শুভ জন্মদিন জিনেদিন জিদান!

শুভ জন্মদিন জিনেদিন জিদান!

::: মাঈনুদ্দীন বিপ্লব :::

ফুটবলের জন্ম চীনে হলেও বিশ্বকাপ ফুটবলের ধারণাটা কিন্তু আসে একজন ফরাসির মাথা থেকে। অথচ বিশ্বকাপের একে একে ১৫টি আসর কেটে গেলেও বিশ্বকাপ জয়ী দলের তালিকায় আসেনি বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্মদাতা ফ্রান্সের নাম। অবশেষে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর ৬৮ বছর পর সেই অধরা স্বপ্ন ধরা দেয় ফ্রান্সের কাছে এবং এর মূলে ছিলেন ফ্রান্সের এক অভিবাসী খেলোয়াড়। সে আর কেউ নন জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান।

জিদানের বাবার নাম ইসমাঈল ও মায়ের নাম মালিকা। তাদের বসবাস ছিল উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ায়। ১৯৫৩ সালে জিদানের বাবা-মা অভিবাসী হয়ে বসতি গড়েছিল ফ্রান্সের দারিদ্র পীড়িত মার্সেই শহরতলিতে যার নাম ক্যাসেলাইন। একে একে চারটি সন্তান জন্ম নেয় ইসমাঈল মালিকার সংসারে। ১৯৭২ সালের ২৩ জুন সামান্য মুদি দোকানি ইসমাঈলের ঘর আলোকিত করে সবার অগোচরে জন্মগ্রহণ করেন ফুটবল নক্ষত্র জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। সংক্ষেপে তাকে জিনেদিন জিদান বা ‘জিজু’ নামে ডাকা হয়।

ছোটবেলা থেকেই জিদানকে দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। শৈশবে বেড়ে উঠেছেন এমন একটি শহরের আলো বাতাস গায়ে মেখে যেখানে বেকারত্ব এবং আত্নহত্যার হার ছিলো আশংকাজনক ভাবে বেশি। খেলা শুরু করার আগে ছোট্ট সাইকেল নিয়ে শহর দাপিয়ে বেড়াত। জিদানের পাঠশালা বলতে ছিল শহরের রাস্তাঘাট।
জিদানের মায়ের ইচ্ছা ছিল তার ছেলে জীবনে বড় কিছু একটা হোক। তাই তিনি জিদানকে এই তিনটি কথা সবসময় মনে রাখতে বলতেন –

➔ মানুষকে সম্মান করা
➔ পরিশ্রম করা
➔ কাজে মনোযোগী হওয়া

জিদানের বয়স যখন ১৪ বছর তখন নাম লেখান কান ক্লাব এর জুনিয়র লেভের ফুটবল টিমে। সে সময় ইউরোপিয়ান কাপের ফ্রান্স বনাম পর্তুগাল ম্যাচে বলবয়ের কাজ করেছেন। সেই জিদানই ১৭ বছর বয়সে “কান ক্লাব” এর মূল দলে জায়গা করে নিলেন।

Jean Varraud নামে এক স্কাউট তার ক্লাবের জন্য প্রতিভা খোঁজার কাজে বের হয়েছেন। ঘটনাক্রমে একদিন জিদানের খেলা তার চোখে পড়ে। কিন্তু সেদিন জিদান খুব বেশি ভালো খেলে নি। তারপরও Jean Varraud এর কাছে জিদানের খেলা ভালো লেগে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটে যান তার ক্লাবের পরিচালকের কাছে। পরিচালক তখন খুবই ক্লান্ত ছিলেন এবং তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। Jean Varraud তার ক্লাবের পরিচালকে জানান সে একটি প্রতিভার সন্ধান পেয়েছেন এবং এখনই তার সাথে যেতে হবে। কিন্তু ক্লান্ত পরিচালক কিছুতেই যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। শেষমেষ Jean Varraud এর জোরাজুরিতে যেতে রাজি হয়। Jean Varraud ও পরিচালক জিদানের খেলা দেখছেন। কিছুক্ষণ পরই জিদানের কাছে একটি পাস এলো। জিদানের পাসটি রিসিভ করার কৌশল দেখেই পরিচালকও মুগ্ধ হয়ে যান এবং ১৪ বছর বয়সী জিদান রাস্তার ফুটবল থেকে উঠে আসেন ক্লাবের ফুটবলে।

১৪ বছর বয়সে ক্লাবে যোগ দিলেও মূল দলে সুযোগ পেতে অপেক্ষা করতে হয় ১৭ বছর পর্যন্ত (১৮ মে ১৯৮৯ সাল)। আর গোলের দেখা পেতে আরও প্রায় দুই বছর কেটে যায় (১৮ মে ১৯৮৯ সাল)। চার নাম্বার পজিশনে থেলে লীগ শেষ করে তার দল। উয়েফা ক্লাবে জায়গা করে নেয়। এমন সময় ক্লাবের বেশ কিছু ভালো প্লেয়ার অন্য দলে চলে যায়। খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি উয়েফা কাপে। এমনকি লীগে রেলিগেশনেও পড়ে অবনমন হয় দ্বিতীয় বিভাগে।
১৯৯২-৯৩ সালে জিদান “কান” ছেড়ে চলে এলেন ফ্রান্সের ক্লাব বোরডক্সে। পরের চার বছর এই ক্লাবেই খেলেছেন।

বোরডক্সে জিদানের চমৎকার নৈপুন্য চোখে পড়ে ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসের। ১৯৯৬ সালে জুভেন্টাসে এসে প্রথম পরিচয় ঘটলো বিজেন্তে লিজারাজু আর ক্রিস্টোফার ডুগারির সাথে। পরবর্তীতে এই ত্রয়ী মিলেই ১৯৯৮ সালে ইতিহাস গড়েছিলেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। জুভেন্টাসে খেলাকালীন সময়ে জুভেন্টাস দুইবার সিরিএ শিরোপা এবং ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে পরপর দুইবার উয়েফা লীগের ফাইনালে উঠলেও দুর্ভাগ্যজনকবশত দুবারই রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হেরে যায়।

২০০১ সালে জুভেন্টাস ছেড়ে যোগ দেন স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদে। জিনেদিন জিদান যখন জুভেন্টাস ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন তখন রিয়াল মাদ্রিদকে রেকর্ড পরিমাণ ট্রান্সফার ফি পরিশোধ করতে হয়েছিল। যার পরিমাণ ছিল ৭০.৫ মিলিয়ন ডলার। এত বেশি পরিমাণ আর্থিক লেনদেন ফুটবল বিশ্বে এর আগে কখনো ঘটেনি।
২০০২-০৩ সালে রিয়ালের লা-লীগা জেতার পেছনে বড় অবদান জিদানেরই ছিল। একই বছরে তিনি ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলার হন। কিন্তু মাদ্রিদ ছাড়ার সময়টা মোটেই ভালো ছিল না এই কিংবদন্তীর। দলীয় সাফল্য ঢাকা পরে তার ব্যক্তিগত সাফল্য। দল ব্যর্থ হলেও উজ্জ্বল ছিলেন জিদান। ২০০৬ সালে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলস্কোরার নির্বাচিত হন।

জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের হয়ে অভিষেক ঘটে চেক রিপাবলিকানের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে। ম্যাচে জিদান মূল একাদশে ছিলেন না। ম্যাচে ফ্রান্স ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। সবাই ধরে নিয়েছিলেন ফ্রান্স ম্যাচটি হারছে। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ৬৬ মিনিটে জিদান মাঠে নামেন। ম্যাচ শেষে ফলাফল ২-২, এই দুটি গোলই করেন জিদান। ৩০ গজ দূর থেকে দূর্বল বাম পায়ে শট এবং গোল।
তার কিছুক্ষণ পর কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে পেনাল্টি বক্সের মাঝামাঝি মাথা ছুঁয়ে গোল করলেন!

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্স অংশগ্রহণ করতে পারে নি। অনেকটা বিতর্কিতভাবেই ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল দলে জায়গা পান জিদান। সে সময় ফ্রান্সের অন্যতম প্লে মেকার ছিলেন “এরিক ক্যান্টোনা”। ক্যান্টোনার নিষেধাজ্ঞার কারণে দলে সুযোগ পান জিদান। কিন্তু সে সময় বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেই সমালোচনা মাথায় নিয়ে জিদান বিশ্বকাপ খেলতে নামেন জিদান।
If France has any hope tonight ,this man is it
সময়টা ছিল ১৯ জুলাই, ১৯৯৮ সাল। স্টাডে ডি ফ্রান্স এর সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে জিদান যখন আপন মনে আওড়ে যাচ্ছেন জাতীয় সংগীত, পুরো বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ তখনো ভাবছে বিশ্বকাপ এবার ব্রাজিলেরই হবে। ক্যামেরার চোখ ঘুরতে ঘুরতে সেটি যখন জিদানের ওপর পড়লো ফুটবল ভাষ্যকার তখন ঘোষণা করলেন – “If France has any hope tonight ,this man is it” ভাষ্যকারের কথা ফলে গেল অক্ষরে অক্ষরে। জিদানের মাথার কাছে ব্রাজিলের ১১ জোড়া পায়ের কারুকার্য হার মানতে বাধ্য হলো। জিদানের হেড থেকে আসলো দুই গোল, খেলার শেষের দিকে ইমানুয়েল পেটিট তৃতীয় গোলটি করে নিশ্চিত করলেন, ব্রাজিল এই পরাজয়ের দু:খ সহজে ভুলতে যাচ্ছেনা। ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতলো, জিদান ঢুকে গেলেন ইতিহাসের পাতায়।

২০০২ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্স যখন খেলতে আসে তখন ফ্রান্স বিশ্ব ফুটবলে হট ফেভারিট দল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দলের কান্ডারী জিদান তখন ভুগছিলেন উরুর ইনজুরিতে। যার কারণে প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি। জিদানবিহীন ফ্রান্সও খুব বেশি সুবিধা করতে পারে নি প্রথম দুই ম্যাচে। তৃতীয় ম্যাচে ইনজুরি নিয়ে জিদান মাঠে নামলেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় জিদানের ফ্রান্স। সে সময় জিদানের অভাব অক্ষরে অক্ষরে অনুভব করে ফ্রান্স।
বছর ঘুরতে ঘুরতে আবার এলো ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ। কিন্তু তার আগেই ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে ফেলেছেন জিদান। সেবার ফ্রান্স অনেক কষ্টে বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করে। কোচের ডাকে দেশের টানে দলের এই অবস্থায় শেষ মুহূর্তে অবসর ভেঙে আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নামেন জিদান।

এবারের বিশ্বকাপে জিদানের শুরুটা হলো বেশ ঢিমেতালে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে সাসপেনশনের খড়গেও পড়লেন। কিন্তু ফিরতি ম্যাচেই আবার সেই পুরনো জিদান, স্পেনের বিপক্ষে নিজে গোল করলেন, প্যাট্রিক ভিয়েরাকে দিয়ে আরেকটি করালেনও। কোয়ার্টার ফাইনালে এসে আবার সেই ব্রাজিলের মুখোমুখি। সারা বিশ্ব বিমুগ্ধ নয়নে প্রত্যক্ষ করলো চরম উৎকর্ষময় ফুটবলের প্রদর্শনী। নাম ভূমিকায় সেই চিরচেনা জিজু। সেই নেশা ধরানো ড্রিবলিং, হঠাৎ নেয়া পায়ের মোচড়ে ডিফেন্ডারদের ছিটকে ফেলা, ডিফেন্স চেরা নিঁখুত পাস – জিদান যেন তার তূণের সব অস্ত্রের প্রদর্শনীতে নামলেন এদিন। নিজে খেললেন, দলকে খেলালেন, কোটি কোটি দর্শকের পাশাপাশি ব্রাজিল ফুটবল দলও যেন তার মায়াবী ফুটবলের দর্শক বনে গেলো। পুরো সময় জুড়ে তেমন কোন আক্রমণই গড়ে উঠলোনা ফ্রান্সের সীমানায়। ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী গোলটিতেও রাখলেন প্রত্যক্ষ অবদান, তার বাড়ানো ক্রসে পা বাড়িয়ে বাকি কাজটুকু সারলেন থিয়ের অঁরি।

সেমিফাইনালে ফ্রান্স মুখোমুখি হলো পর্তুগালের। জিদানের নেয়া পেনাল্টি আবারও ফ্রান্সের ফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করলো। কিন্তু ফাইনালে বিতর্কিত আচরণের কারণে তীব্র লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় জিদানকে। ইতালির বিরুদ্ধে অমীমাংসিত খেলা গড়ায় ট্রাইবেকারে, যাতে ফ্রান্স ৫-৩ ব্যবধানে হেরে যায়। জিদান লাল কার্ড না দেখলে ম্যাচটা ফ্রান্সই জিততো তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না।

প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের ঠিক দুই বছর পরই ফ্রান্সের ঘরে ওঠে ইউরোপ চ্যাম্পিয়নশীপের ট্রফি। যার মূলে ছিলেন জিনেদিন জিদান। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে নিলেন এক অসাধারণ ফ্রি কিক, আর সেমিফাইনালে গোল্ডেন গোল করে দলকে ওঠালেন ফাইনালে।

তার পরের ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের শুরুটা ভালো হলেও শেষটা ভালো যায় নি ফ্রান্সের। শুরুর ম্যাচে ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করলো জিদানের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স। ফ্রান্স যখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচে ০-১ গোলে পিছিয়ে জিদান গোল করলেন হেরে যাওয়ার একেবারে শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে। ৯১ আর ৯৩ মিনিটের মাথায় করা তার দুটো গোল পাল্টে দিলো খেলার গতিপথ। ফ্রান্স জিতলো ২-১ গোলে। কিন্তু শেষমেষ কোয়ার্টার ফাইনালে গ্রীসের সাথে হেরে গিয়ে বিদায় নিলো ফ্রান্স।

২০০৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের ব্যর্থতার পর ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জিনেদিন জিদান। পরবর্তীতে অবশ্য ২০০৬ সালে দল ও দেশের কথা বিবেচনা করে অবসর ভেঙ্গে খেলায় যোগ দিয়েছিলেন। ২০০৬ বিশ্বকাপের পর ফুটবল থেকে অবসর গ্রহণ করেন বিশ্ব ফুটবলের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান।
মেজাজী জিদান

১ম ম্যাচে ফ্রান্স ৩-০ গোলের ব্যবধানে জিতে। যার অনেকটা অবদান জিদানের। পরের ম্যাচেও অসাধারণ পারফরম্যান্স করা জিদান মেজাজ হারিয়ে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়ের গায়ে থু থু মারেন। যার কারণে লাল কার্ড দেখে পরের দুই ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি। যার পুনরাবৃত্তি ঘটে ২০০৬ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে। ইতালিয়ান ফুটবলার মাতোরাজ্জিকে মাথা দিয়ে হেড করার কারণে ফাইনাল ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে বিদায় নিতে হয় জিদানকে। তবে দুবারই জিদানের এরকম আচরণের কারণ ছিল তাকে গালাগাল করা।

২০০৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ১১০ মিনিটের মাথায় জিদান ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতারাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে ঢুঁ মারার অপরাধে লাল কার্ড দেখেন। ঘটনার শুরু হয় জিদান এবং মাতারাজ্জির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। এরপর জিদান যখন মাতারাজ্জির কাছ থেকে চলে আসতে শুরু করেন তাকে উদ্দেশ্য করে মাতারাজ্জি আবার কিছু কথা বলেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে জিদান হঠা করে ঘুরে দাড়ান,কিছুটা দৌড়ে এসে সরাসরি মাতারাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে ঢুঁ মারেন।ফলশ্রুতিতে মাতারাজ্জি বুক চেপে ধরে মাটিতে পরে যান। ঘটনার পরবর্তীকালে খেলা যদিও থেমে যায় কিন্তু ব্যাপারটি ঘটেছিলো রেফারি হোরাসিও এলিযোন্ডোর চোখের আড়ালে। ম্যাচ কর্মকর্তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, চতুর্থ কর্মকর্তা লুইস মেদিনা ক্যান্তালেযো ইয়ারফোনের মাধ্যমে রেফারিকে বিষয়টি অবহিত করেন।প রবর্তীকালে সহকারী রেফারির সাথে আলোচনা করে বিষয়টি নিশ্চিত হবার পর এলযোন্ডো জিদানকে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন এবং তাকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন।

অবশেষে মুখ খুলেন সেই রেফারি হোরাসিও এলিজোন্দে। জিদানকে লাল কার্ড দেখানোটা যেমন ঠিক ছিল, তেমনি সিদ্ধান্তটাও নাকি কঠিন ছিল তার পক্ষে। বিশ্ব ফুটবলের নেতিবাচক যে কয়েকটি ঘটনা আছে তার মধ্যে অন্যতম জিদানের হেড কাণ্ড। অপ্রত্যাশিত হলেও এটা এখন ফুটলের ইতিহাসের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওই ঘটনাকে রেফারিং ক্যারিয়ারে অন্যতম মুহূর্ত বলে আখ্যা দিয়ে ৫০ বছর বয়সী এ রেফারি বলেন, ‘যেহেতু বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা, তাই ওই ঘটনাটা আমার ভুলে যাওয়ার কথা নয়। কারণ যাকে লালকার্ড দেখিয়েছিলাম দলের কাছে তার গুরুত্বটা ছিল অনেক। ও ছিল ফ্রান্সের অধিনায়ক সাবেক বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় জিনেদিন জিদান।’ আর্জেন্টাইন রেফারি আরো বলেন, ‘ওকে সরাসরি লালকার্ড দেখানোটা অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু কেউ বলতে পারবে না যে ওই সময় আমার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। ওটাই ছিল আমার রেফারিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।’

জিদানের বয়স যখন ১৯ বছর তখন তিনি “কান ক্লাবে” খেলেন। কান ক্লাবের হয়ে জিদান যখন প্রথম গোল করেন তখন তার গোলের উদযাপন দেখে গ্যালারিতে বসা স্প্যানিশ নৃত্যশিল্পী ভেরোনিকার মনে গেথে যান। জিদান ও ভেরোনিকার সংসারে রয়েছে চার ছেলে। এনজো (জন্ম ১৯৯৫), লুকা (জন্ম ১৯৯৮), থিও (জন্ম ২০০২) এবং এলিয়াজ (জন্ম ২০০৫)। তার মধ্যে প্রথম তিনজন সবাই রিয়াল মাদ্রিদ অ্যাকাডেমিতে ভর্তি। খেলার দিক থেকে এনজো হলো মিড ফিল্ডার, লুকা গোল কিপার এবং থিও স্ট্রাইকার। সবচেয়ে মজার কথা, মাদ্রিদের এস্তাদিও সান্তিয়াগো বের্নাবেউতে মানুষজন আজ যখন জিদান জিদান করে শোর তোলে, তখন সেটা ঐ এনজো জিদানের কল্যাণে।

২০০০ সাল থেকে জিদান নিয়মিতভাবে দৈনিক পত্রিকার ভোটে অন্যতম জনপ্রিয় ফরাসি ব্যক্তিত্ব হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তিনি ২০০০, ২০০৩ ও ২০০৬ সালে সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, ২০০৫ সালে দ্বিতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এবং ২০০১ ও ২০০২ সালে চতুর্থ সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নির্বাচিত হন।

জন্ম ও পৈতৃক সূত্রে জিদানের ফ্রান্স ও আলজেরিয়া উভয় দেশের নাগরিকত্ব ছিল। এক সময় আলজেরিয়া জাতীয় দলে যোগ দিয়েছিলেন জিদান। কিন্তু আলজেরিয়া জাতীয় দলের কোচ তাকে তার ধীরগতির কারণে দল থেকে বাদ দেন। সেই কোচ যে কতখানি ভুল ছিল তা আমাদের সকলেরই এখন জানা।

ফুটবল বিশ্বে অনেক বছর ধরেই বিতর্ক চলছে সেরা ফুটবলার কে তা নিয়ে। ফিফার নির্বাচন অনুযায়ী পেলে, ম্যারাডোনা দুজনই সেরা ফুটবলার হলেও জনপ্রিয় ওয়েবসাইট “ইয়াহুর” করা এক জরিপে বিশ্বের সেরা ১০ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড় হলেন জিনেদিন জিদান। সর্বাধিক ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জিদান এই জরিপে সেরা নির্বাচিত হন। জিদানের চেয়ে ৩২৮ ভোট কম পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন ম্যারাডোনা। স্বভাবতই তৃতীয় স্থানে পেলের থাকার কথা থাকলেও তৃতীয় স্থানটি দখল করেন ব্রাজিলের জিকো। জিকো এই জরিপে ১০ শতাংশ ভোট পান। ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এই জরিপের চতুর্থ স্থানে রয়েছেন ফ্রান্সের প্লাতিনি। আর ১ শতাংশ ভোট পেয়ে পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন যথাক্রমে শিফো ও ভালদেরামা। আর সপ্তম স্থানে রয়েছেন পেলে।

গতি ছিলো না তেমন, তাই বলে আটকে রাখতে পারেনি কেউ। অসাধারণ ড্রিবলিং, পাসিং, টেকনিক দিয়ে গোল করেছেন, করিয়েছেন, খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। ছয় বছর ধরে ফিফা প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার এর প্রথম তিনজনের মধ্যে ছিলেন, এর মধ্যে প্রথম হয়েছেন ৩ বার। চ্যাম্পিয়নস লীগের গত ২০ বছরের ইতিহাসে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। ই্উরো, বিশ্বকাপ, শীর্ষ দুই ইউরোপিয়ান লীগ, চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতেছেন। ছোটখাটো কাপের কথা না হয় বাদই দিলাম! সাথে জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়। জায়গা করে নিয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার এর তালিকায়! ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা অকৃত্রিম। তাই নিজে যেমন ফুটবলকে দিয়েছেন অসাধারণ কিছু মুহূর্ত তেমনি ফুটবলও তাঁকে দিয়েছে দুহাত ভরে!

১৯৯৮ সালে জিদান জিতে নেন ব্যালন ডি’অর এবং সাথে FIFA World Player of the Year! (তখন এ দুটো পুরষ্কার আলাদা ছিলো।)। ২০০৪ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন জিদানকে বিশ্বের ৪২ তম সর্বোচ্চ সম্মানীপ্রাপ্ত খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০১ সালে ইউএনডিপির “দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বিষয়ক কর্মসূচির জন্য জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নিযুক্ত হন। বিশ্বের মাত্র ২৫ জন খেলোয়াড়ের সৌভাগ্য হয়েছে ক্যারিয়ারে চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ, ইউরো এবং কনফেডারেশনস কাপ – এই চারটি বড় শিরোপা জেতার। জিদান তাঁদের মধ্যে একজন।

শুভ জন্মদিন জিনেদিন জিদান!

জিদানের তত্ত্বাবধায়নে ফ্রান্সে দুটি অনাথাশ্রম চলে, তিনি নিজে পথশিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এছাড়া ইউনেস্কোর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন। নিজ উদ্যোগে আইচআইভি এইডস সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন জিদান।

২০০৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ফুটবল বিশ্বের নক্ষত্র জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তরুণ ফুটবলারদের সাথে ফুটবলও খেলেন জিদান।

ফুটবল থেকে অবসর গ্রহণের পর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িত রাখেন জিদান। পাশাপাশি কোচ রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হবার অনেক ইচ্ছা ছিলো। কোচ হবার জন্য কোচিংয়ের উপর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ২০৩/১৪ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩/১৪ মৌসুমে কার্লো আঞ্চেলত্তির সহকারী হিসেবে মাদ্রিদের লা ডেসিমার সাক্ষী ছিলেন জিদান। এছাড়াও ওই মৌসুমে কোপা ডেল’রে জয় করেন জিদান। ২০১৪/১৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ কস্ট্রিলার হেড কোচ হন। সেই সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ কোন ট্রফি না পাওয়ায় কার্লো আঞ্চেলত্তিকে স্যাক করা হয় এবং রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হন রাফা বেনিতেজ। রিয়াল মাদ্রিদের বাজে পার্ফমেন্সের জন্য অর্ধেক মৌসুমে রাফা বেনিতেজ কে স্যাক করা হয় এবং জিদান কে মাদ্রিদের কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মাত্র ২.৬ বছর রিয়াল মাদ্রিদের কোচিং এর দায়িত্ব পালন করে গত মাসের ৩১ তারিখের রিয়াল মাদ্রিদের কোচের পদ থেকে সরে দাড়ান। মাত্র আড়াই বছর কোচিং করিয়ে যে কোন কোচের চেয়ে সবচেয়ে বেশি ট্রফি জয় করার রেকর্ড গড়েন। গড়েছে টানা ৩ বার চ্যাম্পিয়নস লীগে জয়ের। এছাড়াও লালীগায় টানা ১৬ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড করেন যৌথ ভাবে। স্প্যানিশ টিম হিসেবে করে টানা ৪০ ম্যাচ আনবিটেন থাকার রেকর্ড। করেছে টানা ৭৩ ম্যাচে স্কোর করার রেকর্ড।

৩ টি চ্যাম্পিয়নস লীগ
২ টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ
২ টি উয়েফা সুপার কাপ
১ টি লালীগা
১ টি স্প্যানিশ সুপার কাপ

২০১৭ সালের বেস্ট কোচ নির্বাচিত হন!

আশা ছিলো স্যার আলেক্স ফার্গুসন বা আর্সেন ওয়েঙ্গারের মতো জিদান রিয়াল মাদ্রিদে লং টাইম কোচের পদে থাকবে। সবকিছুই ঠিকঠাক চলার পরেও মাত্র আড়াই বছরের মাথায় নিজেই সরে দাড়ালেন। আশা করি যেখানেই যান রিয়াল মাদ্রিদে যেমন সাফল্য পেয়েছেন তেমনি সাফল্য পান। আপনার জন্য সব সময় শুভ কামনা থাকবে। পরিবার পরিজন নিয়ে সর্বদা ভালো থাকবেন।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

18 − four =