ভুটান বিপর্যয় – চোখ খুলবে কর্তাদের?

চারিদিকে বাংলাদেশ টাইগারদের ক্রিকেটে জয়জয়কার, মাশরাফি-সাকিব-তামিমদের নিয়ে এত হৈচৈ, কিন্তু আমাদের আরেকটি বাঘের দলের যে করুণ দশা, সেদিকে মনে হয় কারো আক্ষেপ নেই।

বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল এখন “মৃত”! হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন!

গতরাত ছিল বাংলাদেশ ও ভুটানের মাঝে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ফিরতি প্লে-অফ। এই ভুটান ম্যাচ সবই লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। আগের ১১ সাক্ষাতে ভুটান কখনো মাথাই তুলতে পারেনি। জানবাজি লড়ে তিনটি ম্যাচ করেছিল ড্র। বাকি আটটিতেই হার। ২৭ গোল খেয়ে নিজেরা করেছে মাত্র ৪টি। সেই ভুটানই নিজেদের মাঠে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ফিরতি প্লে-অফে গতরাতে বাংলাদেশের জালে ৩ বার বল পাঠিয়েছে। একেকটি গোল শেল হয়ে বিঁধেছে বাংলাদেশের বুকে। ৩-১ গোলে জয় তুলে ভুটানি ফুটবলাররা বাংলাদেশের ফুটবলের শরীর থেকে খুলে নিয়েছে শেষ কাপড়টাও।

নগদ ক্ষতি, ২০১৯ এশিয়ান কাপের মূল বাছাইপর্ব খেলা হবে না বাংলাদেশের। ড্র করতে পারলেও সেই সুযোগ ছিল। ২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাই শেষ আগেই। তাই আগামী বছর তিনেক আর ফিফা-এএফসির ম্যাচ মিলবে না। এ কারণেই এই হারের কষ্টটা এত বেশি।

তবে এ আর নতুন কি? ক্রিকেটের এই দেশে ফুটবল যেখানে উপেক্ষিত, তখন এই ঘটনা আর তেমন অবাক হবার নয়। ক্রিকেটে কাড়ি কাড়ি টাকা বিনিয়োগ, একদম রুট লেভেল থেকে শুরু করে চলছে সেরা ক্রিকেটার বের করার আপ্রান চেষ্টা, আন্তর্জাতিক লেভেলের লীগ আয়োজন কতই না চেষ্টা! আর সেই চেষ্টার ফল কিন্তু পেয়েছি আমরা। বিশ্বক্রিকেটে আমরা এখন পরাশক্তি। সবাই আমাদের সমীহ করে চলে।

আর ফুটবলে ঠিক তার উল্টোচিত্র! না কোনো ইনভেস্টমেন্ট, না কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্ল্যান, কিচ্ছু নেই। আমাদের দেশে ফুটবল মানেই হল বৃষ্টির দিনে কাঁদায় নেমে একটা বল নিয়ে লাফালাফি করা, আনন্দ করা।

বাংলাদেশ দলের কোচ টম সেন্টফিট এর ভাষ্যমত, তাঁর কথা নাকি শোনেনি ফুটবলাররা। ওঁদের ফিটনেস ঘাটতি চরমে। কোচের অনুশীলনের বাইরে ব্যক্তিগত অনুশীলন, নিজেকে উন্নত করার কোনো চেষ্টা নেই। এই ফুটবলাররা ক্লাব থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা পান বাজে খেলেও। কোনো জবাবদিহি করতে হয় না তাদের। অনেকের মতে, এ কারণেই ভালো খেলার আগ্রহটাই মরে গেছে বাংলাদেশের ফুটবলারদের।

সালাউদ্দিনের মতে, অনেক করেছেন তিনি। আর কিছু করার নেই তার। কি করেছেন তিনি? শুধু কোচের পর কোচ চেঞ্জ করে, কোচিং স্টাফ চেঞ্জ করা, কিন্তু কোন দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা তিনি নিয়েছেন কি?

বেশি দূরে না, আমাদের পাশের দেশ ভারতের ফুটবলে চেষ্টা দেখলেই তো হিংসে হয়। ভুটানের কথা তো না বললেই নয়। ওদের জাতীয় দলের অধিনায়ক নাকি একজন ক্যাপ্টেন, বিমান চালান। সেখান থেকে সময় বের করে নিয়ে ফুটবল খেলেন আর দলকে জিতান। আর আমাদের মামুনুলরা লাখ লাখ টাকা পেয়েও কিচ্ছু করতে পারেন না!

একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সব লীগ। অনূর্ধ্ব-১৪ বিমান কাপ, অনূর্ধ্ব-১৪ জেএফএ কাপ, স্কুল ফুটবল, সুপার কাপ, বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ- সব হারিয়ে যাচ্ছে অতলে। তাই এত বড় একটা আঘাত যে আসবে, সেটা তেমন আশ্চর্যজনক ব্যাপারও নয়।

২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৫৭ আর সাউথ আফ্রিকার কাছে ৭৭ রানে অল-আউট হবার পর ঘুম ভেঙ্গেছিল আমাদের সবার। বাংলাদেশ ক্রিকেটে উত্থানের শুরু আসলে এরপর থেকেই। ওই আঘাতটা না আসলে হয়তো আমরা পরাক্রমশালী দল হয়ে এত তাড়াতাড়ি উঠতে পারতাম না। ভুটান বিপর্যয় তাই এক দিক থেকে বড় উপকারই করেছে দেশের ফুটবলের। এই ‘মৃত’ জাতীয় দল নিয়ে টানাটানি এবার বন্ধ হবে। এই দলের জন্য ঘরোয়া লিগ বন্ধ থাকে দিনের পর দিন। সব টাকা চলে যায় বিদেশি কোচদের বেতনে। যে কারণে দুই মাস ধরে বন্ধ স্থানীয়দের বেতন। ভুটান শিক্ষা মাথা পেতে এবার যদি কর্তারা টাকার সঠিক ব্যবহার করে তৃণমূলে নজর দেন। নতুন খেলোয়াড় তুলে এনে যদি নতুনভাবে শুরু করেন ফুটবলের পথচলা, সেই বরং ভালো!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

18 − 2 =