ব্রাজিল পেন্টা-কথন

১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে মারিও জাগালোর অধীনে ব্রাসিল ১৯৫৮, ১৯৬২ বিশ্বকপের মত আবারও পর পর দুইবার ফাইনালে উঠে। কিন্তু ফাইনালে ফ্রান্সের সামনে আর দাঁড়তে পারে নি সেলেসাওরা। রোনালদোর ভয়াবহ ইঞ্জুরী, আর জিদানের আকাশছোঁয়া ফর্মের কারনে ব্রাসিলকে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ হারতে হয়েছে ৩-০ এর ব্যবধানে। জিদানের জোড়া গোলে সেদিন ব্রাসিল ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো। রোনালদো, কাফু, বেবেতোরা থাকা স্বত্বেও সেদিন ব্রাসিল বিশ্বকাপ জিততে পারে নি। জিতলে হয়তো সেই ১৯৯৮ সালেই ব্রাসিল জিতে যেত তাদের পেন্টা বিশ্বকাপ আর ইতিহাসের পাতায় হতো আরেক ইতিহাস। কিন্তু ভাগ্য সহায় না থাকলে কিই বা করার..?
.
১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপের পর ব্রাসিলের অবস্থা এতই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো যে পরবর্তি বিশ্বকাপ (২০০২) এ কোয়ালিফাই করতে হলে কোয়ালিফাই এর শেষ ম্যাচটি ভেনেজুয়েলার সাথে জিততেই হবে। তা না হলে ব্রাসিল কোয়ালিফাই করতে পারবে না। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে ভেনেজুয়েলাকে হারিয়ে কোনমতে সেই টুর্নামেন্টের(২০০২ বিশ্বকাপ) আন্ডার ডগ দল হিসেবে কোয়ালিফাই করলো ব্রাসিল..
.
২০০২ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের ১৭ তম আসর। এই প্রথম বিশ্বকাপের আসর বসে এশিয়ায়। আর এই বিশ্বকাপ ই ছিলো ব্রাসিলের জন্য ইতহাস গড়ার বিশ্বকাপ, সমালোচকদের মুখে কালি মেখে দেওয়ার বিশ্বকাপ..
.
কোরিয়া-জাপান। এই প্রথম এশিয়ার এই দুই দেশ মিলে যৌথভাবে আয়োজন করতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ১৭ তম আসর। ৩২ টি দল, যৌথভাবে ২০ টি ভেন্যু নিয়ে কোরিয়া-জাপান প্রস্তুত বিশ্বকাপের ১৭ তম আসর আয়োজনের জন্য। ৩১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের ১৭ তম আসরের যাত্রা হয় ফ্রান্স বনাম সেনেগালের খেলার মধ্য দিয়ে আর পর্দা নামে ব্রাসিল বনাম জার্মানের খেলার মধ্য দিয়ে। ৬৪টি ম্যাচের মধ্যে গোল হয়েছে ১৬১ টি যার মধ্যে আত্মঘাতি গোল ছিলো তিনটি। পুরো বিশ্বকাপে দর্শক হয়েছিলো ২৭ লক্ষ ৫ হাজার ১৯৭ জন, গড়ে প্রতি ম্যাচে দর্শক হয়েছিলো ৪২ হাজার ২৬৯ জন। বিশ্বকাপের হট ফেবারেট দল ছিলো ফ্রান্স, জার্মান, ইংল্যান্ড, ইতালী, আর্জেন্টিনা, বেলজিয়ামের মত দল। কিন্তু সবার আশাকে গুঁড়ে বালি দিয়ে টানা তিনবার ফাইনালে উঠে রেকর্ড সংখ্যক ৫ বার বিশ্বকাপ জিতার গৌরব অর্জন করে ব্রাসিল..!
.
লুইজ ফেলিপে স্কোলারী। ব্রাসিলের ২০০২ বিশ্বকাপের কোচ, এই প্রথম ব্রাসিলের দায়ীত্ব তাকে দেওয়া হলো। দলে এসেই তিনি বিশ্বকাপের স্কোয়াড থেকে বাদ দেন দুরন্ত ফর্মে থাকা ১৯৯৪ বিশ্বকাপের নায়ক রোমারিওকে। এর জন্য তাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। তিনি আরও সমালোচিত হন পা ভাঙ্গা ইঞ্জুরড রোনালদোকে দলে নিয়ে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর রোনালদো একেবারে ইঞ্জুরী কবলে পড়ে গিয়েছিলো। ভেঙ্গে গিয়েছিলো দু পা ই। ফর্মও ছিল খারাপ। এই প্লেয়ারকে দলে নেওয়া কোন মানেই নেই। কিন্তু স্কোলারী তার সিদ্ধান্তে অটল, রোনালদোকে বাদ দিয়ে রোমারিওকে দলে নেওয়ার জন্য ব্রাসিলের রাষ্টপতি পর্যন্ত স্কোলারীকে আবেদন করেছিলো। কিন্তু স্কোলারী তাদের কোন কথায় শুনেন নি। রোনালদোও সেই বিশ্বকাপে পুরো বিশ্বকে নিজের জাত চিনিয়েছেন, সমালোচকদের মুখে কালি মেখে হয়ে গেলেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার যিনি কিনা গোলকি কাটিয়ে গোল দিতে ওস্তাদ..!

গোলকি মার্কোস, দিদা, ডিফেন্ডার কাফু, গিলবার্তো সিলভা, লুসিও, জুনিয়র, এডমিলসন রবার্তো কার্লোস, মিডফিল্ডার রোনালদিনহো, রিভালদো, কাকা, ক্লেবারসন, জুনিনহো, লুইজাও আর ফরোয়ার্ড ডেনিলসন, এডিলসন, লুইজাও আর সমালোচিত রোনালদো কে নিয়ে স্কোলারী সাজান তার স্কোয়াড। দিয়ে দিলেন ৩-৫-২ এর ডিফেন্সিভ ফর্মেশন। আগে ডিফেন্স সামলাও, পরে গোল দাও এই অবস্থা।
.
ব্রাসিলের অবস্থান হয় গ্রুপ সি তে। যেখানে অন্যান্য দলগুলো হলো তুর্কি, চায়না, কোস্টারিকার মত কিছুটা সাধারন দল..!
.
৩জুন ২০০২। বিশ্বকাপের ১৭ তম আসরে সেলেসাওরা নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নাম এশিয়া-ইউরোপ সংযুক্তকারী দেশ তুর্কির সাথে। ব্রাসিলের একাদশে আছে মার্কোস, জুনিয়র, লুসিও, এডমিলসন, অধিনায়ক কাফু, গিলবার্তো সিলভা, রবার্তো কার্লোস, জুনিনহো, দিনহো, রিভালদো আর রোনালদো..

হাড্ডাহাডি লড়াইয়ের মধ্যে প্রথমার্ধের ঠিক কিছুক্ষন আগের ইঞ্জুরী টাইমে হাসানের গোলে এগিয়ে যায় তুর্কিরা। ব্রাসিল ১-০ এ পিছিয়ে..! এরপরের অর্ধে ৫০ মিনিটে সেই টেকো মাথার রোনালদোর অসাধারন ফিনিশিং এ ব্রাসিল সমতায় আসে। তর্জনী উদযাপন করে বিশ্বকে বলছিলেন আমি শেষ হই নি, আমি শেষ হই নি। এরপর খেলা শেষ হওয়ার কিছুক্ষন আগে ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি পায় ব্রাসিল। পেনাল্টিতে রিভালদোর করা গোলে ব্রাসিল তাদের প্রথম ম্যাচ কষ্টার্জিত ভাবে ২-১ গোলে জয় পায়। তুর্কিরা তাদের ভুগিয়েছিলো বেশ..
.
৮জুন ২০০২। নিজেদের ২য় ম্যাচে সেলেসাওদের মুখোমুখি চ্যাং চুং চায়না। দলের স্কোয়াডে নতুন মুখ এন্ডারসন পলগা। খেলার ১৫ মিনিটেই বুলেট ম্যান রবার্তো কার্লোসের গোলে এগিয়ে যায় সেলেসাওরা। ২৫ মিনিটের মাথায় হলুদ কার্ড খেয়ে বসে ঝাকড়া চুলের রোনালদিনহো, যিনি কিনা পরে বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন তার পায়ের জাদু। ৩২ মিনিটে রিভালদোর গোলে ব্রাসিল ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। এরপর ৪৫ মিনিটে পেনাল্টিতে দিনহোর গোলে প্রথামার্ধেই ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় সেলেসাওরা। কিন্তু এখনো হয়তো রোনালদো জাদু বাকী ছিলো। খেলার ৫৫ মিনিটে অসাধারন ফিনিশিং এ চায়নাদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় সেলেসাওরা..!
.
১৩জুন ২০০২। কোস্টারিকার সাথে গ্রুপ পর্বের নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলতে নেমে কোস্টারিকার সাথে ছেলেখেলা করে ব্রাসিল..

খেলার ১০ মিনিটেই রোনালদোর গোলে ১-০ এগিয়ে যায় সেলেসাওরা। এরপর আবার সেই রোনালদো ম্যাজিক, যাকে নিয়ে বিশ্বকাপের আগে কত সমালোচনাই না হয়েছিলো, আজ তারাই করছে রোনালদো বন্দনা। ১৩ মিনিটে আরেকটি গোল অর্থ্যাৎ জোড়া গোল করে সমালোচক দের মুখে কালি ছুড়ে দিয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রত্যেক ম্যাচে গোল করার গৌরব অর্জন করেন। ব্রাসিল ২-০ এ এগিয়ে..

খেলার ৩৮ মিনিটে এডমিলসনের গোলে ৩-০ এ এগিয়ে যায় সেলেসাওরা। এরপর ৩৯ মিনিটে ওয়ানচোপ আর ৫৬ মিনিটে গোমেজ গোল করে ব্যবধান কমায়। ব্রাসিল ৩-২ এ এগিয়ে। এরপর ৬২ মিনিটে রিভালদো আর ৬৪ মিনিটে জুনিয়রের গোলে ৫-২ গোলে কোস্টারিকাকে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২য় রাউন্ডে পা রাখে এই টুর্নামেন্টের আন্ডার ডগ ব্রাসিল। অপরদিকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ হয়ে যায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স আর হিট ফেবারেট আর্জেন্টিনা। রিভালদোও এই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রত্যেক ম্যাচে গোল করার গৌরব অর্জন করেন। এই ম্যাচে খেলে নি রোনালদিনহো। তবে ৭২ মিনিটে রিভালদোর সাবস্টিটিউট হিসেবে মাঠে নামেন কাকা.. grin emoticon
.
১৭ জুন ২০০২। ২য় রাউন্ডে ব্রাসিলের মুখোমুখি আরেক ফেবারেট দল ইউরোপের ডার্ক হর্স খ্যাত বেলজিয়াম। হাড্ডাহাড্ডি এক লড়াইয়ে প্রথমার্ধ শেষ হয়। ৬৭ মিনিটে রিভালদো গোল করার পর জামা খুলে দৌড়ানোর সেলিব্রেশন আজও ফুটবল প্রেমীদের মনে পড়ে। এরপর আবারও সেই রোনালদো ম্যাজিক। ৮৭ মিনিটে এই বিশ্বকাপে নিজের ৫ম গোল করে ব্রাসিলকে ২-০ গোলের জয়ে ভাসান। সেই সাথে রিভালদো আর রোনালদো এই বিশ্বকাপে টানা ৪ ম্যাচে গোল করা একমাত্র প্লেয়ার হিসেবে গন্য হয়..! ব্রাসিল কোয়াটারে পা রাখে।
.
২১ জুন ২০০২। শেষ আটে ব্রাসিল মুখোমুখি হয় ডেবিড বেকহাম, মাইকেল ওয়েন এর তৎকালীন হট ফেবারেট দল ইংল্যান্ডের সাথে। এই খেলায় রোনালদিনহোর ফ্রিকিকে করা গোলটি বিশ্বকাপের সেরা গোলের মর্যাদা পায়। ম্যাচটা সম্পর্কে একটু বলি…

খেলার বয়স ২৩ মিনিটের কাছাকাছি। মিডফিল্ড থেকে বলটিকে ইংলিশ প্লেয়ার সিনিক্লায়ার ল্যাফটে থাকা মাইকেল ওয়েনকে ক্রস করলে সেটা লুসিওর পায়ে লাগে, কিন্তু লুসিও বলটি রিসিভ করতে পারেনি। তারই ভুলে বল নিয়ে ডি-বক্সের মধ্যে ঢুকে গোলকি মার্কোসকে প্রতিহিত করে বল জালে জড়ায় মাইকেল ওয়েন। স্কোলারী সহ পুরো ব্রাসিল শিবির হতাশ। ইংলিশরা ১-০ এ এগিয়ে..! সে কি উল্লাস ইংলিশদের তা বলার নয়..!

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রথমার্ধের ঠিক ইঞ্জুরীর দুই মিনিটে (৪৭ মিনিট) রোনালদিনহো ম্যাজিক। ঝাকড়া চুল নিয়ে মিডফিল্ড থেকে পায়ের জাদু দিয়ে একা বল টেনে নিয়ে তিনজন প্লেয়ার ড্রিবল করে ডি-বক্সের কাছাকাছি এসে রাইট সাইডে এক অসাধারন থ্রু পাস দেয় পারফেক্ট টেন রিভালদকে। এরপর সাথে সাথেই বাম পায়ের আলতো শটে ব্রাসিলকে সমতায় ফেরান রিভালদো। জার্সি খুলে সে এক অসাধারন সেলেব্রেশন। করলেন বিশ্বকাপের টানা ৫ ম্যাচে ৫টি গোল। ব্রাসিল ১-১ ইংল্যান্ড।

২য়ার্ধের ৫০ মিনিটে প্রায় মিডফিল্ডের কাছাকাছি রাইট সাইড এ ফ্রিকিক পায় ব্রাসিল। কে জানতো এই ফ্রিকিক টি হবে ইংলিশদের বিশ্বকাপ শেষ করে দেওয়া ফ্রিকিক। কে জানতো এই ফ্রিকিক টি ফুটবল ইতিহাসের সেরা ৫ ফ্রিকিকের মধ্যে ১ টি হবে..

ফ্রিকিক নিতে আসলো ঝাকড়া চুলের রোনালদিনহো। ডি-বক্সের ঝটলা হয়ে আছে সেলেসাও আর ইংলিশরা। ফ্রিকিক নিলো দিনহো, বল ভাসতে ভাসতে ভাসতে ডি-বক্স পেরিয়ে সব প্লেয়ারের মাথা পেরিয়ে গোলকি ডেবিড সিমানের মাথা পেরিয়ে সেকেন্ড বারের কোনাকুনি তে ঢুকে বল জালে প্রবেশ করলো। ইংলিশ গোলরক্ষক সিমান হতাশ এবং অবাক, এ কিভাবে সম্ভব..? ব্যাকহাম হা করে শুধু বলটার দিকে তাঁকিয়ে ছিলো..!

আর রোনালদিনহো সাথে সাথে দৌড়িয়ে ডাগ আউটে গেলেন, একটা সাম্বা ডান্স দিলেন আর সতীর্থরা এসে জড়িয়ে ধরলেন। বিশ্বকাপের শুধু এই ম্যাচে রোনালদো কোন গোলই পায় নি। ছিলেন সেদিন ইংলিশদের কড়া মার্কিং এ। যদি সেই ম্যাচে গোল পেত তাহলে জারেরজিনহোর সাথে বিশ্বকাপের প্রতিটা ম্যাচ গোল করার গৌরভ অর্জন করতো। ব্রাসিল ২-১ এ জয় পেয়ে সেমিতে চলে গেলো..

খেলার ৭০ মিনিটে একটা হালকা ফাউলের জন্য শুধু শুধু লাল কার্ড খেয়ে বিতাড়িত হয় রোনালদিনহো যার ফলে সেমিতে খেলার সুযোগ পায় নি। সেদিন অবাক হয়ে আর হাসতে হাসতে মাঠ থেকে বেড়িয়ে যান রোনালদিনহো..

রোনালদিনহোর সেই অসাধারন ফ্রিকিক সম্পর্কে ইংলিশ গোলরক্ষক ডেভিড সিমান বলেন- যেহেতু ফ্রিকিক টি অনেক দুরে থেকে হয়েছিলো তাই আমি মনে করেছি দিনহো বলটিকে ডি-বক্সের মধ্যকার কোন প্লেয়ারের মাথায় ভাসাবে। তাই আমি গোল লাইন থেকে অনেকটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু আমি যদি জানতাম এই হাল হবে তাহলে কখনোই গোল লাইন ছেড়ে যেতাম না। ওই ঝাকড়া চুলের প্লেয়ারটি আমাকে যেভাবে পরাস্থ করেছিলো আমি এমন পরাস্থ আমার ক্যারিয়ারে কখনোই হই নি..” tongue emoticon tongue emoticon
.
২৬ জুন ২০০২। বিশ্বকাপের শেষ চারে সেলেসাওরা মুখোমুখি হয় সেই গ্রুপ পর্বের তুর্কিদের সাথে। জিতলে ফাইনালে প্রথমবারের মত মুখোমুখি হবে ব্রাসিল জার্মানি। ম্যাচটি হয়েছিলো চরম উওত্তেজনার। খেলার ৪৯ মিনিটে রোনালদোর করা একমাত্র গোলে ব্রাসিল ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২ টানা তিন বিশ্বকাপের ফাইনালে যাওয়ার গৌরব অর্জন করেন। রোনালদো করলেন এই বিশ্বকাপের ৬টি গোল। যারা বলেছে তিনি শেষ হয়ে গেছে তাদের চোখে তর্জনী আঙ্গুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলেছেন স্কোলারী আমাকে নিয়ে ভুল করে নি, কোথায় আমার হেটার রা..?
.
৩০ জুন ২০০২। ব্রাসিলের মুখোমুখি পুরো বিশ্বকাপে মাত্র ১ গোল হজম করা অলিভার কান, মাইকেল বালাক, মিরোস্লাভ ক্লোস আর ইউরোপের পাওয়ার হাউজ জার্মানী। জাপানের ইয়োকোহামা স্টেডিয়ামে জার্মান যদি কাপ জিতে তাহলে ৪ বারের মত কাপ জিতে ব্রাসিলের সাথে রেকর্ড সংখ্যক কাপ জিতায় ভাগ বসাবে। আর ব্রাসিল যদি জিতে তাহলে একমাত্র দল হিসেবে ৫ বার বিশ্বকাপ জিতার গৌরভ অর্জন করবে..!

দলে এসেছে রোনালদিনহো। মার্কোস, কাফু, কার্লোস, এডমিলসন লুসিও, জুনিয়র, গিলবার্তো সিলভা, দিনহো, রিভালদো, রোনালদোদের নিয়ে ৩-৫-২ এর ডিফেন্সিভ ফর্মেশনে ব্রাসিল প্রস্তুত তাদের ৫ম বিশ্বকাপ জিতার আর ইতিহাসের একমাত্র দল হিসেবে সবচেয়ে বেশীবার কাপ জিতার এবং সমালোচকদের মুখে চুন কালি মেখে দেবার..!

কমেন্টেটর বলছে- এই খেলা হবে গোলকিপার অলিভার কান আর স্ট্রাইকার রোনালদোর মধ্যে।

প্রথমার্ধের মধ্যভাগে রিভালদোর থেকে ডি-বক্সের মধ্যে বল পায় দিনহো। দুই জন প্লেয়ারদের ধোঁকা দিয়ে থ্রু পাস দেয় গোল মার্কিং পজিশনে থাকা ফলস নাইন রোনালদোকে। কিন্তু রোনালদোর শট সেকেন্ড বার ঘেষে চলে যায় বাহিরে..! মিস

এরপর আবার ঠিক একই ভঙ্গিমায় বল পেয়ে রোনালদোকে পাস দেয় দিনহো। কিন্তু রোনালদোর আলতো শটকে আটকিয়ে দেয় সর্বকালের সেরা এক গোলকিপার অলিভার কান..! আবার মিস।

ডি-বক্সের মধ্যে মিডফিল্ড থেকে বল পেয়ে যায় ক্লেবারসান। তার বাম পায়ের গ্রাউন্ড শট অলিভার কানকে পরাস্থ করতে পারে নি। ডান সাইডের বার ঘেষে চলে যায় বাহিরে।

এরপর আবার রোনালদিনহো থেকে বল নিয়ে ডি-বক্সের বাহির থেকে ক্লেবারসনের শট বারে লেগে ফিরে আসে। মিস..। ঘামতে থাকে গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অলিভার কান..!

প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজার একটু আগে রোনালদোর শিউর গোল হওয়া শটকে ফিরিয়ে দেয় অলিভার কান। মিস, আবার মিস..

গোলশুন্য ড্র

২য়ার্ধের শুরুতেই জার্মানরা ফ্রিকিক পেলে ফ্রিকিক টি সেলেসাওদের সাইড বারে লেগে ফিরে আসে। এবারের মত বেঁচে গেলো সেলেসাওরা..!

খেলার বয়স ৬৮ মিনিট। দিনহোর থেকে মিডফিল্ড হতে ল্যাফট উইং এ বল পায় রোনালদো। তাকে মার্কিং এ দুই প্লেয়ার। রোনালদো পড়ে গেলে বল থাকে ডি-বক্সের একটু বাহিরে জার্মানদের পায়েই। মাটি থেকে উঠে রোনালদো ছোঁ মেরে বলটাকে নিয়ে পাস দেয় রিভালদোকে এবং সাথে সাথে পাস দিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে যায়। ডি-বক্সের বাহিরে রিভালদোর জোড়ালো শট এবং অলিভারের কানের সেইভ কিন্তু হাত ফসকে বেরিয়ে যায়, এবং সেটি জালে জড়ায় দৌড়ে আসা টেকো মাথার রোনালদো। গোওওওওওওওওওওওওওওল..

পরাস্থ করলেন অলিভার কানকে। করলেন বিশ্বকাপের ৭ম গোল। তর্জনী উদযাপন। ব্রাসিল ১-০ এ এগিয়ে।

আবারো রোনালদো ম্যাজিক। খেলার বয়স ৭৯ মিনিট। ক্লেবারসন ডি-বক্সে পাস দেয় রিভালদোকে, রিভালদো সেটি রিসিভ না করে ধোঁকা দিয়ে রোনালদোকে দেয়। ওখান থেকেই রোনালদোর ডান পায়ের শট এবং গোওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওল…

মুখ থুবড়ে পড়লো অলিভার কান। দুই হাত দুই দিকে দিয়ে টেকো মাথা রোনালদোর উদযাপন..! ব্রাসিল ২-০ জার্মান। ৫ম শিরোপার অনেক কাছে ব্রাসিল।

বাকী সময় চলে হিংস্র জার্মানের পাশবিক আক্রমন। সব কটি আক্রমন ফিরিয়ে দেয় মার্কোস।

রেফারীর শেষ বাঁশি এবং ব্রাসিল জিতে গেলো ২-০ গোলের ব্যবধানে। এবং সেই সাথে ব্রাসিলের নাম আরও একবার ইতিহাসের পাতায় মুদ্রিত হয়ে গেলো..!
.
একমাত্র দল হিসেবে ৫ ৫টি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড ব্রাসিলের। এই ইতিহাস এখনো কেও ভাঙ্গতে পারে নি..! ১৯৭০ এর পর ২০০২ বিশ্বকাপই একমাত্র বিশ্বকাপ যে বিশ্বকাপে সেলেসাওরা অপরাজিত ছিলো..!
.
যেই রোনালদোকে নেওয়ার জন্য স্কোলারীর দুয়ো ধ্বনি শুনতে হয়েছিলো সেই স্কোলারী বিশ্বকাপ জিতে বুঝিয়ে দিলো রোনালদোকে নিয়ে উনি ভুল করেছে কি করেন নি। রোনালদোও তার যোগ্য সম্মান দিয়েছে। ৮ টি গোল করে হয়েছে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা..! সেই সাথে ব্রাসিলের হয়ে পেলের করা বিশ্বকাপের ১০ গোলের রেকর্ড ভেঙ্গে দিলো রোনালদো। ২০০২ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপে তার গোল ১১টি..!
.
রোনালদোর পরই রিভালদো ছিলো সেরা প্লেয়ার। স্কোলারী ত বলেছেন যে, ২০০২ বিশ্বকাপের সেরা প্লেয়ার অলিভার কান হলেও আমার মতে এই বিশ্বকাপের সেরা প্লেয়ার রিভালদো..!
.
পুরো টুর্নামেন্টে ৫টি গোল করে, আর দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলে পারফেক্ট টেন খ্যাত রিভালদো।
.
পুরো টুর্নামেন্টে দাপটের সাথে খেলে আসা অলিবার কানের জার্মানী ও অলিবার কান নিজে শেষমেষ ব্রাসিলের বা শুধুমাত্র রোনালদোর কাছে ধরাশয়ী হয়।
.
যেই রোনালদো ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন, ইঞ্জুরীর কবলে পরে ক্যারিয়ার ছিলো যার হুমকির মুখে, যেই রোনালদোকে ২০০২ বিশ্বকাপের নেওয়ার জন্য স্কোলারীকে দুয়োধ্বনি শুনতে হয়েছিলো সেই রোনালদো ২০০২ বিশ্বকাপে ৮ ৮টি গোল করে সকল কথার কড়া জবা দিয়েছে..! হ্যাঁ এটাই ব্রাসিলিয়ানদের বৈশিষ্ট্য। হয়ে গেলেন সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার..!
.
রোনালদোর টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গোল্ডেন বুট পাওয়া, গোলকিপার হয়েও প্রথমাবারের মত অলিবার কানের গোল্ডেন বল পাওয়া, অলিবার কানের সেরা গোলকিপারের পুরষ্কার গোল্ডেন গল্ফ পাওয়া, গ্রুপ পর্ব থেকেই আর্জেন্টিনা আর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এর বিদায়, ব্রাসিলের রেকর্ড সংখ্যক বিশ্বকাপ জিতায় আর কাফুর হাতে বিশ্বসেরার মুকুট তুলে দিয়ে শেষ হলো বিশ্বকাপের ১৭ তম আসর..!
.
হ্যাঁ, হয়তো সেই বিশ্বকাপের দলে সাম্বার ছোঁয়া এতটা ছিলো না, ডিফেন্সিভ খুব খেলেছিলো ব্রাসিল কিন্তু রোনালদো, রিভালদো আর দিনহোর পায়ের নেশা ধরানো জাদুতে তা ছাপিয়ে গেছে..! সাম্বা উছ্বাস চলছে। স্কোলারীর হাত ধরে ব্রাসিল জিতলো তাদের পঞ্চম আর রেকর্ড সংখ্যক বিশ্বকাপ..
.
হয়তো ১২ বছর আগে ব্রাসিল শেষ বিশ্বকাপ জিতেছে। কিন্তু আমাদের এখনো বিশ্বাস আছে যে ব্রাসিল অতি শীঘ্রই হেক্সা জিতে নিবে। ফিরে পাবে ব্রাসিল তাদের সোনালী ইতিহাস। হয়তো ব্রাসিলের দলে এখন কোন রোনালদো, রিভালদো নেই, কিন্তু আমরা জানি এটা ব্রাসিল। যাদের শরীরে রক্তের বদলে ফুটবলের ধারা প্রবাহিত হয়। যাদের কাছে ফুটবল একটা ধর্মের মত, যারা ফুটবলকে দিয়েছে সৌন্দর্যের তকমা, আমরা তাদের নিয়ে হেক্সা জিতাতে আশাবাদী..
.
#গ্রান্দেব্রাসিল
#ফোর্সাসেলেসাও
#AHM80

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × 2 =