পেপ গার্দিওলার ফার্নান্দিনহো-ধাঁধা

পেপ গার্দিওলার ফার্নান্দিনহো-ধাঁধা

পেপ গার্দিওলা ম্যানচেস্টার সিটির কোচ হবার পর থেকেই শোনা যাচ্ছে এমন এক ধরণের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার তিনি চাচ্ছেন যার প্রথম কাজই হল নিজের অসাধারণ পাসিং ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে দুই সেন্টারব্যাকের ঠিক মাঝে থেকে পুরো খেলার গতিপথকে নিয়ন্ত্রণ করা। এর আগে গার্দিওলা যে দলেই কোচিং করিয়েছেন, প্রত্যেক দলেই এই ধরণের সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বার্সেলোনার কথাই চিন্তা করুন, সেখানে এই ভূমিকা পালন করার জন্য সার্জিও বুসকেটস কে পৃথিবীর অন্যতম সেরা পাসিং ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এই গার্দিওলাই বানিয়েছিলেন। বায়ার্ন মিউনিখে এসে এই কাজ দিয়েছিলেন ফিলিপ লাম কে, যদিও মূলত ফিলিপ লাম জীবনের একটা বিরাট অংশ রাইটব্যাক হিসেবেই খেলে গিয়েছেন। তবুও, লামের সঠিক পাস দেওয়ার প্রবণতা, নেতৃত্বগুণ ও দুর্দান্ত ফুটবল-মস্তিষ্কের কারণে এই ভূমিকায় খেলতে সমস্যা হয়নি তাঁর। আবার লামের পাশাপাশি এই ভূমিকায় খেলার জন্য রিয়াল মাদ্রিদ থেকে উড়িয়ে এনেছিলেন জাবি আলোনসোকেও, যে আলোনসো এই ভূমিকায় পৃথিবীর ইতিহাসেরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় – জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেয়া পিরলো, পল স্কোলস এর পাশাপাশি। জাবি আলোনসোকে আনতে গিয়ে টোনি ক্রুসের মত মিডফিল্ডারকে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে সঁপে দিতেও পিছপা হননি গার্দিওলা, এই পজিশনের খেলোয়াড়দের গার্দিওলা তাঁর নিজের সিস্টেমের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

পেপ গার্দিওলার ফার্নান্দিনহো-ধাঁধা

কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, ম্যানচেস্টার সিটিতে আসার পর এই ভূমিকায় বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় যারা আছেন, তাদের মধ্যে কাউকেই গার্দিওলা সিটিতে আনেননি এখন পর্যন্ত। বরং ভরসা করে গেছেন সিটিতে থাকা ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ফার্নান্দিনহোর উপরে। ফার্নান্দিনহোকে তাঁর কোচিং করানো অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের খেতাব দিয়েছেন গার্দিওলা নিজেই। সিটিতে আসার পরে এক ইলকায় গুন্দোগান ছাড়া কোন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারই আনেননি তিনি, যদিও গুন্দোগানও গার্দিওলার সিটির অবিচ্ছেদ্য কোন অংশ নন। অর্থাৎ বলা বাহুল্য, ফার্নান্দিনহোর উপরেই আস্থা রেখেছেন গার্দিওলা। ফার্নান্দিনহোও গত দেড়-দুই মৌসুম ধরে কোচের আস্থার প্রতিদান নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বেশ দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু গত মৌসুমের শেষ থেকে এই মৌসুমের শুরু কয়েকটা ম্যাচ বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ৩২ বছর বয়সী ফার্নান্দিনহোর এই পজিশনে খেলার মত সামর্থ্য আর নেই। যে কারণে গার্দিওলাও দলবদলের বাজারে তাঁর সিস্টেমের সাথে যায় এরকম একটা আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার খোঁজা শুরু করেছেন। গত দেড়-দুই মৌসুম ধরেই শোনা গিয়েছে হয় বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের জার্মান মিডফিল্ডার জুলিয়ান ভাইগেল কিংবা নাপোলির ইতালিয়ান মিডফিল্ডার জর্জিনহোকে দলে আনছেন গার্দিওলা। এর মধ্যে জর্জিনহো তো প্রায় সিটিতে চলেই এসেছিলেন। কিন্তু শেষ মূহুর্তে মন পালটে চেলসিতে নাম লিখিয়েছেন এই মিডফিল্ডার। গার্দিওলাও শেষ মূহুর্তে তড়িঘড়ি করে অন্য কাউকে না কিনে সেই ফার্নান্দিনহোর উপরেই ভরসা রেখেছেন। যদিও তিনি জানেন শিরোপা জেতার জন্য শুধু ফার্নান্দিনহোর উপর ভরসা করলেই চলবে না, যে কারণে অন্য ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার দলে আসার আগ পর্যন্ত দলে থাকা অন্য খেলোয়াড়দের সামর্থ্যের সদ্ব্যবহার করে ফার্নান্দিনহোর ফর্মহীনতা ঢাকার চেষ্টা করছেন গার্দিওলা, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের উপর কম নির্ভর করছেন তিনি। আর এ কারণেই ফার্নান্দিনহো আর ইংলিশ সেন্টারব্যাক জন স্টোনস, দুইজনের খেলার স্টাইলেই এসেছে বেশ পরিবর্তন।

জন স্টোনস ম্যানচেস্টার সিটিতেই খেলেন, এই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট ইংল্যান্ডের মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন তিনি। যারা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের খেলা ভালোভাবে দেখেছেন, তারা বুঝতে পেরেছেন ইংল্যান্ডের দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যে জন স্টোনস বেশ উপরে উঠে খেলেছেন, নিজের সফল পাস প্রদান করার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একজন সেন্টারব্যাক হয়েও ইংল্যান্ডের আক্রমণ গড়ার কাজে বেশ সহযোগিতা করেছেন, শুধুমাত্র প্রথাগত সেন্টারব্যাকের মত রক্ষণাত্মক কাজে নিজেকে নিয়োজিত না রেখে। আর স্টোনসের খেলার স্টাইলের এই পরিবর্তনের পেছনে আছেন কিন্তু তাঁর ক্লাব-কোচ গার্দিওলাই।

গার্দিওলা বুঝেছেন, বয়সী ফার্নান্দিনহো আর এক-দুই মৌসুম আগের মত পুরো দলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে খেলতে পারেন না। যে কারণে ফার্নান্দিনহোর কাজের ভার এখন কিছুটা হলেও ম্যানসিটির সেন্টারব্যাক জন স্টোনসের উপরে বর্তিয়েছে। জন স্টোনসের কাঁধে এখন দায়িত্ব থাকে ডিফেন্স থেকে সঠিক পাস দিয়ে বল বের করে আনার। তাই বলে এমন না যে ফার্নান্দিনহো একেবারেই তাঁর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র দায়িত্বটা ফার্নান্দিনহো আর স্টোনসের মধ্যে ভাগ হয়েছে, এই যা। স্টোনস এখন ডিফেন্স থেকে দলের আক্রমণ গড়ে দেওয়ার কাজে কার্যকরী ভাবে অংশ নেন, ডেভিড সিলভা, কেভিন ডে ব্রুইনিয়া, বার্নার্ডো সিলভা ও ইলকায় গুন্দোগানের সাথে পাস আদান-প্রদান করার মাধ্যমে দলের আক্রমণ গড়ে দেন। ফলে ফার্নান্দিনহোর দায়িত্ব কমে যায় অনেক খানি, চাপও কমে অর্ধেক হয়ে যায়। যদিও নিজের দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের উপর এত কম নির্ভর থাকার এই প্রবণতাটা বার্সেলোনা বা বায়ার্ন মিউনিখ, কোথাও দেখাননি গার্দিওলা। পছন্দের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার দলে না আসার কারণেই এই “Contingency Plan”।

পেপ গার্দিওলার ফার্নান্দিনহো-ধাঁধা
জন স্টোনস

ফার্নান্দিনহোর পক্ষে যে দলের একক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে পারবেন বিশ্বকাপে ব্রাজিল-বেলজিয়াম ম্যাচটা পর্যালোচনা করলে। সে ম্যাচে ব্রাজিলের মূল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরো কার্ড সমস্যার কারণে না খেলার জন্য দলে সুযোগ পান ফার্নান্দিনহো। দলের অন্যতম খারাপ পারফর্মার হিসেবে ব্রাজিলের বিদায়ে বেশ বড়সড় ভূমিকা রাখেন তিনি।

পেপ গার্দিওলা গত মৌসুমে লিগ জিতেছেন, এই মৌসুমে সিটির কোচ হিসেবে তাঁর লক্ষ্যও বড় – লিগের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়। আর এই লক্ষ্য পূরণ করার জন্য অতি শীঘ্রই আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার আনতে হবে গার্দিওলাকে। সেটা হতে পারে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের জুলিয়ান ভাইগেল, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের রড্রি কিংবা সাউদাম্পটনের মারিও লেমিনা। সে পর্যন্ত গার্দিওলা কিভাবে নিজের দলের এই একটা খুঁত ঢেকে রাখতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “পেপ গার্দিওলার ফার্নান্দিনহো-ধাঁধা

মন্তব্য করুন

one × 4 =