মাতিপে সওয়ার লিভারপুলের ডিফেন্স

এইবার দলবদলের বাজারে প্রায় প্রত্যেকটা বড় ক্লাবই নিজেদের সেন্ট্রাল ডিফেন্সকে আরও শক্তিশালী করার জন্য বেশ কিছু নতুন খেলোয়াড় এনেছে। আর্সেনালে এসেছেন জার্মান সেন্টারব্যাক শকোদ্রান মুস্তাফি, ম্যানচেস্টার সিটি নিয়ে এসেছে তরুণ ইংলিশ সেন্টারব্যাক জন স্টোনস কে, হোসে মরিনহো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে এসেই আইভোরিয়ান তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল সেন্টারব্যাক এরিক বাইয়িকে নিয়ে এসেছেন। প্যারিস সেইন্ট জার্মেইতে কিছু সময় থাকার পর আবারো চেলসিতে ফিরে এসেছেন ব্রাজিলিয়ান সেন্টারব্যাক ডেভিড লুইজ। বসে ছিল না লিভারপুলও, তারাও ২৫ বছর বয়সী ক্যামেরুনিয়ান সেন্টারব্যাক জ্যল মাতিপ কে এনে তাদের ডিফেন্সকে করেছে শক্তিশালী।

তবে একটা জিনিস বলতেই হয়, স্টোনস বলুন বা মুস্তাফি, বাইয়ি বা লুইজ, কেউই কিন্তু বিশাল ট্রান্সফার ফি ছাড়া তাঁদের নতুন ক্লাবগুলোতে আসেননি। এই যেমন মুস্তাফিকে ভ্যালেন্সিয়া থেকে আনতে গিয়ে আর্সেনালকে মোটামুটি ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে, যা কিনা একটা ডিফেন্ডারের পেছনে আর্সেনালের খরচ করা সর্বোচ্চ পরিমাণ মূল্য। ওদিকে ৪৭.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে এভারটন থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে গিয়ে ত ফুটবল ইতিহাসেরই দ্বিতীয় সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় হয়ে গিয়েছেন জন স্টোনস। ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল এক ট্রান্সফার ফি’র বিনিময়ে স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়াল থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে হোসে মরিনহোর ছত্রছায়ায় এসেছেন তরুণ আইভোরিয়ান ডিফেন্ডার এরিক বাইয়ি, আর নিজের সাবেক ক্লাবে ডেভিড লুইজকে ফেরানোর জন্য চেলসিকে খসাতে হয়েছে ৩৪ মিলিয়ন পাউণ্ড।

এদের সবার থেকে প্রথম থেকে এই জায়গাতে ভিন্ন ছিলেন যিনি এই মৌসুমে লিভারপুলের সেন্ট্রাল ডিফেন্সকে শক্তিশালী করতে এসেছেন। তিনি ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির ক্যামেরুনিয়ান সেন্টারব্যাক জ্যল মাতিপ, জার্মান ক্লাব শালকে ০৪ থেকে হয়েছে যার আগমন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, শালকের সাথে ১৬ বছর থাকার পর তাঁর সাথে আর চুক্তি নবায়ন না করতে চাওয়ায় লিভারপুল এই মৌসুমে মাতিপকে এনেছে একটা পয়সাও খরচ না করে, ফ্রি তে!

মাতিপের সামর্থ্য সম্বন্ধে ক্লপ জানতেন সেই শালকে থেকেই
মাতিপের সামর্থ্য সম্বন্ধে ক্লপ জানতেন সেই শালকে থেকেই

বিশাল বিশাল ট্রান্সফার ফি তে উক্ত ক্লাবগুলোতে আসার ফলে এই মৌসুম শুরু পর থেকে স্বভাবতই সবার নজর বাইয়ি-স্টোনস-মুস্তাফি-লুইজদের দিকেই ছিল। জ্যল মাতিপ একে ত বিশাল ট্রান্সফার ফি’র বিনিময়ে আসেননি, তাঁর উপর তাঁকে ব্রিটিশ মিডিয়া তেমন একটা চেনেও না। ফলে স্পটলাইটহীন জীবনেই একরকম প্রথম থেকেই নিজের কাজ করে যাচ্ছেন মাতিপ।

তাতে তাঁর কৃতিত্ব বিন্দুমাত্রও কমে যায়নি। শালকের হয়ে নিয়মিত লেফান্ডোভস্কি-অবামেয়াং-মুলার-গতসা-হার্নান্দেজ দের মত অ্যাটাকারদের সামলানো মাতিপ এই ২৫ বছর বয়সেই ইতোমধ্যে শালকের হয়ে খেলে ফেলেছিলেন দুই শতাধিক ম্যাচ। আর বুন্দেসলিগায় বহুদিন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের ম্যানেজার থাকার সুবাদে বর্তমান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও জানতেন মাতিপের সামর্থ্য সম্পর্কে। হয়তোবা ডর্টমুণ্ডে থাকাকালীন সময়েই মাতিপকে চেয়েছিলেন নিজের ক্লাবে, কিন্তু বিধি বাম, শালকে যে ডর্টমুন্ডের সবচেয়ে বড় শত্রু! শত্রুশিবির থেকে খেলোয়াড় টানার কাজটা যে মোটেই সহজ হবেনা সেটা ক্লপ ভালোই জানতেন। তাই হয়তোবা ভেবে রেখেছিলেন কখনো অন্য ক্লাব ম্যানেজ করলে সবার আগে এই মাতিপকেই নিয়ে আসবেন নিজের ছত্রছায়ায়।

সুযোগ আসলো এবার। ইয়ুর্গেন ক্লপও ডর্টমুন্ড ছেড়ে লিভারপুলে এসেছেন, আর লিভারপুলও সেন্ট্রাল ডিফেন্সের কারণে বেশ বহুদিন ধরেই সমস্যায় ছিল। ওদিকে শালকেতেও মাতিপ আর নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হতে চাচ্ছিলেন না, ১৬ বছর এক ক্লাবে থাকার পর বোধকরি নতুন চ্যালেঞ্জের জয় উতলা হয়ে উঠেছিল তাঁর মন। ফলে দুইয়ে দুইয়ে একেবারে চার মিলে গেল। ফ্রি ট্রান্সফারে জ্যল মাতিপকে লিভারপুলে নিয়ে আসলেন ক্লপ। এবং এসেই মিলিয়ন মিলিয়ন পাউণ্ডের বিনিময়ে আসা বাইয়ি-স্টোনস-মুস্তাফি-লুইজদের থেকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে যাচ্ছেন এই ক্যামেরুনিয়ান।

লিভারপুলে এসেই তিনি যে কাজটা করেছেন সেটা হল গত দুই মৌসুম ধরেই একরকম ফ্লপ থাকা ক্রোয়েশিয়ান সেন্টারব্যাক দেয়ান লভরেনকে ফর্ম ফিরিয়ে আনাতে সাহায্য করেছেন। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে মাতিপ-লভরেন জুটিই এখন ক্লপের এক নাম্বার পছন্দ, ফলে জায়গা পাচ্ছেন না ফরাসী সেন্টারব্যাক মামাদু সাখো।  যার কারণে সামনের দলবদলের বাজারে সাখো যদি লিভারপুল ছেড়েও দেন, আশ্চর্যের কিছুই থাকবেনা। গত দুই মৌসুম ধরে বাজে ফর্মের জন্য উঠতে বসতে সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে দেয়ান লভরেনকে। এখন পাশে মাতিপকে সেন্টার ডিফেন্সিভ পার্টনার হিসেবে পেয়ে লভরেনের খেলাতেও দেখা যাচ্ছে উত্তরোত্তর উন্নতি। একজন একেবারে নো-ননসেন্স ফিজিক্যাল ডিফেন্ডার (দেয়ান লভরেন), যিনি কিনা একরকম শক্তি ও কড়া ট্যাকলিংয়ের উপরে নির্ভর করে ডিফেন্স করেন, আরেকজন শান্ত-সৌম্য বল প্লেয়িং একজন সেন্টারব্যাক (জ্যল মাতিপ), শারীরিক শক্তি ব্যবহার না করে কেবলমাত্র খেলাটার গতিপথ বুঝে, তুখোড় পজিশনিং ও পাসিং সেন্স দিয়ে একেবারে ডিফেন্স থেকে লিভারপুলের খেলাটা গড়ে দিতে পছন্দ করেন – সুতরাং বলা যায় দুইজন একেবারেই দুই গোত্রের ডিফেন্ডার, যারা জুটি বেঁধে লিভারপুলের ডিফেন্সকে উদ্ধার করছেন একের পর এক সপ্তাহ। অনেকটা কিছু মৌসুম আগের মার্টিন স্কার্টেল আর ড্যানিয়েল অ্যাগারের পার্টনারশিপের মত।

লভরেনের সাথে পার্টনারশিপটাও জমেছে বেশ
লভরেনের সাথে পার্টনারশিপটাও জমেছে বেশ

একেবারে ডিফেন্স থেকে খেলাটা গড়তে পছন্দ করেন মাতিপ। বল পায়ে পাসিংয়ে তাঁর দুর্দান্ত দক্ষতার কারণে প্রায়ই তিনি আরেকজন অতিরিক্ত মিডফিল্ডারের ভূমিকাই পালন করেন বলতে গেলে, অন্যান্য মিডফিল্ডারদের সাথে গেইম-প্লে তে অংশ নেন নিয়মিত। গত সপ্তাহে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে খেলাটার কথাই যেমন ধরা যাক, তাঁর শুরু করা একটা আক্রমণের জের ধরেই দ্বিতীয়ার্ধে ঐ প্রান্তে ইউনাইটেড গোলরক্ষক ডেভিড ডা হেয়াকে পরীক্ষা নিয়েছিলেন জার্মান মিডফিল্ডার এমরে চ্যান অসাধারণ এক শটে, যদিও ডা হেয়া সেটা আটকে দেন। আবার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচকেও পুরো ম্যাচে একেবারে চুপ রাখার একমাত্র কৃতিত্ব ছিল এই মাতিপের। ডি-বক্সের মধ্যে ইব্রা যে তিনবারের বেশী বলের স্পর্শ পেলেন না, তিনবার যে তাঁর পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া হল, একবার যে কড়া ট্যাকলিংয়ের শিকার হলেন, ম্যাচের শেষের দিকে যে মরিনহো ইব্রাকে উঠিয়ে নিতে বাধ্য হলেন, তাঁর কৃতিত্ব শুধুমাত্র জ্যল মাতিপকেই দিতে হবে। পুরো ম্যাচে ইব্রা গোল বরারবর শট নিতে পেরেছিলেন মাত্র একটা, অফসাইডের ফাঁদে পা দিয়েছেন তিন-তিনবার। শুধু ইব্রা বলেই না, লেস্টার সিটির বিপক্ষে খেলার সময় জেইমি ভার্ডি, চেলসির সাথে খেলার সময় ডিয়েগো কস্টা, টটেনহ্যামের সাথে খেলার সময় হ্যারি কেইন – কেউই মাতিপের বিপক্ষে বলতে গেলে সেরকম কোন সুযোগই পাননি ঝলসে ওঠার।

ইব্রাহিমোভিচের সাথে টক্কর দিয়েছেন সেয়ানে-সেয়ানে
ইব্রাহিমোভিচের সাথে টক্কর দিয়েছেন সেয়ানে-সেয়ানে

শুধুমাত্র ইউনাইটেড বলেই না। এই সপ্তাহে ওয়েস্ট ব্রমের সাথেও মাতিপের পারফরম্যান্স ছিল মনে রাখার মত। এগারোটা ক্লিয়ারেন্সের পাশাপাশি একটাও এরিয়াল  ডুয়েল বা বাতাসে ভেসে আসা বল মোকাবিলায় হেরে যাননি তিনি প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের কাছে। ৪৬ বল প্রতিপক্ষের সীমানায় বল পাঠিয়েছেন ৮২% পাস সফলতা দিয়ে।

খেলার কোন পর্যায়েই মাথা গরম করে কোন উল্টোপাল্টা সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি এখনো পর্যন্ত মাতিপকে। ঠান্ডা মাথায় নিজের দুর্দান্ত পজিশনিং সেন্সের সুবিধা নিয়ে ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিগুলোতেও যথেষ্ট পরিপক্কতার সাথে বিপক্ষ স্ট্রাইকারদের ভালো খেলতে বাধা দেন তিনি। এখন সেট-পিস সামলানোর ক্ষেত্রে যদি মাতিপ বা লভরেন আরেকটু দূরদর্শিতার পরিচয় দেন, লিভারপুল শিরোপা জয়ের যে অনেক কাছাকাছি চলে যাবে, সে কথা বলাই যায়।

ফ্রি তে ইয়ুর্গেন ক্লপ এর থেকে ভালো কিছু পেতে পারতেন? মনে হয় না!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 × 2 =