গ্যাব্রিয়েল বারবোসা : ইন্টারের নতুন রোনালদো?

ব্রাজিলিয়ান ফেনোমেনন রোনালদো থেকে এমপেরোর আদ্রিয়ানো, গত দুই দশকে ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানে ব্রাজিল থেকে স্ট্রাইকার যারাই এসেছেন, ক্লাবের ইতিহাসে নিজেদের নাম একেবারে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে দিয়ে গেছেন। তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হল মাত্র, ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোস কাঁপানো উনিশ বছর বয়সী ব্রাজিলের হয়ে অলিম্পিকজয়ী স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বারবোসা। ২৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে সান্তোস থেকে ইন্টার মিলানে যোগ দিয়েছেন “নতুন নেইমার” খ্যাত এই স্ট্রাইকার।

গ্যাব্রিয়েল নতুন নেইমার কি না, সেই আলোচনায় আসা যাবে পরে। ইন্টার মিলানে যেহেতু যোগ দিয়েছেন, নতুন রোনালদো বা নতুন আদ্রিয়ানো হতে পারবেন কিনা, ইন্টার সমর্থকদের কাছে মূল ভাবনার বিষয় সেটাই। ছয় মৌসুমের বেশীরভাগ সময়েই ইনজুরি-জর্জর থেকেও ব্রাজিলিয়ান রোনালদো ইন্টারে যা যা করে গেছেন (৬৮ ম্যাচে ৪৯ গোল, একবারের ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় ও ব্যালন ডি অর), তাঁর সিকেভাগ গ্যাব্রিয়েল বারবোসা করতে পারলেও বর্তে যাবেন ইন্টার সমর্থকেরা। কিংবা রোনালদো না হলে আরেক আদ্রিয়ানো, বর্তমান সময়ে মূলত নেতিবাচক কারণে খবরে আসা এই ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার যে কয়দিন ফর্মে ছিলেন, ট্রফির পরে ট্রফি দিয়ে গেছেন ইন্টার মিলানকে।

ইন্টারে রোনালদো কিংবদন্তীসম
ইন্টারে রোনালদো কিংবদন্তীসম

মিডিয়া মূলত ব্যতিব্যস্ত গ্যাব্রিয়েল বারবোসাকে নতুন নেইমার বানানোর জন্য। গ্যাব্রিয়েল নিজেও কিছুদিন আগে বলেছিলেন বার্সেলোনায় নেইমারের সাথে তাঁর খেলার ইচ্ছার কথা। এমনকি সান্তোসের সাথে বার্সেলোনার এরকম একটা চুক্তিও ছিল যে গ্যাবিয়েলকে ইউরোপিয়ান কোন ক্লাবের কাছে বিক্রি করার কথা উঠলে বার্সেলোনা কেনার সুযোগ পাবে সবার প্রথমে, এখন বার্সেলোনা কিনতে চায় নাকি চায় না তাঁদের ব্যাপার। বোঝাই যাচ্ছে, আসল নেইমারকে নিয়েই আপাতত সন্তুষ্ট বার্সা ম্যানেজমেন্ট, নতুন নেইমারকে আর দরকার নেই, যেই সুযোগটাই লুফে নিয়েছে ইন্টার মিলান।

মাত্র আট বছর বয়সে সান্তোসের যুব অ্যাকাডেমীতে যোগ দেওয়া গ্যাব্রিয়েল যুবদলের হয়ে পরের আট মৌসুমে এমন গোলের বন্যা বইয়ে দেন, সমর্থকেরা তাঁর নামের প্রথমাংশের সাথে ‘গোল’ শব্দটা জুড়ে দিয়ে ‘গ্যাবিগোল’-ই বানিয়ে দেয়। ঐ আট মৌসুমে ছয় শতাধিক গোল করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল, যা সান্তোসের মূল দলের তৎকালীন কোচ মুরিসি রামালহোকে বাধ্য করে মূল দলের সাথে তাঁর অনুশীলন করার সুযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য, মাত্র ১৬ বছর বয়সে! সান্তোসের মূল দলেও অভিষেক হয়ে যায় তাঁর এই সময়ে, ফ্ল্যামেঙ্গোর বিপক্ষে, কাকতালীয়ভাবে সান্তোসের হয়ে নেইমারের শেষ ম্যাচ ছিল সেটা। কি আশ্চর্য মিল, আসল নেইমারের বিদায়ে নতুন নেইমারের আগমনবার্তা!

আসল নেইমারের সাথে 'নতুন' নেইমার
আসল নেইমারের সাথে ‘নতুন’ নেইমার

তারপর থেকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি গ্যাব্রিয়েলকে। এই পর্যন্ত সান্তোসের হয়ে ৮২ ম্যাচ খেলে ২৪ গোল করেছেন। তাঁর ডাকনাম শুনে বলাই বাহুল্য, গোলের পর গোল করে যাওয়াই তাঁর স্বভাব, অর্থাৎ ফিনিশিং দুর্দান্ত। কিন্তু তাই বলে আবার টিপিক্যাল ‘নাম্বার নাইন’ স্ট্রাইকারও কিন্তু তিনি নন। সান্তোস ক্যারিয়ারে মোটামুটি ১৫টারও বেশী অ্যাসিস্ট ও ৮২% সফল পাসের হার জোরেশোরেই বলে তাঁর টেকনিক্যাল দক্ষতার কথা, তাঁর ভার্সেটাইলিটির কথা। এজেন্ট ওয়াগনার মৌরা ত বলেই দিয়েছেন, “গ্যাব্রিয়েল বারবোসার আছে পাওলো হেনরিক গানসোর বাম পা, নেইমারের টেকনিক্যাল স্কিল ও লুকাস মৌরার মত দ্রুততা।”

দুর্দান্ত টেকনিক্যাল স্কিল, চট করে দ্রুততার সাথে দৌড়ে মার্কার ডিফেন্ডারকে পিছে ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা, প্রচুর এনার্জি আর অ্যাটাকিং থার্ডে নিরলসভাবে খেটে যাওয়ার ক্ষমতা গ্যাব্রিয়েল বারবোসার ভার্সেটাইলিটির কথা প্রকাশ করে, প্রকাশ করে উইংয়েও তাঁর খেলতে পারার সামর্থ্যকে। দুই পায়ে খেলতে পারলেও মূলত বাম পায়ের এই খেলোয়াড় গোল করতে পারেন যেকোন কোণ থেকে। গ্যাব্রিয়েলের আরেকটা দুর্দান্ত গুণ হল ট্রেডিশনাল স্ট্রাইকারদের মত শুধুমাত্র ডি-বক্সেই ঘোরাফেরা করেন না তিনি, দরকার হলে মাঝমাঠে নেমে এসেও দলের বল পজেশন রক্ষায় সহায়তা করেন, আক্রমণ নির্মাণে সাহায্য করেন। এসব গুণ এর মধ্যেই সমর্থকেরা দেখে নিয়েছেন এবারের রিও অলিম্পিকে, যেখানে দুই গোল করে ব্রাজিলের স্বর্ণ জয়ে গ্যাব্রিয়েল বারবোসা রেখেছেন অপরিসীম ভূমিকা।

গ্যাবিগোল
গ্যাবিগোল

আপাতত গ্যাব্রিয়েল বারবোসার দুর্বলতা কোন কিছু থেকে থাকলে সেটা তাঁর শারীরিক দুর্বলতা। শক্তিশালী বিশালদেহী কোন স্ট্রাইকার নন তিনি। তাই গতি, দুর্দান্ত ড্রিবলিং, চৌকস পজিশনিং সেন্স – এসব গুণের উপরেই তাঁকে নির্ভর করতে হয়। এখন ইউরোপীয়ান লিগে যেহেতু এসেই গেছেন, এই দুর্বলতাটাও কোচ ফ্র্যাঙ্ক ডে ব্যোরের অধীনে কাটিয়ে উঠবেন, সে আশা করা যেতেই পারে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fifteen + four =