পেলে ও গারিঞ্চা : ছোট পাখি ও কালোমানিকের গল্প

পেলে ও গারিঞ্চা : ছোট পাখি ও কালোমানিকের গল্প

ঝড়ো আবহাওয়ায় আন্দেজ পর্বতমালার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটি বিমান। পেটে ব্রাজিল ফুটবল দল। অবতরণস্থল চিলি, ’৬২ বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ।

পাইলট ঠিকমতোই চালাচ্ছিলেন। আন্দেজের অগণন মাথার ওপর বাতাসের খেল কেটে বেরিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়! এখানকার বাতাস ভীষণ অবাধ্য। বিমানের সামর্থ্যের পরীক্ষা নেবেই। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বহনকারী বিমানকেও দিতে হয় পরীক্ষা। বলা নেই কওয়া নেই, একেবারে হঠাত্ করেই ভয়ানক ঝাঁকুনি! পাইলটদের ভাষায়, ‘এয়ার পকেট অব টার্বুল্যান্স’। তবে ঠিকঠাকমতো চালাতে পারলে সমস্যাটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও ক্ষণস্থায়ী।

ফুটবলাররা সবে ডিনারে বসেছেন। টেবিলে ধূমায়িত গরম গরম স্টেক। খায় কে! সবার ত্রাহি উঠে গেল। চোখের সামনেই টাটকা উদাহরণ ‘মিউনিখ ট্র্যাজেডি’। মাত্র চার বছর আগের সেই বিমান দুর্ঘটনায় আট ফুটবলার হারিয়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। এবার আন্দেজের বুকে নিজেদের প্রাণটাও বুঝি যায়! ভয়ে `ইষ্টনাম’ জপছেন ফুটবলাররা। শুধু একজন ব্যতিক্রম। নিজ আসনে সে এতটাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে, যেন কিছুই ঘটেনি!

সতীর্থদের ভিমরি খাওয়ার দশা। এ যে অবিশ্বাস্য, মৃত্যুভয় কার নেই! সবার শ্লেষমাখানো জিজ্ঞাসা, ‘তুমি কি পাগল! পরিবার-পরিজন বলে কিছু নেই?’

পেলের পরিবার তো ছিল-ই। কিন্তু শীতল চোখের জিজ্ঞাসায় তার জবাব, ‘এছাড়া আমাকে আর কী করতে বলো’?

দুলুনি থেমে গেল একসময়। কিছুক্ষণ আগেই মৃত্যুভয়ে সিটকে ওঠা প্রাণগুলোর মুখেও ফিরল হাসি-তামাশা। অনেক পরে এ ঘটনা প্রসঙ্গে পেলে লিখেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। মৃত্যু লেখা থাকলে হতো।’

এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। ‘পেলে’ নামে পরিচিতি। ফুটবল রসিকদের কাছে ‘কালোমানিক’। তবে সে কালোয় সাফল্যের আলোই বেশি। পেলের সেই আলোকে গায়ে মাখতে মানে পেলেকে বুঝতে হলে, সৃষ্টিকর্তার ওপর তার অমিত ‘বিশ্বাস’-এর হেতু অনুধাবন জরুরি। পেলে একজন খাঁটি ক্যাথলিক। ছোট থাকতে রাস্তায় কখনো ফুটবল খেলার অনুমতি পাননি। তার বদলে যেতে হয়েছে গির্জায় ফাই-ফরমাশ খাটতে। ফুটবল ও ক্যাথলিজম— এ দুটি শিকড়ে দাঁড়িয়েই তিনি আজকের পেলে।

পেলের জীবনে ‘মারাকানাজ্জো’ এসেছিল নয় বছর বয়সে। ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলে উরুগুয়ের কাছে সেই হার! যে হার আজো পর্যন্ত ব্রাজিলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর একটি। পেলের ভেতরটা চুরমার হয়ে গিয়েছিল। ছোট্ট পেলে ছুটে গিয়েছিলেন বাবার কামরায়। সেখানে দেয়ালে যিশু ঝুলছেন পরম যত্নে। ত্রাণকর্তার সামনে নয় বছর বয়সী ছেলেটির সে কি আহাজারি! তবে একসময় মানুষের কান্নাও ফুরিয়ে আসে।

পেলের ভীষণ রাগ হলো। ছবির যিশুকে ভীষণ ক্রোধ মাখানো গলায় তার জিজ্ঞাসা, ‘এটা কি হলো? আমাদের সঙ্গে কেন এমন হলো? কেন যিশু, কেন? কেন আমরা এ শাস্তি পেলাম?’

পরে সে ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পেলে বলেছিলেন, ‘ভীষণ কেঁদেছিলাম। কান্না শেষে যিশুর ছবির সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। তাকে বোধহয় বলেছিলাম, তুমি তো জানো, আমি সেখানে থাকলে ব্রাজিলকে কাপ হারতে দিতাম না। আমি থাকলে ব্রাজিল জিততোই।’

যিশুকে ছেড়ে পেলে ছুটে গিয়েছিলেন বাবার কাছে। শোকাতুর বাবাকে ছেলের সান্ত্বনাবাণী, ‘দেখো, একদিন আমি তোমাকে ঠিকই বিশ্বকাপ এনে দেব।’

বড় হয়ে ওঠার পর যিশুর সঙ্গে কথা বলা চলেছে পেলের, ‘কোনো সমস্যায় পড়লে সরাসরি তাকে জিজ্ঞাসা করেছি, কেন তুমি আমাকে এর মধ্যে ফেললে? আমাকে দিয়ে যদি ভালো কাজই করাতে চাও, তাহলে সমস্যায় ফেললে কেন?’

যিশুর সঙ্গে পেলের এ জগত্ আমাদের অচেনা। অজানাও। তিনবার বিশ্বকাপজয়ী, হাজার গোলের মালিক যে পেলেকে আমরা জেনে এসেছি, এ কি সে-ই!

পেলের চোখে, তিনি শুধুই ঈশ্বরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটা অংশ নন। সেটা মনে করলে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একশ কোটিরও বেশি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি দাঁড়াতে হয় তাকে। কিন্তু পেলে নিজেকে ঈশ্বরের সেবক মনে করেন সেই শৈশব থেকে— যে কি না, বিশ্বসংসারে সৃষ্টিকর্তার বিধান সম্পাদনের একটি হাত!

পেলের বেড়ে ওঠা একেশ্বরবাদ চেতনায়। পরিবার তাকে শিখিয়েছে, সৃষ্টিকর্তার ওপর আর কেউ নেই। কিছু হতে পারে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফুটবলমোদীরাও বিশ্বাস করেছে, পেলের ওপর কিছু নেই। আর কিছু হতে পারে না। অনেকটাই, ফুটবল বাইবেলের ঈশ্বর!

অথচ দিয়েগো ম্যারাডোনা আছেন। এমন আরো বেশ ক’জন। লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হতে পারে শেষ দুটি নাম। কিন্তু পেলে আজো বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ রেফারেন্স পয়েন্ট। কোনো ফুটবলারকে বিচারের তুলাদণ্ডে একমাত্র বাটখারা।

পক্ষে সায় দিয়েছেন বিপক্ষ দলে খেলা ফুটবলাররা। আলফ্রেড ডি স্টেফানো থেকে ফেরেংক পুসকাস। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার থেকে ববি মুর। একে একে সবার রায়- পেলে ‘গ্রেটেস্ট’। যাকে ঘিরে এ রায়, ১৭ বছর আগে সে-ই পেলে নিজেই একবার উদাহরণ টেনেছিলেন, ‘সংগীতে যেমন একদিকে বিটোফেন অন্যদিকে বাকিরা। তেমনি ফুটবলেও, একদিকে পেলে অন্যদিকে বাকিরা।’

সেই বাকিদের মধ্যে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম ‘রোল মডেল’ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তিনিও একবার বলেছেন, ‘পেলে ফুটবল ইতিহাসের সেরা। সেখানে শুধু একজন পেলেই থাকবেন।’

রোনালদোর জন্ম ১৯৮৫ সালে। পেলে অবসরে যান তার আট বছর আগে। যার খেলা তিনি প্রায় দেখেনই-নি, তাকে সর্বকালের সেরা বলা যায় কীভাবে? প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যাপারটা কি তাহলে একটা ধারা, একটা সংস্কৃতি? মানুষ বুঝি এ ধারায় বশ মেনে বলে ফেলে মুখ ফসকে?

কিন্তু পেলের পক্ষে রয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি ইতিহাস ও পরিসংখ্যান। ১ হাজার ২৮৩ গোল সংখ্যা ভুলে যান, ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিন-তিনটে বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবতিলক যার কপালে, তাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একজন ফুটবলারকে মাপতে পরিসংখ্যানের বাইরে যা দেখা হয়, সেটা তার দক্ষতা। পেলে এক্ষেত্রে যুগ যুগ ধরেই বাকিদের ঈর্ষার পাত্র। কচি-কাঁচাদের আদর্শ।

গতি, ড্রিবলিং, বল-কন্ট্রোল আর ম্যাচ ফোকাসিংয়ে ‘পারফেকশনে’র কাছাকাছি। এমনকি তার গোল মিসও ইতিহাসে শৈল্পিক মর্যাদা পেয়েছে! ১৯৭০ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই ‘ডামি’! টোস্টাওয়ের থ্রু ধরতে এগিয়ে আসা পেলেকে ঠেকাতে দৌড়ে সামনে চলে এসেছিলেন উরুগুয়ে গোলরক্ষক লাদিস্লাও মাদুরোউকিচ। সামনে বল পেয়েও পেলে তাকে ‘ডামি’ করেছিলেন। বল আর পেলে, উভয়কেই হারিয়ে উরুগুয়ে গোলরক্ষক তখন মহাফ্যাসাদে। যদিও পেলের শটটা পোস্টে না থাকায় গোল হয়নি।

ফুটবল শুধু গোলের খেলা হলে, ভাবনাটা যত অভূতপূর্বই হোক না কেন, গোল তো মিস? তবে এভাবে চাঁদেও কলঙ্ক খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রাজিলের হয়ে পেলের গোল সংখ্যা ৭৭। ওদিকে ইরানের জার্সিতে ১৪৯ ম্যাচে ১০৯ গোল করেছেন আলি দায়ী। কিন্তু তাকে কেউ সর্বকালের সেরাদের কাতারে বিবেচনা করেনি।

সেরাদের কাতারে উঠে আসার ক্ষেত্রে বিশ্বকাপ রেকর্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। পেলে এক্ষেত্রে ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে জিতেছেন তিনটি বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০)। এর মধ্যে ’৬২ চিলি বিশ্বকাপে তিনি খেলেছেন গ্রুপপর্বে, সেটাও প্রথম দুই ম্যাচে। মেক্সিকোর বিপক্ষে মারিও জাগালোকে দিয়ে গোল করানোর পর চার ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেছিলেন ম্যাচের শেষ গোল। পরের ম্যাচ সাবেক চেকোশ্লোভাকিয়ার বিপক্ষে। এ ম্যাচে দূরপাল্লার একটি শট নিতে গিয়ে পায়ে চোট পান। বাকি টুর্নামেন্টে পেলে আর মাঠে নামেননি।

একক প্রচেষ্টায় বিশ্বকাপ জেতানোর কথা উঠলে সবার আগে উঁকি দেন ’৮৬-র ম্যারাডোনা। তবে বিশ্বকাপ ফুটবলে ‘ওয়ান ম্যান শো’র প্রথম নজির দেখা গিয়েছিল তারও ২৪ বছর আগে ’৬২ বিশ্বকাপে। সেই ‘ওয়ান ম্যান’কে ব্রাজিলের মানুষ ভালোবেসে তাকে ডাকত ‘আলেগ্রিয়া দো পোভো’ বলে। যার অর্থ জয় অব পিপল। ব্রাজিলের কবি ভিনিয়াস ডি মোরায়েস বলতেন, ‘আনজো দ্য পারনাস টরলাস’। ইংরেজিতে-অ্যাঞ্জেল উইথ বেন্ট লেগস। অর্থাত্ বাঁকানো পায়ের দেবদূত।

ঠোঁটকাটা সমর্থকরা বলে থাকেন, পেলে আদতে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছেন। চিলিতে তো চোটের কারণে প্রথম দুই ম্যাচের পর আর মাঠেই নামতে পারেননি! ’৫৮ এবং ’৭০ বিশ্বকাপে দারুণ ভূমিকা থাকলেও, তা একক প্রচেষ্টায় দেশকে চ্যাম্পিয়ন করানোর আখ্যা পায়নি। ’৫৮ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন দিদি। তবে সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে জোড়া গোল দিয়ে নিজের আগমনী বার্তা ঘোষণা করেছিলেন ব্রাজিলের ‘ও রেই’ পেলে, অর্থাত্ ‘রাজা’!

১৯৭০ বিশ্বকাপের ব্রাজিল স্রেফ ঐন্দ্রজালিক। দলের সবাই ‘মাস্টার’ ফুটবলার। কিন্তু সাফল্য এসেছিল টিমগেমের ওপর নির্ভর করে। সেবার নির্ভেজাল দলগত প্রচেষ্টায় জুলেরিমে ট্রফি চিরতরে ঘরে তুলেছিল ব্রাজিল। যেখানে পেলে, টোস্টাও, জর্জিনহো, রিভেলিনো কিংবা কার্লোস আলবার্তোদের সমান অবদান। ব্রাজিলের সচেতন ফুটবলপ্রেমীরা তা জানেন, আর জানেন বলেই পেলে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে আদৃত হতে পারেননি স্বয়ং তার জন্মভূমিতে! ব্রাজিলের মানুষ আজো হেলেনো ডি ফ্রেইতাস এবং সেই ‘বাঁকানো পায়ের দেবদূত’কেই বেশি ভালোবাসে।

দেশের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে থোড়াই কেয়ার ছিল পেলের। নিজের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড-ভ্যালুই তার কাছে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এজন্য ফুটবলের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে পেলের সাম্রাজ্য। নানা পদের ক্যারিয়ার গড়ার ব্যস্ততাটা তার আজকের নয়, সেই অবসর নেয়ার সময় থেকেই। মাঝে মধ্যে তিনি ফুটবল নিয়ে নিদান দেন বিশ্বকে। মজার ব্যাপার, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে তার উল্টো। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও পেলের বিতর্কিত মন্তব্যে তার গোলের মতোই অসংখ্য। প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিত্বের সুযোগে ব্রাজিলিয়ানরা তাকে নিয়ে হাসে, রয়েছে হতাশাও।

তার কারণ জিজ্ঞাসা করতে পারে লুই ফেলিপে স্কলারিকে। সোজাসাপ্টা কথা বলতে অভ্যস্ত ‘বিগ ফিল’ ২০০২ সালে একবার বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি পেলে ফুটবল সম্পর্কে কিছুই জানে না। কোচ হিসেবে তার কোনো অবদান নেই। বিশ্লেষণগুলোও সবসময় ভুল হয়েছে। ব্রাজিলে সে হতে পারে সবার আদর্শ, কিন্তু তার বিশ্লেষণের এক পয়সাও মূল্য নেই।’

ব্রাজিলে ‘Football’ হলো ‘Futebol’। স্থানীয়দের উচ্চারণ। ঠিক এ নামেই (Futebol) নামেই একটা বই রয়েছে ব্রাজিলের খ্যাতনামা লেখক অ্যালেক্স বেলোজের। সে বইয়ে তিনি বলছেন, ‘সবাই (ব্রাজিল) এ ধারণাটা পোষণ করে যে, পেলে যতটা ব্রাজিলের, তার চেয়েও বেশি এ বিশ্বসংসারের। তিনি বৈশ্বিক সম্পদ। আন্তর্জাতিক রেফারেন্স পয়েন্ট। তাকে বোঝাও বেশ সহজ এক গরিব কৃঞ্চাঙ্গ, যে তার নৈবেদ্য ও দক্ষতা দিয়ে জিতেছে বিশ্বসেরার মুকুট। তবে ব্রাজিলিয়ানরা গারিঞ্চাকে যতটা ভালোবাসে, তাকে ততটা নয়।’

 

গারিঞ্চা?

 

ফুটবলের বাইরে এ নাম— ‘কাশাচা’য় চুর বল্গাহীন নারীসঙ্গের জীবন। এমন জীবন পারে না নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ থামাতে, যা পেরেছিলেন ‘পেলে’— আশির দশকে ইউরোপে কোকা-কোলার পর দ্বিতীয় সেরা ব্র্যান্ড।

’৫৮ বিশ্বকাপে ১৭ বছর বয়সী পেলে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল করলেও সবচেয়ে বেশি বিচ্ছুরিত হয়েছিলেন গারিঞ্চা। গণমাধ্যম তাকে নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী হয়নি। একটা বেসামাল জীবনকে মেলে ধরার ঝুঁকি নেয়ার তুলনায় হতদরিদ্র অবস্থা থেকে পেলের পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসার গল্পই বেশি টেনেছে গণমাধ্যমকে। মাত্র ১৭ বছর বয়সী একটা দরিদ্র ঘরের ছেলে, সে কিনা বিশ্বকাপের সেমিতে করল হ্যাটট্রিক! ফাইনালেও জোড়া গোল! এমন গল্প আছে কয়জনের?

পেলে তাই ধীরে ধীরে জায়গা নিতে শুরু করেন বইয়ের পাতায় আর সিনেমার পর্দায়। দেশ-বিদেশে সংবাদপত্রের শিরোনাম। তার ক্লাব স্যান্টোস ভেবে দেখল, কামাইয়ের এই তো সুযোগ! হাতে যদি থাকে শতাব্দীর সেরা বক্স অফিস হিট, তাহলে প্রীতি ম্যাচ খেলতে বিশ্বসফরে বের হলে কেমন হয়? রথ দেখার সঙ্গে কলাও বেচে বেশ দু’পয়সা আয় হবে।

১৯৫৯ সালে পেলেকে তাই খেলতে হয়েছিল একশরও বেশি ম্যাচ। এর মধ্যে তিন সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফরেই খেলেছেন ১৫ ম্যাচ। ষাটের দশকের শুরুর দিকেও সপ্তাহে তিনটি করে ম্যাচ খেলতে হয়েছে তাকে। সঙ্গে যোগ করুন ম্যাচ খেলতে নানা দেশে ছুটে যাওয়ার ভ্রমণক্লান্তি।

স্যান্টোসের বিশ্বসফর ছিল পেলের জন্য পোয়াবারো। এতে তার পরিসংখ্যান যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি স্যান্টোসও তাদের ফুটবল ‘গসপেল’-এর রঙ-রূপ-রস ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী।

ব্রাজিলের জন্য ’৫৮ বিশ্বকাপ শুধুই ৮ বছর আগের সেই ‘মারাকানাজ্জো’ বিপর্যয়ের দাওয়াই ছিল না। আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে ওটা ব্রাজিলের ঘুরে দাঁড়ানোর বছরও। দেশটির অন্যতম সেরা ফুটবল লিখিয়ে নেলসন রদ্রিগেজের ভাষ্য, ‘১৯৫৮-র সেই জয় ব্রাজিলিয়ানদের শরীরী ভাষা পাল্টে দিয়েছিল। ’৫৮-র পর থেকে তারা মানুষের মাঝে আর দোঁ-আশলা কুকুর হয়ে থাকেনি, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তো নয়ই।’

পেলে ছিলেন সেই ‘নতুন ব্রাজিল’-এর সাইনবোর্ড। একেবারে খাপে খাপ। তিনি নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন। সুইডেন বিশ্বকাপ জয়ের পর ডাক এসেছিল ব্রাজিলের সেনাবাহিনী থেকে। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়েও সেনাবাহিনীকে ‘না’ করতে পারেননি। কিন্তু কণ্ঠে অহম ঝরিয়ে সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছিলেন, ‘আমি তো দেশের হয়ে আগেই লড়েছি। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তা আবারো করার কোনো দরকার দেখছি না।’

ফুটবলের জনকখ্যাত ইংল্যান্ডে পেলে তার শ্রেষ্ঠত্বের চিরকালীন ভিত্তি রচনা করেছিলেন ১৯৬৪ সালে। মারাকানায় প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ১-৫ গোলে হারে ইংলিশরা। পেলে একাই করলেন চার গোল। টাইমসের শিরোনাম, ‘কালোমানিকে বশ ইংল্যান্ড’। প্রতিবেদনের ভেতরে লেখা হলো, ‘এ যেন উত্সব, কোনো রঙিন চলচ্চিত্রের প্রতিচ্ছবি, একজন কৃঞ্চাঙ্গ অরফিয়াস; আহা! এই তো জীবন; এটা ছিল পেলের রাত… যা দেখার জন্য বেঁচে থাকা সার্থক, এমনকি হারেও।’

টিভিতে রঙিন বিশ্বকাপের শুরু ১৯৭০ থেকে। বিশ্বব্যাপী সবার সেই রঙিন বিশ্বকাপের ‘আইকন’ হিসেবেও পেলেকে সবাই লুফে নিয়েছে। হেলেনোর মতো ১৯২০ সালে জন্মালে তার কোনো ফুটেজ পাওয়ার যেত কিনা সন্দেহ। হয়তো হেলেনোর মতোই ব্রাজিলের বাইরে তাকে কেউ চিনত না!

পরবর্তীতে পেলে নিজেকে ‘গ্রেটেস্ট’ দাবি করলেও চিলি বিশ্বকাপের পরের বছর কিন্তু উল্টো বলেছিলেন, ‘কথাটা আমি প্রথম বলিনি। মানুষ বলছে আমি বিশ্বসেরা। এখানে আমার কোনো হাত নেই। আমি বিশ্বাস করি সর্বকালের সেরা ফুটবলার এখনো জন্মেনি। তাকে সব পজিশনেই সেরা হতে হবে। গোলকিপিং, ডিফেন্স, এমনকি ফরোয়ার্ডেও।’

সুইডেন (১৯৫৮) বিশ্বকাপের পর স্যান্টোসের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন পেলে। বহির্বিশ্বে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে স্যান্টোস যে ফি পাবে, পেলে একাই পাবেন তার অর্ধেক। ’৭০ বিশ্বকাপের আগে চুক্তি হলো পুমার সঙ্গে। তাদের বুট পরে খেলবেন। বিনিময়ে আসবে ১ লাখ ২০ হাজার ডলার। এজন্য ’৭০ বিশ্বকাপে তাকে বহুবার মাঠে বুটের ফিতে বাঁধতে দেখা গেছে। সেই ‘স্ট্যান্টবাজি’র জন্য পুমা তাকে দিয়েছে ২০ হাজার ডলার। বাকি অংকটা এসেছে ধাপে ধাপে পরবর্তী চার বছরে। এসবই বিশ্বব্যাপী ‘পেলে’ ব্র্যান্ড শুরুর প্রসববেদনা। পরবর্তী সময়ে হাবলটের ঘড়ি থেকে সাবওয়ে স্যান্ডউইচ, এমনকি ছেলেদের যৌন সমস্যার বিজ্ঞাপনেও দেখা গেছে পেলেকে!

স্কুলের বন্ধুরা তাকে মজা করে ডাকত পেলে। পর্তুগিজ ভাষায় এ নামের কোনো অর্থ নেই। ১৯৪০ সালে মিনাস গেরিয়াসে পেলে নয়, ডিকো জন্মেছিলেন। মা-বাবার রাখা নাম। সেই ডিকো কিংবা এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তোর সঙ্গে পেলের কোনো মিল নেই। স্বীকারোক্তি রয়েছে তার আত্মজীবনীতেই, ‘এডসনের মনকে পাল্টে পেলে বানানো সহজ কথা ছিল না। পেলের জীবনটা সম্পূর্ণ আলাদা। সে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে। আমার মাস্টারকার্ডেই পার্থক্য দেখি। এক পিঠে পেলের স্বাক্ষরসহ সেই বাইসাইকেল কিকের ছবি। অন্য পিঠে আমার নিজের (এডসন) স্বাক্ষর।’

আত্মজীবনীতে মাস্টারকার্ডের প্রসঙ্গ অনেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। তাদের মতে, পেলে তো এমনই! সবকিছুতেই নিজের ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাব-নিকাশ, এসব ক্ষেত্রে ভীষণ বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। নিজেকে তিনি স্রেফ একজন ফুটবল তারকা হিসেবে দেখেননি। তিনি ঈশ্বরের সেবক। চর্মচক্ষে দেখা সবকিছু তাকে জিততেই হতো। আত্মজীবনীতে পেলে নিজেই বলেছেন, ‘আমি কে ছিলাম? কি ছিলাম? শুধুই একজন ফুটবলার? না, তার চেয়েও বেশি কিছু।’

পেলের আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে বর্ণ প্রসঙ্গ। তার প্রাণের দাবি, পেলের কোনো বর্ণ নেই। শ্রেণী অপ্রয়োজনীয়। বলেছেন, ‘পেলের কোনো বর্ণ, জাতি কিংবা ধর্ম নেই। সে সব জায়গাতেই গ্রহণযোগ্য।’

লাতিন আমেরিকার মধ্যে দাসপ্রথা থেকে ব্রাজিল বেরিয়ে এসেছে সবার শেষে। পেলের শরীরেও রয়েছে ক্রীতদাসের রক্ত। বলা হয়, তার পূর্বপুরুষরা ব্রাজিলে এসেছিলেন অ্যাঙ্গোলা অথবা নাইজেরিয়া থেকে। ’৫৮ বিশ্বকাপের ব্রাজিল সত্যিকার অর্থেই বহুবর্ণের দল নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রথম দল। সে আসরে নিজের অভিজ্ঞতার বয়ানে পেলে বলছেন, ‘বাকি সব দলেই শুধু শ্বেতাঙ্গরা ছিল। এটা মোটেও স্বাভাবিক লাগেনি। সতীর্থদের সম্ভবত জিজ্ঞেস করেছিলাম, কালোরা কি শুধু ব্রাজিলেই থাকে?’

বর্ণবৈষম্য নিয়ে সচেতন পেলের মধ্যে এক ধরনের ‘প্রোটো-মেসিয়ানিজম’ দর্শনের প্রতিচ্ছবি রয়েছে। বিশেষ করে যখন তার মনে হয় কেউ সেভাবে তার কদর করছে না। তার আত্মজীবনীতেও ঝরেছে সে আক্ষেপ, ‘আমেরিকায় এলভিস প্রিসলি ও মার্টিন লুথার কিংয়ের স্মরণে জাদুঘর রয়েছে। কিন্তু ব্রাজিলে পেলের নামে কোনো জাদুঘর নেই। এটা এমন কিছু যা আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয়নি।’

স্বার্থপর এবং আত্মকেন্দ্রিক মনে হলেও, পেলে কিন্তু জীবদ্দশাতেই নিজের অমরত্ব নিশ্চিত করেছেন। ব্রাজিল তার আক্ষেপ ঘোচাতে ৫ বছর আগেই জাদুঘর তৈরি করেছে। খ্যাতিমানদের জীবন পেলের বয়ানে এ রকম, ‘অর্থ কিংবা খ্যাতি কুড়োতে পারলে মানুষ আপনাকে ভিন্ন চোখে দেখবে। বিখ্যাতরা যেন সম্পূর্ণ আলাদা একটা বর্ণ— না সাদা, না কালো।’

বাঁকানো পায়ের দেবদূত মানে, গারিঞ্চা ছিলেন পেলের ঠিক বিপরীত। দুজনের মধ্যে শত্রুতা ছিল কিনা, তা জানা যায়নি। তবে বন্ধুত্ব যে খুব একটা ছিল না, তা নিশ্চিত। গারিঞ্চার উঠে আসাও হতদরিদ্র গরিব ঘর থেকে। কিন্তু তার কাছে জীবন ছিল উপভোগের পানপাত্র। সেটা মাঠ কিংবা মাঠের বাইরে। পেলের কাছে এ দুটি জায়গা আবার জীবনকে প্রতিষ্ঠার মঞ্চ। গারিঞ্চা তার বেসামাল জীবন দিয়ে যে প্রতিষ্ঠাকে প্রশ্ন করেছেন, পেলে নিজেই সেই প্রতিষ্ঠার ভিত্তিমূল, তাবত্ দুনিয়ার ফুটবলারদের ‘তীর্থ’।

অ্যালেক্স বেলোজের যুক্তি, ‘ব্রাজিলে পেলেকে সবাই কদর করে। কিন্তু গারিঞ্চাকে ভালোবাসে। সেখানে প্রায় সবাই বলবে, গারিঞ্চার সামর্থ্য পেলের চেয়ে বেশি ছাড়া কম ছিল না। মাঠে নেমে পেলে ক্ষুরধার ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে কাটাতেন, কারণ প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে সেটা করতেই হতো। কিন্তু গারিঞ্চা ঠিক একই কাজ করেছেন, স্রেফ মনের খোরাক মেটাতে।’

ফুটবলের পাশাপাশি ‘কাশাচা’ ও নারীসঙ্গও ছিল গারিঞ্চার মনের খোরাক। সর্বসঙ্গ তো ভালো হয় না! আর অসত্ সঙ্গেই সর্বনাশ। গারিঞ্চারও ঠিক তা-ই হয়েছিল। ‘কাশাচা’র নেশা ১৯৮৩ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তাকে পাঠিয়ে দেয় না ফেরার দেশে। যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন কিংবা বাড়িঘর ছাড়া ভবঘুরের মতো রাস্তায় ঘুরেছেন, তখন পেলে তার ক্যারিয়ারের সেরা সতীর্থের কোনো খোঁজ রাখেননি। এমনকি গারিঞ্চার মৃত্যুর পর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও পেলে যাননি! পরে অজুহাত দেখিয়েছিলেন, ‘আমি মরদেহ দেখতে ঘৃণা করি। এর চেয়ে প্রার্থনা করতেই ভালো লাগে।’

যে খেলোয়াড়টি ছাড়া ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে পেলের তিনটে বিশ্বকাপ জেতা হতো না। যার অনুপস্থিতিতে পেলে জন্ম দিতে পারতেন না ‘ফুটবল ইতিহাসের সেরা তিন মিনিট।’ ব্রাজিলের জার্সিতে যার সঙ্গে মাঠে নেমে পেলেকে কখনো হারতে হয়নি; সেই গারিঞ্চার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পেলে যাননি!

অ্যালাগোয়াস প্রদেশের শহর পালমেইরা দস ইন্দোস। এখান থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ‘ফুলনিও’দের বসবাস। আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে তারা পরিচিত। প্রায় তিন হাজার মানুষের এ গোত্রে আছে তিনটি ফুটবল দল! খেলোয়াড়দের অনেকেরই পা বাঁকানো। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, এমন পা নিয়ে খেলবে কীভাবে! আদতে ওটাই তাদের সেরা অস্ত্র। পঞ্চাশের দশকে এমন বাঁকানো পা’কে তুলির মতো খেলিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের মনে অমর কবিতা লিখে গেছেন ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো দস স্যান্টোস।

এটা পরিবারপ্রদত্ত নাম। বড় বোন রোসার দেয়া নামেই তাকে সবাই চেনে। কিন্তু জানে কয়জন? একদিন মাছ ধরতে গিয়ে কোত্থেকে যেন একটা ছোট পাখি ধরে এনেছিলেন ম্যানুয়েল। তাই দেখে রোসা বলেছিলেন, পাখিটা ঠিক তোমার মতোই ছোটখাটো, এ তো গারিঞ্চা-ব্রাজিলের ক্ষুদ্রাকৃতির গায়ক চড়ুই পাখি। সেই থেকে ম্যানুয়েল হয়ে গেলেন গারিঞ্চা। মানে, ছোট পাখি।

গারিঞ্চার আত্মজীবনীতে লেখক রুই কাস্ত্রো জানিয়েছেন, তার পূর্বপুরুষরা ‘ফুলনিও’ গোত্রের। এমনকি গারিঞ্চার নামের পদবি মিলে যায় ১৭ বছর আগের ফুলনিও আদিবাসী গোত্রপ্রধানের নামের সঙ্গে, হোয়াও ফ্রান্সিসকো দস স্যান্টোস ফিলহিও।

২৮ অক্টোবর, ১৯৩৩। গারিঞ্চার জন্মসাল। ধাত্রী খেয়াল করেছিল, তার বাম পা বাইরের দিকে বাঁকানো। ডান পা-ও বেঁকে কিছুটা ভেতরে চলে এসেছে। পরে ডাক্তারও সার্টিফিকেট দিলেন, ছেলেটা পঙ্গু! কারণ ডান পা বাম পায়ের তুলনায় ছয় সেন্টিমিটার ছোট। মেরুদণ্ডও স্বাভাবিক নয়; অনেকটা ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো। শুরুতে চিকিত্সা করালে হয়তো এসব সমস্যার সমাধান হতো। কিন্তু গারিঞ্চার জন্ম রিও ডি জেনিরোর প্রত্যন্ত অঞ্চল পাউ গ্রান্দের ভীষণ দরিদ্র এক মদ্যপ বাবার পরিবারে। চিকিত্সার সঙ্গতি কিংবা সহায় কোনো কিছুই ছিল না। আর তাই কোনো দিন হাঁটতে পারবেন কিনা, তা নিয়েই সংশয় ছিল।

কিন্তু পেটের টানে ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষদের হাঁটুর ওপর ভর করে দাঁড়াতেই হয়। পাউ গ্রান্দের আর দশটা ছেলের মতো গারিঞ্চাকেও ব্রিটিশদের টেক্সটাইল কারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দিতে হয়েছিল ১৪তম জন্মদিনের এক মাস একদিন পর। আলসেমির জন্য ছাঁটাই হয়েছেন কয়েকবার। আবার ফিরিয়েও আনা হয়েছে। কারখানার ফুটবল ক্লাবের সভাপতির দরকার ছিল তাকে।

একেবারেই সাধারণ বল্গাহীন একটা জীবন। উচ্চাশা কি জিনিস, তা গারিঞ্চার মাথায় ঢোকেনি বেঁচে থাকার শেষ দিন পর্যন্ত। তার কাছে ফুটবল ছিল স্রেফ মজা করার অনুষঙ্গ। এ দিয়ে ঈর্ষণীয় ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা-ভাবনা গারিঞ্চাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। ‘মারাকানাজ্জো’ বিপর্যয় চলাকালীন তিনি মাছ ধরতে গিয়েছিলেন! রেডিওতে ফাইনালের ধারা-বিবরণী শোনার প্রয়োজন বোধ করেননি। মাছ ধরা থেকে ফিরে এসে দেখলেন সবাই কাঁদছে। ব্রাজিলের হার ততক্ষণে জানা হয়ে গেলেও কান্নার কারণটা তিনি বুঝতে পারেননি। আশপাশে যাকে পেয়েছেন সবাইকে তার জিজ্ঞাসা, একটা ফুটবল ম্যাচ হেরে কান্নার কী আছে!

সেই সময় ফুটবল নিয়ে গারিঞ্চার সর্বোচ্চ আশা ছিল প্রতি সপ্তাহে কারখানা দলের হয়ে খেলা। এর বাইরে বড় কোনো ক্লাবের হয়ে খেলে ক্যারিয়ার গড়ার ভাবনা তার ছিল না। পরিচিতজন তাকে টেনেহেঁচড়ে ট্রায়ালের জন্য নিয়ে গেলেও কাজ হতো না। এক্ষেত্রে গারিঞ্চার নিজের প্রতি অবহেলার গল্প কিংবদন্তিতুল্য! একবার তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ভাস্কো-দা-গামায়। সঙ্গে করে বুট না নিয়ে যাওয়ায় পত্রপাঠ বিদায়! ফ্লুমিন্সেতে ট্রায়াল চলাকালীন পালিয়ে চলে এসেছিলেন। বাড়ি ফেরার শেষ ট্রেনটা ধরতে হতো, তাই। ১৯ বছর বয়সে সুযোগ পেলেন বোটাফোগোতে। সেটাও, ক্লাবটির সাবেক এক খেলোয়াড় তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে!

গারিঞ্চা প্রথাগত স্ট্রাইকার ছিলেন না। ছিলেন না মিডফিল্ডারও। খেলতেন রাইট উইংয়ে। কিন্তু সহজাত ড্রিবলিংয়ে ঢুকে পড়তেন প্রতিপক্ষের বিপত্সীমায়। প্রতিবার একইভাবে, একই কায়দায়। প্রতিপক্ষ তার সব ট্যাকটিস জানত। কিন্তু থামাতে পারত না। বোটাফোগোয় ট্রায়ালের দ্বিতীয় দিনে রাইট উইংয়ে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন নিল্টন স্যান্টোস। পরবর্তীতে ব্রাজিল জাতীয় দল তো বটেই, নিল্টন স্যান্টোস গোটা ফুটবলের ইতিহাসেই অন্যতম সেরা লেফটব্যাক। গারিঞ্চা করলেন কি, প্রথম টাচেই ‘নাটমেগ’ (দুই পায়ের মধ্যে দিয়ে বল নেয়া) করলেন স্যান্টোসকে। স্যান্টোসের ক্ষেত্রে এর আগে যা কখনো কেউ করতে পারেনি! ট্রায়াল শেষে বোটাফোগো কর্তাদের গিয়ে ফুটবলের ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ বলেছিলেন, ‘বিপক্ষ দলে মুখোমুখি হওয়ার থেকে তাকে দলে টেনে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।’

দুই মাস পরই বোটাফোগোর একাদশে হ্যাটট্রিকে অভিষেক (১৯৫৩ সাল) রাঙান গারিঞ্চা। ১৩ বছর পর বোটাফোগোর শেষ ম্যাচটা খেলার পর তার নামের পাশে ২৪৫ গোল। সেটাও, স্ট্রাইকার নয়, উইঙ্গার হিসেবে! গারিঞ্চার খেলার ধাঁচ ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইয়ে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন উরুগুয়ের কিংবদন্তিতুল্য লেখক এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো, ‘সে ফর্মে থাকলে মাঠ পরিণত হতো সার্কাসে। বলটা যেন তার পোষমানা প্রাণী, এবং খেলাটা পরিণত হতো আমন্ত্রনমূলক উত্সবে। গারিঞ্চা তার পোষমানা বলটার সঙ্গে জুটি বেঁধে এমনসব কসরত উপহার দিতেন, যা দেখে নাভিশ্বাস উঠে যেত দর্শকদের। গোটা ফুটবল ইতিহাসে তার মতো আর কেউ-ই মানুষকে এতটা আনন্দ দিতে পারেনি।’

ফিফার কাছে গারিঞ্চা তাই ‘চ্যাপলিন অব ফুটবল।’ যিনি বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ক্ষুরধার ড্রিবলিংয়ে মাঠে ফেলে দেয়ার পর থেমে যান। মাটিতে পড়ে যাওয়া সেই খেলোয়াড়কে হাত বাড়িয়ে টেনে তুলে আবারো তাকে ড্রিবলিং করেন! ’৫৮ বিশ্বকাপের আগে ফিওরেন্টিনার মাঠে শেষ প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল ব্রাজিল। দ্বিতীয়ার্ধে তিন স্বাগতিক ডিফেন্ডার রোবোত্তি, মাজনিনি ও সারভাতোকে ড্রিবলিংয়ে পেছনে ফেলা গারিঞ্চার সামনে শুধুই গোলকিপার সার্তে। তাকেও ‘ডামি’ করে ফেললেন পেছনে। সামনে শুধুই জনমানবহীন ফিওরেন্টিনার জাল। পেছনে পড়িমরি করে ছুটে আসা রোবোত্তি।

গারিঞ্চা পোস্টে শট না নিয়ে খানিক দাঁড়ালেন! রোবোত্তিকে আসার সুযোগ তো দিতে হবে!

দ্বিতীয় সাক্ষাতে গারিঞ্চার সামান্য শরীরী ঝাঁকুনিতে রোবোত্তি আছড়ে পড়েছিলেন পোস্টে। এর পর তার আলতো টোকায় বল জালে। ভাবখানা এমন যেন, এছাড়া গারিঞ্চার আর কিছুই করার ছিল না! সুনসান নীরবতা নেমে এসেছিল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। গলার আওয়াজ বলতে গারিঞ্চার রাগান্বিত সতীর্থরা। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে খেলতে নেমে, কেউ এমন সার্কাসসুলভ আচরণ করে!

মাঠে ক্লান্তিহীন ড্রিবলিং করে যেতেন গারিঞ্চা। সঙ্গে নানা রকম ‘ডামি’ আর শরীরী ঝাঁকুনি। অবিশ্বাস্য বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। একবার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিলেন ডিফেন্ডার ভাইরোকে। বল ‘জাগলিং’য়ে তাকে নিয়ে খেলছিলেন গারিঞ্চা। ড্রিবলিং করতে করতে হঠাত্ই দৌড়। ভাইরোও তাকে থামাতে দৌড় দিলেন। গ্যালারিতে হাসির রোল পড়ে গেল। গারিঞ্চা দৌড়াচ্ছেন বল ছাড়াই। ভাইরো অন্ধের মতো তার পিছু ছুটে বোকা সেজেছেন।

’৫৮ বিশ্বকাপে ভীষণ চাপে ছিল ব্রাজিল। আবেগে ভেসে স্বপ্নপূরণ হয়নি আগের দুটি আসরে। সে আসরে তাই মানসিকভাবে শক্ত-সামর্থ্য স্কোয়াড গড়তে চেয়েছিল ব্রাজিল। এজন্য কোচিং স্টাফে নিয়োগ দেয়া হয় একজন সাইক্রিয়াটিস্ট। স্কোয়াড বাছাইয়ে প্রাধান্য দেয়া হলো খেলোয়াড়দের আক্রমণাত্মক মানসিকতা ও বুদ্ধিমত্তা। গারিঞ্চা এ দুটি বিষয়ে ‘শূন্য’ পেয়েছিলেন! সেই সাইক্রিয়াটিস্ট রিপোর্টে মন্তব্য করেছিলেন, গারিঞ্চার বুদ্ধিমত্তা শিশুদের মতো, আক্রমণাত্মক মানসিকতা শূন্যের পর্যায়ে!

সুইডেনে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপ জিততে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি ব্রাজিল। গোথেনবার্গের কাছাকাছি এক রিসোর্টে তাঁবু খাটিয়েছিল ব্রাজিল দল। খেলোয়াড়দের নারীসঙ্গ প্রীতি জানতেন দলের ডাক্তার। আর তাই রিসোর্টের ২৮ জন নারী কর্মীকে পাল্টে পুরুষ কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়। সেই রিসোর্টের পাশেই আবার ‘নুডিস্ট কলোনি’। খেলোয়াড়দের রুমের জানালা দিয়ে এলাকাটা দিব্যি দেখা যেত। কলোনি বাসিন্দাদের আপাতত কয়েক দিন আবৃত শরীরে চলা-ফেরার অনুরোধও করেছিল ব্রাজিল কোচিং স্টাফ।

সুইডেন বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম দুই ম্যাচে একাদশে জায়গা হয়নি পেলে-গারিঞ্চার। দুজনেরই বিশ্বকাপ অভিষেক ‘সায়েন্টিফিক’ দলখ্যাত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে। তখন পর্যন্ত পেলে-গারিঞ্চা সম্পর্কে কেউ তেমন একটা জানত না। আনকোরা দুই খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়ে প্রতিপক্ষ দলকে চমকে দিতে চেয়েছিলেন ব্রাজিল কোচ ভিসেন্তে ফিওলা। কিক-অফের পর একাই পাঁচ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ৪০ সেকেন্ডের মাথায় সোভিয়েতের গোলপোস্ট কাঁপান গারিঞ্চা। এক মিনিট পূর্ণ হওয়ার আগে তার পাস থেকে আবারো গোলপোস্টে মারেন পেলে। এভাবে টানা তিন মিনিট চোখ ধাঁধানো সব আক্রমণের ফসল হিসেবে ভাভাকে দিয়ে গোল তুলে নিয়েছিলেন পেলে-গারিঞ্চা। ফরাসি সাংবাদিক গ্যাব্রিয়েল হনোটের চোখে, এ তিন মিনিট ‘ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সেরা তিন মিনিট’।

ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গারিঞ্চা প্রসঙ্গে নেলসন রদ্রিগেজ লিখেছিলেন, ‘আমরা তাকে পাগল ঠাউরেছি। কিন্তু বিশ্বকাপে সে প্রমাণ করে দিল, আসলে আমরাই পাগল। কারণ আমরা যুক্তি দিয়ে তার ব্যাখাতীত রিফ্লেক্স আর প্রতিভাকে বোঝার চেষ্টা করি। আমরাই ষাঁড় ও জলহস্তী দল।’ ব্রাজিলের খ্যাতনামা কবি পাওলো মেন্দেজ ক্যাম্পোস গারিঞ্চাকে ‘আর্টিস্টিক জিনিয়াস’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছিলেন, ‘কবিকে যেভাবে দেবদূত ছুঁয়ে যায়, আকাশ থেকে কুড়িয়ে সংগীতজ্ঞ যেভাবে সুর বাঁধেন, গারিঞ্চাও সেভাবে ফুটবল খেলেন। নিখাদ জাদু, কোনো রকম ভোগান্তি আর পরিকল্পনা ছাড়াই।’

’৬২ বিশ্বকাপের ব্রাজিলকে নিয়ে শঙ্কা ছিল। প্রথম দুই ম্যাচের পর ইনজুরিতে পড়েছিলেন পেলে। দিদি, ভাভা, দালমা স্যান্টোস, নিল্টন স্যান্টোসরাও দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে। কিন্তু কীসের কি! গারিঞ্চা প্রায় একাই ব্রাজিলকে এনে দিলেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। নিজে হয়েছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার সেই ‘ব্যানানা শট’ থেকে করা গোলের পর ব্রিটিশ গণমাধ্যম বলেছিল, ‘স্ট্যানলি ম্যাথুজ, টম ফিনে এবং একজন সাপুড়ের সংমিশ্রণে গড়া’ গারিঞ্চা।

চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে করেছিলেন জোড়া গোল। সাবেক চেকোশ্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে খেলেছিলেন ভীষণ জ্বর নিয়ে। তাতে অবশ্য ফল পাল্টায়নি। ব্রাজিল জিতেছিল ৩-১ ব্যবধানে। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থেকে গারিঞ্চার এ বিশ্বকাপ জয় তার শেষের শুরুও। বাঁকানো পা তত দিনে আশীর্বাদ থেকে সমস্যায় রূপ নিতে শুরু করেছিল। চিকিত্সাশাস্ত্র অনুযায়ী, দৌড়ালে গারিঞ্চার টিবিয়া ও ফেমারের (পায়ের দুটি হাড়) মধ্যে সংঘর্ষে হাড়ের গুঁড়ো জমা হতো। ১৯৫৯ সালে তাকে বলা হয়েছিল, অস্ত্রোপচার করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পাউ গ্রান্দের এক আস্থাভাজন গারিঞ্চাকে বুদ্ধি দিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচার করালে তুমি আর আগের মতো খেলতে পারবে না। এ কথা শোনার পর গারিঞ্চা আর দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের কথা ভাবেননি। ’৬৬ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির কাছে ৩-১ গোলে হারে ব্রাজিল। জাতীয় দলের হয়ে এটাই ছিল তার শেষ ম্যাচ; ‘ক্যানারিনহো’দের হয়ে ৫০ ম্যাচের (১২ গোল) ক্যারিয়ারে একমাত্র হারও!

লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠে, তারা কোন গ্রহের? আদৌ কি এ পৃথিবীর! ’৬২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে চিলির জালে জোড়া গোল করার পর গারিঞ্চাকে নিয়ে প্রথম তোলা হয়েছিল এ প্রশ্ন। দেশটির দৈনিক ‘এল মার্কারিও’ শিরোনাম করে, ‘গারিঞ্চা কোন গ্রহ থেকে এসেছেন?’ অবশ্য মাঠের বাইরেও তাকে ঘিরে এ প্রশ্ন তোলা যায়। কেননা তিনি আর দশটা মানুষের মতো বৈষয়িক হিসাবি জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন না। ফুটবলনেশার বাইরে তার ছিল আরো দুটি নেশা— মদ্যপান ও নারীসঙ্গ। এ দুটি বদভ্যাস তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ালেও ভেতরের মনটা ছিল শিশুর মতো সরল।

’৬২ বিশ্বকাপের কথা। কোচ বোর্ডে প্রতিপক্ষ দলের ট্যাকটিস বোঝাচ্ছেন। ওরা এই করবে, সেই করবে; আমরা তার জবাবে এই করব, সেই করব ইত্যাদি। গারিঞ্চা হাই তুলে কোচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রতিপক্ষ এই করবে, ওই করবে বলছেন। আপনি কি ওদের অমন করতে বলেছেন?’ সুইডেন কিংবা চিলি বিশ্বকাপে গারিঞ্চা একটি রেডিও কিনেছিলেন। রেডিওতে নিজের দেশের গান শুনবেন বলে! আসলে ব্রাজিল ছেড়ে কত দূরে ছিলেন, সে ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল না।

’৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে সুইডেনকে হারানোর পর তার সতীর্থরা উল্লাসে ফেটে পড়লেও গারিঞ্চা বুঝতে পারছিলেন না এত আনন্দের কী আছে! ভেবেছিলেন, এটা হয়তো লিগের মতোই দুটি করে ম্যাচ, তাই আরো একটা ম্যাচ বাকি। সবচেয়ে অবাক করা কথা হলো, ’৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নামার আগে গারিঞ্চা জানতেন না প্রতিপক্ষ কোন দল! আসর শুরুর আগে তার টনসিলে অস্ত্রোপচার করা হয়। কোনো রকম চেতনানাশক ছাড়াই ডাক্তারের সুই-সুতোর সেলাই সহ্য করেছিলেন। অস্ত্রোপচার শেষে বোঝা গেল তার ব্যথা সহ্যের হেতু, ‘সেই ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করলাম। এখন থেকে ইচ্ছেমতো আইসক্রিম খেতে পারব!’

টাকা-পয়সার কোনো হিসাব তিনি রাখতেন না। পেলের মতো ছিল না নিজস্ব অ্যাকাউন্ট্যান্ট। একবার গারিঞ্চার বন্ধুরা বুদ্ধি করে দুই ব্যাংক কর্মকর্তাকে ঠিক করে তার ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজর হিসেবে। সেই দুই ব্যাংকার গারিঞ্চার বাসায় গিয়ে দেখলেন, কোথায় নেই টাকা-পয়সা! কাপ-পিরিচের ওপর ভিজে নষ্ট হচ্ছে চকচকে সব নোট! আসবাবপত্রের ফোঁকরেও গুঁজে রাখা হয়েছে কিছু। এমনকি টাকা-পয়সা রাখা হয়েছে ফলের পাত্রেও!

গারিঞ্চার এই বেসামাল জীবনের সুযোগ নিয়েছে বোটাফোগোও। বিশ্ব জয় করেও বোটাফোগোয় খেলে গেছেন নামমাত্র টাকায়। কখনো সই করেছেন সাদা চুক্তিপত্রেও! গারিঞ্চার আত্মজীবনীতে লেখক রুই কাস্ত্রোর ভাষ্য, ‘পেশাদার ফুটবলে গারিঞ্চা সর্বকালের সেরা অ্যামেচার ফুটবলার। সে কখনো অনুশীলন করেনি। কোনো এজেন্ট ছিল না। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করত কোনো কিছু না দেখেই। বিশেষ করে টাকার অংকটা বসানোর আগেই স্বাক্ষর করেছে বেশির ভাগ সময়। বিশ্বকাপ জয়ের বোনাস হাতে পাওয়ার পর সে টাকাটা তার স্ত্রীকে দেয়। বাচ্চাদের খেলার ম্যাট্রেসের নিচে সেই টাকা লুকিয়ে রেখেছিলেন তার স্ত্রী। বহু বছর পর সেই টাকাটার কথা মনে পড়ে তাদের। গিয়ে ম্যাট্রেস তুলে দেখেন, সেগুলো এখন উইপোকার খাবারের উচ্ছিষ্ট।’

প্রথম বিয়ে ১৮ বছর বয়সে। সে ঘরে আট মেয়ের জন্ম হওয়ায় তাকে ছেড়ে রিওতে চলে যান গারিঞ্চা। তিন বিয়েতে বৈধ সন্তানের সংখ্যা ১৪। এর বাইরে আরো গোটাকয়েক সম্পর্ক ছিল। তার মধ্যে রয়েছেন ব্রাজিলের তত্কালীন ভাইস প্রেসিডেন্টের সাবেক প্রণয়নী ও অভিনেত্রী। তবে সেই সময় ব্রাজিলের সবচেয়ে বিখ্যাত সাম্বা গায়িকা এলজা সোয়ারেসই গারিঞ্চার মনে দাগ কেটেছিলেন বেশি। এলজার মধ্যে গারিঞ্চা খুঁজে পেয়েছিলেন ভালোবাসার সব রঙ। দুজনের ছবি ঘরে টাঙিয়ে রাখতেন ব্রাজিলের ফুটবলমোদীরা। তাদের কাছে এ দুজন ছিলেন ‘রাজ-যোটক’। গারিঞ্চা ফুটবলের, এলজা সাম্বার। ব্রাজিলিয়ানদের জীবন যে দুটি বিষয়ের ঘূর্ণাবর্তে বহমান, তার রাজা-রানী!

কিন্তু তাদের সেই রাজার ব্যক্তিগত জীবনটা ছিল অ্যালকোহলে পরিপূর্ণ। মাঠে নামার আগে ও পরে ‘কাশাচা’ লাগবেই গারিঞ্চার। এমনকি বিরতির সময় লুকিয়ে পানি খাওয়ার বোতলেও ভরেছেন ‘কাশাচা’ (ব্রাজিলের এক ধরনের অ্যালকোহলিক পানীয়)! আর্থিক দৈন্যদশায় পড়ায় ব্রাজিল কফি ইনস্টিটিউটের দূত করা হয়েছিল তাকে। এ দায়িত্ব পালনেও তিনি ছিলেন ঐতিহাসিক রকমের ব্যর্থ। বোলোনিয়ায় কফি প্রদর্শনীতে এক ইতালিয়ান তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ব্রাজিলিয়ান কফি কি সত্যিই ভালো?’

জবাব এল, ‘জানি না। কোনো দিন এটা খেয়ে দেখিনি। তবে এটা বলতে পারি যে, ব্রাজিলিয়ান কাশাচা দুর্দান্ত জিনিস।’

গারিঞ্চা ‘কাশাচা’ খাওয়া শুরুর পর একসময় সেই কাশাচাই খেয়ে দেয় তার জীবন। মদ্যপান করে একবার বাবাকে নিয়ে গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। একইভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন বান্ধবী এলজাকে সঙ্গে নিয়েও। এলজার দুটি দাঁত উপড়ে গিয়েছিল। তবে এলজার মাকে নিয়ে গাড়ি দুর্ঘটনাটা গারিঞ্চাকে কষ্ট দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। এ দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। এলজাও গারিঞ্চাকে ছেড়ে চলে যায়।

অভাব-অনটনের পাশাপাশি ভীষণ একা হয়ে পড়েন গারিঞ্চা। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের কাছে মাথা গোঁজার জন্য একটা বাড়ি চেয়েছিলেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর থেকেই উধাও। একদিন তাকে দেখা গেল রিও ডি জেনিরো শহরের গির্জার সামনে। পাঁড় মাতাল হয়ে কাঁদছেন। এভাবে কয়েক বছর চলার পর ১৯৮০ সালে ভীষণ অসুস্থ গারিঞ্চাকে নিয়ে যাওয়া হয় রিও কার্নিভালে। তখন সাধারণ বাহ্যজ্ঞান তার ছিল না। বসেছিলেন কার্নিভালের এক কোণে। ভিআইপি বক্স থেকে তার দিকে ফুলে্র তোড়া ছুড়ে মেরেছিলেন পেলে। ঘোরের মধ্যে থাকা গারিঞ্চা এসবের কোনো কিছুই খেয়াল করেননি। পেলে তার সতীর্থের কাছে এগিয়ে পর্যন্ত আসেননি। টিভি ক্যামেরায় দেখা গেল, হতাশায় কালোমানিক বারকয়েক মাথা নাড়লেন।

আকণ্ঠ মদ্যপানের খেসারতগুণে ১৯ জানুয়ারি, ১৯৮৩ কর্পদকশূন্য এবং ভীষণ একা হয়ে বিশ্বসংসারের মায়া কাটান গারিঞ্চা। মারাকানায় নেয়া হয়েছিল তার কফিন। সেখান থেকে গারিঞ্চার জন্মস্থান পাউ গ্রান্দে পর্যন্ত হেঁটে তার শবযাত্রার সঙ্গী হয়েছিল লাখো মানুষ। রিও ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হোসে সের্জিওর চোখে, গারিঞ্চার মৃত্যুর খবর ব্রাজিলিয়ানদের ঘরে পৌঁছেছিল জাতীয় শোকের আবহ হয়ে। ‘ছোট পাখি’র শেষ জীবনের নিয়তিটুকুর জন্য সবাই নিজেকে অপরাধী ভেবেছে। সের্জিওর ভাষায়, ‘গারিঞ্চাকে সবাই চিনত। তিনি কখনো নিজের শিকড় ছাড়েননি। আর তাই বেশির ভাগ ব্রাজিলিয়ান তাকে ভেবেছে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে। সে প্রতিনিধির এমন মৃত্যুর জন্য সবাই তো নিজেকে দোষারোপ করবেই।’

গারিঞ্চার মৃত্যুর পরদিন ব্রাজিলের খ্যাতনামা কবি কার্লোস দ্রুমান দি আন্দ্রেয়া তার কলামে লিখেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকলে তিনি ভীষণ চতুর। গারিঞ্চা তারই পাঠানো সেই ভাগ্যবিড়ম্বিত প্রতিনিধি, যে কিনা একাই গোটা দেশের দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সৃষ্টিকর্তাই আবার একই সঙ্গে ভীষণ নিষ্ঠুরও। খেলা ছাড়ার সঙ্গে গারিঞ্চা যেন তার জীবনকেও ছেড়ে দিয়েছিলেন! কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কেউ তার খেয়াল রাখেনি। আমাদের দুর্ভাগ্য আবারো সমাগত। কিন্তু আরেকজন গারিঞ্চাকে কখনই খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

দ্রুমান সঠিক বলেছিলেন। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল আজ পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনো ‘ছোট পাখি’র দেখা পায়নি। দেশটির বুড়ো-থুত্থুড়ে ‘নস্টালজিক’ ফুটবলমোদীরা তাই এখনো ঢুঁ মারেন রিও ডি জেনিরোর সমাধিক্ষেত্রে। যেখানে ঘুমিয়ে থাকা গারিঞ্চার সমাধিফলকে লেখা রয়েছে—, ‘Here rests in peace the one who was the joy of people – Mane Garrincha .’

ব্রাজিলিয়ানদের নিঃশ্বাসের এক পিঠে পেলে, অন্যপিঠে গারিঞ্চা। পেলে নিজেকে গড়েছেন। গারিঞ্চাকে কেউ গড়তে পারেনি। কারো কাছ থেকে শেখার মতো ধৈর্যও তার ছিল না। আর দশটা সাধারণ ব্রাজিলিয়ানের মতোই গারিঞ্চার জীবনদর্শন ছিল, খাও-দাও, মাঠে ফুর্তি করে বাঁচো। দুই কিংবদন্তির প্রতি ব্রাজিলিয়ানদের মনোভাবটা তকমাতেই পরিষ্কার— পেলেকে ডাকা হয় ‘ও রেই’। মানে, রাজা। গারিঞ্চা ‘জয় অব পিপল’। অর্থাত্ মানুষের আনন্দ। যে আনন্দের ব্যাখ্যায় অ্যালেক্স বেলোজের ভাষ্য, ‘ব্যাপারটা এমন নয় যে, পেলেকে ব্রাজিলিয়ানরা অপছন্দ করে। এখানকার মানুষ ভীষণ আবেগি। তাই গারিঞ্চার জীবনটাই তাদের বেশি টেনেছে। মাঠে যেভাবে তিনি খেলেছেন, সেটা যেন ব্রাজিলিয়ানদের জীবনদর্শন। যত পারো মজা করো। এ জায়গাটায় ব্রাজিলিয়ানরা পেলের চেয়ে গারিঞ্চাকেই বেশি ভালোবাসে। পেলে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি বৈশ্বিক তারকা। জিততে ভালোবাসেন। গারিঞ্চা শুধু খেলতে ভালোবাসতেন। ব্রাজিল কিন্তু বিজয়ীদের দেশ নয়, এখানে উপভোগই জীবন।’

গারিঞ্চার কাছ থেকে জীবন উপভোগ শিখলেও, তার জীবদ্দশায় দাম চুকাতে পারেনি ব্রাজিল। মরণের পর ছোট পাখির সমাধিফলকে অন্তত কৃতজ্ঞতাটুকু জানাতে ভোলেনি তার ভক্তরা, ‘thank you, garrincha. for having lived।’

লিখেছেন – মেহেদী হাসান রোমেল

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 + 7 =