোল করে সাইডলাইনে ছুটে গিয়ে ভিডিওম্যানের কাছ থেকে ভিডিও ক্যামেরাটা নিয়ে পুরো স্টাডিও অল্পিম্পিকোর দর্শকদের দিকে তাক করে ধরলেন তিনি, দেখতে লাগলেন হতাশাগ্রস্ত লাৎসিও সমর্থকদের চেহারা! এতকিছু করার পরেও যে খেলোয়াড় নিজের চিরবৈরী ক্লাব লাৎসিওর সবচাইতে উগ্র সমর্থকগোষ্ঠীর কাছ থেকে বিদায়বেলায় এরকম সম্মান পায়, তাঁর মৃত্যুঞ্জয়ী লিগ্যাসি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার কোন অবকাশ আছে কি?

সেই বিখ্যাত সেলিব্রেশান

শতকরা ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনেরই হয়তোবা উত্তর হবে, “না”। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হল ঐ বাকী একজনের মধ্যেও এএস রোমার বর্তমান কোচ লুসিয়ানো স্প্যালেত্তি কিংবা সাবেক রোমা ও বার্সেলোনা কোচ লুইস এনরিকের মত মানুষ ছিলেন, থাকবেন। প্রিয় বন্ধু জিয়ানলুইজি বুফন এখনও জুভেন্টাসের হয়ে মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন অবিনশ্বর প্রাণশক্তির সাথে, দু’দিন পর রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে মাঠে নামবেন তিনি, গত ছয়বছর ধরে জুভেন্টাসের ছয়-ছয়টি লিগ শিরোপার সাথে অন্যান্য শিরোপাজয়ের ক্ষেত্রে বুফনের অনস্বীকার্য ভূমিকার জন্য অনেকের মুখে মুখেই এখন এই গুঞ্জন উঠেছে যাতে এবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলে ইতালি ও জুভেন্টাসের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম গোলরক্ষক বুফনের হাতেই যেন ব্যালন ডি’অরের মর্যাদাটা শোভা পায়।

বুফনের মত টট্টিকেও যদি স্প্যালেত্তি বা এনরিকের মত কোচেরা মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করতেন, আরও এক-দুই বছর আনন্দের সাথেই হয়তো রোমান কলোসিয়ামের শ্রেষ্ঠ গ্ল্যাডিয়েটর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের সাতকাহন শুনিয়ে যেতে পারতেন বিশ্ববাসীকে!

টট্টি-বুফন : বন্ধুত্ব অম্লান

লুসিয়ানো স্প্যালেত্তি চাননি সেটা। এই পুরোটা মৌসুম জুড়েই স্প্যালেত্তির সাথে টট্টির ব্যক্তিত্বের বিরোধটা একরকম প্রকাশ্যই হয়ে গিয়েছিল। বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত টট্টি হয়তোবা মুখ ফুটে কিছু বলেননি, তাই বলে বসে থাকেননি স্ত্রী ইলাইয়া ব্লাসি। ইতালির এই সুপারমডেল প্রকাশ্যেই কিছুদিন আগে স্প্যালেত্তিকে “ছোট মানুষ” হিসেবে অভিহিত করে রোমানদের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা এক স্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন। পঁচিশ বছরের এএস রোমা ক্যারিয়ারে এরকম হাজারবার অবহেলার শিকার হওয়া রোমের অবিসংবাদিত সম্রাট এবার হয়তোবা আর থাকছেন না, বাজতে শুরু করেছে বিদায়ঘন্টা, রোমের লাল অংশের মানুষরা আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করে দিয়েছিল সেটা।

এরকম অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হবার ঘটনা টট্টির জীবনে প্রথম নয় মোটেও। আজন্ম রোমা সমর্থক ব্যাঙ্কের কেরানি লরেঞ্জো টট্টি আর গৃহিনী ফিওরেল্লা টট্টির ঘর আলো করে আসা ছোট ছেলেকে যেভাবেই হোক রোমার হয়েই খেলতে হবে, লরেঞ্জো-ফিওরেল্লার ধনুর্ভঙ্গ পণই ছিল এটা একরকম। টট্টি নিজেও ন্যুটেলা স্যান্ডউইচ খেতে খেতে রোমের রাস্তায় রাস্তায় পায়ে ফুটবল নিয়ে জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনির নকল করতে চাইতেন। সেই জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনি, এএস রোমার ইতিহাসে যেই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার “যুবরাজ” এর তকমা পেয়েছিলেন। কোন একটা বিচিত্র কারণে নিজের শহরের সেরা ক্লাবের নজরেই টট্টি পড়েননি প্রথমে, ফর্তুইদো লুতিদোর-লোডিগিয়ানির মত ক্লাবে নিজের যুব ক্যারিয়ার শুরু করা টট্টির প্রতিভার আলোর ছটা মিলান পর্যন্ত চলে গেলেও রোমার কলোসিয়াম পর্যন্ত সেই প্রতিভার আলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল অনেক পরেই। নব্বইয়ের দশকের সেই সময়ে সাবেক ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনি, তাঁর ডানহাত আদ্রিয়ানো গ্যালিয়ানিকে নিয়ে নিজের স্বপ্নের ক্লাব এসি মিলানকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাব বানানোর চেষ্টায় মত্ত তখন, এই লক্ষ্যেই তখন মিলানের কোচ হয়ে এসেছিলেন প্রথমে আরিগো সাচ্চি, পরে ফ্যাবিও ক্যাপেলো। সাচ্চি-ক্যাপেলোর অধীনে মিলান যে নিজেদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল – সে কথা নাহয় পরে বলা যাবে। মূল বিষয় সেটা না। মূল বিষয় হল মিলানকে এই শ্রেষ্ঠ ক্লাব বানানোর জন্য মিলানের খেলোয়াড় হিসেবে এই টট্টিকে অনেক চেয়েছিলেন ক্যাপেলো-গ্যালিয়ানি। চেয়েছিল জুভেন্টাস-লাৎসিওর মত ক্লাবও। কিন্তু না, ফিওরেল্লার এক কথা, ছেলে রোমা ছাড়া কোথাও খেলবেনা। ১৯৯১ সালে ইউয়েফা কাপের এএস রোমা বনাম ইন্টার মিলানের ফাইনালে বলবয় হিসেবে থাকা ফ্র্যানসেস্কো টট্টির আর কোন বিকল্পও ছিলনা তাই। ১৯৮৯ সালে লাৎসিও, জুভেন্টাস, এসি মিলানের মত ক্লাবের পর রোমার টনক নড়ে – “আরে! শহরে এমন প্রতিভা থাকা সত্বেও আমরা তাকে নিচ্ছিনা কেন!” পরে ফিওরেল্লা নিজেই রোমার যুবদলের কোচ জিলডো জিয়ান্নিনির (যিনি কিনা আবার টট্টির আইডল জিউসেপ্পের বাবা) সাথে যোগাযোগ করে বলেন রোমায় তাঁর ছেলেকে নেওয়ার কথা, ইতোমধ্যেই টট্টির প্রতিভার খবর চলে এসেছিল রোমাতে, তাই তাকে দলে নিতে দ্বিতীয়বার আর ভাবেননি জিলডো। শত ঝঞ্ঝাটের পর রোমায় নাম লেখানোর স্বপ্নপূরণ হয় টট্টির। এককালের আইডল জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনির সাথে হয় ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করার সৌভাগ্য!

আইডলের সাথে, আইডলের পাশে

এই জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনির ভূমিকাও টট্টির জীবনে সুদূরপ্রসারী। টট্টির এক আদর্শ বড়ভাই-ই ছিলেন তিনি বলতে গেলে। “ওকে দেখলে আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যেত। আমরা রুমমেটও ছিলাম। আমি এককালে যা কিছু করার চেষ্টা করতাম, ওকেও আমি ঠিক সেসবই অনুকরণ করতে দেখতাম…” জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনির ভাষ্য। এমনকি নিজের উপার্জন করা টাকা দিয়ে টট্টি যখন নিজের প্রথম গাড়ি হিসেবে একটা “ভক্সওয়াগন গলফ জিটিআই” কিনতে চাইলেন, অর্থের ঝনঝনানিতে ছেলের মাথা বিগড়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত টট্টির মা ফিওরেল্লা ফোন করে বসেন জিয়ান্নিনিকে, উদ্দেশ্য – জিয়ান্নিনি যেন বোঝান এখন টট্টির এত দামী গাড়ি কেনার বয়স হয়নি। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে জিয়ান্নিনির উত্তর শুনে উল্টো স্তব্ধ হয়ে যান ফিওরেল্লা, কেননা জিয়ান্নিনির জীবনের প্রথম গাড়িটাই ছিল মার্সিডিজ বেঞ্জ!

**********

ত এভাবেই নিজের স্বপ্নের ক্লাব এএস রোমার যুবদলের হয়ে খেলা শুরু করলেন টট্টি। নিয়মিত নিজের বয়সের থেকে বড় বয়সের ছেলেদেরকে মাঠে নাকানিচুবানি খাওয়ানো টট্টির প্রতিভা দেখে মুখ হাঁ হতে লাগলো রোমার সকল কোচদের। রোমার তৎকালীন অনুর্ধ্ব-২০ দলের কোচ লুসিয়ানো স্পিনিওসি এই ছেলের খেলা দশমিনিট দেখেই ক্লাবের স্পোর্টিং ডিরেক্টর জর্জিও পেরিনেত্তিকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, কোনভাবেই যেন এই ভবিষ্যৎ সুপারস্টারকে হাতছাড়া করা না হয়! টট্টি ছিলেনই এমন, ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা তাঁর এতটাই ছিল, খেলার ট্যাকটিক্যাল দিকগুলো তাঁর সামনে বিশ্লেষণ করা আর সময় নষ্ট করা – সমানই ছিল!

এরকমই অনুর্ধ্ব-২০ দলের এক খেলায়, আসকোলির বিপক্ষে ১৬ বছরের টট্টি জোড়া গোল করে বসলেন। তা দেখেই কি না, মূলদলের কোচ ভুয়াদিন বোসকভ ব্রেসিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে টট্টিকে মূল স্কোয়াডে রাখলেন।

১৬ বছরের ছেলের চোখে তখন স্বপ্নের রংবেরঙের প্রজাপতির আনাগোনা, তবে এবার কি হবে মূল দলের সাথে খেলার সুযোগ? তবে এবারই কি পূরণ হবে আজন্মলালিত স্বপ্নটা?

ব্রেসিয়ার সাথে খেলায় দ্বিতীয়ার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে আছে রোমা। এমন সময় মাঠে খেলায় ব্যস্ত সার্বিয়ান মিডফিল্ডার (পরবর্তীতে ইন্টার ও লাজিও কিংবদন্তী ও এসি মিলান কোচ) সিনিসা মিহায়লোভিচ। ব্রেসিয়ার কোন এক খেলোয়াড় ইনজুরির কারণে মাঠে শুশ্রূষা নিচ্ছিলেন, এই ফাঁকে মিহায়লোভিচ টাচলাইনে এসে পানি খেতে খেতে কোচ বোসকভকে পরামর্শ দিলেন ১৬ বছর বয়সী বাচ্চাটাকে মাঠে নামানোর জন্য।

“যাও ছেলে, মাঠে নামো…” বোসকভের এই আহবান বুঝতে ভালোই বেগ পেতে হয়েছিল, ঐদিন স্ট্রাইকার রবার্তো মুজ্জির পাশে বসে থাকা ফ্র্যানসেস্কো টট্টি প্রথমে ভেবেছিলেন মুজ্জিকে উদ্দেশ্য করেই হয়তো কথাগুলো বলছিলেন বোসকভ। কিন্তু না, টট্টির ঘোর কাটে মুজ্জির এক কথাতেই, “এই ছেলে, কোচ তোমার সাথে কথা বলছে, যাও কিছুক্ষণ ওয়ার্মআপ কর, তারপর মাঠে নামো…”

ঘোর ঘোর স্বপ্নালু চোখে ত্রস্তপদে বেঞ্চ থেকে দাঁড়ালো টট্টি, স্বপ্ন কি তবে আসলেই বাস্তব হচ্ছে? রোমার হয়ে খেলার স্বপ্ন? রোমার লাল জার্সিটা, যে জার্সিটা এতদিন নিজের শোবার ঘর আলো করে ছিল, যে জার্সি গায়ে এতদিন জিয়ান্নিনি, রুডি ভলার, ফ্যালকাও, সক্রেটিসের মত তারকারা স্টাডিও অলিম্পিকো মাতিয়েছে, সে জার্সি গায়ে দিয়ে রোমাকে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নটা পূরণ হচ্ছে তবে?

অভিষেকের দিনে

ঝাপসা চোখে ছেলেটা দেখলো স্ট্রাইকার রুজিয়েরো রিজিতেলি আস্তে আস্তে টাচলাইনে চলে আসছেন সাবস্টিটিউট হবার জন্য… অর্থাৎ তাকে মাঠে নামতে হবে, এখনই নামতে হবে… আচ্ছা, মা ফিওরেল্লা কি দেখছেন খেলাটা? কিংবা বাবা লরেঞ্জো? তাদের চোখও কি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তটা দেখে? নাহ, দেরী করা ঠিক হচ্ছেনা, এদিকে কোচ কথা বলেই যাচ্ছেন। কি বলছেন কোচ? মাঠে নামতে বলছেন হয়ত, আচ্ছা মাঠে নামতে দেরী হচ্ছে দেখে কি উনি ক্ষিপ্ত? নাহ… এসবকিছু আসলেই সত্যি হচ্ছে…

রোমার হয়ে মাঠে নামলো ফ্র্যানসেস্কো টট্টি!

**********

ভুয়াদিন বোসকভের অধীনে রোমার হয়ে অভিষেক ঘটলেও, ফ্র্যানসেস্কো টট্টির নিয়মিত রোমার হয়ে মাঠে নামা শুরু হয় কোচ কার্লো মাজোনে এর অধীনে। কার্লো মাজোনে – যিনি কিনা নিজেই ছিলেন রোমের সন্তান, রোমের নতুন যুবরাজের মর্ম বুঝেছিলেন ভালোভাবেই। যতদিন রোমার কোচ ছিলেন, টট্টিকে আগলে রেখছিলেন নিজের সন্তানের মতই। মাজোনে আর জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনির ছায়াতলে থেকে টট্টির দিনগুলো তাই কাটতে থাকলো স্বপ্নের মত।

কিন্তু স্বপ্নরা কখনো চিরস্থায়ী হয় না, হয় কি?

টানা তিন-তিনটা মৌসুম কোন শিরোপা না জিততে পারার ব্যর্থতা নিয়ে ক্লাব ছাড়তে হল কার্লো ম্যাজোনে কে, ঐদিকে ক্যারিয়ারের অন্তিমলগ্নে পৌঁছাতে থাকা রোমার এককালের যুবরাজ জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনিও বুঝেছিলেন রোমাতে তাঁর দিনও শেষ, তাই তিনি পাড়ি জমালেন অস্ট্রিয়ান ক্লাব স্টুর্ম গ্রাজ-এ। একা হয়ে গেলেন টট্টি, ক্লাবে যাকে নিজের বাবা আর বড়ভাইয়ের মর্যাদা দিয়েছিলেন তিনি, একে একে চলে গেলেন তাদের সবাই।

প্রিয় কোচ কার্লো ম্যাজোনের সাথে

যাহোক, লেখা শুরু করার সময় বলছিলাম বিদায়বেলার মত এরকম অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হবার ঘটনা টট্টির জীবনে প্রথম নয় মোটেও। সদ্য স্নেহবঞ্চিত টট্টি ঘোর কাটতে কাটতেই নিজেকে আবিষ্কার করলেন নতুন কোচ কার্লোস বিয়াঞ্চির রোষানলের মধ্যে। এই আর্জেন্টাইন কোচ কোন এক বিচিত্র কারণে টট্টিকে সহ্য করতে পারতেন না, দ্রুতই টট্টিকে ক্লাবছাড়া করার জন্য তোড়জোড় শুরু করলেন। অথচ জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনি চলে যাওয়ার ফলে এই মৌসুম থেকেই টট্টির ১০ নাম্বার জার্সি পরার কথা ছিল, সেই স্বপ্নের দশ নাম্বার জার্সি, যে জার্সি পরে খেলার স্বপ্ন তাঁর আজন্মলালিত। বিয়াঞ্চির অধীনে দশ নাম্বার জার্সি পরা কি, ক্লাবে থাকাই দুষ্কর হয়ে গেল টট্টির জন্য। ঘটনা বুঝে টট্টিকে পাওয়ার জন্য লাইন লেগে গেল ইতালিয়ান ক্লাবগুলোর, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জেনোয়া, সাম্পদোরিয়া, এসি মিলান ও জুভেন্টাস। রোমার সন্তান কোনভাবেই এসি মিলান বা জুভেন্টাসে যাবেন না, সেটা ত জানা ছিলই। ফলে জেনোয়া বা সাম্পদোরিয়ার মধ্যে কোন একটা ক্লাবে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেও টট্টির মন পড়ে ছিল রোমাতেই। যদি কোনভাবে কোন ভোজবাজির মত সবকিছু পালটে গিয়ে তাঁর রোমাতে থাকা হয়ে যায়, তাহলেই ত হয়!

উপরে যিনি থাকেন তিনি হয়তো টট্টির প্রার্থনা শুনেছিলেন, লিগ টেবিলের একেবারে নিচের দিকে থাকার অপরাধে রোমা ছাঁটাই করে কোচ কার্লোস বিয়াঞ্চিকে।

**********

রোমাতে টট্টির ক্ষমতাটা সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন চেক কোচ জদেনেক জেমান। অতি-আক্রমণাত্মক মনোভাবাপন্ন হিসেবে সর্বজনবিদিত এই কোচ টট্টিকে ঘিরেই সাজাতে থাকেন তাঁর রণপরিকল্পনা। এই জেমানের অধীণেই মাত্র ২২ বছর বয়সে রোমার অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ডটা ওঠে টট্টির হাতে, যেটা কিনা এখনও সিরি আ তে একটা রেকর্ড। জেমান বুঝতে পেরেছইলেন, একটু অন্তর্মুখী স্বভাবের হলেও এই টট্টির পক্ষেই সম্ভব মাঠে যোগ্য নেতৃত্ব দেবার। ৪-৩-৩ ফর্মেশানে টট্টিকে লেফট উইঙ্গে খেলানো শুরু করলেন জেমান, ফলে আরও স্বাধীনভাবে খেলতে পারলেন টট্টি।

পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই এরকম বিভিন্ন কোচের বিভিন্ন মতাদর্শের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য আক্রমণভাগের প্রায় সব পজিশানেই খেলেছেন টট্টি। একেবারে রোমার যুবদলে যখন ছিলেন, তখন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতেন, মূলদলে ডাক পাওয়ার পরেও স্ট্রাইকারই ছিলেন, জদানেক জেমানের অধীনে স্ট্রাইকার থেকে লেফট উইঙ্গার হয়ে যাওয়া টট্টি পরবর্তী কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলোর অধীনে ৩-৪-১-২ ফর্মেশানে আবার হয়ে গিয়েছিলেন প্লেমেকার বা আদর্শ ”নাম্বার টেন” এর মত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। সামনে দুই স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা আর ভিনসেঞ্জো মন্টেলা আর তাদের পেছনে টট্টি – টট্টির জীবনের প্রথম ও একমাত্র স্কুডেট্টো জেতার রেসিপি ছিল এটাই, বাতলে দিয়েছিলেন কোচ ফাবিও ক্যাপেলো। পরে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার থেকে কোচ লুসিয়ানো স্প্যালেত্তির জন্য আবার “ফলস নাইন” ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হতে হয়েছিল টট্টিকে। মূলত, পেপ গার্দিওলার অধীনে লিওনেল মেসির বিধ্বংসী খেলার কারণ এই “ফলস নাইন” পজিশানে মেসির আগে এই টট্টিই খেলে দেখিয়েছেন এই সিস্টেমটা কিরকম বিধ্বংসী হতে পারে। তখন স্প্যালেত্তির সকল স্ট্রাইকার – যথাক্রমে আন্তোনিও কাসানো, শাবানি নন্দা, ভিনসেঞ্জো মন্টেলা সবাইই ইনজুরিতে পড়েছিলেন, একই সাথে। ফলে নিজের ট্যাকটিকসে একটু পরিবর্তন আনতে হয় স্প্যালেত্তিকে, ৪-৩-৩ ফর্মেশানে টট্টিকে একেবারে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানো শুরু করেন তিনি। কিন্তু টট্টির ভূমিকাটা কিন্তু ট্রেডিশনাল কোন স্ট্রাইকারের মত ছিল না, মাঠে নামলেই টট্টির ভূমিকাটা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের মত হয়ে যেত, ফলে ফর্মেশানটা হয়ে যেত অনেকটা ৪-৬-০ ফর্মেশানের মত, অর্থাৎ স্ট্রাইকারহীন একটা সিস্টেমে খেলত রোমা। মাঠে নেমেই টট্টি অ্যাটাকিং মিডফিল্ড থেকে খেলা পরিচালনা করতেন, তাকে একটু পেছনে রেখে দুই দিক থেকে দুই উইঙ্গার আর এক মিডফিল্ডার মানচিনি, সিমোনে পেরোত্তা আর রড্রিগো তাদেই আক্রমণভাগে প্রতিপক্ষকে একের পর এক আক্রমণে ছিন্নভিন্ন করে দিতেন। স্প্যালেত্তির ট্যাকটিক্সের এই পরিবর্তন আর টট্টির এই নতুন ফর্মেশানে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্যই মূলত টানা দুইবার কোপা ইতালিয়া যেতে রোমা, তিনবার লিগে হয় রানার্সআপ। তিরিশে পা দিয়ে সেবারই টট্টি জাদুতে চতুর্থবারের মত বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ইতালি, বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র চারমাস আগে পা ভাঙ্গা টট্টি, যার কি না কোনভাবেই বিশ্বকাপে খেলার কথা ছিল না, প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর দেশের হয়ে কিছু জয়ের জিগীষার কারণেই পায়ে লোহার প্লেট পরে প্রচন্ড ব্যথা নিয়েই খেলেন বিশ্বকাপ। ইতালির হয়ে সেবার প্রত্যেক ম্যাচ খেলেন তিনি, সাত ম্যাচে এক গোল আর চার-চারটি অ্যাসিস্ট করে ইতালিকে ত বিশ্বকাপ জেতানই, সাথে নিজেও টুর্নামেন্টের সেরা একাদশে জায়গা করে নেন।

স্কুডেট্টো হাতে

আরও পড়ুন…

ফিরে দেখা – রোমার জয়

কার্লো ম্যাজোনে, ভিনসেঞ্জো মন্টেলা, লুইস এনরিকের অধীনে কখনো আদর্শ নাম্বার টেন বা ট্রেকোয়ার্টিস্টা হয়ে খেলা, আবার লুসিয়ানো স্প্যালেত্তি আর রুডি গার্সিয়ার সময়ে “ফলস নাইন” হিসেবে খেলা কিংবা জদানেক জেমানের অধীনে শুধুমাত্র লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলা এই ফ্র্যানসেস্কো টট্টি পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই এরকম বিভিন্ন কোচের অধীনে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় নিজেকে নব নবরূপে আবিষ্কার করেছেন, নিজেকে ভেঙ্গে গড়েছেন বারংবার। ফলে লুইস এনরিকে, লুসিয়ানো স্প্যালেত্তি কিংবা কার্লোস বিয়াঞ্চির মত কোচেরা তাকে না চাইলেও নিজের ক্ষমতা দিয়েই তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন রোমার জন্য তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ! বারবার তাঁর দিকে ধেয়ে আসা সকল কটুক্তি, সকল তামাশার জবাব দিয়েছেন মাঠেই। এমনকি বাজারে টট্টিকে নিয়ে যত কৌতুক শোনা যায় সেসবকিছু নিয়ে একটা বই-ই বের করে বসেছিলেন খেয়ালী এই রাজকুমার, তিনদিনের মাথায় ইতালিতে বেস্টসেলার হওয়া সেই বই থেকে আসা সকল অর্থ চলে যায় ইউনিসেফের তহবিলে, ঠিক যেমনটা চলে গিয়েছিল লিওনেল মেসির জার্সি থেকে আসা অর্থটাও, গত মৌসুমে বার্সেলোনা বনাম এএস রোমার প্রাকমৌসুম এক ম্যাচের শেষে জার্সি বদল করেছিলেন এই দুই কিংবদন্তী!

ফ্র্যানসেস্কো টট্টি কি শুধুই রোমারই সম্রাট? ইতালিরও কি নন? একটুর জন্য নিজের দেশকে ২০০০ ইউরো জেতাতে পারেননি যিনি, ছয়বছর পর আক্ষরিক অর্থে এক পা নিয়ে খেলে যে খেলোয়াড় দলকে বিশ্বকাপ জেতাতে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখতে পারেন, তাকে কি ইতালির সম্রাট হিসেবে আখ্যায়িত করাটা অযৌক্তিক কিছু হবে? পেট্রোডলারের ঝনঝনানির এই যুগে কেবলমাত্র একটা ক্লাবেই সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়া বিরলপ্রজ এই খেলোয়াড় হয়ত ২০০২ সালেই ইতালিকে এনে দিতে পারতেন বিশ্বকাপ, দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ন্যাক্কারজনক রেফারিং-এর শিকার যদি হতে না হত ইতালিকে। ক্যারিয়ারে অর্ধেকেরই বেশী সময় অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ট্রেকোয়ার্টিস্টার ভূমিকায় খেলা টট্টি গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরি, লুকা টনি, ফিলিপ্পো ইনজাঘি, অ্যালেসসান্দ্রো দেল পিয়েরোর মত স্ট্রাইকারদের থেকেও বেশী গোল করেছেন, এটাও কি তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের আরেক নিয়ামক নয়? আরও কিছুদিন নিয়মিত খেললে হয়ত সিলভিও পিওলাকে টপকে সিরি আ এর ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী গোলদাতাই হতেন তিনি, আর মাত্র চব্বিশটা গোলই ত লাগত!

বিশ্বজয়ী টট্টি

এএস রোমার হয়ে ৭৮৫ ম্যাচ, ৩০৭ গোল, একটি লিগ শিরোপা, দুটি করে কোপা ইতালিয়া আর সুপারকোপা জেতার পর সদ্য অবসর নেওয়া টট্টি এখন আয়নায় নিজেকে যখন দেখবেন, তিরিশ বছর আগে জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনিকে ছাড়িয়ে যেতে চাওয়া হাজারো স্বপ্ন বোনা সেই শিশুটা কালের বিবর্তনে কিভাবে কিভাবে রোমের একমেবাদ্বিতীয়ম সম্রাট হয়ে গেছেন, তাঁর এই উত্থানে তিনি কি গর্বিত হবেন না? অবশ্যই হবেন, না হয়ে পারেনই না।

যেমনটা পারিনা আমরা, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্য লাস্ট রোমান গ্ল্যাডিয়েটরের কোটি কোটি ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীরা!

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “বলবয় থেকে রোমান সম্রাট : এক ফ্র্যান্সেসকো টট্টির সাতকাহন

মন্তব্য করুন

eighteen + nine =