শুভ জন্মদিন, ডন ডিয়েগো!

পৃথিবীতে এমন কিছু ফুটবলার আছে যাদের নিয়ে কিছু লেখার আগে আপনাকে অসংখ্যবার ভাবতে হবে। থেকে শুরু করবেন? কি দিয়ে শুরু করবেন? তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। এরকমই একজন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।

কারো মতে সর্বকালের সেরা ফুটবলার। নিজ দেশ আর্জেন্টিনায় তো আছেই, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে ম্যারাডোনাকে চিনে না বা উনার নাম শুনা নাই এমন মানুষ পাওয়া যাবে। ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আর্জেন্টিনার লানুসে জন্ম নেন ১৯৬০ সালে, ৩০ অক্টোবর। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেন ৪র্থ। একেবারে গরীব পরিবারে জন্ম নেয়া ডিয়েগো মাত্র ৮ বছর বয়সেই টালেন্ট স্কাউটসের নজরে পড়েন। আইরিশ কিংবদন্তী জর্জ বেস্ট আর ব্রাজিলের সুপারস্টার রিভেলিনোকে আইডল মানতেন দ্য গোল্ডেন বয় ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনার ফুটবল স্কিলস নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। কি ছিলনা ওই ছোট গড়নের মানুষটির পায়ে। পাসিং, শুটিং, ড্রিবলিং, ফিনিশিং, প্লে-মেকিং। ফুটবল নিয়ে কি করতে পারতেন নাহ এই ফুটবল ঈশ্বর। দেখে নেওয়া যাক তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ার সম্বন্ধে…

আর্জেন্টিনোস জুনিয়রস ::

২০ অক্টোবর ১৯৭৬ সালে প্রফেশনাল ডেব্যু হয় তার আর্জেন্টিনা জুনিয়র্স হয়ে। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই। জার্সি নাম্বার ছিল ১৬। ৫ বছর খেলেছেন এই ক্লাবের হয়ে। করেছেন ১১৫ গোল, ১৬৭ ম্যাচে।

বোকা জুনিয়র্স::

১৯৮১ তে রিভার প্লেটের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক প্রাপ্ত প্লেয়ার হবার প্রস্তাব ফিরিয়ে যোগ দেন তাদেরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বোকা জুনিয়র্সে।ট্রান্সফার ফি ছিল মাত্র ৪ মিলিয়ন ডলার। ম্যারাডোনা বলেছিলেন, শৈশব থেকেই চেয়েছিলেন বোকার নীল-হলুদ জার্সি গায়ে জড়াতে।তাই বেছে নিয়েছেন বোকাকেই। বোকার হয়ে অভিষেকেই জোড়া গোল আসে ফুটবল ঈশ্বরের পা থেকে। ১৯৮১ এর ১০ এপ্রিল প্রথম ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় রাইভালরি সুপারক্লাসিকোতে অভিষেক ঘটে তার। ফলাফল ম্যারাডোনার বোকা জিতে ৩-০ এ।করেছিলেন এক গোল। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিপার-ডিফেন্ডার ডুয়ো ফিল্লোল ও আলবার্তো টারান্টিনিকে ড্রিবল করে করেছিলেন অসাধারণ এক গোল। বোকার হয়ে মাত্র একটিই লীগ জিতেন ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনা আছেন আর বিতর্ক হবে না, সেটা অনেকটা অষ্টম আশ্চর্যের মত অস্বাভাবিক। বোকার কোচ সিলভিও মারজোলিনির সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় যোগ দেন তিনি…

17b62071d3e62c2a9b96e0b833858320

বার্সেলোনা::

১৯৮২ বিশ্বকাপের পর পরই রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে স্প্যানিশ ক্লাবে যান ডন ডিয়েগো, ৫ মিলিয়ন পাউন্ডে। ৭৮ এ আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতানো কোচ সেজার মিনোত্তির আন্ডারে রিয়ালকে হারিয়ে ১৯৮৩ এর কোপা ডেল রে জিতেন উনি। জিতেছেন স্প্যানিশ সুপার কাপও। ওই সিজনের প্রথম এল ক্লাসিকোতে শুধু গোলই করেন নি,হয়েছিলেন প্রথম রাইভাল ফুটবলার যাকে পুরো সান্টিয়াগো বার্নাব্যু দিয়েছিল স্ট্যান্ডিং অভিয়েশন। বিতর্ক, ইঞ্জুরি তার বার্সা ক্যারিয়ারকে বেশি লম্বা হতে দেয়নি। ১৯৮৪ এর কোপা ডেল রের বিতর্কিত ফাইনালেই লাস্ট ম্যাচ ছিল ডনের বার্সা অধ্যায়ের। শেষ পর্যন্ত অনেকটা বাধ্য হয়ে ক্লাবের সেরা খেলোয়ারকে বিক্রি করতে বাধ্য হন তখনকার বার্সা প্রেসিডেন্ট জোসেপ লুইস নুনেজ।

বার্সায় ডিয়েগো
বার্সায় ডিয়েগো

নাপোলি::

৭৫০০০ দর্শকের সামনে স্টাডিও সান পাওলোতে ম্যারাডোনাকে নেপলসের ক্লাবটি নিজেদের করে নেয়। দর্শকদের তখন শুধু একটিই কথা তাদের সেভিওর, মেসাইয়া এসে পড়েছে। নেপলসে তখন ঠিক মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছিলো না, ছিলো না ভালো পরিবহন সুবিধা এবং নগর চালানোর জন্যে যে একজন নগরপিতা লাগে তাও ছিলো না। পুরা নেপলস জুড়ে খালি খালি ডন ডিয়েগো আর ডন ডিয়েগো। সাউথ ইতালিতে তখন বিপ্লব কারণ এতদিন তারা শুধু নর্থের ক্লাবগুলোর জয় দেখে এসেছে। মিলান,জুভ,রোমার রাজত্ত্বে হানা দেওয়ার অস্ত্র এখন নাপোলির হাতে। কিছুদিনের মধ্যেই সমর্থকদের ভালোবাসার প্রতিদান দেয়া শুরু করেন ডন। পেয়ে ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ডও। তাও আবার ইতালিয় ফুটবলের লিজেন্ড জিওসেপ্পে ব্রুস্কোলেত্তির কাছ থেকে। ম্যারাডোনা নামক জাদুকরের স্পর্শে নাপোলি পায় নিজেদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য। ৮৬-৮৭ মৌসুমে লীগ জিতার পরে নেপলসে যেনো স্বয়ং জিউস নেমে নাপোলির উতসবে মেতে ছিল। ম্যারাডোনা নাপোলিতে কি খেলেছিলেন তা সম্পর্কে ফ্রাংকো বারোসি, পাওলো মালদিনি বলেন, ডিয়েগো যখন খেলতে থাকে তাকে আটকানো একদম অসম্ভব। যাইহোক, ইতালিতেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। কোকেইন নিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে, দলের ট্রেনিং মিস করে। নারী কেলেংকারি তো ছিলোই। নারী কেলেংকারি আর ম্যারাডোনা একই সুত্রে গাথা।

maradona-napoli

সেভিয়া/নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ/বোকা:::

নাপোলি অধ্যায়ের পর ডন যোগ দেন সেভিয়াতে। রিয়াল মাদ্রিদের প্রস্তাব ফিরিয়ে সেভিয়াতে ছিলেন ১ বছর। এরপর আর্জেন্টাইন ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েস ঘুরে আবার ঘাটি সেই বোকাতেই। ক্লাব ক্যারিয়ারে ৪৯১ ম্যাচে করেছেন ২৫৯ গোল।

টিম আর্জেন্টিনা ও ডন :::

আর্জেন্টনার ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ছিলেন ডন। মেসির জন্ম না হতো তাহলে ডনই থাকতেন সেরা। অনেকেরই মতে লিওর থেকে ডনই এখনো সেরা। সেটা মেসি নিজেও স্বীকার করে। ১৬ বছরেই আকাশি-নীলে অভিষেক হাংগেরির বিপক্ষে। ১৯৭৮ এর বিশ্বকাপে মিনোত্তি আন্ডার-এইজড বলে দলে রাখলেন না। ৮২ তে খেলেন প্রথম বিশ্বকাপ। খেলেছেন ৫টি ম্যাচই। তেমন আলো ছড়াতে পারেননি। তবে প্রতিটি ম্যাচেই শিকার ছিলেন অগণিত ট্যাকেলের। ৮৬ র মেক্সিকো বিশ্বকাপে যা করেছেন ডনের আগে, পরে এখনো যা কেউ করতে পারে নি। পারবেও না। অনেকটা একাই জিতালেন আর্জেন্টনাকে ২য় শিরোপা। ফুটবল মানচিত্রে জন্ম নিল ডন ডিয়েগো,ডন ডিয়েগোর ফুটবলীয় ইতিহাস। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছেন জগত বিখ্যাত দুই গোল। হ্যাফ ডেভিল-হ্যাফ এঞ্জেল উপাধি পাওয়া ম্যাচে ৬ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি।

1986_1467088570

Maradona, turns like a little eel and comes away from trouble, little squat man… comes inside Butcher and leaves him for dead, outside Fenwick and leaves him for dead, and puts the ball away… and that is why Maradona is the greatest player in the world.”

—Bryon Butler BBC Radio commentary on Maradona’s second goal

সেমিতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে করেন আরো দুই গোল। দ্বিতীয় গোলটিও ছিল অসাধারণ। অনেকটা ইংলিশদের বিপক্ষে করা দ্বিতীয়টির মত। ওয়েস্ট জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে আর্জেন্টিনা জয় পায় ৩-২ গোলে। ডাবল মার্কিং এ থাকা সত্বেও ম্যারাডোনা তার জাদুর ছোয়া ঠিকই দিয়েছিলেন ফাইনালের ভেন্যু আজটেকাতে। ১ লক্ষ ১৫ হাজার মানুষ ছিলেন সেই ম্যাজিক শো’র সাক্ষী। জর্জ বুরুচাগার শেষ দিকের গোলে ২য় বারের মত সোনার হরিণ জিতে আলবিসেলেস্তেরা। ১৯৯০ এর কাপেও ছিলেন আর্জেন্টাইনদের কাপিতান। এংকেল ইঞ্জুরির কারণে আগের থেকে ধার কমলেও সেবারও ডন ডিয়েগোর নায়ে সোয়ার হয়ে ফাইনালে উঠে আকাশি-নীলরা। যদিও বিতর্কিত এক পেনাল্টিতে হেরে ডনের টানা দু-বার ছোয়া হলো নাহ স্বর্ণের সেই কাপটি। ১৯৯৪ এ দু ম্যাচ খেললেও ড্রাগে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হন ডন। ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ৯১ ম্যাচে করেন ৩৪ গোল। আর্জেন্টাইন ফুটবলে ডনের অবদান ম্যাচ বা গোল কোনোটিই বিচার করার অধিকার কারো নেই।

কোচিং করিয়েছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে। ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইনরা কোয়ালিফাই করে একেবারে শেষ মুহুর্তে। বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তখনো। দলে নেননি হাভিয়ের জানেত্তি, জুয়ান রোমান রিকেলমের মত ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্লেয়ারদের। যাইহোক বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন দের চিরশত্রু জার্মানিদের কাছে কোয়াটার ফাইনালে হালির লজ্জায় ডুবেছিল ম্যারাডোনার দল।

আর্জেন্টাইন এবং দুনিয়া জুড়ে অসংখ্য আর্জেন্টিনা দলের ফ্যানের কাছে ডন ডিয়েগো ভালোবাসার নাম,আবেগের নাম। ফুটবল মানেই ভালোবাসা আর সেই ভালোবাসার সকল উৎস ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা।

শুভ জন্মদিন ডন ডিয়েগো!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven − seven =