মারিও মানজুকিচ – জুভেন্টাসের গোপন অস্ত্র

গত মৌসুমে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ দামী স্ট্রাইকার হিসেবে এবং ইতালিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বেশী দামী দলবদলের অংশ হিসেবে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার গঞ্জালো হিগুয়াইন যখন নাপোলি থেকে জুভেন্টাসে আসলেন, সবাই মোটামুটি ধরেই নিয়েছিলেন, মাত্রই এক মৌসুম আগে স্প্যানিশ ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ থেকে দলে আসা ক্রোয়েশিয়ান স্ট্রাইকার মারিও মানজুকিচের মূল একাদশে থাকার সময় বুঝি শেষই হয়ে এল। কারণ জুভেন্টাস কোচ ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রি দলকে মূলত যেই ফর্মেশানে খেলান, সেই ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে মূলত তিনজন প্রথাগত স্ট্রাইকার একসাথে খেললে দলের গেইমপ্ল্যান ও কম্বিনেশান নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, ফরোয়ার্ড লাইনে তিনজন টার্গেটম্যানের জায়গাও নেই এই ফর্মেশানে বলতে গেলে, আর খেলানো গেলেও তাদের মধ্যে রসায়ন না থাকার সম্ভাবনাটাই প্রবল।

ট্যাকটিক্সের পরিবর্তনটা আসলো জানুয়ারিতে। অ্যালেগ্রি দেখলেন, দলের সবচেয়ে বেশী সৃষ্টিশীল আর দরকারি পাঁচজন খেলোয়াড় (হিগুয়াইন, ডাইবালা, মানজুকিচ, পিয়ানিচ আর কুয়াড্রাডো) সবাইকে একইসাথে সফলভাবে ৩-৫-২ বা ৪-২-৩-১ কোন ফর্মেশানেই খেলানো যাচ্ছেনা, তাদের নিজ নিজ পজিশান বহাল রেখে। কিন্তু অ্যালেগ্রি নাছোড়বান্দা, তার এই পাঁচজনকে খেলানো লাগবেই। তাহলে এমন কিছু একটা করতে হবে যাতে কোন খেলোয়াড়কে নিজের স্বাভাবিক পজিশানটা পরিবর্তন করতে হয়, যাতে সবাই-ই ভালোভাবে খেলতে পারেন, এটা বুঝেছিলেন তিনি। এবং এর মাধ্যমেই অ্যালেগ্রি তার পোড় খাওয়া ম্যানেজেরিয়াল ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। সারাজীবন লম্বা, শক্তিশালী টার্গেটম্যানের ভূমিকায় খেলা মারিও মানজুকিচকে বানালেন লেফট উইঙ্গার!

বদলে যাওয়া মানজুকিচ

৪-২-৩-১ ফর্মেশানে একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা শুরু করলেন গঞ্জালো হিগুয়াইন, তার একটু পিছে প্রথাগত ”নাম্বার টেন” এর ভূমিকায় দেখা গেল আরেক আর্জেন্টাইন, “নতুন মেসি” নামে খ্যাত পাবলো ডাইবালাকে, ডান উইংয়ে খেলা শুরু করলেন কলম্বিয়ান উইঙ্গার হুয়ান কুয়াড্রাডো আর তাদের পেছনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে রাখা হল মিরালেম পিয়ানিচকে। বাকী থাকে লেফট উইং পজিশানটা। অ্যালেগ্রি সেখানেই জানুয়ারি থেকে খেলানো শুরু করলেন মারিও মানজুকিচকে। আর ফলটাও পাওয়া শুরু করলেন হাতেনাতে। এই ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনের পর সিরি আ তে জুভেন্টাস ১০ ম্যাচে ড্র করেছে কেবলমাত্র একটি, বাকীসব জিতেছে। কোপা ইতালিয়া আর চ্যাম্পিয়নস লিগেও অপরাজিত তারা।

কিন্তু অ্যালেগ্রি কিভাবে বুঝলেন যে মারিও মানজুকিচের মত এরকম একটা শক্তিশালী সুযোগসন্ধানী টার্গেটম্যানকে এভাবে বাম উইংয়ে এত স্বচ্ছন্দভাবে খেলানো যাবে? ঘটনার শুরু খুব সম্ভবত হয়েছিল গত ইউরোতে। যখন কিনা পেছনে লুকা মডরিচ, মাতেও কোভাচিচ, ইভান পেরিসিচ, মার্সেলো ব্রোজোভিচ, ইভান রাকিটিচের মত বিশ্বের সেরা সেরা মিডফিল্ডারদের থাকার পরেও টার্গেটম্যান মারিও মানজুকিচ গোল করতে ব্যর্থ হলেন। বয়স হচ্ছে তিরিশ ছুঁই ছুঁই, ডি-বক্সে থেকে গোল করার সেই প্রবণতাটা যে আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে, সেটা বাকী সবার মত লক্ষ্য করেছিলেন অ্যালেগ্রিও। তাই বুঝি হিগুয়াইনকে নিয়ে আসার জন্য এত তোড়জোড় শুরু করেছিলেন তিনি গত মৌসুমেই। কিন্তু তাই বলে মানজুকিচকে একেবারে ফেলে দেননি তিনি। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির, প্রায় ২০০ পাউন্ড ওজনের এই বিশালদেহী শক্তিশালী স্ট্রাইকার, ডি-বক্সে খেটে খেলার জন্য যার সুনাম আছে, অ্যালেগ্রি ঠিক করলেন মানজুকিচের উপর থেকে গোল করার দায়িত্বটা সরাতে হবে, বরং সতীর্থ হিগুয়াইন আর ডাইবালা যাতে অ্যাটাকিং থার্ডে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোল করার সুযোগ পায়, সেদিকেই বরং মানজুকিচের মনোযোগটা সরিয়ে দিলেন অ্যালেগ্রি। বাম উইংয়ে থেকে প্রতিপক্ষ রাইটব্যাককে তটস্থ রাখা, উইঙ্গারের আড়ালে একটা লুকায়িত লেফটব্যাকের ভূমিকা পালন করা শুরু করলেন মানজুকিচ। এবং এক্ষেত্রে মানজুকিচের শারীরিক সক্ষমতাটা অনেক বেশী ভূমিকা রাখা শুরু করল। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা দেখলেন এককালের শক্তিশালী সেন্টার ফরোয়ার্ড এখন গোল করা বাদ দিয়ে শরীরের শক্তি দিয়ে উইংয়ের বাম প্রান্তে অহরহ ট্যাকল করে যাচ্ছেন, লেফটব্যাক অ্যালেক্স সান্দ্রোর সাথে মিলে জুভেন্টাসের বামদিকটাকে একবারে নিশ্ছিদ্র করে রাখছেন, আক্রমণে যাওয়ার চেয়ে কিংবা গোল করার চেয়ে বামদিকে ক্রমাগত ওঠানামা করাটাই এখন যার কাছে মুখ্য। এই লেফট উইং পজিশানটার জন্য জুভেন্টাসের স্কোয়াডে আরেক ক্রোয়েশিয়ান মার্কো পিয়াকা যদিও ছিলেন, কিন্তু তার রক্ষণে বেশী মনোযোগ না থাকার কারণে মানজুকিচকেই এভাবে নতুন করে সৃষ্টি করলেন যেন অ্যালেগ্রি!

হ্যাঁ, এটা ঠিক, প্রথাগত উইঙ্গারদের মত দুর্ধর্ষ গতি আর ট্রিক দিয়ে হয়তোবা মানজুকিচ আক্রমণে এখন অতটা গুরুত্ব দিতে পারেন না, পুরো মৌসুমে সিরি আ তে সাতটা গোল আর ৪টা অ্যাসিস্ট যার প্রমাণ, কিন্তু এটাও সত্যি, মানজুকিচের এরকম অ-প্রথাগত উইঙ্গারে রূপান্তরিত হওয়াটাই জুভেন্টাসকে এখন তার স্কোয়াডের বাকী চারটা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে (হিগুয়াইন, ডাইবালা, পিয়ানিচ, কুয়াড্রাডো) স্বাভাবিকভাবে খেলার লাইসেন্সটা দিচ্ছে।

মানজুকিচ বিশাল শারীরিক গড়নের হওয়ায় কোন রাইটব্যাক ত তার সাথে পেরে ওথেননই না বলতে গেলে, সাথে মানজুকিচের উপস্থিতির ফলে জুভেন্টাসের লেফটব্যাক অ্যালেক্স সান্দ্রো বা কাওয়াদো আসামোয়াও মাঝেমাঝে সুন্দরভাবে ওভারল্যাপ করে আক্রমণ শানাতে পারেন, স্ট্রাইকারদের অ্যাসিস্ট করে দিয়ে আসতে পারেন। মানজুকিচের এই পজিশনাল পরিবর্তনের কারণে আরেকটা যে মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে সেটা হল সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার লিওনার্দো বোনুচ্চি, যিনি কিনা বল পায়ে তার দক্ষতার কারণে ডিফেন্সের অ্যান্দ্রেয়া পিরলো নামে খ্যাত, তিনিও স্বচ্ছন্দে তার দলের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের লম্বা লম্বা নিশানার পাস দিতে পারছেন। জুভেন্টাস বনাম পোর্তোর চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচটাই দেখুন, পরথম নয় মিনিটের মধ্যেই দুই-দুইবার বোনুচ্চিকে দেখা গেছে মানজুকিচকে লক্ষ্য করে লম্বা পাস দিতে। বোনুচ্চির এই ক্ষমতাটাও অ্যালেগ্রিকে একেবারে ডিফেন্স থেকে আক্রমণ শানাতে সাহায্য করছে। ট্যাকটিক্যালি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত, বল পায়ে দক্ষ, ক্রমাগত বিরতীহীন ভাবে দৌড়াতে পারা খেটে খেলা একজন খেলোয়াড় হবার ফলে মারিও মানজুকিচ এখন একই সাথে একজন স্ট্রাইকার, একজন লেফট উইঙ্গার এবং একজন লেফটব্যাক!

মজার ব্যাপার হল, জুভেন্টাসের দুই উইংয়ে যে এরকম দুটো সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী উইঙ্গার আছে, তাদের মধ্যে পারফরম্যান্সের কিন্তু বিশেষ কোন ফারাক নেই। জানুয়ারি থেকে অ্যালেগ্রি যে ৪-২-৩-১ ফর্মেশান নিয়ে দলকে খেলাচ্ছেন, তখন থেকে হিসাব করা শুরু করলে দেখা যাবে চতুর, ট্রিকি এবং অস্বাভাবিক দ্রুত প্রথাগত উইঙ্গার হুয়ান কুয়াড্রাডো ডানদিক থেকে দুই গোল, এক অ্যাসিস্ট আর ১৬ টা “কি-পাস” দিয়েছেন। অপরদিকে অ-প্রথাগত, কুয়াড্রাডোর তুলনায় অনেক ধীরগতির ও ট্যাকলে মনোযোগী উইঙ্গার হয়েও মানজুকিচ গোল করেছেন একটি, অ্যাসিস্টও করেছেন একটি, আর ”কী-পাস” দিয়েছেন ১৩টি। খারাপ কি! দুইজনই দুইজনের মত করে প্রতিপক্ষের চিন্তার কারণ হচ্ছেন, এটাও জুভেন্টাসের ট্যাকটিক্যাল সামঞ্জস্যের অন্যতম একটা উদাহরণ।

মানজুকিচের এই ভূমিকার সাথে ২০১০ সালের সর্বজয়ী ইন্টার মিলান দলের ক্যামেরুনিয়ান স্ট্রাইকার স্যামুয়েল এতোর ভূমিকার একটা তুলনা করা যেতে পারে। বার্সেলোনাতে একমাত্র স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলা এতোকে তখন মরিনহো ইন্টার মিলানে ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফর্মেশানে উপরের দুইজন স্ট্রাইকারের একজন হিসেবে খেলালেও মাঠে দেখা যেত এতোর ভূমিকাটা অনেকটা উইঙ্গারের মত হয়ে গেছে। ফলে তিনি ডিফেন্ডারদের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হতেন, আর ফলে গোল করার কাজটা সুবিধাজনক হত আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার ডিয়েগো মিলিতোর জন্য। মানজুকিচের এই ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনের জন্য বার্সেলোনার মত দলকে হারিয়ে জুভেন্টাস আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে, ভাবা যায়! দানি আলভেস চলে যাওয়ার ফলে (সেই জুভেন্টাসেই গিয়েছেন) বার্সার রাইটব্যাক পজিশানটা এখন সবচাইতে দুর্বল, আর ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রিও মানজুকিচ নামক গোপন অস্ত্র দিয়ে ঠিক সেইখানেই আঘাত করেছেন বারংবার।

এই মৌসুমে জুভেন্টাস যদি বিশ্বজয়ী কোন একটা ক্লাবেও পরিণত হয়, ইতিহাস কিন্তু বেশী গোল করা বা অ্যাসিস্ট করার জন্য হিগুয়াইন বা ডাইবালাদেরই মনে রাখবে, কিন্তু আসল কাজটা করছেন কিন্তু এই মানজুকিচই, যার কারণে স্কোয়াডের সবাই-ই নিজেদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও সামর্থ্যের বহিপ্রকাশ ঘটিয়ে খেলতে পারছেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

20 + eleven =