স্মৃতির পাতায় শত জয়

বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের ১০০ তম জয়। কথাটা ভাবতেই অনেক গুলো স্মৃতি চোখে ভেসে উঠল।

আমার দেখা বাংলাদেশের প্রথম জয় কোনটি, একটু চেষ্টা করলেই হয়ত মনে করা যাবে। ৯৯ এর বিশ্বকাপে জয় পাওয়ার পর ২০০৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে একটি জয় দেখার জন্য। ক্রিকেট বুঝার পর থেকে শুধু অপেক্ষাই করেছি নিজেদের একটি জয় দেখব বলে।
এর মাঝে যে আনন্দের স্মৃতিগুলো মনে পরে তার মধ্যে মাশরাফির সুইং, তারেক আজিজ, তাপস বৈশ্যের উইকেট পাওয়া, জাবেদ ওমর বেলিমের কাট, হান্নান সরকারের চেক, ওয়ান ডাউনে আশরাফুলের মন মাতানো (বেশির ভাগই স্বল্পস্থায়ী) ইনিংস, মিঃ ফিফটি হাবিবুল বাশারের পুল শট, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অলক কাপালির ৮৯*, সৈয়দ রাসেলের মিডিয়াম ফাস্ট স্পিন বল, উইকেটের পেছনে খালেদ মাসুদ পাইলট, রফিকের ঘূর্ণী যাদু, সাথে দলেরএকমাত্র মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে স্লগ ওভারে পিটানো। এই পিটানো দেখেই কি মজা টাই না নিতাম!
কাপালি, আফতাব, রাজিন সালেহ, মাঞ্জারুল রানা, আব্দুর রাজ্জাক, শাহারিয়ার নাফিসের মত নতুন মুখ আসত, চমক দেখাত, আর আমরা আশায় বুক বাঁধতাম। কিন্তু তারা প্রায় সব ম্যাচেই কিপার আর স্লিপে ক্যাচ শিখিয়ে সাজ ঘরে ফিরে যেতেন। বিদেশি বোলারদের বাউন্সের কাছে নিজেদের প্রত্যাশা ডাউন খেয়ে যেত। এক চামিন্দা ভাস কে কখনোই ভাল লাগত না। প্রথম ওভারেই স্বপ্ন খেয়ে দিত। আরেকজন গিলিসপি, তাকেও আমাদের বিপক্ষে ২০০ মারতে হল!! সবচেয়ে অসহায় লাগত সাংগাকারা কে বোলিং করার সময়। আউটই হতে চায় না। ৫ দিনের টেস্ট ৩ দিনে শেষ হয়ে যায়, যার ২ দিন বাংলাদেশ খালি বোলিং ই করত। তবুও খেলা দেখতাম। একটা চার, একটা ছয় দেখা কি যে আনন্দ দিত!

199603-5
বাংলাদেশ যেখানে এক হিথ স্ট্রিকের কাছেই হেরে যেত সেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০৫ এর শুরুতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। এনামুল হক জুনিয়রের বলে আশরাফুলের সেই ক্যাচ।
আমার এখনো মনে আছে, ২০০৫ সালের জুনে যখন অস্ট্রেলিয়া কে বাংলাদেশ প্রথমবার হারালো তখন নানুর বাড়িতে ছিলাম, খেলা দেখতে পারিনি। সম্ভবত আব্বা আসার পর খবর টা পাই যে, বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া কে হারাইছে সাথে আশরাফুল সেঞ্চুরি করছে; প্রথমে বিশ্বাস করি নাই। বিশ্বাস করার পর গেঞ্জি ঘুরাইতে ঘুরাইতে পুকুর পাড়ে একটা দৌড় দিসিলাম। ওয়ানডে তে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান মেহেরাব হোসেন অপির সেঞ্চুরি শুধু শুনেই এসছিলাম তারপর আশরাফুলের টাও লাইভ দেখা মিস করলাম। যতবারই হাইলাইতস দেখাইসে ততবারই দেখতাম। গিলিসপির বলে আফতাবের সেই বিশাল ছয়। আহ! যাইহোক আশরাফুলের ৯৪ রানের ইনিংসটা মিস করি নাই। ওইদিন আশরফুলকে বোল্ড করার পর ভদ্র প্লেয়ার কলিংউডরে মনে মনে কি গালি টাই না দিসিলাম।
২০০৫, ২০০৬, ২০০৭ সাল বাংলাদেশের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্টের বছর। ’০৫ দলে যোগ দেয় পাইলটের উত্তসূরি মুশফিক। ২০০৬ এ আসে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফলতম ক্রিকেটার সাকিব। আর ২০০৭ এর শুরুতে অভিষেক হয় ওপেনিং এর মূল ভরসা তামিম। আমাদের বর্তমান সাইলেন্ট কিলার, যার আগে কাজ ছিল সাইলেন্টলি মান সম্মান বাঁচানো, সেই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অভিষেকও হয় ২০০৭ সালেই। তারাই এখন দলের মূল কান্ডারি।
২০০৭ এ বিশ্বকাপে আসে অভাবনীয় সাফল্য। যা আমাদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ২০০৯ সালে ওয়েস্টইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয় তাও আবার ২-০ তে হোয়াইটওয়াশ। এটাই প্রথম বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ জয়। সাকিব যে কি জিনিস তা ওই সিরিজেই ক্রিকেট বিশ্ব প্রমাণ পায়। তাছাড়া একই টেস্টে বাংলাদেশের ৩ জন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেন এই সিরিজে।
২০১০ থেকে ’১৪ পর্যন্ত অনেক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে; ১৪ সালটা তো প্রায় জয়হীন। আগেই বলেছি প্রত্যাশা যেহেতু বেশি তাই ছোট সাফল্যগুলোকে আর সাফল্য মনে হয় না। এর মধ্যে অনেক খেলোয়ারের আনাগোনা হয়েছে জাতীয় দলে। অনেকে হতাশ করেছে আবার অনেকে নতুন করে প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

bangladesh-vs-pakistan-2015-2nd-odi-dhaka-highlights-image-2
২০১৫ সাল থেকে নতুন উদ্যম ফিরে পেয়ছে দলটি। প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে গেল বাংলাদেশ, ১৬ বছর পর পাকিস্তান কে হারের স্বাদ উপহার দেওয়া সাথে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা, ইন্ডিয়াকে, সাউথ-আফ্রিকার সাথে সিরিজ জয়, সেরা ৮ দল হিসেবে ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে জায়গা করে নেওয়া। সব মিলিয়ে ২০১৫ সালটা অনেকটা স্বপ্ন্বের মত কেটেছে। ঘরের মাঠে এখন পর্যন্ত টানা ৭ ওডিআই সিরিজ জিতেছি আমরা। আশা করি ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও এই জয় রথ চলবেই।
তবে এখনো অনেক দূর্বলতা রয়ে গেছে। অনেক কিছু শেখার বাকি। টেস্ট আর টি-২০ তে এখনো অনেক পিছিয়ে। টি-২০ এর জন্য যেমন পারফেক্ট হার্ডহিটার নাই, তেমনি টেস্টে ধৈর্‍্য সহকারে খেলার মত ব্যাটসম্যানও অনেক কম। টেস্টে একটানা বল করার মত ভাল ফাস্ট বোলার নাই, এটাকিং স্পিনার নাই। এইরকম অনেক কমতি আছে দলে। ওয়ানডেতেও উন্নতি করার অনেক জায়গা রয়েছে।

নতুন পুরনো মিলিয়ে একটা ব্যালেন্সড টিম পেয়েছি আমরা। এখন চাই সবার সামর্থ্য টা কাজে লাগাক। বিশ্বকাপ কবে জিতব জানিনা। তবে শুধু এটা চাই যে নিউজিল্যান্ড – সাউথ আফ্রিকার মত ক্রিকেট বিশ্বে নিজেদের শক্ত অবস্থান টা যেন তৈরি করতে পারি।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 × 1 =