জ্যাকপট জিদান ও রঙ্গীলা রোনালদোর জাদুলীলা

সোঁদা গন্ধের মাটির উপর থেকে আকাশ ছোঁয়া যায় কি?

সবুজ ঘাসে মোড়ানো সমতটে শুয়ে কি পাওয়া যায় ঐ শুভ্রতায় নীল মাখানো আকাশের নাগাল?

উড়োজাহাজের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সৃষ্টিকর্তা রাইট ভাতৃদ্বয় হয়ত বুক এক হাত ফুলিয়ে বলতেই পারে ‘আমরা ছুঁইয়ে দেখিয়েছি’ । তেপান্তর পেরুতে হবেনা । এপার থেকেই বারো হাত বুক ফুলিয়ে জবাব আসতে পারে আরো দৃঢ়তায়, আরো শুদ্ধ অহমিকায়- ‘আমরাও এসেছি, ছুঁয়েছি, বাহুবন্দী করেছি’ । চিরচেনা সেই প্রেয়সীর অনামিকায় যে আবারো দখলদারিত্বের আংটি পড়িয়েছে বারো হাত গর্বওয়ালারা ।

আকাশ জয় থেকে ফেরা যাক ভূমিতে । আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট কিংবা তৈমুল লং’রা কি পেরেছিলেন তামাম ভূখণ্ডকে মুঠোয় পুরতে? বহু কাঠখড় পুঁড়িয়েও অপূর্ণতাকে এড়াতে পারেননি তারা । তবে সেই অপূর্ণতা কিন্তু ঠিকই সাড়া দিয়েছে সেই বারো হাত গর্বওয়ালাদের মহা শাসনের অভিপ্রায়ে । অভিনব বারো হাত গর্বওয়ালাদের কি আর কোনো অভিযোগ থাকলো পূর্ণতার মহাজনের কাছে?

প্রকৃতির এমন একপেশে উদারতায় অভিযোগ অনুযোগের ঝাঁঝালো সুর বেঁজে উঠতেই পারে । একাধিক বিদ্রোহী কন্ঠে বাঁজতেই পারে ‘তারা কেন বারবার, কেন আমাদের হাহাকার?

প্রকৃতি কি ছেড়ে কথা বলবে? জবাবে যোগ্যতায় চুপ করিয়ে দিবে স্রেফ । কিংবা খানিকটা রসিকতায় বলতেই পারে ‘বিত্তশালী সুদর্শন পাত্রে কে না চায় কন্যা সম্পাদন করতে?

প্রকৃতি আর বিদ্রোহীর বিতণ্ডায় কিন্তু মনযোগ হারাবেনা এক আদিম মহাশয় । তিনি ইতিহাস !

রাশভারী চেহারায় ঠিকই নিজের অমর বুকে লিখে নিবেন নতুন এক অধ্যায় ।

যে অধ্যায় রচিত হয়েছে বৃটিশ সাম্রাজ্যের কার্ডিফে । যে অধ্যায়ে আবারো দিব্য রুপকথার জন্ম দিয়েছে ঘাসে উড়ে বেড়ানো একদল শুভ্র যোদ্ধা ।

ঢাল-তলোয়ার, তীর-ধনুক কিংবা হালের AK47-পারমানবিক বোমা নয়; ৪০০ গ্রাম ওজনের এক গোলক নিয়েই যারা করেছে স্পেন, ইউরোপ তথা বিশ্বজয় । যে গোলকের পোষাকী নাম ‘ফুটবলই’ কিনা আবারো শ্রেষ্ঠত্বের নতুন উপাখ্যান রচিত করলো স্যান্তিয়াগো বার্নাব্যু নামক উপত্যকায় ।

যে উপত্যকায় পূর্বে বহুবার রচিত হয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের ধারাবাহিক উপন্যাস, সূচিত হয়েছে সূচারু অমরত্ব বিন্যাস ।

এই উপত্যকা যেমন সবুজ ঘাসে শিশির ঝড়িয়েছে তেমন যুগান্তরের অপেক্ষা যন্ত্রণা দিয়েছে । তবে সে যন্ত্রণার প্রলেপে এমন এক দাওয়াই মিললো- যে দাওয়াইয়ের জন্য অনেকেই যুগ যুগ সেই যন্ত্রণা আলিঙ্গন করতে চাইবে । তবে এ যন্ত্রণাও যে ব্যাঘ্র দুগ্ধের ন্যয় দারুন দুষ্প্রাপ্য । বার্নাব্যুর উপত্যকার পাতা উল্টিয়ে এবার যাওয়া যাক কার্ডিফে । যেখানে রচিত হয়েছে ইতিহাসের নববধূ অধ্যায় ।

০৩/০৬/২০১৭, কার্ডিফ !

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একাদশতম বৃহত্‍ এই নগরীতে বেশ সাজ সাজ রব । নিরাপত্তাও ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে । এখানেই যে শুরু হতে যাচ্ছে ইউরোপীয়ান ক্লাব ফুটবলের সবথেকে মর্যাদার আসর ‘উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ’ এর ফাইনাল !

যে ফাইনালে দুপাশে দুপায়ে প্রস্তুত বিশ্ব ফুটবলের দুই দৈত্য ক্লাব জুভেন্টাস ও রিয়াল মাদ্রিদ । নানান সমীকরণ, স্বপ্ন ও শক্তি বিচারে শুরু হতে যাওয়া যুদ্ধে কার কি চাওয়া?

তুরিনের ওল্ড লেডিদের দৃষ্টি এই শ্রেষ্ঠত্বে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্ব ঘোঁচানোর । দেড় যুগ আগেও ঠিক এমনই এক মহরণে বন্ধ্যাত্বটা ঘুঁচেই যেত । তবে সে স্বপ্নটা গর্ভেই হনন করেছিল বার্নাব্যুর সাদা ডাকাতরা ।

আজ তবে প্রতিশোধেই ঘুঁচে যাক অপেক্ষার যন্ত্রণা । নয়া সেনসেশন দিবালার সাথে অভিজ্ঞ হিগুয়াইন-মানজুকিচ আর কিয়েলিনি, বনুচ্চিদের পিঠে দণ্ডায়মান জিজি বুফনরা যে এবার বড্ড মরিয়া ।

প্রেরণায় টুর্নামেন্টে তাদের দূর্ভেদ্য দেয়াল আর প্রতিপক্ষের সাথে শেষ দেখায় তাদের বিদেয় করার এক দারুন স্মৃতি ।

ওদিকে তিক্ত স্মৃতিটার জবাব হয়ত খুব বেশি পাত্তা পায়নি মাদ্রিদ শিবিরে । কারণ তারচেয়েও বড় লক্ষ্যটা তাদের চোখে লাভ ইমোজি দিয়ে ঢেকে রেখেছিল । যে ইমোজিতে ঢাকা পড়ে আছে লা ডুয়োদেসিমা । যে ইমোজিতে ঢাকা পড়ে আছে শ্রেষ্ঠত্বের এই আসরে নয়া নাম পাওয়া চ্যাম্পিয়ন্স লীগে টানা দুবার শিরোপা বগলদাবার হাতছানি । ঢাকা পড়ে আছে বায়ার্ন মিউনিখ, এ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের মত দানো বধের সফল সমাপ্তির ।

জুভেন্টাসের প্রতিশোধ নাকি প্রকৃতির পুনরায় মাদ্রিদ প্রেম ?
তকার্ডিফে লটারী জিতছে এবার কারা?

উত্তর দিতে শুরু থেকে ইয়েস স্যার বলে হাত উঁচিয়ে দৃশ্যপটে জুভেন্টাসের উচ্ছলতা । রেফারি সূচনা বাঁশি বাঁজানোর মিনিট তিনেকের মাথায় দুরপাল্লার শটে রিয়াল দস্তানা মানবের পরিক্ষা নেন গঞ্জালো হিগুয়াইন । কেইলর নাভাস তা ফিরিয়ে দিলেন সতর্কতায় । কাছে পিঠে কেউ না থাকায় রিবাউণ্ডেও জাল খোঁজা হলোনা ওল্ড লেডিদের ।

তবে বড় পরীক্ষাটা এলো আরো মিনিট তিনেক পর । ডিবক্সের বাইরে থেকে দুরন্ত এক ভলি চালালেন পিয়ানিক । ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দূর্গ সামলালেন কোষ্টারিকান গোলরক্ষক । এরপরেও চাঁপ বজায় রাখলো তুরিনের প্রতিনিধিরা । তখনো যেন ছন্দ খুঁজে পায়নি মার্সেলো, ইস্কো, রোনালদোরা । এরই মাঝে কাউন্টার এ্যাটাকে টনি ক্রুসকে ফেলে দেওয়ায় হলুদ কার্ড দেখেন পাওলো দিবালা । তুরিনোদের প্রেশার কোন সাফল্যের মুখ দেখার আগেই খাতা খুলে বসলো রিয়াল মাদ্রিদ । ২০ মিনিটে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সেই কাউন্টার এ্যাটাকেই কার্ডিফে প্রথম উত্‍সবের উপলক্ষ টানলো তারা । দানি কার্ভাহালের সাথে দেওয়া নেওয়া করে বুফন দেয়াল ভেদ করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো । উল্লাসে ফেঁটে পড়া মাদ্রিদ সমর্থকদের সামনে চিরাচরিত ট্রেডমার্ক উদযাপনে রোনালদো ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরলেন । সেই ঘোরার মাঝেই আঙ্গুল ঘুরিয়ে যেন জানান দিয়ে দিলেন ‘এক নম্বর? সে তো আমিই’ !

গ্রুপ পর্বের সেই মৃতপ্রায় রোনালদো স্বরুপ দানোতে যে ফিরলেন নক আউট মঞ্চে সেটি বহাল কার্ডিফ রাতেও । ধারাভাষ্যাকারও সেটিই মনে করিয়ে দিলো । ২০১৪ আসরের পর আবারো ফাইনালে গোল পেলেন রিয়াল প্রাণ ভোমড়া । আর এই যজ্ঞের ফাইনালে নিজে গোল পেয়েছে এমন ফাইনাল হারেনি এই সুপারস্টার । তবে কি এবারও?

উঁহু, এত সহজে মানবে কেন এ্যালেগ্রি শিষ্যরা । সিআর সেভেনকে জবাব দিতে মিনিট সাতেক পরেই জুভেন্টাস আনলো সমতা । জবাবটা যেন বাধিয়ে রাখার মত । বাম কর্নার থেকে এ্যালেক্স সান্দ্রোর পাঠানো বল বুক দিয়ে নামিয়ে আলতো ভলিতে মানজুকিচের বুকে পাঠালো হিগুয়াইন । সেখান থেকে মাটিতে পড়ার আগেই অবিশ্বাস্য এক বাইসাইকেল ভলিতে বলকে জালের ভেতরের মাটির স্বাদ দিলো এ্যালেগ্রির গোপন অস্ত্র মানজুকিচ ।

প্রথমার্ধের ইতি ঘটে রোনালদো-মানজুকিচের গোলেই । টানেলে ফেরার সময় স্কোরবোর্ড যেন এক কঠিন স্নায়ূচাপ রাতের ইংগিত দিচ্ছিলো ।

শেষটা কি তবে স্নায়ূ ক্ষয়ে হয়েছিল ?

নাহ, সে উপলক্ষ্যে জল ঢেলে দিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ । গোটা মৌসুমে ভক্তদের নার্ভের চরম পরিক্ষা নেওয়া মাদ্রিদ যেন সব পুষিয়ে দেওয়ার জন্য বেছে রেখেছিল কার্ডিফের রাতকেই । তাই তো দ্বিতীয়ার্ধে জিদানের দল অবতীর্ন হলো এক স্বৈরশাসকের ভূমিকায় । ওল্ড লেডিদের কোথাও দাঁড়াতেই দিলোনা রিয়ালের আপ টু বটম । শুরুটা অবশ্য মিস দিয়েই হলো । মার্সেলোর ক্রসটায় অল্পের জন্য পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো । নতুন করে আবার সূচনা করলেন বুলডোজার কিংবা দ্য ট্যাংক খেতাব পাওয়া হেনরিক ক্যাসিমিরো । ৬০তম মিনিটে টনি ক্রুস বুফনকে লক্ষ্যে করে শট মারলে তা সান্দ্রো বাধায় ফিরে চলে আসে ৪০ মিটার দুরত্বে । যেখানে দাঁড়িয়ে দ্য ট্যাংক । সময় নিলেন না মোটেও । ট্যাংকের গোলা ছুঁড়লেন ইতালিয়ান দূর্ভেদ্য দেয়াল লক্ষ্য করে । আবারো ভাঙ্গলো বুফন বাঁধ । মাদ্রিদ আবারো এগিয়ে গেলো । ততক্ষণে বাতাসে দুহাত প্রসারিত করে সাইডলাইনের সতীর্থদের কাছে ছুটলেন ক্যাসি । এরপর পেরুলো পাক্কা তিন মিনিট । ধাক্কা সামলে উঠতে যেই না মরিয়া হতে প্রস্তুতি নিচ্ছে জুভেন্টাস তখনই যেন কার্ডিফের সব আলোটুকু নিজের এবং নিজের দলের দিকে টেনে নিলেন দ্য বেস্ট রোনালদো । টাচ লাইন থেকে লুকা মদ্রিচের পরিশ্রমী পাসটা দৌঁড়ে এসে লুফে নিলেন পর্তুগীজ মহাতারকা । কিয়েলিনি-বনুচ্চি জুটি যেন তখনো বিষয়টা হজম করতে পারছেনা । দুজনের ঠিক মাঝখানে ঢুকেই যে বলকে জালের কোলে পাঠিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো । ধ্রুপদী নাম্বার নাইনের ন্যয় রোনালদোর পজিশনিং যেন বলে গেল– Long Live cr9, Goodbye cr7 ।

মাঠে মাদ্রিদের তখন একক আধিপত্য । ৬৩তম মিনিটেই এগিয়ে ১-৩ ! স্কোরবোর্ড আর ফিল্ড ইম্প্যাক্ট বলে দিচ্ছিলো অনানুষ্ঠিকভাবে ম্যাচটা বোধহয় এখানেই ফয়সালা হয়ে গেল । ওল্ড লেডিরা শেষ চেষ্টা চালাতে চেয়েছিল বৈকি । তবে তা ধোপে টেকেনি । প্রথমার্ধের ছঁন্দহীন মার্সেলো-ইস্কো জুটিতেই তটস্থ থাকতে হয়েছে ইতালির গার্লফ্রেণ্ডদের ।

এরই মাঝে হ্যাট্রিকের দারুন এক সুযোগ হাতছাড়া করেন রোনালদো । ৭২তম মিনিটে মার্সেলো পাসটা পায়ে জমাতেই পারেননি । এরপর ৭৯ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে রোনালদোর পাসটা বল জালে জড়াতে পারেনি বদলী খেলোয়ার হিসেবে মাঠে নামা ঘরের ছেলে প্রিন্স অফ ওয়েলস খ্যাত গ্যারেথ বেল । বনুচ্চি ইঞ্চি ব্যবধানে তেড়ে এসে বল ক্লিয়ার করেন । মিনিট দুয়েক বাদে দানি আলভেজের ফ্রিকিক থেকে পাওয়া ক্রসটা মাথা ছুঁইয়ে দিয়েছিলেন সান্দ্রো । তবে রাতটা মাদ্রিদের ছিল বলেই কিনা সাইড বারে বাতাস দিয়ে বেড়িয়ে গেল বলটি । পরের মিনিটে রামোসকে বুট চাপা দেওয়ায় ২য়বারের মত হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন জুভেন্টাসের বদলী খেলোয়ার কুয়েদ্রাদো ।

শেষ মুহুর্তে কোন জাদু দেখাতে পারেনি এ্যালেগ্রির ছাত্ররা । উল্টো ৮৯তম মিনিটে লা মাদামাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুঁকে দেন মাদ্রিদের নয়া আশির্বাদ মার্কো এসেন্সিও । মার্সেলোর চিরচেনা ভঙ্গিমায় ডোমিনেটেড পাসটা সেকেণ্ডেই বুফনের নাগালের বাইরে দিয়ে জাল আলিঙ্গন করান এই স্প্যানিয়ার্ড । এরপর সোজা ভোঁ দৌড় গ্যালারীর দর্শকদের কাছে । মুহুর্তেই ডুবে গেলেন তাদের ভীড়ে । ওদিকে এসেন্সিওকে না পেয়ে রোনালদোর কোলেই চড়ে বসলেন লুকা মদ্রিচ । গোলটা যে কে করলো তখন যেন তা ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো ।

সেই ধাঁধার উত্তর তো স্টেডিয়াম ও টিভির সামনে বসে থাকা দর্শকরাই দিতে পেরেছে । তবে ইউরোপের ক্লাব শ্রেষ্ঠত্ব ও রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যকার প্রেম ধাঁধা যেন অনেকের কাছে দূর্বোধ্যই রয়ে গেলো । গুনে গুনে ১২বার এই শ্রেষ্ঠত্ব নিজেদের শোকেসে সাজালো গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ক্লাবটি । জর্জ হেইড বলেছিলেন ‘গভীর ভালবাসার কোন ছিদ্রপথ নেই’ । হয়ত ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্ব ও রিয়াল মাদ্রিদেরও তাই । ছিদ্রপথ নেই বলেই হয়ত ভালবাসাটা আজও নিজেদের পথে চলছে অন্যদের নামমাত্র তুষ্ট করে ।

তবে এ ভালবাসাটা কিন্তু স্রেফ আবেগে অর্জিত হয়নি । এর পেছনে রয়েছে বহু হাঁটু মোড়ানোর দৃশ্য, রয়েছে বহু বেদনার অশ্রুজল । কার্ডিফ বিজয়টা এক সময় যেন দুধভাত হয়ে গেল । হাই ভোল্টেজ এমন ফাইনালে ওল্ড লেডিদের ট্রেডমার্ক রক্ষণ যখন ৬৩ মিনিটেই তিনখানা হজম করলো তখনই যে অনেকে সেখানে ম্যাচের সমাপয়েত্‍ দেখেছিলেন । আয়েশে ফাইনাল জেতা রিয়ালের ফাইনালে আসার রাস্তাটা কিন্তু যথেষ্ট উত্থান-পতনেই ছিল । গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে নিজেদের উঠোনে শেষ মুহুর্তে হার এড়িয়ে জিতেছিল তারা । রোনালদোর ফ্রিকিক ও মোরাতার হেডার গোল শেষ পাঁচ মিনিটে দলকে পরাজয়ের হাত থেকে টেন জয়ের সাথে করমর্দন করায় । বরুশিয়াকে তাদের মাঠেই চেপে ধরা হয়েছিল, তবে দুই লেগে তিনবার এগিয়ে গিয়েও ড্র’র মুখ দেখতে হয়েছে । পোলিশ চ্যাম্পিয়ন লেগিয়ার মাঠে দিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েও প্রায় লজ্জার পরাজয়ের মুখে পড়েছিল লস ব্ল্যান্কোসরা । মৌসুমে তাদের লেট গোল আশির্বাদ সেদিনও ছিল রক্ষাকর্তার ভূমিকায় । ডিফেণ্ডিং চ্যাম্পিয়নদের শেষতক হতে হলো গ্রুপ রানারআপ । নতুন করে স্বপ্ন দেখানো হলো নক আউট মঞ্চকে ঘিরে । কে না জানে, নক আউটে মাদ্রিদ এক হৃদয়হীন পাষাণ । হৃদয় গলানো যায়নি এবারো । শেষ ষোল’র লড়াইয়ে নাপোলি দুই লেগেই লীড পেয়েছিল বটে, তব সেই লীড দুটি দুবারই ধুয়ে গেছে তিন গোলের জোয়ারে । শেষ চারের আগেই মাদ্রিদকে পরিক্ষা দিতে হয়েছে দানো বায়ার্নে । দীর্ঘদিন নিজেদের দূর্গে না হারা, অন্যদের জালে রীতিমত গোল উত্‍সবে মেতে থাকা মুলার, লেওয়াণ্ডস্কিদের স্বপ্নটাও অবশ্য ডুবেছে মাদ্রিদের নক আউট পাষাণীতে । ঢেঁকি নাকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে । রিয়াল-এ্যাতলেটিকোর ইউসিএল সাক্ষাত্‍ও বুঝি তেমনই । বায়ার্ন বধের পর দুই মাদ্রিদ টানা চারবারের মত মুখোমুখী । এটিএমের আগ্নেয়গিরী তুল্য প্রতিশোধীয় লাভা অবশ্য পাত্তা পায়নি সর্ব সাদাদের কাছে । দুই লেগে ৪-২ এর বিনিময়ে কার্ডিফের টিকিট কেটে ফেলেছিল রামোস বাহিনী । নার্ভ পরিক্ষায় বারবারই উতরে গেছে ইতিহাসমণ্ডিত দলটি । ফলাফলটাও হাতেনাতে পেয়েছে তারা । ১২তম ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দিন দশেক আগেই তারা ঘরে তুলেছিল বহু প্রতিক্ষিত ঘরোয়া লীগ লা লীগা । শেষ দিনে মিমাংসা হওয়া শিরোপা লড়াইয়ে স্নায়ূযুদ্ধে বেশ ভালভাবেই কৃতকার্য ছিল ৩৩বারের স্প্যানিশ সেরারা । পাঁচ বছর পর লা লীগা আর টানা ইউসিএল জয় ঘুঁচে দিলো ডাবলের অপেক্ষা । যে ডাবলের জন্য প্রায় পাঁচ যুগ প্রহর গুণেছে স্পেনের রাজধানীর ক্লাবটি ।

মাদ্রিদ থেকে মিডল ইস্ট কিংবা কার্ডিফ থেকে কায়রো- উত্‍সবে আতশবাঁজি পুঁড়লো অগণিত । খোলা হলো শত শ্যাম্পেইনের বোতল, অলিগলিতে বাঁজলো মাদল ।

শ্রেষ্ঠত্বের আনন্দে চোখ ভিঁজিয়েছে হাজারো লক্ষ সমর্থক । আর তাদের এই সুখ অশ্রুর পিছনের কারিগরকে কিন্তু রীতিমত তার চকচকে টেকো মাথাটা ঘামাতে হয়েছে বহু রণকৌশলে । কেতারাদুস্ত টেকো ফরাসী ভদ্রলোকটি যে পায়ের পর মাথা দিয়ে এভাবে বিশ্ব শাসনে নামবেন তা কি কেউ অনুমান অব্দি করেছিল?

মাত্র ১৮ মাস যার কোচিং অভিজ্ঞতা তাও কিনা এক একাডেমির তাকে নিয়ে বাঁজিটা বোধহয় সবচেয়ে বিশ্বাসী বাজিকরও ধরতেননা । তবে রিয়াল প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ বোধহয় অন্য ধাতুতে গড়া জুয়াড়ী । রাফা বেনিতেজের অস্বস্থিকর অধ্যায় কাটাতে বাঁজিটা ধরলেন ফরাসী ভদ্রলোকটাকে নিয়েই । সাদা জার্সি গায়ে বার্নাব্যুর এক সময়ের ছাত্র এখন স্যুটেড,বুটেড শিক্ষক । ভাল ছাত্র হলেই ভাল শিক্ষক হওয়া যায়না প্রবাদকে যেন ভুল প্রমাণ করে ছাড়লেন ইতিহাসের সর্বসেরাদের অন্যতম গ্রেট ফুটবলার জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান । মাত্র ১৭ মাসে দুহাতে যা অর্জন করলেন তিনি, তা তো ১৭ বছরেও অনেকের স্বপ্নে আসেনা । দায়িত্ব যখন তার ঘাড়ে চাঁপলো তখন লীগ টেবিলে রীতিমত অসহায় রিয়াল মাদ্রিদ । চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার সাথে পয়েন্ট ব্যবধান এক সময় দাঁড়ালো ১১ তে । বার্সার তখন চলছে অপরাজেয় উত্‍সব । সেই উত্‍সবে ছেঁদ টানলেন জিদানই । ন্যু ক্যাম্পে পিছিয়ে পড়েও রোনালদোকে দিয়ে জয় আদায় করে ছাড়লেন । বার্সা হারলো স্প্যানিশ রেকর্ড ৩৯ ম্যাচ পর । এরপর ১১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা রিয়াল লীগ হেরেছিল মাত্র ১ পয়েন্টে । লা লীগা পেরিয়ে ইউসিএল !

ইতালিয়ান জুজু কাটাতে বদ্ধ পরিকর জিজু এবারও জিতলেন । রোমাকে হারিয়ে তার চ্যাম্পিয়ন্স লীগ যাত্রা সেই যে শুরু করলেন তা আজ রীতিমত স্বপ্নের বিলাসিতার বাস্তব চিত্র । ইউরোপ জয়ে যেন তিনি এলেন, দেখলেন, জয় করলেন । পরেরটাও তাই । মাঝখানে ভল্ফসবার্গ ও এবারের আসরে এটিএমের কাছে হেরেছিলেন বটে, তবে তাতে তার শিরোপাহানী হয়নি কিন্তু । দায়িত্ব নেওয়ার পর লীগার যে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন তা যেন কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিলেন এই মৌসুমে । মৌসুমের বেশিরভাগ সময়েই টেবিলে ডোমিনেট করে জিতলেন প্রতিক্ষিত লা লীগা । অথচ এই ডোমিনেশন বা শিরোপা জয় কিন্তু মোটেও সহজ ছিলোনা । মৌসুমের শুরুতেই তাকে ফ্রন্ট লাইনের সেরাদের ছাড়াই খেলতে হয়েছে । গোলবারের নিচেও অনেকটা সময় পাননি কেইলর নাভাসকে । লম্বা ইঞ্জুরিতে ছিলেন মাদ্রিদের বর্তমান বিশ্বসেরা মিড ত্রয়ী । ডিফেন্সেও কি কম পরিক্ষা দিতে হয়েছে তাকে ! সার্জিও রামোস, পেপে, কার্ভাহালরা একই সাথে ছিটকে পড়েন । মার্সেলো ছাড়াও তাকে খেলতে হয়েছে । কিন্তু তাতেও যেন এতটুকু ভাটা পড়েনি তার অজেয় রথের । বুদ্ধিদ্বীপ্ত সাব আর প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত বিশ্রামে তিনি দেখিয়েছেন দারুন মুন্সিয়ানা । ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কথাই ধরুন না, একাধিকবার তাকে সাব করেছে । এমনকি সিজনে ১৩ ম্যাচে তাকে পূর্ণ বিশ্রাম দিয়েছেন । শুরুতে রোনালদো ভক্তরা এটা নিয়ে নাখোশ থাকলেও জিদানের জাদুটা মৌসুমের শেষদিকে এসে টের পেয়েছে ।

ফ্রেশ লেগ আর ফ্রেশ মাইণ্ডের রোনালদো মৌসুম শেষে কিরকম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তা ন্যয়ার, অব্ল্যাক, বুফনদের জিজ্ঞেস করে দেখুন । শুধু দলের সেরা তারকাই নন, প্রতিটি খেলোয়ারেরই আলাদা যত্ন নিয়েছেন জিজু । মৌসুমের শুরুতেই রোমায় চলে প্রায় নিশ্চিত ছিল নাচো ফার্নান্দেজের । মাদ্রিদের এই প্রোডাক্ট কখনই মাদ্রিদসূলভ হয়ে উঠতে পারেননি বলে বদনাম ছিল । অথচ সেই বদনামী ছেলেটিই কিনা জিদানের কথায় থেকে গেল আর বাঁজি মেরে দিলো সবাইকে হা করিয়ে দিয়ে । মৌসুমে মাদ্রিদের অন্যতম সেরা ডিফেণ্ডার । নিজ পজিশনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন কি, প্রক্সি দিতে দিতেই তো ফুসরত্‍ মেলেনি এই স্প্যানিশের । রামোস বা পেপে নেই ? নাচোকে ডাকো । ফুলব্যাক সমস্যা ? সমস্যা কি, নাচো আছে । ভার্সেটাইল নাচো তাই এবার ছিলেন জিদানের জিয়ন কাঠিতে বদলে যাওয়া এক পরিণত অবয়ব ।

ইঞ্জুরি ইস্যুতে আবারো শীর্ষেই ছিলেন গ্যারেথ বেল । মাদ্রিদের সবথেকে ব্যয়বহুল এই ফুটবলার এবারো মৌসুমের অর্ধেকটা সময় মাঠের বাইরে কাটিয়েছে । উইং নির্ভর দলে বেলের মত উইংগারের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে বড় ক্ষতি । তবে সে ক্ষতিটা ঠিক মাদ্রিদকে ছুঁতে পারেনি জিদানের পাণ্ডিত্যে । হেলদী বেঞ্চ জিদানের জন্য যেমন উপহার ছিল তেমনি জিদানের কৌশলও ছিল দলের জন্য আশির্বাদ । টেনিস সুপারস্টার রাফায়েল নাদালের পরামর্শের উপহার মার্কো এসেন্সিও তো রীতিমত বাজিমাত করে ছাড়লো । সিজনের শুরুতেই উয়েফা সুপার কাপ ফাইনালে দুরপাল্লার দুরন্ত সেই গোল দিয়ে শুরু । এরপর গোল পেয়েছে লীগা, ইউসিএল সবখানেই অভিষেকে গোল পেয়েছে । গতি, স্কিল, ফিনিশিং দিয়ে ইতিমধ্যেই মন কেড়ে নিয়েছে ফুটবল বোদ্ধা ও দর্শকদের । সেভিয়ার বিপক্ষে একক নৈপূণ্যর ঐ গোলটা নিশ্চই আজীবন ভুলবেননা ওয়াণ্ডার মার্কো । বেলের অভাবে আরেক তরুন লুকাস ভাস্কেজও দিয়ে গেছে শতভাগ । গত মৌসুমের তুলনায় যদিও এবার খানিকটা ম্রিয়মান ছিলেন মাদ্রিদের বেঞ্চ ডেপথ ও নিজের ফিনিশিং দুর্বলতার কারণে । তবুও গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো জিদান তাকে নামিয়েছে আর তার প্রতিদানও দিয়েছে মাদ্রিদের নাম্বার সেভেনটিন । জিদানের হাতে এখন বিশ্বের সেরা মিডফিল্ড । ক্রুস, ক্যাসিমিরো, মদ্রিচদের নিয়ে গড়া মধ্যমাঠ এক স্বপ্নের মধ্যমাঠ । মদ্রিচ, ক্যাসিমিরো একাধিকবার ইঞ্জুরিতে পড়েছে । ঘাবড়াননি রিয়াল গুরু । অনুরোধের ঢেঁকি গিলে দলে থেকে যাওয়া মাতেও কোভাসিচকে দিয়েই শূন্যস্থান দারুনভাবে করেছেন জিদান । আবার ইস্কো, হামেসদেরও জায়গা ও সময় অনুযায়ী ছঁকে রেখেছিলেন । ফলটা মাদ্রিদ পেয়েছে বৈকি !

বারবার ইঞ্জুরিতে আক্রান্ত দল নিয়েও জিদান অপরাজিত থেকেছে পাক্কা ৪০ ম্যাচ । ভেঙ্গে দিয়েছে বার্সেলোনার ৩৯ ম্যাচের রেকর্ডও । এর আগে পেপ গার্দিওয়ালার টানা ১৬ লীগ ম্যাচ জয়ের রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছিলেন বেরসিক জিজু । বেরসিক ? উঁহু, মাদ্রিদের ড্রেসিংরুম সামলানো কেউ বেরসিক হয় কিভাবে । খেলোয়ারী জীবনের মেজাজী জিদান যখন মাদ্রিদের দায়িত্ব নিলো অনেকেই বলছিল উত্তপ্ত হয়ে উঠবে রোনালদো, বেল, রামোসদের সাজঘর । সে সব অনুমানকে রীতিমত কাঁচকলা দেখিয়ে ছেড়েছেন তিনি । অফ দ্য ফিল্ড ও অন দ্য ফিল্ড খেলোয়ারদের বন্ধুত্ব ও অভিভাবকত্বের রুপ দেখিয়েছেন । মৌসুমের মাঝপথে এবং শেষের দিকে এসে রামোস, রোনালদো থেকে শুরু তরুন ভাস্কেজ, মারিয়ানোরাও বারবার ড্রেসিংরুমের জিদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছে । দলের সিনিয়ররা বারবার একে অন্যের অবদানের কথা উল্লেখ করেছে । যে অবদানে নাম আছে কিকো ক্যাসিয়া থেকে মারিয়ানো দিয়াজ পর্যন্ত । স্কোয়াডের সবাইকে মাঠে নামিয়েছিলেন জিদান । অবিশ্বাস্য এক ফ্যাক্ট হলো মৌসুমে ক্যাসিয়া, নাভাস ও কোয়েন্ত্রাও ছাড়া স্কোয়াডের বাকি সবাই গোলের দেখা পেয়েছে ! আশ্চর্য না হয়ে উপায় কই?

অধিনায়ক ডিফেণ্ডার সার্জিও রামোসই করেছেন ১০ গোল !

যার মধ্যে বেশিরভাগ নাটকীয় ম্যাচ বাঁচানো কিংবা ম্যাচ জেতানো । গোল দিয়ে মাপা যায়না, মার্সেলো !

বর্তমান বিশ্বের এক বৈচিত্র্যময় সেরা লেফটব্যাক । চতুরতা, স্কিল, গতি, প্যাশন আর গোল করানোর অসামান্য দক্ষতায় এবারো আপন আলোয় উজ্জ্বল ছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান । লীগের শেষদিকে এসে করেছিলেন মহাগুরুত্বপূর্ণ এক গোল । ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে মাদ্রিদ যখন পয়েন্ট হারানোর শংকায় তখনই দিয়েগো আলভেজকে পরাস্ত করে ৩ পয়েন্ট এনে দেন এই ফুলব্যাক । ফুলব্যাক ?

আধুনিক ফুটবলের এক আশির্বাদ । যেখানে রক্ষণ সামলে ফুলব্যাকরা উপরে চলে যায় আক্রমণে সাহায্য করতে । আর মাদ্রিদ যেন বর্তমানে এই জায়গাটিতেও আশির্বাদপুষ্ট । রাইটব্যাক দানি কার্ভাহাল দিনকে দিন পরিণত হচ্ছে, বাড়াচ্ছে মুগ্ধতা । ডান প্রান্ত ধরে তার ছুটে বেড়ানো, অবদান এই মুহুর্তে তাকে অনেকের চোখে সেরা রাইটব্যাকের ভোট পাইয়ে দিচ্ছে ।
কার্ভাহালের বিকল্পে দানিলো লুইজ । বেশ কয়েকবারই সমালোচিত হয়েছিলেন নিজেকে মেলে না ধরতে পারায় । তবে জিদানের বাড়তি যত্ন আর তার নিজের ডেডিকেশন ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনছে এই রাইটব্যাককে । তবে ইঞ্জুরির অভিশাপে আর ট্র্যাকে ফেরা হলোনা ফ্যাবিও কোয়েন্ত্রাও এর । হাসপাতালের ছুড়ি কাঁচির নিচেই যেন তার চির ঠিকানা ।

চির ঠিকানা মাদ্রিদেই হতে পারতো আরেক পর্তুগীজ পেপে ফেরেইরার । তবে এবার বিচ্ছ্বেদটা হয়েই গেলো মাদ্রিদ-পেপের । দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতি ঘটিয়ে অবশেষ বার্নাব্যু ছাড়ছেন মাদ্রিদ ইতিহাসের সেরা এই বিদেশী ডিফেণ্ডার । যাওয়ার আগে দিয়ে গেলেন অনেক কিছু । বিদায়ী মৌসুমেও ছিলেন রক্ষণের নির্ভরতার প্রতীক । ডার্বিতে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়ায় সাদা জার্সিটি গায়ে বেশ অনেক ম্যাচই মিস করলেন পেপে, মিস করালেন ভক্তদেরও । তার স্থলাভিষিক্ত রাফায়েল ভারান মোটামুটি পারফর্মেন্স আর ইঞ্জুরিতে পার করলেন মৌসুমটা । আসছে মৌসুমে রামোসের পাশে নিয়মিত নামটা হয়ত ভারানেই ।

ভারানেদের দায়িত্ব বোঝা অনেকটাই হালকা যিনি করে দেন তিনি ক্যাসিমিরো । দ্য ট্যাংক খ্যাত ক্যাসিমিরো এবারো পরম দৃঢ়তায় মধ্যমাঠের নিম্নস্তর সামলেছে । এল ক্ল্যাসিকোর পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স লীগে করেছেন দুরপাল্লার দুটি বুলেট শট গোল ।
ক্যাসিমিরোর দু পাশে দুই বিশ্বসেরা । লুকা মদ্রিচ ও টনি ক্রুস !

মাদ্রিদের নিউক্লিয়াস খ্যাত মদ্রিচ এবারো মাঠে তার পুরোটুকো নিংড়ে দিয়েছেন । বল দখল, ইন্টারসেপশন, আর চান্স ক্রিয়েটে দলের আপ টু বটম রেখেছেন সমৃদ্ধ । সমৃদ্ধির আরেক রুপকার টনি ক্রুস !

দ্য প্রফেসর !

জার্মান স্নাইপার !

দিনকে দিন নিজেকে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন এক অন্য উচ্চতায় । দলের প্রয়োজনে নিচে থাকছেন স্থির আবার উপরে ছুটছেন অস্থির । ইন্টারসেপশন, চোখ ধাঁধানো পাসিং, সেট পিস আর জেদি বল রিকোভারি ।

কম্প্লিট এক প্যাকেজ এই জার্মান ভদ্রলোক !

কম্প্লিট হতে পারতো মাদ্রিদের ফ্রন্ট থ্রিও । তবে বেলের ইঞ্জুরি সখ্যতা আর বেঞ্জেমার পড়ন্ত ছঁন্দ একত্র BBC কে সারা মৌসুমে অকেজো রেখেছে । তবে হামেস, ইস্কো এবং মোরাতার মত তিনটি হাই প্রোফাইল নাম জিদানকে বরাবরই আস্বস্থ রেখেছে । প্লেয়িং টাইম নিয়ে মোরাতা-হামেস জুটি খানিকটা অভিমান করতেই পারে । তবে জিদানের সিদ্ধান্ত, কৌশল আর মৌসুমের গোধূলী লগ্নে সবচে বড় দুটি ট্রফি বগলদাবায় সে সব হয়ত এখন মনে রাখতে চাইবেনা কেউই । মৌসুমের শেষদিকে এসে ইস্কোতে যারপরনাই মুগ্ধ ছিলেন ভক্ত-সমর্থকরা । ড্রিবলিং, ফিনিশিং আর ক্রিয়েশন মুগ্ধতা ছড়িয়েছে বার্নাব্যুর উঠোনে । মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন হামেস রদ্রিগেজও । যতখানি সময় পেয়েছেন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন । বিলিয়ে দেওয়ার এই মিছিলে আলভারো মোরাতাও ছিলেন । সদ্য সমাপ্ত লা লীগা মেসির পর সবথেকে ভাল গোল গড় ছিল এই স্প্যানিশ নাম্বার নাইনের । সুযোগ পেয়ে সদ্ব্যবহার করেছে ডোমিনিকান মারিয়ানো দিয়াজও । দেপোর্তিভোর বিপক্ষে ঘাঁড় দিয়ে সেই স্নায়ূক্ষয়ী সমতাসূচক গোলের স্মৃতি তাকে নিঃসন্দেহে আজীবন আনন্দ দিবে । সদ্ব্যবহারে ভুল করেননি গোলবার প্রহরী কিকো ক্যাসিয়াও । মৌসুমের শুরু নাভাসের অস্ত্রপচারে মাদ্রিদ গোলবার দায়িত্ব ক্যাসিয়ার হাতেই ছিল । মাঝখানে কোপা দেল রেতে নিয়মিত ও লীগেও সুযোগ পেয়েছিলেন । তার পারফর্মেন্স যা ছিল তাতে অখুশি হবেনা নিশ্চই গুরু জিনেদিন জিদান ।

হাসপাতাল সখ্যতা বাদ দিলে বেলও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান । লীগের শুরুর দিকে রোনালদোর অনুপস্থিতিতে আক্রমণভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকেই । বেশ কিছু পয়েন্ট এনেছেন গোল ও এসিস্ট করে । অবদান প্রসংগে বেঞ্জেমাও হাত তুলতে পারে । সদ্য জয়া করা ইউসিএলের গ্রুপ পর্বের সেরা মাদ্রিদ খেলোয়ার ছিল এই ফ্রেঞ্চ । লীগে তার অধারাবাহিকতা অবশ্য দারুন দৃষ্টিকটু ছিল । তবে ইউসিএলের শেষ চারে এটিএমের মাঠে যে স্কিলটা দেখিয়েছিলেন তিনি, তাতে হয়ত রসিক ভক্তরা তার সাত খুন মাফ করেও দিতে পারে । অবশ্য ডিফেন্সে খানিকটা স্লপি রামোস সব খুন মাফ পেয়ে যাবেন নিশ্চিতভাবেই । নরওয়ে থেকে শুরু করে ন্যু ক্যাম্প; মৌসুমে বহু ম্যাচ প্রতিপক্ষের গলা থেকে টেনে কেড়ে নিয়েছে এই ডিফেণ্ডার । বলা বাহুল্য, সবই প্রায় ম্যাচের অন্তিত মুহুর্তে । রামোস টাইম বলে যে একটা ট্রেণ্ডও শুরু হয়ে গেছে এখন । মৌসুম শেষে সব শিষ্যর মৌসুম পর্যলোচনা করে কোচ জিদান তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেই পারেন । তবে সেই ঢেকুরের সাথে কান অব্দি বিস্তৃত একটি হাসিরও দেখা মিলবে নিশ্চিতভাবে । আর সেটির কারণ একটি স্পেশাল নাম । যে নামে বিশ্বাস রেখেছিলেন তিনি নিজে, বিশ্বাস রাখতে বলেছিলেন ধৈর্য্যর সাজ সেজে ।

যে নামের সাময়িক বিবর্নতায় বিশ্বাস হারিয়েছিলো ভক্তদের এক অংশ । আর অংশকেই হয়ত বিস্তৃতা হাসিটা দিয়ে জবাব দিয়ে দিবেন ইতিহাস রচয়ী এই কোচ ।

আচ্ছা, হাসির এই উত্‍স কোন নামে?

হ্যা ঠিকই ধরেছেন !

প্যারিস আঘাতের সেই আহত যোদ্ধাটি । যে কিনা মাঠে ফিরলেও স্বরুপে ঔজ্জল্য ছড়াতে পারেননি । ধকল কাটিয়ে ওঠা শরীর নিয়ে শুরুতে পারেননি স্বভাবসূলভ ভুড়ি ভুড়ি গোল করতে । স্বভাববিরুদ্ধ দৃষ্টিকটু মিসও করেছেন ধারাবাহিকভাবে ।

সিংহরা ক্লান্তিতে থামে, পিছিয়ে যায়না । সেটাই যেন করে দেখালেন শতাব্দীর সর্বোচ্চ গোলস্কোরার মহোয়দয় । একে একে জবাব দিলেন সবাইকে । জনৈক পত্রিকার ফ্রন্ট পেইজে তার হাঁটু মোড়া ছবি দিয়ে ক্যাপশন ছিল তার দিন শেষ !

শেষ? শব্দটায় যে বড্ড আপত্তি জবাব মহাজনের । জবাবটা তাই দিলেন বেশ আয়েশ করেই । বুড়িয়ে গেছেন, ফুরিয়ে গেছেন রবে যখন সমালোচক মহল অট্টহাসিতে মত্ত ঠিক তখনই দেপোর্তিভো আলাভেসের মাটিতে গিয়ে হ্যাট্রিক করে আসলেন তথাকথিত বৃদ্ধ ফুটবলারটি । জবাবের তেজস্ক্রিয়তা এত বেশি ছিল যে তা থেকে রেহাই মেলেনি এ্যাতলেটিকো মাদ্রিদেরও । ভিসেন্তে ক্যালদেরনে গিয়েও হ্যাট্রিকে যেন রাগ মোচন করলেন তিনি । তবে সমালোচনা আর উপহাসের তীর তখনো ধেয়ে আসছিলো । চ্যাম্পিয়ন্স লীগের গ্রুপ পর্বের ছয় ম্যাচে মাত্র দুই গোল তার । এতেই যেন পোয়াবারো নিন্দুক গোষ্ঠী । চলতে থাকলো কটাক্ষ । চলতি টুর্নামেন্টের ৭৫ তম গোলস্কোরার বলে টিপ্পনীও কাটা হলো । কেউ কেউ তো মুণ্ডুপাত করে ছাড়লেন । তাতে কি দমেছিলেন লালচে-তামাটে যোদ্ধাটি?

উত্তরের জন্য বাধা ছিল রাউণ্ড অফ সিক্সটিনের দুটি ম্যাচ । এরপর এলো কোয়ার্টার ফাইনাল, এলো মাইটি বায়ার্ন ! এলো দূর্ভেদ্য জার্মান প্রাচীর ম্যানুয়াল ন্যয়ার, এলো বোয়াটেং-লামদের প্রতিরোধ দেয়াল ।

জবাব দেওয়ার জন্য কঠিন মঞ্চই বৈকি!

কিন্তু তাতে ভ্রুক্ষেপ করলেন কই ছয়ফুটি দানোটি?

ভয়ংকর এলিয়েঞ্জ এরেনায় উল্টো হালুম হুংকারে দুই দুইবার ন্যয়ারকে কাবু করে ঘরে ফিরে এলেন । জবাবের কি তখনো বাকি ছিল? হ্যা, অনেকটাই হয়ত । অন্তত তার কাছে । তাই ফিরতি দেখায় নিজের উঠোনে ন্যয়ারকে পরাস্ত করলেন গুনে গুনে তিনবার । হ্যা, হ্যাট্রিক !

যেখানে অনেকে ন্যয়ারকে সারাজীবনেও টলাতে পারেনি সেখানে ফুরিয়ে গেছে অপবাদ পাওয়া লোকটি আস্ত হ্যাট্রিক করে দম নিলেন । জবাব পর্বটা তখনই শেষ হয়ে যাবার কথা ছিল । তবে জবাব মহাজনটি যে জবাবের ব্যাপারে বড্ড দিলখোলা । একবার দিতে থাকলে তাকে থামানোর সাধ্যি কার? থামানোই গেলোনা তাকে । ন্যয়ারের পর জবাবের মঞ্চে অব্ল্যাক ও তার সামনে দাঁড়ানো গোদিন-স্যাভিচরা । সে যে নামই হোক, মহাজনের লক্ষ্য ছিল যে ঐ গোলপোস্টের জাল । আর তার এই লক্ষ্যের সামনে যে আসবে সেই পুঁড়বে । অব্ল্যাকরা পুঁড়েছিল কি সে রাতে? মৌসুমে ২য় বারের মত অব্ল্যাককে হ্যাট্রিক দেখিয়ে ছাড়ার পর উত্তরা সহজেই অনুমেয় । তবে সে রাতের অগ্নিকাণ্ডে টানা চারবারের মত রিয়ালের কাছে ইউসিএল কপাল পুঁড়েছিল সিমিওনে শিষ্যদের ।

কি আশ্চর্য ! এক সময় মাত্র ২ গোল করে ৭৫তম স্কোরার সেই বুড়াটি রাতারাতি যে ১০ গোলে উন্নীত । তাও আবার তিন ম্যাচেই!

সামনে স্বপ্নের ফাইনাল !

যে ফাইনালের জয়টা বদলে দিতে পারে অনেক সমীকরণই । ওল্ড লেডিদের দেয়ালটা তখন যেমন দূর্ভেদ্য ঠিক তেমনি দুর্বোধ্য । কিন্তু তাতে যেন তার থোড়াই কেয়ার । যেকোন মূল্যে কার্ডিফ বিজয় চাই তার । পরিশ্রমী ও অধ্যাবসায়ের সেই বরপুত্রের অস্থিরতা দেখা মিললো ম্যাচের পূর্বের অনুশীলনে । শরীরে শান দিচ্ছেন আর চোয়াল দৃঢ় করে সতীর্থদের কি জানি বোঝাচ্ছেন পরিপাটি চুলের যুবকটি । হয়ত বলছেন- ‘বিশ্বাস রাখো নিজেদের উপর, চলো জিতি’ ।

বিশ্বাসটা রেখেছিলেন তার সতীর্থরা । বিশ্বাস রেখেছিলেন তিনি নিজে । পুরষ্কারটি তাই হাতেনাতে বুঝিয়ে দিলে রাশভারী ইতিহাস মহাশয় । ডেকে যেন বললেন- ‘বাছা তুমি বড্ড জ্বালাতন করো । তোমার সন্তানের ন্যাপিও ততবার বদলে দাওনি যতবার আমি তোমার জন্য আমার অধ্যায়গুলো বদলে নতুন করে লিখেছি ।’

প্রতিত্ত্যুরে হয়ত গাল ভাঁজ করা হাসিই দিয়েছিলেন মহাকালের এই মহাতারকা । হয়ত চোখ টিপে বলেছিলেন- ‘ইতিহাস মহাশয়, এই যন্ত্রণা এখনই শেষ হবার নয় । আসছে ব্যালন ডি’অর, আসছে দ্য বেস্ট, আসছে কনফেডারেশন্স কাপ । হাতে শান দিয়ে রাখুন । আবারো ইতিহাসে নতুনত্ব গাঁথতে হবে যে’ !

স্নেহমাখা হাসিতে ইতিহাস বিদায়ী জবাবে হয়ত স্তুতি গেয়ে গেছেন-

‘এ শ্রমে বিনম্রে রাজি আমি,

এ শ্রমে বিনিদ্রীতায় রাজি আমি,

এ শ্রমে দ্যর্থহীন কন্ঠে বলি আমি-

হে ক্রিশ্চিয়ানো !

মহাকালের এক মহা ভাস্বর তুমি । যে ভাস্বরে অবিনশ্বর তোমার CR7 রুপকথা নামটি ।

রুপকথা কি শেষ ?

উহু, এতো সবে শুরু ! আজ কলম থেমে গেলো, থেমে গেলো কীবোর্ডের বোতাম অত্যাচার । তবে চলতে থাকবে জ্যাকপট জিদান ও রঙ্গীলা রোনালদোর জাদুলীলা । তবে চলুক রোনালদোর চলন্ত রেলাগাড়ী, তবে জ্বলুক জিদানের কৌশলী টেকো আগ্নেয়গিরী ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × 3 =