হালির লজ্জা ইউনাইটেডের

গত ম্যাচে বাস পার্ক করে হোক, নেতিবাচক ফুটবল খেলে হোক আর যেভাবেই হোক, ফর্মের তুঙ্গে থাকা লিভারপুলকে কোনরকমে 0-0 ড্র তে আটকে রেখে এক পয়েন্ট নিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যানেজার হোসে মরিনহো। কিন্তু এই সপ্তাহে আর এই ট্যাকটিক্স খাটলো না তাঁর, ফলে তাঁর “ঘরে ফেরাও” মধুর হল না। চেলসির কিংবদন্তী ম্যানেজার হোসে মরিনহো তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম নিজের নতুন দল কে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর সাবেক কর্মস্থল স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে। কিন্তু তাঁর সাবেক শিষ্যরা তাঁকে মনে রাখার মত কোন উপহার দেননি, উলটো ৪-০ গোলে হারার লজ্জা নিয়ে ম্যানচেস্টারে ফিরেছেন হোসে মরিনহো।

নিজের সাবেক শিষ্যদের বধ করার জন্য সেই চির পরিচিত ৪-২-৩-১ ফর্মেশানের উপরেই আস্থা রাখেন হোসে মরিনহো। গোলবারে চিরবিশ্বস্ত স্প্যানিশ গোলরক্ষক ডেভিড ডা হেয়ার সামনে ইংলিশ সেন্টারব্যাক ক্রিস স্মলিং ও আইভোরিয়ান সেন্টারব্যাক এরিক বাইয়ির জুটি, দুই ফুলব্যাক হিসেবে দুইদিকে কলম্বিয়ান রাইটব্যাক আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া ও ডাচ লেফটব্যাক ডেলেই ব্লিন্ড। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে বেলজিয়ান মারুয়ান ফালাইনির সাথে গত সপ্তাহে দুর্দান্ত খেলা স্প্যানিয়ার্ড এরিক হেরেরার সামনে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় পল পগবা, আর দুই উইংয়ে খেলেছেন দুই ইংলিশ মার্কাস র‍্যাশফোর্ড ও হেসে লিনগার্ড। স্ট্রাইকে ছিলেন যথারীতি সুইডিশ সুপারস্টার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ। ইনজুরির কারণে দলে রাখা হয়নি দলের অধিনায়ক ওয়েইন রুনি কে।

ওদিকে জুভেন্টাসের সাবেক কোচ আন্তোনিও কন্তে চেলসিতে আসার পর থেকেই ইতালিয়ান লীগে তাঁর পরীক্ষিত ৩-৪-৩ ফর্মেশানকে বহুদিন ধরেই চেলসির খেলায় প্রয়োগ করতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু ইনজুরির কারণে হোক বা দলে খেলোয়াড় না থাকার কারণে হোক সেই ফর্মেশান ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারছিলেন না চেলসিতে। এতদিন পর গত তিন সপ্তাহ ধরেই নিজের প্রিয় ৩-৪-৩ ফর্মেশানে চেলসিকে খেলাতে পারছেন তিনি, ফলও পাচ্ছেন হাতেনাতে। সেদিনও ইউনাইটেডের বিপক্ষে ৩-৪-৩ ফর্মেশানেই দল সাজিয়েছিলেন তিনি। স্প্যানিশ ফুলব্যাক সেজার অ্যাজপিলিক্যুয়েটা, ইংলিশ সেন্টারব্যাক গ্যারি ক্যাহিল ও ব্রাজিলিয়ান সেন্টারব্যাক ডেভিড লুইজকে বসিয়েছিলেন তিনি বেলজিয়ান গোলরক্ষক থিবো কোর্টোয়ার সামনে, তিন সেন্টারব্যাক হিসেবে। দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেছেন সার্বিয়ান মিডফিল্ডার নেমানিয়া মাতিচ ও এই মৌসুমেই চ্যাম্পিয়ন লেস্টার সিটি থেকে দলে আসা ফরাসী মিডফিল্ডার এনগোলো কান্তে। দুই উইংব্যাক হিসেবে মাঠে নামানো হয়েছিল নাইজেরিয়ান ভিক্টর মোজেস ও এই মৌসুমেই ফিওরেন্টিনা থেকে দলে আসা স্প্যানিশ লেফটব্যাক মার্কোস আলোনসোকে। দুই উইংয়ে স্প্যানিশ পেদ্রো রদ্রিগেজ ও স্ট্রাইকে ডিয়েগো কস্টা – এরকমই ছিল চেলসির লাইনআপ। ইনজুরির কারণে মূল একাদশে জায়গা পাননি চেলসির কিংবদন্তী অধিনায়ক জন টেরি।

ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই চেলসি বুঝিয়ে দেয় তাদের সাবেক কোচের জন্য বিন্দুমাত্রও ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় তারা। খেলা শুরুর মাত্র একত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই স্বদেশী মার্কোস আলোনসোর অ্যাসিস্ট থেকে গোল করে ইউনাইটেডের সমর্থকদের গলার আওয়াজকে নিঃশব্দ করে দেন স্প্যানিশ উইঙ্গার পেদ্রো রদ্রিগেজ। গোলটার মাহাত্ম্য আরও বেশী বেড়ে যায় এই কথা জানলে যে ঐ একত্রিশ সেকেন্ডে ইউনাইটেডের কোন খেলোয়াড়ই একবারের জন্যও বল স্পর্শ করতে পারেননি। উলটো মোজেস আর গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়া ছাড়া চেলসির সবাই-ই ঐ ১২ পাসের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন যে ১২ পাসের পর পেদ্রোর গোলটা হয়!

একুশ মিনিটে আবারো এগিয়ে যায় চেলসি। ইডেন হ্যাজার্ডের কর্নার থেকে গোল করে চেলসিতে দুই গোলে এগিয়ে দেন ইংলিশ সেন্টারব্যাক গ্যারি ক্যাহিল। প্রথমার্ধে এরকম অবস্থায় মারুয়ান ফালাইনিকে বাজেভাবে ট্যাকল করার জন্য লাল কার্ড খেতে পারতেন চেলসি সেন্টারব্যাক ডেভিড লুইজ, কিন্তু রেফারি মার্টিন অ্যাটকিনসন একটা হলুদ কার্ড দেখিয়েই ছেড়ে দেন তাঁকে। ম্যাচে একটা মুহূর্তের জন্যও ইউনাইটেডের খেলা দেখে মনে হয়নি তারা চেলসিকে হারাতে পারে। যেটার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে দ্বিতীয়ার্ধে আট মিনিটের ব্যবধানে ইডেন হ্যাজার্ড ও এনগোলো কান্তের কাছ থেকে আরও দুটো গোল খেয়ে বসলে। পূর্ণ এক হালি গোল খাওয়ার লজ্জা নিয়ে মাঠ ছাড়ে মরিনহো বাহিনী।

এই ম্যাচের যথারীতি নিজের জঘন্য খেলার ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী ট্রান্সফার ফি তে দলবদল করা পল পগবা। তাঁর সাথে জঘন্য খেলেছেন সুইডিশ তারকা ইব্রাহিমোভিচও। গত ম্যাচে দুর্দান্ত খেললেও এই ম্যাচে আবারো হারিয়ে গেছেন অ্যান্ডার হেরেরা, ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটা মূলত তাঁর ভুল ক্লিয়ারেন্স থেকেই হয়।

ম্যাচ শেষে টাচলাইনে যথারীতি আরেক ঘটনা ঘটান মরিনহো। বরাবরই ইতিবাচক-নেতিবাচক বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে আলোচনায় থাকতে পছন্দ করা এই কোচকে ম্যাচ শেষে চেলসি কোচ আন্তোনিও কন্তের কানে কানে বেশ অনেকক্ষণ করে কিছু একটা বলতে দেখা যায়। পরে জানা যায় চার গোল খাওয়ার পর টাচলাইনে কন্তের উদ্দাম উদযাপন পছন্দ হয়নি এই পর্তুগিগ কোচের – “এ ধরণের উদযাপন আপনি করবেন যখন আপনার দল শ্বাসরুদ্ধকর এক ম্যাচে ১-০ গোলে জিতবে, ৪-০ গোলে যখন জিতবে তখন নয়। এটা অসম্মানজনক”। বোঝাই যাচ্ছে, আঁতে ভালোই ঘা লেগেছে মরিনহোর!

মরিনহোর কারিয়ারেরই অন্যতম বড় হার এইটা। এর আগে রিয়াল মাদ্রিদের ম্যানেজার থাকার সময় বার্সেলোনার কাছে হেরেছিলেন ৫-০ গোলে, আর চ্যাম্পিয়নস লিগে রবার্ট লেভান্ডোভস্কির বীরত্বে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের কাছে ৪-১ গোলে “লণ্ডভণ্ড” হয়েছিল তাঁর রিয়াল মাদ্রিদ।

এদিকে গত ম্যাচে চেলসির সাথে ড্র করলেও আবারও জয়ের ধারায় ফিরে এসেছে লিভারপুল। গত কয়েক মৌসুম ধরেই দেখা যাচ্ছিল ইংলিশ ম্যানেজার টনি পিউলিস যে দলই ম্যানেজ করেন না কেন, সেই দলের বিপক্ষে লিভারপুলের জয়টা সোনার হরিণ হিসেবেই দেখা দিচ্ছিল। যেমন – স্টোক সিটি, ক্রিস্টাল প্যালেস, এবং এখন ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিওন। ২০১২-১৩ মৌসুমের শেষদিকে এই পিউলিসের ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছেই ড্র করে মূলত লিগ শিরোপা-স্বপ্নের সমাধি ঘটে লিভারপুলের। কিন্তু এবার লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ সেরকম কোন অঘটন ঘটতে দেননি। পিউলিস-জুজু তাড়িয়েছেন ওয়েস্টব্রমকে ২-১ গোলে হারিয়ে। প্রথমার্ধেই সেনেগালিজ উইঙ্গার সাদিও মানে ও ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ফিলিপ্পে ক্যুটিনিওর গোলে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় লিভারপুল, বিরতির পর ওয়েস্ট ব্রমের আইরিশ ডিফেন্ডার গ্যারেথ ম্যাকঅলি একটি গোল শোধ করে দিলেও শেষ পর্যন্ত সেটা ম্যাচ জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না, ফলে পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়েই মাঠ ছাড়ে লিভারপুল।

এদিকে উত্তর লণ্ডনের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী আর্সেনাল ও টটেনহ্যাম হটস্পার তাদের নিজ নিজ ম্যাচে গোলশূণ্য ড্র করেছে, তাদের আটকে দিয়েছে যথাক্রমে মিডলসব্রো ও বোর্নমাথ। গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন লেস্টার সিটি নিজেদের মাঠে ৩-১ গোলের জয় পেয়েছে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে। নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার আহমেদ মুসা, জাপানিজ স্ট্রাইকার শিনজি ওকাজাকি ও অস্ট্রিয়ান লেফটব্যাক ক্রিস্টিয়ান ফুকস নাম লিখিয়েছেন গোলের খাতায়, ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে একটি গোল শোধ করেন ফরাসী মিডফিল্ডার ইয়োহান কাবাই। ড্র করেছে পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটিও। সাউদাম্পটনের মাঠে গিয়ে ১-১ গোলে ড্র করে এসেছে তারা। সাতাশ মিনিটে সিটি সেন্টারব্যাক জন স্টোনস এর ভুলের পূর্ণ সুবিধা নেন সাউদাম্পটনের ইংলিশ উইঙ্গার ন্যাথান রেডমন্ড। ৫৫ মিনিটে সেই গোল শোধ করে হারের লজ্জা থেকে গার্দিওলাকে বাঁচান নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার কেলেচি ইহেয়ানাচো। এর ফলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা পাঁচ ম্যাচ জয়হীন থাকলেন গার্দিওলা, যা তাঁর ক্যারিয়ারেরই সবচেয়ে বড় জয়খরা। প্রিমিয়ার লিগের আঁচটা এবার ভালোই টের পাচ্ছেন এই স্প্যানিশ ট্যাকটিশিয়ান!

এই সপ্তাহের ম্যাচগুলো শেষে সমান পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষভাগে অবস্থান করছে ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল ও লিভারপুল। শুধুমাত্র গোল ব্যবধানেই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে তারা। চার ও পাঁচ নম্বরে আছে লন্ডনের দুই ক্লাব চেলসি ও টটেনহ্যাম, গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন লেস্টার সিটি পড়ে আছে ১২ নম্বরে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 + 16 =