দ্য ওয়াহ ফ্যাক্টর

একবার স্টিভ ওয়াহ বলেছিলেন, তিনি কোন না কোনভাবে আগে থেকে জেনে যেতেন, কখন মার্ক আউট হবেন! আগে থেকে কোন না কোনভাবে একটা ইশারা পেতেন, চার মিনিটের ছোট যমজ ভাই মার্ক কখন আউট হবেন সেই ব্যাপারে! ১৯৯৩ সালের লর্ডস টেস্টের সময় ফিল টাফনেলের বলে নার্ভাস নাইন্টি নাইনে আউট হবার সময় স্টিভ ওয়াহ এক বল আগেই বলে বুঝতে পেরেছিলেন, পরবর্তী বলেই সাজঘরে ফিরতে যাচ্ছেন মার্ক! একই ঘটনা বলে ঘটেছিল ১৯৯৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ব্রিজটাউন টেস্টে, কার্টলি অ্যামব্রোসের বলে মার্কের আউট হবার আগে স্টিভ আগে থেকেই বলে বুঝতে পেরেছিলেন, স্টিভের দাবি অন্তত এটাই! একবার স্টিভ আমেরিকায় ছিলেন, কিন্তু মার্ক দেশের হয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বোতে খেলতে গিয়েছিলেন। সেই টেস্ট শুরু হবার আগের দিন বলে স্টিভ স্বপ্নে দেখেছিলেন এই টেস্টে “পেয়ার” (টেস্টের দুই ইনিংসেই শূণ্য রানে আউট হওয়া) পেতে যাচ্ছেন মার্ক! এবং হয়েছিলও ঠিক সেটাই! এমনকি কলম্বো টেস্টের পরের টেস্টের দুই  ইনিংসেও রানের খাতা খুলতে পারেননি মার্ক!

“ত এটা যদি সত্যি হয়েই থাকে তাহলে ও সবসময় আমার ডাবল সেঞ্চুরি করার স্বপ্ন দেখলেই পারে!” হাসতে হাসতে বলেছিলেন মার্ক, চার মিনিটের বড় যমজ ভাই স্টিভের দাবি শুনে, নাটকীয়ভাবে যেই ভাইকে টেস্ট দল থেকে হটিয়েই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট অভিষেক ঘটেছিল যার!

দুই ভাইয়ের রসায়ন হয়ত খেলার মাঠে কখনই চোখে পড়ত না, সম্ভবও ছিল না সেটা। প্রথাগত অস্ট্রেলীয় পেশাদারিত্বের আড়ালে দুইজনই নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনকে মিডিয়ার আলো থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন সবসময়েই। দুইজন একসাথে ক্রিজে ব্যাট করলে দেখা যেত কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছেন পর্যন্ত না। কিংবা কখনো কখনো বিপক্ষ দলের প্রয়োজনীয় কোন উইকেট পাওয়ার জন্য অনিয়মিত অফস্পিনার মার্ক ওয়াহকে বোলিং করতে পাঠানো হলে তিনি যখন সেই উইকেটটি পেতেন, দুই ভাই আনন্দের আতিশয্যটা কোনভাবেই প্রকাশ করতেন না – একটু পিঠ চাপড়ে দেওয়া, একটু হাত মেলানো, এটাই। ফলে বিরক্তির উদ্রেক ঘটত আমাদের মত দর্শকদের, খেলার মাঝে দুই ভাইয়ের হালকা খুনসুটি দেখার অপেক্ষায় বসে থাকতাম যারা।

স্টিভ ওয়াহ – বিরক্তিকর হলেও কার্যকরী ব্যাটসম্যান

আগেই বলেছি, টেস্টে স্টিভ ওয়াহের আগমন মার্কের থেকে ছয় বছর আগে হলেও চার মিনিটের বড়ভাইকে সরিয়েই পরম আরাধ্য ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ অর্জন করেন মার্ক ওয়াহ। ১৯৯১ সালের একদিনে, বাসায় ফিরে স্টিভ মার্ককে সুখবর জানালেন –

“এতদিনের চেষ্টা সফল হয়েছে তোমার, অভিনন্দন! দলে সুযোগ পেয়েছ তুমি”

“অ্যাঁ? টেস্ট দল! ও আচ্ছা। ধন্যবাদ, কিন্তু বাদ কে পড়ল?”

“আমি” স্টিভের অকপট স্বীকারোক্তি।

পরের দুই মিনিট ঘরে এক অস্বস্তিকর নীরবতা ছিল, মার্কের কথা অনুযায়ী। তবে সেদিন স্টিভের বাদ পড়া থেকে মার্কের টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়াটা নিয়েই বাড়িতে বেশী মাতামাতি হয়েছিল, মা বেভারলির মতে। আর সবাই মোটামুটি স্টিভের অধ্যবসায় সম্বন্ধে জানত, সে যে খুব তাড়াতাড়ি আবার টেস্ট দলে ফিরবে এ নিয়েও সবাই নিঃসন্দেহ ছিল, তাই স্টিভের দল থেকে বাদ পড়া নিয়ে বাসায় অত কথা হয়নি – “সেদিন আমার থেকে বেশী স্টিভই বেশী কথা বলছিল বাসায়, মন খারাপ করা দূরে থাক” মার্কের স্বীকারোক্তি!

মার্ক ওয়াহ – আপাদমস্তক আনন্দদায়ী

শোনা যায়, সতীর্থ গ্লেন ম্যাকগ্রাকে নিয়েও দুই ভাইয়ের অবস্থান দুই মেরুতে ছিল। স্টিভ ওয়াহ, বিশ্ব ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠতম অধিনায়ক হিসেবে স্বভাবতই সতীর্থ ম্যাকগ্রার ভুলত্রুটি শোধরানোর জন্য সর্বদা তৎপর থাকতেন। ম্যাকগ্রা – যিনি কিনা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেস বোলার হলেও ব্যাটিংয়ের দিক দিয়ে ছিলেন দুর্বলতম, স্টিভ ওয়াহ তাঁর ব্যাটিংয়ের উন্নতির জন্য নিজেই একরকম ম্যাকগ্রার ব্যাটিং কোচ হয়ে গিয়েছিলেন। ওদিকে মার্ক অত কোচিং-টোচিংয়ের ধার ধারেননি, সুন্দরমত সবার সামনে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে ম্যাকগ্রাকে দিয়ে আর যাই হোক ব্যাটিং হবেনা, এমনকি ম্যাকগ্রা জীবনে কখনো টেস্টে অর্ধশতক করতে পারবেন না, এই মর্মে একটা বাজীও ধরেছিলেন মার্ক! দুঃখের বিষয় হল, বাজীটা শেষ পর্যন্ত হারতে হয়েছিল মার্ককে, ম্যাকগ্রাকে ব্যাটসম্যান বানানোর জন্য স্টিভের কঠোর অভিপ্রায়ই সফল হয়েছিল, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্যাবার মত পেস-স্বর্গ এক পিচে ম্যাকগ্রা করেছিলেন ৬১ রান, তাঁর ক্যারিয়ার-সর্বোচ্চ ও বলা বাহুল্য, একমাত্র হাফ সেঞ্চুরি!

আরেক সতীর্থকে নিয়েও দুই ভাইয়ের অবস্থান দুই মেরুতে ছিল। যেখানে শ্যেন ওয়ার্ন ছিলেন দলে মার্ক ওয়াহর সবচাইতে ভালো বন্ধু, স্টিভ ওয়াহর সাথে ওয়ার্নের শত্রুতা ত ক্রিকেট ইতিহাসের অংশই হয়ে গেছে একদম! মার্ক টেইলরের পর শ্যেন ওয়ার্নেরই কথা ছিল অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হবার, কিন্তু মদ-নারী ও জুয়ায় আসক্ত বেখেয়ালী ওয়ার্নের জায়গায় স্থিতধী স্টিভকেই অধিনায়ক হিসেবে মনে ধরেছিল তখন অস্ট্রেলীয় নির্বাচকদের। সেই যে শুরু হল দুইজনের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই, আজ অবধি তা মিটমাট হয়নি। ওদিকে শ্যেন ওয়ার্নের বলে মার্ক ওয়াহ এর দুর্দান্ত ক্যাচ ধরা – টেস্ট ও ওয়ানডেতে একসময় এক নিয়মিত দৃশ্যই ছিল।

শুধু সতীর্থদের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থানের ক্ষেত্রেই নয়, তারা শুধু নামেই ছিলেন যমজ। চেহারা, ব্যক্তিত্ব, স্বভাব – কোনকিছুতেও তাদের কোন মিল ছিল এই দাবি কেউ করতে পারবেনা। “কখনো যদি আমার জীবন বাঁচানোর জন্য কোন এক ব্যাটসম্যানের উপর নির্ভর করতাম তাহলে সে হত স্টিভ ওয়াহ” আরেক অস্ট্রেলীয় সফল অধিনায়ক রিচি বেনোর কথাতেই ফুটে ওঠে ব্যাটসম্যান হিসেবে কতটা দাতিও্যবান ও নির্ভরশীল ছিলেন স্টিভ ওয়াহ, নিজের উইকেটকে একেবারে যক্ষের ধনের মত আগলে রাখতেন। ওদিকে মার্ক ছিলেন একদম ভিন্ন। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পসরা সাজিয়ে এক সময় নিজেকে শচীন টেন্ডুলকার আর ব্রায়ান লারার কাতারে নিয়ে গিয়েছিলেন মার্ক, ওয়ানডেতে। টেস্টে অবশ্য লারা বা শচীনের পাশের জায়গাটা সবসময়েই ছিল স্টিভের।

আজ ২ জুন, বিশ্ব ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠতম ভ্রাতৃদ্বয় নিজেদের ৫২ তম জন্মদিন পালন করছেন। কি, বুড়ো মনে হচ্ছে নিজেকে?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × 4 =