অন্যচোখেঃ কি রেখে গেল ৬ সপ্তাহের বিশ্বকাপ ?

৬ সপ্তাহের বিশ্বকাপ ! বাংলাদেশকে দিয়েছে অনেক কিছু । কোন কোন দিন সাধের ঘুমটা কেড়ে নিয়ে গেছে বিশ্বকাপ। কিন্তু এর বাইরে এ বিশ্বকাপটা ক্রিকেটকে খেলাধুলার এ বিশ্বায়নের যুগে কি দিয়ে গেলো ? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি । কিছু কথা বলতেই হবে বাংলাদেশের সমর্থকের পোশাকটা খুলে রেখে ! খেলাটার একদম থার্ড পার্টি হিসেবে । খেলাটার পাশের একজন লোক হিসেবে । মিশেল প্লাতিনির মত লোকে যেখানে খেলাটার প্রসারের জন্যে ৪০ দলের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের কথা বলেন , সেখানে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজারওয়ালা এই ক্রিকেট খেলা আসলে বৈশ্বায়নের পথে কতোটা এগোলো ?

এমন ম্যাচ খুব  বেশি আসে নি !
এমন ম্যাচ খুব বেশি আসে নি !

প্রথমে কিছু চমকে উঠা পরিসংখ্যান দেই । কয়েকদিন আগে কোথায় যেন পড়তে পড়তে এই স্ট্যাটিস্টিক্স পাই । ২০১৫ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ৪৯ টা ম্যাচের মধ্যে মাত্র ৪টি ম্যাচের ফলাফলটা জানার জন্যে মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছে শেষ ওভার পর্যন্ত । এর চাইতেও অবাক করা পরিসংখ্যান হলো ৩৩টা ম্যাচই ৬০ রানের ব্যবধান বা ৫ ওভার আগেই জিতে নিয়েছে বিজয়ী দল । তবে হ্যাঁ ! এসব পরিসংখ্যানের ভিতরেও খুঁতের জায়গা আছে । আপনি বলতে পারেন, দুটো দলের কেউই ৩৫ ওভারের বেশি ব্যাট করতে পারলো না । হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ হলো ! সেই ম্যাচটার ফলাফল তো আর ১০০ তম ওভার পর্যন্ত যাবে না । আপনি হয়তো সামনে এসে আমাকে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের প্রথম রাউন্ডের ম্যাচটার কথা স্মরণ করিয়েও দিবেন । কিন্তু আমার পাল্টা জবাব হলো, এ রকম ম্যাচ বেরোবার সুযোগ বা ওরকম উইকেট আইসিসি রাখছে কোথায় ? আইসিসির লোকজনের হাতে ফুটবল বিশ্বকাপের দ্বায়িত্বটা দিয়ে দিলে আমি নিশ্চিত গোল বাড়ানোর জন্যে বারপোস্টটা আরো চওড়া করে দিতো । কিংবা বলের ভেতরের বাতাস গড়বড় করে বলের গতিবিধিটাকে গোলকীপার আর ডিফেন্ডারদের জন্যে অনিশ্চিত করে দিতো । আমার এখনো মনে পড়ে , ২০১০ বিশ্বকাপের বল জাবুলানির ভিতরের বাতাসের পরিমাণ নিয়ে ফুটবল বিশ্বে সে কি তোলপার !
কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটের যুগটা ২৭৫ থেকে ৩৫০ এ দৌঁড়ে প্রবেশ করছে , তাতে কারো কোন মাথাব্যাথা নেই !

বেশি গোল ফুটবলের কোয়ালিটি নিশ্চিত করে না … এটা ওখানকার লোকেরা ঠিক বোঝে । কিন্তু আমাদের বোঝানো যায় না … বেশি রান আসলে ক্রিকেটের কোয়ালিটি নিশ্চিত করে না । বোলারদের গিনিপিগ বানাতে এতোটুকু নীতিতে বাঁধে নি তাদের , কিন্তু ওপাশে ইকার ক্যাসিয়াস আর ম্যানুয়েল নয়ার বা জিয়ানলুইজি বুফোরা স্টারই থেকে যায় । একজন মিচেল স্টার্ক বা ট্রেন্ট বোল্টের কথা হয়তো বলবেন । কিন্তু আমি বলবো সারা বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান দেখুন ।

আহ ! ক্রিকেট !
আহ ! ক্রিকেট !
আহ ! ক্রিকেট ! কিন্তু সহযোগী দেশে এমন উন্মাদনা দেখতে চায় না খোদ আইসিসিই !
আহ ! ক্রিকেট ! কিন্তু সহযোগী দেশে এমন উন্মাদনা দেখতে চায় না খোদ আইসিসিই !

নাহ ! ছবিটা ভারতের নয় । নয় বাংলাদেশেরও । ছবিটি নেপালের । শুধু এই একটা ছবিতেই নয় ট্রল ক্রিকেটের মত ক্রিকেট রিলেটেড পেইজ আর সোশ্যাল সাইটগুলোতেও দেখবেন ক্রিকেট নিয়ে তাদের ক্রেইজের লেভেলটা আসলে কোন জায়গায় ? কিন্তু যাদের দেখার কথা , তারা দেখলে তো ভালোই হতো ! ১০ দলের বিশ্বকাপ আমাদের আসলে কি দেবে ? এখান থেকে আমি আসলে যা দেখি তা হলো , ১০ দলের বিশ্বকাপ আমাদের আসলে আরেকটা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি টাইপের কিছু একটা দেবে । নেপালের মতো এমন দলগুলোকে হয়তো আর দেখা যাবে না ! হয়তো দেখা যাবে না আয়ারল্যান্ডের মতো একটা দলকে ।

এ জায়গায় এসে আপনি আমাকে প্রশ্ন করবেন , একটু আগে আপনিই না বললেন খেলার কোয়ালিটি ভালো হচ্ছে না … ম্যাচের অর্ধেক পথে ম্যাচের ভাগ্য ঘুরে যাচ্ছে । আবার এখন আপনিই বলছেন, ছোট দলগুলোকে সুযোগ করে দিতে … ছোট দল নিলে তো কোয়ালিটি স্যাক্রিফাইস করতেই হবে । আসলে আপনি চান টা কি ভাই ? আমার কথা হলো , ভাই ! ফুটবল বিশ্বকাপে যেভাবে স্পেনকে টপকে চিলি… কিংবা ইংল্যান্ড আর ইতালিকে টপকে কোস্টারিকা যেভাবে উঠে , সেই উঠার সুযোগটা তো রাখুন ! দুটো টেস্ট প্লেয়িং দলকে হারিয়েও কাজের কাজ কিছুই হলো না আইরিশদের । ভাবা যায় ? সকারের খোঁজ খবর রাখলে আপনার অবশ্যই জানার কথা , পেশাদার ফুটবলের ইউরোপের সবচেয়ে বড় চারটা লিগের দুটো হলো ইতালিয়ান সিরি আ আর বার্ক্লেইস প্রিমিয়ার লিগ । এত বড় দুটো দেশ কোন এক কোস্টারিকার কাছে বাদ পড়ার পরেও ফিফা সেটার কারণে সামনে ফিকচারের বদল আনার ভাবনাটা কি ভাবে ? না ! ভাবে না । কারণ তারা জানে , কিছু জিনিসের অরিজিনালিটি বজায় রাখতে হয় । খেলাটার সতীত্ব হচ্ছে এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলো ।

কোস্টারিকার উত্থান কি ফিঁকে করেছে বিশ্বকাপকে ?
কোস্টারিকার উত্থান কি ফিঁকে করেছে বিশ্বকাপকে ?

কিন্তু ২০০৭ বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডে ভারত আর পাকিস্তানের বাদ পড়াটাকে যে ক্রিকেটের ইতিহাসেরই সবচাইতে বড় পাপের ট্যাগ দিয়ে দিয়েছে আইসিসি । সেই পাপের শাস্তি হিসেবে প্রতিটি বিশ্বকাপেই ক্রিকেটকে চাবুক মেরে প্রায়াশ্চিত্ত করতে দিচ্ছে আইসিসি । সেই চাবুকের নাম কি জানেন ? “লম্বা বিরক্তিকর একঘেঁয়ে প্রথম রাউন্ড ”
যেখানে আয়ারল্যান্ড তাদের চাইতে উপরের স্তরের দুটো দলকে হারিয়েও সামনের দিকে আর বাড়ার লাইসেন্স পায় না …

আইরিশদের কাছে হেরছে দুটো টেস্ট প্লেয়িং নেশনঃ কিন্তু আদতে লাভটা কি ?
আইরিশদের কাছে হেরছে দুটো টেস্ট প্লেয়িং নেশনঃ কিন্তু আদতে লাভটা কি ?

যেখানে ৪২ ম্যাচের প্রথম রাউন্ডের প্রথম ৩০ ম্যাচ পরেই নিশ্চিত হয়ে যায় ৮টা কোয়ালিফাই করা দলের মধ্যে কে কে থাকছে… ৮টায় ৮টা না পাওয়া গেলেও ৬টা স্পট তো একদম ঠিক হয়ে যায় অর্ধেক খেলার পরেই । প্রথম রাউন্ডের শেষের দিকে ক্রিকেট বিশ্বকাপে দলগুলো খেলে ফিকচারে রেজাল্টের ঘরে স্রেফ কিছু একটা বসানোর জন্যে। কি বসবে সবাই যেনো আগেই জানে !
২০০২ এর সেনেগালের মত ২০০৭ এর ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়ারল্যান্ড উঠে গিয়েছিলো । সেটাই ছিলো ক্রিকেটের পাপ ! আর কারো চোখে না হলেও আইসিসির চোখে তো বটেই । ৪২ ম্যাচের ঝিমানো প্রথম রাউন্ডের পরে তারপরে আকস্মিক ৬ ম্যাচের নকআউট রাউন্ড । সারাদিন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে হাঁটার পরে আকস্মিক ১০০ মিটারের দৌঁড় দিয়েই টুর্নামেন্ট ওভার ! রিডিকুলাস !

তাদের সামনের দিকের প্ল্যান তো আরো ভয়াবহ ! ১০ দল ? সেটা নিয়ে আবার বিশ্বকাপ হয় নাকি ? নামটা বদলে ফেলুন । তার চাইতে আরো ভালো হয় কি ? একটা লিগ বানিয়ে ফেলুন ! ১০ দলের লিগ সিস্টেমের খেলা ।২৭৫ রানের ক্রিকেটকে ৩৫০ এর ক্রিকেট বানানোর প্রসেস থেকে দূরে আসুন ! প্রথম রাউন্ড আরো ট্রিকি , আরো কম্পিটিটিভ করুন !

ক্রিকেট বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির সংখ্যা হয়তো কমবে না কখনোই
ক্রিকেট বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির সংখ্যা হয়তো কমবে না কখনোই

নোটঃ ২০০৯ সালের টি ২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ একটা মাত্র ম্যাচ হেরে বাদ পড়ে যায় আয়ারল্যান্ডের কাছে । সেদিন কষ্ট পেয়েছিলাম অনেক । তবে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডে ভ্রমণ করা সাংবাদিকদের ট্যুর ডায়েরিতে যখন পড়ি , “বিশ্বকাপ যে এখানে চলছে সেটা নাকি বোঝারই দায় নেই অস্ট্রেলিয়ায় !”… তখন কষ্টটা আরো বেশি লাগে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টে গোল হয় ১৭১ টি। আর ২০১৪ এর ব্রাজিল বিশ্বকাপেও সমান ১৭১ টি। এ দুটো হলো ওয়ার্ল্ড কাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড । মাঝে ২০০২, ২০০৬, ২০১০ গোলের সংখ্যা কমেছেও । কিন্তু আমাকে কি আইসিসি এ নিশ্চয়তা দিতে পারবে , ২০১৯ বা ২০২৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির সংখ্যা বা রানরেট এবারের চাইতে কমতেও পারে ?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

16 + 6 =