সৌম্য ফর্মে নেই কিভাবে?

নিজের সবশেষ দুই ওয়ানডেতে সৌম্য সরকারের রান ৮৮* ও ৯০। দক্ষিণ আফ্রিকা বোলারদের ছাতু বানিয়ে আমাদের সিরিজ জিতিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে শেষ ম্যাচটায় মর্নে মর্কেলের বলে সৌম্যর সেই ছক্কাটি আমার মতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন দিন আর নতুন প্রজন্মের মানসিকতার একটি প্রতীক। অফ স্টাম্পের বাইরে লেংথ বল দারুণ অথোরিটি আর প্রচণ্ড ডিসডেইনে সৌম্য উড়িয়েছিলেন মিড উইকেট দিয়ে…ভয়ডরহীন, দু:সাহসী, তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া!

অথচ চারপাশে প্রায় সবার কণ্ঠে শোনা যাবে, সৌম্য ফর্মে নেই। প্রেস কনফারেন্সে এই প্রশ্ন বেশ নিয়মিত ওঠে। আমজনতা ও ফেসবুক জনতার এই চিন্তায় ঘুম হারাম। কারণ ইনজুরি থেকে ফিরে সে টি-টোয়েন্টিতে রান পায়নি। ঢাকা লিগে রান পায়নি। সবই ঠিক আছে। কিন্তু সবশেষ দুই ম্যাচেই তো ম্যাচ জিতিয়েছে! সেই ব্যাটসম্যানকে ‘ফর্মে নেই’ কিভাবে বলে লোকে!

বলতে পারেন, সৌম্য সবশেষ ওয়ানডে খেলেছে ১৩ মাস আগে। বাংলাদেশ দলও কিন্তু সবশেষ ওয়ানডে খেলেছে ৯ মাস আগে। তাহলে সেই সিরিজে খেলা ক্রিকেটারদের যারা ঢাকা লিগে করেনি, তাদের বাদ দেবেন? আর অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবহ, ইনটেনসিটি, চাপ এসব অনেকের সেরাটা বের করে নিয়ে আসে। আমরা আশা করতেই পারি, আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে নামলে সৌম্য সেখান থেকেই শুরু করবেন, যেখানে শেষ করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।

থিতু ওপেনিং জুটির অভাব বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিরন্তন সমস্যা….. ছিল! এখন নেই। আমার মতে ওপেনিং জুটি এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের একটা সেরা পর্যায়ে আছে।

ওয়ানডেতে তামিম ও সৌম্য মাত্র ১০ ইনিংস ওপেন করেছেন। এতেই ৩টি সেঞ্চুরি জুটি। জুটির গড় ৫৪। সৌম্য নিজের এবং এই জুটির অনেক কিছু প্রমাণের এখনও বাকি। তবে ইঙ্গিতটা তো দারুণ, শুরুটা দারুণ সম্ভাবনা জাগানিয়া। তাহলে কেন ওপেনিং নিয়ে বারবার এত প্রশ্ন? এত বেশি প্রশ্ন তুললে যা হয়, ওই ব্যাটসম্যানের নিজের মনেও সংশয় ঢুকে যায় অনেক সময়। বাজে ফর্ম নিয়ে টানা প্রশ্ন শুনতে শুনতে সৌম্যর মনেও হয়ত নিজেকে নিয়ে সংশয়ের বীজ ঢুকে গেছে। যেটা খুব ভালো কিছু নয়! আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় সবশেষ ওয়ানডের ব্যাটিংটাই তার মনে রাখা উচিত। ঢাকা লিগ বা টি-টোয়েন্টির ব্যাটিং ফর্ম নয়।

টেস্টে তামিম-ইমরুল জুটি দুর্দান্ত ধারাবাহিক। টেস্ট ইতিহাসে মাত্র ২০টি জুটি ওপেনিংয়ে ২ হাজারের বেশি রান করেছে। আমাদের তামিম-ইমরুল জুটি তাদের অন্যতম। জুটির গড় ৪৯.০৯। জুটির এই গড় কিংবদন্তীর হেইন্স-গ্রিনিজ জুটি বা আধুনিক ক্রিকেটের সফল গিবস-কারস্টেন, আতাপাত্তু-জয়াসুরিয়া, সাঈদ আনোয়ার-আমির সোহেল, কুক-স্ট্রাউস, ভন-ট্রেসকোথিক, জুটির চেয়েও বেশি। তাতে তামিম-ইমরুল জুটি অবশ্যই হেইন্স-গ্রিনিজের চেয়ে ভালো হয়ে যায়নি, তবে ধারাবাহিকতাটা বোঝা যাচ্ছে!

তামিম আমাদের ইতিহাসের সফলতম ব্যাটসম্যান। তবে ইমরুলেরও এখানে বড় অবদান। আমরা ভুলে যাই, গতবছর টেস্টে আমাদের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন ইমরুল। খুলনায় সারাদিন কিপিং করে পরে দেড়শ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছিলেন। দলে ফেরার পর ৮ টেস্টে করেছেন ৩ সেঞ্চুরি!

তার পরও ইংল্যান্ড সিরিজে খারাপ করলে দেখা যাবে ইমরুল জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বিপ্লবি ক্রিকেটপ্রেমি জনতা। এখনই ইংল্যান্ড সিরিজের জন্য বাংলাদেশের ওয়ানডে দল গড়তে দেওয়া হোক, অনেকের মনে পড়বে না ইমরুলের নাম। অথচ বাংলাদেশের সবশেষ দুই ওয়ানডেতে ইমরুলের রান ৭৬ ও ৭৩! ইমরুলদের কারও মনে থাকে না, কারণ ওরা গ্ল্যামারাস নন। চটকদার নন।

তাতে সমস্যা নেই। সমস্যা অযৌক্তিক প্রশ্ন তুললে। কারও মনে সংশয়ের বীজ ঢুকিয়ে দিলে। আশা করতে পারি, সৌম্য-ইমরুলরা এই সংশয়ের বীজকে লালন করবেন না। একজন যথারীতি তুলবেন ঝড়। আরেকজন আড়ালে থেকেই নিজের কাজ করে যাবেন, সমৃদ্ধ করবেন দেশের ক্রিকেটকে, নিজেকে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × three =