জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে আবারও বিপদ সংকেত : কোচিং স্টাফের সবাইকে ছাঁটাই

জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে আবারও বিপদ সংকেত - প্রথম পর্ব
এবারের বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছেনা জিম্বাবুয়ে এর। এটা জানা কথা। এককালে গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক, নিল জনসনদের মত প্রতিভা পয়দা করা জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের নিশানা থাকছেনা এবারের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে পরাজিত হয়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছে তারা। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের এই দুর্দিনে আপনি যদি তাদের ক্রিকেটের আগের সোনালী দিনগুলোর কথা ভেবে একটু মন খারাপ করতে বসেন বা স্মৃতিচারণ করতে বসেন – থামুন এখনই! কারণ এর মধ্যেই জিম্বাব্যের ক্রিকেট বোর্ড এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে আপনার মন আরও বেশী খারাপ হয়ে যাবে! চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফের সকল সদস্যকে এবং দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে অধিনায়ক গ্রায়েম ক্রেমারকে। নতুন অধিনায়ক হবার সম্ভাবনা আছে সুপারস্টার উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান ব্রেন্ডন টেইলর।
বোর্ডের নজিরবিহীন এই সিদ্ধান্তে চাকরি হারালেন কে কে? দেখে নেওয়া যাক!
  • প্রধান কোচ – হিথ স্ট্রিক
  • ব্যাটিং কোচ – ল্যান্স ক্লুজনার
  • বোলিং কোচ – ডগলাস হন্ডো
  • ফিল্ডিং কোচ – ওয়াল্টার চাওয়াগুতা
  • ফিটনেস কোচ – শ্যেন বেল
  • টিম বিশ্লেষক – স্ট্যানলি চিওজা
  • অনূর্ধ্ব-১৯ কোচ – স্টিফেন মানগনগো
  • প্রধান নির্বাচক – টাটেন্ডা টাইবু
আপাতত বলা হচ্ছে বিশ্বকাপে খেলতে পারছেনা দেখে সম্পূর্ণ কোচিং স্টাফকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু এটাকে বিশ্বাসযোগ্য কারণ বলে মনে করছেন না জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কেউই। জিম্বাবুয়ের একাধিক মিডিয়া এর মধ্যে রিপোর্ট করেছে এই গণ-বরখাস্তের পেছনের কারণ হল জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট বোর্ডের আর্থিক দুরবস্থা। দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই ক্রিকেটার হিথ স্ট্রিক ও টাটেন্ডা টাইবু, আরেক সুপরিচিত পেসার ডগলাস হন্ডো, দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ল্যান্স ক্লুজনার-সম্বলিত হাই প্রোফাইল কোচদের খরচ চালাতে অপারগ জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেট বোর্ড। নামীদামী কোচের বদলে তারা এখন ঘরোয়া ক্রিকেটের অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিচিত কোচ দিয়ে কোচিং স্টাফ গঠন করতে চায়। কেননা এমনিতেই গত ফেব্রুয়ারী মাসে বোর্ডের সকল পর্যায়ের স্টাফদের বেতনের মাত্র ৪০% টাকা পরিশোধ করেছে বোর্ড, মার্চের বেতনও দিতে পারবে কি না তার নেই ঠিক।
 
জিম্বাবুয়ের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকে খালিহাতে বাদ পড়েছে, বিশ্বকাপে দেখা যাবেনা তাদেরকেও। কিন্তু জিম্বাবুয়ের এফটিপির সূচি অনুযায়ী সামনের দুই বছর পর্যাপ্ত পরিমাণ খেলা রয়েছে। সুতরাং বিশ্বকাপে না খেললেও অন্ধকারে হারানোর মতো অবস্থা তাদের কখনোই হতো না। তাহলে কেন এই সিদ্ধান্ত?
 
দশ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্তেরই বলি হতে যাচ্ছে জিম্বাবুয়ে। সামনের বছর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে না খেলতে পারায় তাদের “ব্র্যান্ড ভ্যালু” কমে গিয়েছে অনেক, ফলে স্পন্সর এবং ব্রডকাস্টিং স্বত্বের দাম কমে গিয়েছে আনুপাতিক হারে। যেহেতু জিম্বাবুয়ে বিশ্বকাপে থাকছেনা সেহেতু লম্বা সময়ের জন্য কোন বড় স্পন্সর তাদের প্রতি আগ্রহও দেখাচ্ছেনা। যে কারণে এখন তাদের স্পন্সর পেতে হবে সিরিজভিত্তিক।
 
কিন্তু শুধু আইসিসিকে দোষ দিলেই হবে না, দায়ভার অনেকাংশেই বর্তাবে জিম্বাবুয়ের নিজেদের উপর। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আইসিসি তাদের হোম অ্যাডভান্টেজ দিয়েছিলো। নিজেদের দেশে অনুষ্ঠিত সিরিজে নিজেদের পরিচিত কন্ডিশনে তারা কি চাইলে একটু ভালো খেলে বিশ্বকাপে উঠতে পারত না? অবশ্যই পারত। প্রথমে ব্যবসায়িক চিন্তার কথা বিবেচনা করে আইসিসি এই বাছাইপর্ব আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশে। কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বকাপে বাছাইপর্ব ছাড়াই সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করায় ভেন্যু সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড এবং জিম্বাবুয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করার আগ্রহ দেখায়। শেষ পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড আর জিম্বাবুয়ের ভেতর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। আইসিসি অবশেষে দায়িত্ব দেয় জিম্বাবুয়েকে। দায়িত্ব পাবার সাথে আইসিসি থেকে টুর্নামেন্ট আয়োজন করার জন্য অনুদান পায় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট বোর্ড।
 
বর্তমানে জিম্বাবুয়েতে আন্তর্জাতিক ভেন্যু বলতে দুটি মাত্র – বুলাওয়াও আর হারারে। বুলাওয়াও সেরকম উচ্চমানের কোন মাঠ নয়। একমাত্র অত্যাধুনিক ভেন্যু বলতে জিম্বাবুয়ের এখন আছে হারারে স্পোর্টস ক্লাব। টুর্নামেন্ট আয়োজন সংক্রান্ত অন্য সকল সুযোগ সুবিধার দিক থেকেও জিম্বাবুয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা আয়ারল্যান্ডের চেয়ে পিছিয়ে ছিলো। তবুও আইসিসি জিম্বাবুয়েকে আয়োজক করে নিজেদের মাঠে খেলার সুবিধাটা দিয়েছিল। শেষ ম্যাচে জিম্বাবুয়ের সামনে খুব সহজ সমীকরণ ছিলো জয়ের জন্য, বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার জন্য। মাঠভরা দর্শকের সামনে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারাতে হত শুধু। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে হেরে বসে জিম্বাবুয়ে।
 
বিশ্বকাপটাকে দশ দলের করার জন্য আইসিসির সমালোচনা করা যেতে পারে কিন্তু জিম্বাবুয়ের বিশ্বকাপে অংশ না নেবার জন্য সুস্পষ্ট দায়ভার জিম্বাবুয়ের নিজের উপর বর্তায়। এই টুর্নামেন্ট যদি আয়ারল্যান্ডে আয়োজন করা হতো তাহলে কি হত? আইরিশ সিমিং কন্ডিশনে হাবুডুবু খেত তারুণ্যে ভরপুর জিম্বাবুয়ে, আরও সংগ্রাম করতে হত তাদের।
 
জিম্বাবুয়ের দলগত পারফরম্যান্স যথেষ্ট খারাপ বর্তমানে। নিয়মিত আফগানিস্তানের সাথে সিরিজ হারার কারণে এখন তারা স্পন্সরও হারাতে বসেছে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eleven − six =