পাকো অ্যালস্যাসের : বার্সার নতুন “ব্যাকআপ স্ট্রাইকার”

মেসি-সুয়ারেজ-নেইমার। মোটামুটি তর্কাতীতভাবেই বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সেরা ফরোয়ার্ড লাইনআপ এখন এইটা। গত কয়েক বছরে এই ত্রয়ী বার্সেলোনাকে উপহার দিয়েছেন গোলের পর গোল, শিরোপাও এসেছে অনেক এই তিনজনের কল্যাণে। তাও, যত সেরাই হোক না কেন, কোন কারণে এই তিনজনের একজন যদি ইনজুরিতে পড়ে যান, সেক্ষেত্রে বার্সার বেঞ্চে কি আদৌ সেই অভাব পূরণ করার মত কোন ফরোয়ার্ড বা অ্যাটাকার আছেন? গত মৌসুমের আগ পর্যন্ত পেদ্রো রদ্রিগেজ ছিলেন, সেই পেদ্রোরও ঠিকানা গত মৌসুম থেকে হয়ে গিয়েছে চেলসি। পেদ্রো যাওয়ার পর থেকে এই ব্যাকআপ ভূমিকায় খেলে যাচ্ছেন মুনির এল হাদ্দাদি।

তবে এই মৌসুমে বার্সা যে এই ব্যাকআপ ভূমিকায় আরো ভালো কাউকে চায়, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল এবারের দলবদলের বাজার খোলার সাথে সাথেই। সেভিয়ার ফরাসী ফরোয়ার্ড কেভিন গ্যামেইরো থেকে শুরু করে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার লুসিয়ানো ভিয়েত্তো, মেক্সিকোর ক্লাব টিগ্রেসের ফরাসী স্ট্রাইকার আন্দ্রে-পিয়েরে জিনিয়্যাক থেকে জুভেন্টাসের পাউলো ডাইবালা, এমনকি নিউক্যাসল ইউনাইটেডের তরুণ স্ট্রাইকার আয়োজে পেরেজকে পর্যন্ত নজরে রেখেছিল বার্সেলোনা, নিজেদের দলে আনার জন্য। বলা বাহুল্য, কোন স্ট্রাইকারকেই দলে পায়নি বার্সেলোনা। ভিয়েত্তো ও গ্যামেইরো নিজেদের মধ্যে দল অদলবদল করেছেন, আর বাকীদেরকে তাঁদের ক্লাব ছাড়ে নি। ফলাফল, সর্বশেষে এই ভ্যালেন্সিয়ার স্প্যানিশ স্ট্রাইকার প্যাকো অ্যালস্যাসেরের প্রতি আগ্রহী হয় বার্সেলোনা।

960

বার্সেলোনা ও ভ্যালেন্সিয়ার ট্রান্সফার সখ্যতার ইতিহাস আজকের নতুন না। গত কয়েক বছর ধরেই ভ্যালেন্সিয়া থেকে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়। ২০১০ বিশ্বকাপের ঠিক আগ দিয়ে স্পেইনের সুপারস্টার স্ট্রাইকার ডেভিড ভিয়া ভ্যালেন্সিয়া থেকে যোগ দেন বার্সেলোনায়। ২০১২ মৌসুমে ভ্যালেন্সিয়া থেকে উড়ে এসে স্প্যানিশ লেফটব্যাক জর্ডি আলবা বার্সার লেফটব্যাক সমস্যার সমাধান করেছিলেন, তাঁর দুই মৌসুম পরেই বার্সার ইনজুরি-জর্জর ডিফেন্সকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে ভ্যালেন্সিয়া থেকে নিয়ে আসা হয় ফরাসী সেন্টারব্যাক জেরেমি ম্যাথিউকে। আর এই মৌসুমে ইউরোজয়ী পর্তুগিজ মিডফিল্ডার আন্দ্রে গোমেজকে ভ্যালেন্সিয়া থেকে নিয়ে আসার খবর ত সবারই জানা। এই তালিকায়ই এবার যোগ হতে যাচ্ছে স্প্যানিশ স্ট্রাইকার পাকো অ্যালস্যাসেরের নাম।

স্পেইনের অনুর্ধ্ব ১৬ থেকে মোটামুটি বয়সভিত্তিক সব দলে খেলা এই স্ট্রাইকারের মূল স্পেইন দলে অভিষেক ২০১৪ সালে। তারপর থেকে ১৩ ম্যাচ খেলে ৬ গোল করেছেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরু দিকে রবার্তো সলদাদো, জোনাস, নেলসন ভালদেস, হেলদের পোস্টিগা, আরিতজ আদুরিজ, আলভারো নেগ্রেদো ইত্যাদি স্ট্রাইকারদের ছায়ায় থাকা অ্যালস্যাসেরের প্রকৃত উত্থান মূলত ২০১৪ সাল থেকে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। আর এখন ত বার্সেলোনার নজরেই পড়ে গেছেন। ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে ৯২ ম্যাচে ৩০ গোল করা এই স্ট্রাইকারই এখন বার্সার বিখ্যাত ‘ব্যাকআপ ম্যান’।

বার্সার নতুন ব্যাকআপ ম্যান
বার্সার নতুন ব্যাকআপ ম্যান

প্যাকো অ্যালস্যাসেরকে একবিংশ শতাব্দীর মডার্ণ স্ট্রাইকারদের এক উজ্জ্বল উদাহরণ বলা চলে। গত প্রায় দশ বছর ধরে ভ্যালেন্সিয়ার অ্যাকাডেমি ও স্পেইনের প্রত্যেকটি বয়সভিত্তিক দলে খেলার ফলে স্প্যানিশ টিকিটাকার সাথেও বড্ড মানিয়ে যায় তাঁর খেলার ধরণটা। টিপিক্যাল অলস নাম্বার নাইন নন তিনি, যাকে বরাবরই মিডফিল্ডার কিংবা উইঙ্গারদের উপর ভরসা করে থাকতে হয় গোলসহায়তার জন্য। নিয়মিত অ্যাটাকিং থার্ডে ছোট ছোট পাসে অব্যস্ত তিনি, নিয়মিত উইঙ্গারদের সাথে জায়গা বদল করতেও দেখা যায় তাঁকে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নিয়মিতভাবে পূর্বসূরি ডেভিড ভিয়ার সাথে তুলনা শুনে আসা এই স্ট্রাইকারের আরেকটা বড় গুণ মিডফিল্ডারদের সাথে লিঙ্ক আপ রাখার অনন্য ক্ষমতা, শুধু শুধু ডি-বক্সে অকার্যকর হয়ে বলের জন্য অপেক্ষা করার স্ট্রাইকার তিনি নন। সাধারণত ৪-৩-৩ ফর্মেশানে তিন ফরোয়ার্ডের মাঝে খেলে অভ্যস্ত অ্যালস্যাসেরের দুই উইংয়ে খেলে থাকেন রড্রিগো মোরেনো ও এই মৌসুমেই ফ্রি তে ওয়েস্টহ্যামে যোগ দেওয়া আলজেরিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার সোফিয়ানে ফেগহৌলি। সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেললেও সামনের তিনজনের যে কারোর পজিশানেই খেলার সামর্থ্য রাখেন অ্যালস্যাসের, তাই বলা যেতে পারে মেসি, সুয়ারেজ বা নেইমার, যে কারোরই পজিশানে যোগ্য ব্যাকআপের ভূমিকা রাখতে পারার ক্ষমতা আছে তাঁর। ফার্স্ট টাচ অসাধারণ, এবং এই জায়গাতেই বার্সার বর্তমান চতুর্থ স্ট্রাইকার মুনির এল হাদাদির চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে তিনি। এই ফার্স্ট টাচ ও দ্রুততার মাধ্যমেই অনেক সময় তাঁর নিজের মার্কার ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলার সামর্থ্য রাখেন তিনি। পজিশনিং সেন্স অনেক ভালো, সতীর্থ কেউ গোল করার জন্য তাঁর থেকেও ভালো অবস্থানে থাকলে ঠিকই তাঁকে খুঁজে নেয় অ্যালস্যাসেরের পাস। ৫ ফিট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার অ্যালস্যাসেরের আরেকটি গুণ গতানুগতিক স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের তুলনায় বেশ শক্তসমর্থ ফিজিক্যাল খেলোয়াড় তিনি, বাতাসে ভেসে আসা বলগুলো সামলানোর ক্ষেত্রেও বেশ দক্ষ, যেটাকে বলা হয় “এরিয়ালি স্ট্রং ক্যালিবার (Aerially strong calibre)” এর খেলোয়াড়।

রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লা লিগার এক ম্যাচে গোল করার পর
রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লা লিগার এক ম্যাচে গোল করার পর

অ্যালস্যাসেরের কোন সমস্যা থেকে থাকলে সেটা তাঁর অধারাবাহিকতা। এই অধারাবাহিকতার কারণে মাঝে মাঝেই তাঁকে বড় ম্যাচগুলোতে নিষ্প্রভ থাকতে দেখা যায়। দুই পায়ে খেলতে সমান স্বচ্ছন্দ হলেও ডান পায়ের উপর তাঁর অস্বাভাবিক ধরণের নির্ভরতা অনেক সময় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কাছে তাঁকে মার্ক করা অনেক সহজ করে তোলে। অ্যালস্যাসেরের আরেকটা নেতিবাচক দিক হল তাঁর “ট্র্যাক ব্যাক” বা বিপদের সময়ে ডিফেন্সে নেমে সতীর্থ ডিফেন্ডারদের সাহায্য করতে অনীহা, ট্যাকলিংয়ে ভালো নন তিনি। তবে এইসব নেতিবাচক দিকগুলোকে তিনি ভুলিয়ে দেন তাঁর অসাধারণ ভিশন, চাতুর্য ও পজিশনিং সেন্স দিয়ে।

মুনির এল হাদ্দাদির চেয়ে এক ধাপ উন্নত মানের এক ব্যাকআপ পেতে যাচ্ছে বার্সা, বলাই যায় তাহলে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twelve − one =