বিরাট বন্দনা

বাংলার মানুষ তাকে গালি দিতে খুব ভালোবাসে। কোহলি না বলে যদি ‘কুলি’ বলে লেখা শুরু করতাম, তাহলে হয়তো অনেক জনপ্রিয় হতো লেখাটা। কিন্তু এই মানুষটি এমন সব মানদণ্ড স্থাপন করেছেন তার ক্যারিয়ারে, আর নিজেকে যেভাবে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন, যেভাবে পরিণত হচ্ছেন কথা বার্তা আচরণে, তাতে তাকে এ প্রজন্মের সেরা ব্যাটসম্যান বললে মোটেই অত্যুক্তি হবেনা।
সত্য কথা বলি, আমিও তাকে পছন্দ করতাম না, তার দুর্বিনীত আচরণের জন্য। কিন্তু এখন যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, কার খেলা দেখতে টাকা খরচ করে টিকিট কেটে মাঠে যাবেন, আমি উত্তরে বলবো, বিরাট কোহলি! তার অনায়াস ভঙ্গির শিল্পিত ব্যাটিং, তার ‘চির-উন্নত-মম-শির’ ধরণের অধিনায়কত্ব, তার অসাধারণ আত্মনিবেদনের কারনে আমি তার ভক্ত হয়ে গেছি।
বিরাটের প্রথম সেঞ্চুরি ২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে। সেদিন তিনি সেবাগের ১৭৫ এর টর্নেডোর ছায়ায় ঢাকা পড়েছিলেন। সেদিন মিরপুরে একজন ভবিষ্যৎ নক্ষত্রের উত্থান পরখ করেছিলাম শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ডে বসে, এজন্য এখন নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।
এরপর দিনকে দিন তিনি ক্রমাগত উন্নতি করেছেন। ব্যাটিঙকে প্রায় ‘পারফেক্ট’ পর্যায়ে নেবার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন তিনি। তেন্দুলকারের মতো মহীরুহ অবসরে গেলে তার জায়গা কে নেবে, এটা নিয়ে ভারতীয়দের দুর্ভাবনার অন্ত ছিল না। বুক চিতিয়ে সেদিন দাঁড়িয়েছিলেন এই বিরাট, বলেছিলেন, আমি প্রস্তুত। বাকিটা ইতিহাস!- তার ব্যাট এর পর যেন আরও বেশি কথা বলতে শুরু করলো তার হয়ে। তার শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো শট খেলা দেখে নাওয়া খাওয়া ভুলে টিভির সামনে বসে যান কোটি ক্রিকেটপ্রেমী। তিনি শিল্পী আর সবুজ ঐ মাঠ তার ক্যানভাস! একেকটি আঁচড় দিচ্ছেন আর মনে হচ্ছে এটা আগেরটার থেকে আরও বেশি সুন্দর।
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো নতুন ভারতীয় দলের রুপকার মহেন্দ্র সিং নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে এই বিষম চাপ এসে পরে তার কাঁধে। চাপে ভেঙে না পড়ে বিরাট প্রমাণ করলেন, তার কাঁধটাও চওড়া, দরকার হলে নেতৃত্ব তিনি দিতে পারেন। তার নেতৃত্বে মাত্র দুটি টেস্ট হেরেছে ভারত। সবথেকে বড় কথা, দলকে মহেন্দ্র সিং এর ছায়া থেকে বের করে নিয়ে এসেছেন এবং তিনি নিজেও নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন অসাধারণ প্রজ্ঞার। অধিনায়ক বিরাট আক্রমণাত্মক, কিন্তু দুর্বিনীত নন। বাংলাদেশকে নিয়ে তার কাছ থেকে যারা খারাপ মন্তব্য আশা করেছিলেন, তাদের হতাশ করে তিনি বাংলাদেশকে আরও টেস্ট খেলতে দেবার কথা বলেছেন।
আজ তিনি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন, কিন্তু ইনিংসে কোন খুঁত নেই। একবার তাইজুলের বলে পরাস্ত হয়ে হেসে দিয়েছিলেন, আরেকবার মিরাজের বলে এল বি ডব্লিউ হয়েও রিভিউ নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি যেভাবে ব্যাটিং করেন, তা আনন্দদায়ক। টেস্টেও খেলেন ওয়ানডের মতো, কিন্তু পার্থক্য হল, তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো এগিয়ে এসে স্পিনারের বল মারতে যান না।
সবথেকে অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে তার ফিটনেস। কোন দিন শুনি নি, তার ইঞ্জুরি হয়েছে। কিভাবে পারেন বিরাট? আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, আই পি এল! আমাদের ক্রিকেটাররা এক নিউজিল্যান্ড সফরেই ইঞ্জুরিগ্রস্থ হলেন এমনভাবে যে ১১ জন নামানোই দায় হয়ে গেলো!
অধিনায়ক হিসাবে তিনি গ্র্যান্ডমাস্টার। শেষ বল পর্যন্ত লড়ে যান। আজ দিনের শেষ বলে ফিল্ডিং পরিবর্তন ও বোলারের সাথে কথা বলা তার আত্মনিবেদন প্রমাণ করে। আমাদের অধিনায়ক যেখানে একের পর এক ভুল করেই যাচ্ছেন, সেখানে বিরাট? চমকে দিতে পছন্দ করেন তিনি।
অনেকে তাকে স্যার ভিভের সাথে তুলনা করে, অনেকে করে তেন্দুলকারের সাথে। আমি বলবো, সবই ঠিক আছে, এই মানুষটা ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ক্যারিয়ার শেষ করার সময় তাদের পর্যায়ে যেতে পারেন, কিন্তু এখনি তুলনা করাটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।অনেকে তাকে স্যার ভিভের সাথে তুলনা করে, অনেকে করে তেন্দুলকারের সাথে। আমি বলবো, সবই ঠিক আছে, এই মানুষটা ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ক্যারিয়ার শেষ করার সময় তাদের পর্যায়ে যেতে পারেন, কিন্তু এখনি তুলনা করাটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।
বিরাট এগিয়ে যান, আনন্দ দিতে থাকুন! আপনার কাছে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। প্লিজ, বাংলাদেশের বিপক্ষে এত ভালো ব্যাটিং না করলে হয় না?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × three =