সুপার লিগের ষড়যন্ত্র ও উয়েফাকে বোকা বানানোর কেচ্ছা : ফুটবল লিকসের বোমা – ২

সুপার লিগের ষড়যন্ত্র ও উয়েফাকে বোকা বানানোর কেচ্ছা : ফুটবল লিকসের বোমা – ২

প্রায়ই ফুটবল খেলার হাঁড়ির গোপন খবর ফাঁস করে দিয়ে আলোচনায় আসে ফুটবল লিকস। এবার তাদের প্রতিবেদনে ফেঁসেছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সহ তথাকথিত বড় বড় সব ক্লাব। নিজেদের দেশের লিগ আর চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলা বাদ দিয়ে ইউরোপের সেরা সেরা ক্লাবগুলো নিজেদের নিয়ে “উয়েফা সুপার লিগ” খেলার পাঁয়তারা করছে, এমনই বোমা ফাটিয়েছে ফুটবল লিকস!

এই পর্বে জেনে নিন কিভাবে উয়েফার সভাপতিকে ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছে ম্যানচেস্টার সিটি ও পিএসজির মত ক্লাবগুলো!

‘ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উয়েফার আড়ালেই নিজেদের ক্লাবে টাকা ঢেলে যাচ্ছে পিএসজি ও ম্যানচেস্টার সিটি। ফুটবল লিকসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এভাবেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে, জানা গেছে, এ কাজে পিএসজি ও সিটির আরব মালিকদের সহায়তা করেছেন খোদ উয়েফা-প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো! সেই রোমান আব্রামোভিচের চেলসি কেনা থেকে শুরু হয়েছিল সংস্কৃতিটা। এখন বিভিন্ন ধনী ব্যক্তিকে ফুটবল ক্লাব কিনতে হরহামেশাই দেখা যায়। ২০০৮ সাল থেকে যে সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছে আরব শেখরাও। কাতার ও সৌদির আরব শেখদের মালিকানায় চলে গিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি, পিএসজির মত ক্লাবগুলো। ফুটবলে টাকার কুমিরদের প্রবেশ ঠেকাতে ও অন্যায়ভাবে নিজেদের অর্জিত সম্পত্তি দিয়ে নিজের ক্লাবকে ধনী বানাতে চাওয়ার এই প্রবণতা ঠেকাতে তৎকালীন উয়েফা প্রেসিডেন্ট মিশেল প্লাতিনি চালু করেছিলেন ‘ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’ নামের আইন। যে আইন নিশ্চিত করে একটা ফুটবল ক্লাব শুধুমাত্র তাঁর আয় করা অর্থ থেকেই ব্যয় করতে পারবে, মালিকের সম্পত্তি থেকে বাধাহীনভাবে খরচ করতে পারবে না। তবে, বড় ক্লাবগুলো যে নিয়মিতই এই আইনের ফাঁক গলে বেপরোয়া ভাবে খরচ করে যাচ্ছে, এটা মোটামুটি কমবেশি সবাই অনুমান করত। অবশেষে এই সত্যটাই আবার নতুন করে সবার সামনে প্রমাণ সহ নিয়ে হাজির হয়েছে ফুটবল লিকস, ফুটবলের বিভিন্ন গুমর ফাঁস করে দিতে সিদ্ধহস্ত যারা।
ফুটবল লিকস তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বহু বছর ধরেই ম্যানচেস্টার সিটি আর পিএসজি তাদের মালিক ও পৃষ্ঠপোষকদের টাকা যথেচ্ছভাবে ব্যয় করে। ম্যানচেস্টার সিটির মালিক খালদুন আল মোবারক আর শেখ মনসুর আল নাহিয়ান গত সাত বছর ধরে ক্লাবে অবৈধভাবে ২.৭ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছেন। ওদিকে পিএসজির মালিক নাসের আল খেলাইফি নিজের ক্লাবে বিনিয়োগ করেছেন ১.৮ বিলিয়ন ইউরোর মত। এই অর্থের সিংহভাগই অবৈধভাবে অর্জিত পৃষ্ঠপোষকদের চুক্তি ও নিজেদের সম্পত্তি থেকে এসেছে। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটি একাই লোকসান করেছে ২৩৩ মিলিয়ন ইউরোর মত। যা উয়েফার ‘ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’ এর সম্পূর্ণ বিরোধী। নিয়ম অনুসারে পিএসজি ও সিটির বড় শাস্তি হওয়ার কথা, বিরাট অঙ্কের অর্থ জরিমানা হওয়া থেকে শুরু করে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলায় নিষেধাজ্ঞা বা জেতা ট্রফি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়া – যে কোন বড় শাস্তিই পেতে পারত এই দুই ক্লাব। কিন্তু এই বড় শাস্তি যাতে এরা না পায়, এ জন্য সিটি ও পিএসজিকে সহায়তা করে গেছেন খোদ উয়েফা-প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো! এ যেন সর্ষের ভেতরেই ভূত!
উয়েফার আইনজীবীদের কাছে পিএসজি ও সিটি যেন ধরা না পড়ে, এ জন্য নিয়মিত এই দুই ক্লাবের মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন ইনফান্তিনো, আইনজীবীদের কাছ থেকে বাঁচার উপায় বাতলে দিতেন। পরে মাত্র ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডে রফা হয় ম্যানচেস্টার সিটির শাস্তির পরিমাণ। পিএসজিও মোটামুটি একই অঙ্কের জরিমানা দিয়ে বেঁচে যায়।

এদিকে শোনা যাচ্ছে, ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক হবার দৌড়ে যে কাতার জিতেছে, সে ঘটনাতেও আছে অস্বচ্ছতা। বলা হচ্ছে, সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি তাঁর মিত্র দেশ কাতারকে বিশ্বকাপের আয়োজক করার জন্য ইনফান্তিনোর সাথে মিলে মিশে একটা বিরাট কু-পরিকল্পনা করেছেন। কাতারি শেখদের ২০১০ সালে সারকোজি প্রস্তাব দেন, তারা যেন পিএসজিকে কিনে নেন, আর ফ্রান্সে যেন একটা খেলার চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করেন। বিনিময়ে তিনি তৎকালীন ফিফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনিকে আদেশ দেবেন যেন ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব কাতার কে দেওয়া হয়। নিকোলা সারকোজি পিএসজির পাঁড় ভক্ত, তাই তাঁর কাতারি বন্ধুরা তাঁর এই পরিকল্পনা ফেলে দিতে পারেন নি। ফলে নাসের আল খেলাইফি বাহিনী কিনে নেয় পিএসজি, আর ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠা করে খেলার চ্যানেল – বিইন স্পোর্টস।

২০১২ সালে সারকোজি যখন নির্বাচনে হেরে গেলেন, ঠিক সে সময়েই একটা বিনিয়োগ ফান্ড গঠন করার পচেষ্টা করেন, যে কাজে তাকে সহায়তা করেন আরব আমিরাতের “মুবাদালা সভেরিন ওয়েলথ ফান্ড” নামের এক সংগঠন, যার প্রধান খালদুন আল মোবারক। ঠিকই ধরেছেন, এই খালদুনই ম্যানচেস্টার সিটির একজন হর্তাকর্তা। পরের বছরে খালদুনের ম্যানচেস্টার সিটি যখন বুঝতে পারলো, ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে এর কঠিন বেড়াজালে পড়তে চলেছে তারা, তখন খালদুন সেই পুরনো বন্ধু নিকোলা সারকোজির সাহায্য চাইলেন। সারকোজিও প্লাতিনিকে বলে দিলেন, সিটির যেন বেশি সমস্যায় না পড়তে হয়।

ফলে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর উপরে দায়িত্ব পড়ে সিটিকে এই সমস্যা থেকে মুক্ত করার। যে কাজটা তিনি গত কয়েক বছর ধরেই করে যাচ্ছেন। উয়েফার উকিলদের কাছে সিটি ও পিএসজি যেন বিশেষ ধরা না পড়ে এ জন্য উকিলদের সাথে মিটিং এর আগেরদিন ইনফান্তিনো নিজে এই দুই ক্লাবকে বাতলে দেন গেরো থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়!
ফরাসি ঘরোয়া ফুটবলে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে গত কয়েক বছরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে পিএসজি। এ সময়ে তারা দলে নিয়ে এসেছে নেইমার, কিলিয়ান এমবাপ্পে, এডিনসন কাভানি, মার্কো ভেরাত্তি, থিয়াগো সিলভা, জলাতান ইব্রাহিমোভিচ, জুলিয়ান ড্রাক্সলার, মার্কুইনহোসের মত অনেক বৈশ্বিক তারকাকে। একই কথা খাটে ম্যানচেস্টার সিটির বেলাতেও। গত দশ বছরে দলটায় এসে খেলে গেছেন সার্জিও আগুয়েরো, ইয়ায়া তুরে, ডেভিড সিলভা, রবিনহো, কার্লোস তেভেজ, রহিম স্টার্লিং, নিকোলাস ওটামেন্ডি, ইকায় গুন্দোগানের মত বিশ্ব ফুটবলের তারকারা। এই সময়ে এই দুই ক্লাব জিতেছে অনেক শিরোপা। ফুটবল লিকসের এই প্রতিবেদনে দুই ক্লাবের অর্জনে একটু কালির দাগ পড়ল, এটা নিশ্চিত!

পরবর্তীতে যখন নেইমার বা অ্যাগুয়েরোদের খেলা দেখতে বসবেন, বা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ যখন দেখতে বসবেন, তখন কি আপনার মনে এসব কথা না এসে থাকবে আর?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

6 + 6 =