পেলের চেয়েও সেরা

ফুটবল খেলাটার শুরু থেকেই ব্রাজিলিয়ানদের সাথে সখ্যতা, ব্রাজিল ও ফুটবল – বহুক্ষেত্রেই একটা পূর্ণ করেছে অপরকে। আধুনিক ফুটবলের বিকাশের পেছনে ব্রাজিলিয়ানদের অবদান সর্বাধিক বললেও বোধকরি ভুল বলা হবে না। সেই ব্রাজিলই যখন ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচটি আসরের মধ্যে একবারও নিজেদের ঘরে শিরোপা তুলতে পারলো না, চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ব্রাজিলীয় কর্তাব্যক্তিরা। ১৯৫৮ বিশ্বকাপের সময়ে তাই ইউরোপীয়দের আদলে তারাও নিজেদের সম্পূর্ণ ফুটবল কাঠামোটাকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করলেন একটা – ইউরোপীয়রা যেরকম নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, ট্যাকটিকস ইত্যাদির দিকে গুরুত্ব দিত বেশী ব্রাজিলীয়ানরাও চাইলো সাফল্য অর্জনের জন্য সেরকমই কিছু একটা করতে। ফলে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া খেলোয়াড়দের আইকিউ টেস্ট, সাইকোলোজিক্যাল প্রোফাইলিং টেস্ট ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এইসব টেস্ট যারা পাশ করতে পারবেন, তারাই বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে যাবেন, এরকমই চিন্তাভাবনা আরকি।

স্কোয়াডের একজন খেলোয়াড় এই দুই টেস্টেই ডাঁহা ফেল করলেন। এমনিতেই জন্ম থেকেই পোলিও ও অপুষ্টির কারণে দুই পা বাঁকা, তার উপর বাম পা টা ডান পায়ের চেয়ে ৬ সেন্টিমিটার লম্বা। কিন্তু তাও স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি, এমনই দুর্দমনীয় ছিল তাঁর প্রতিভা। ১৯৫৮ বিশ্বকাপ ব্রাজিলকে জিতিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন যে না, এইসব নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, ট্যাকটিকসের চেয়েও শিল্পটা বড় – যে শিল্পের ছোঁয়াতেই জেতা যায় বিশ্বকাপ।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে সেই ম্যাচ
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে সেই ম্যাচ

তিনি গারিঞ্চা। পুরো নাম ম্যানুয়েল ফ্র্যান্সিস্কো ডস স্যান্টোস। ছোটবেলা থেকেই টিংটিঙে দুটো পা নিয়ে পাড়া মাতিয়ে বেড়াতেন তিনি, কোনকিছুর তোয়াক্কা করতেন না। বড় বোন রোসা তাই বুঝি তাঁর ডাকনাম রেখেছিলেন গারিঞ্চা – ব্রাজিলিয়ান শব্দটির অর্থ করলে দাঁড়ায় “ছোট পাখি”।

আসলেই তিনি তোয়াক্কা করতেন না কোনকিছুর। এমনকি ফুটবলকেও সেরকম গুরুত্বপূর্ণ বলে কিছু মনে করতেন না যার জন্য জীবন দিয়ে দিতে হবে। ১৯৫০ সালের ফাইনালে নিজেদের মাটিতে ব্রাজিল যখন উরুগুয়ের মুখোমুখি হল, পুরো ব্রাজিলের দৃষ্টি, মনোযোগ তখন মারাকানা স্টেডিয়ামের দিকে। এই গারিঞ্চা তখন খেলা দেখা বাদ দিয়ে চলে গেলেন মাছ ধরতে। আবার ফাইনাল যখন ব্রাজিল হেরে গেল, যা কিনা ব্রাজিলের ইতিহাসে এখনো সবচাইতে দুঃখের দিন হিসেবে পরিচিত, গারিঞ্চা বুঝেই পেতেন না একটা ফুটবল ম্যাচই ত হেরেছে দল, তাতে এত কেঁদেকেটে একসার হওয়ার কি হয়েছে! ১৯৫৩ সালে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব বোটাফোগোতে যোগ দিয়েছিলেনও একরকম অনিচ্ছাসত্বে, বোটাফোগোর এক স্কাউট তাঁকে ধরে বেঁধে কন্ট্রাক্ট সাইন না করালে হয়ত বিশ্ব ফুটবল এই জিনিয়াসের কারবার সম্বন্ধে জানতই না!

ত যাই হোক, বোটাফোগোর হয়ে প্রথম প্রফেশনাল কন্ট্রাক্ট সাইন করার সময়েই তিনি ইতোমধ্যে এক বাচ্চার বাবা হয়ে গিয়েছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই যথেষ্ট মদ ও নারীর প্রতি আসক্ত ছিলেন তিনি। সবমিলিয়ে ৪৯ বছরের জীবনে পাঁচ-পাঁচজন সঙ্গী থেকে পাওয়া ১৪ বাচ্চার মুখ থেকে বাবা ডাক শোনার সৌভাগ্য ত আর এমনি এমনি হয়নি! ছোটবেলার সঙ্গীর সাথে বিয়ে করে সেটা বছর দশেকের বেশী টেকেনি, পরে গাঁটছড়া বাঁধলেন তৎকালীন ব্রাজিলের বিখ্যাত সাম্বা গায়িকা এলজা সোয়ারেসের সাথে, যেটা কিনা তখনকার সময়ে পত্রিকাগুলির অন্যতম আকর্ষণের বিষয় ছিল, বলে রাখা ভালো ব্রাজিলিয়ানরা এই বিয়েটাকে কখনই ভালো চোখে দেখেনি। একবার ত মদটদ খেয়ে টাল হয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মেরেই ফেললেন শাশুড়িকে। এরকম হাজারো পারিবারিক সমস্যায় পড়ে আবার কয়েকবার আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিলেন তিনি! ব্যক্তিগত জীবনে এরকমই খামখেয়ালী ছিলেন এই বিরলপ্রজ ফুটবলার।

যাই হোক, ১৯৫৩ সালে ব্রাজিল কাঁপানো এই তারকা ১৯৫৪ বিশ্বকাপের দলে জায়গা পেলেন না। মাত্র এক বছর আগে ক্যারিয়ার শুরু করা খেলোয়াড়কে দলে রাখতে কোচ ভরসা করতে পারেননি বোধকরি। ১৯৫৮ সাথে পেলের সাথে একসাথে দলে ডাক পেলেন তিনি। যদিও পেলের চেয়ে সাত বছরের বড় ছিলেন তিনি, কিন্তু দুইজনের ব্রাজিল অভিষেক হয়েছিল একই সাথে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে ম্যাচে। সেই ম্যাচের আগে নিজেদের শক্তি নিয়ে সংশয়ে থাকা ব্রাজিলিয়ানরা ম্যাচ শুরু পর প্রথম তিন মিনিটে যা দেখালো, বিশেষত গারিঞ্চা আর পেলে, তা ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ তিন মিনিটের আখ্যা পেয়ে গেছে অনেকের কাছে। পেলে-গারিঞ্চা দুজনের নৈপুণ্যেই প্রথম শিরোপা ঘরে তুললো সেবার ব্রাজিল।

আসলো ১৯৬২ বিশ্বকাপ, প্রথম দুই ম্যাচে ভালো খেলতে পারেননি তেমন পেলে, তার উপর দ্বিতীয় ম্যাচে ইনজুরিতে পড়ে টুর্নামেন্টই শেষ হয়ে গেল তাঁর। শুরু হল গারিঞ্চা-জাদু। বলতে গেলে একরকম নিজের হাতে (নাকি পায়ে?) ব্রাজিলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতালেন তিনি। বলে রাখা ভালো, ১৯৬২ দলে তিনি আর পেলে ছাড়া সেরকম কেউই ছিলেন না, পেলেও যখন ইনজুরিতে পড়ে চলে গেলেন কিছু না করতে পেরে, ফলে গারিঞ্চাকে একাই করতে হয়েছে যা করার, অনেকটা ছিয়াশির বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার মত। জিতলেন গোল্ডেন বল-বুট ; দুটোই। বিশ্ব দেখলো পোলিও আক্রান্ত এক বিকলাঙ্গ খেলোয়াড়ের উপর ভর করে ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের কাহিনী।

ব্রাজিলের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়ের নাম করতে গেলে সবাই মোটামুটি একবাক্যে স্বীকার করেন পেলের নাম। কিন্তু ব্রাজিলে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, পেলে বোধকরি ব্রাজিলেই অতটা জনপ্রিয় না যতটা তিনি বাকী বিশ্বের কাছে জনপ্রিয়। ব্রাজিলিয়ানরা এখনো সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মানে গারিঞ্চাকে। পেলেও কি তা মানেন না?

95d989d3bdc41928554df15f5c4b8829

“বিশ্বের ইতিহাসেরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলার গারিঞ্চা, সে বল দিয়ে এমন কিছু করতে পারত যা আমি আর অন্য কাউকে করতে দেখিনি। বলা বাহুল্য, উনি না থাকলে হয়তোবা আজ আমার তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া হত না” – খোদ পেলের স্বীকারোক্তি!

পেলে সেটা বলবেন নাই বা কেন, ১৯৫৮ সালে পেলে মাত্র ১৭ বছরের তরুণ, বিশ্ব ফুটবলে তখন মাত্র বেজেছে তাঁর আগমনী দামামা। সেবার গারিঞ্চা সহ ভাভা, দিদি, মারিও জাগালো এদের সহায়তাতেই ত ব্রাজিল জিতলো বিশ্বকাপ। ১৯৭০ বিশ্বকাপের সময়ে ফর্মের তুঙ্গে থাকা পেলের সাথে ছিলেন করিন্থিয়ানস ও ফ্লুমিনেন্স মাতানো বিখ্যাত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রিভেলিনো, ক্রুজেইরোর বিশ্বংসী স্ট্রাইকার টোস্টাও, ফ্ল্যামেঙ্গো ও বোটাফোগোর কিংবদন্তী মিডফিল্ডার গেরসন, বোটাফোগোর আরেক কিংবদন্তী জেয়ারজিনহো, সান্তোসের কিংবদন্তী মিডফিল্ডার ক্লদোয়ালদো, ছিলেন কিংবদন্তী অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো তরেস। অনেকটা এ যুগের বিশ্বজয়ী স্পেইন দলের মত। যেখানে একসাথে ফর্মের তুঙ্গে খেলে গেছেন জাভি, ইনিয়েস্তা, টরেস, ভিয়া, বুসকেটস, ফ্যাব্রিগাসদের মত একঝাঁক তারকা।

কিন্তু ১৯৬২ বিশ্বকাপে? সেখানে ত এক গারিঞ্চার কাঁধেই ছিল পুরো ব্রাজিলের ভার। এবং সেটা তিনি পালনও করেছেন অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে। পেলের জীবনে এরকম কোন কৃতিত্ব আছে? দলের একমাত্র সুপারস্টার হয়ে দলকে বিশ্বজয়ী করার কৃতিত্ব? খোদ পেলেও মনেহয় স্বীকার করার সাহস করবেন না। আর এখানেই নিহিত গারিঞ্চার শ্রেষ্ঠত্ব, এখানে পেলের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে গারিঞ্চা।

ওয়েলস ডিফেন্ডার মেল হপকিন্স, যার কিনা ১৯৫৮ বিশ্বকাপে পেলে-গারিঞ্চার মুখোমুখি হওয়ার সৌভাগ্য (!) হয়েছিল, একবাক্যে স্বীকার করেছেন, পেলে নন, গারিঞ্চাই সেরা – সেটা দ্রুততা, ড্রিবলিং, হুট করে জাদুকরি কিছু করে দেখানোর ক্ষমতা সবকিছু মিলিয়েই!

article-2273504-17596a37000005dc-98_964x684

ফুটবল খেলে আনন্দ দিতেন তিনি দর্শকদের। মাঠের ডান প্রান্তে তাঁর দেখানো একের পর এক জাদুকরি মুহূর্তে মোহাবিষ্ট হয়ে থাকত দর্শক, তাঁর প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের বোকা বানানো দেখে আমোদ পেত দর্শক, আনন্দ পেতেন গারিঞ্চাও। গোল করার থেকে গোল করার আগের কারিকুরিগুলো করতেই যার আনন্দ নিহিত ছিল। বিদ্যুৎগতিতে এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল নিয়ে অপেক্ষা করতেন আবার ঐ ডিফেন্ডারের জন্য, যাতে সে আবার বলের জন্য আসে, আর আবার যাতে গারিঞ্চা তাঁকে ড্রিবল করে কাটিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

এমনই খামখেয়ালীপনায় ভরপুর ছিলেন গারিঞ্চা। নিজের দিকে একটু খেয়াল রাখলে হয়তোবা পেলে না, বিশ্ববাসী ধন্য ধন্য করত এই গারিঞ্চাকে নিয়েই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen − 11 =