ট্র্যাজেডির নায়ক স্টিভেন জর্জ জেরার্ড

লিভারপুলের জার্সিতে ৭০৯তম ম্যাচ। অ্যানফিল্ডের রাজা মাঠে এলেন তার তিন রাজকন্যাকে নিয়ে। রাজকন্যারা এতো ছোট যে, কারোরই বোঝার বয়স হয়নি, বাবার মনে কতখানি কষ্টের ঝড়ঝাপটা। রাজার রাজত্ব যে অবসান হোতে চললো। অ্যানফিল্ডে ক্যারিয়ারে শেষ ম্যাচের আগে-পারে দর্শক আর সতীর্থরা ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিককে যে রকম অভ্যর্থনা জানালেন, তা প্রত্যাশিতই ছিলো। তবে যেটা সবচে বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন, সেই জয় নিয়ে অ্যানফিল্ড থেকে যেতে পারলেন না অলরেড গ্রেট।

28C1A7CD00000578-3084597-image-a-231_1431802553938

১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর লিভারপুলের হয়ে প্রথম খেলতে নেমেছিলেন স্টিভেন জর্জ জেরার্ড। মাত্র সতের বছর বয়সে। এরপর কত কিছু বদলে গেছে পৃথিবীতে, শুধু বদলায়নি জেরার্ডের অলরেড পরিচয়। ওই লাল জার্সতেই হয়েছেন বিশ্বসেরা ফুটবলারদের একজন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ জিতেছেন দশটি শিরোপা। তার সময়ে ইংল্যান্ডের অবিসংবাদিত সেরা ফুটবলার হোয়েও জিততে পারেননি কোন লিগ শিরোপা। অথচ চাইলেই হতো। ইউরোপের এমন কোনো বড় ক্লাব নেই, যারা এই মিডফিল্ডারকে দলে ভেড়াতে চায়নি। কিন্তু জেরার্ড শুধুই লিভারপুলের। লিভারপুলও জেরার্ডের। অর্থের চেয়েও একটা দলের প্রতীক হওয়া যে অনেক বড় কিছু, তা বুঝতেন তিনি। তাই অন্য যে কোন উঠতি ফুটবলারের কাছে দল অন্ত:প্রাণ হিসেবে যুগে যুগে ‘আইডল’ হয়ে থাকবেন স্টিভি।

28C0765B00000578-0-image-a-151_1431795596296

কেউ কেউ বলেন, শুধু লিভারপুল ফুটবল ক্লাবটিই নয়, ওই শহরটারই সবচে বড় দূত স্টিভেন জেরার্ড। সতের বছর যে অ্যানফিল্ডে কাটালেন, সেই মাঠে বিদায়ী ম্যাচে সতীর্থরা তাকে জয় উপহার দিতে পারেননি তাঁকে। ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে লিভারপুল হেরেছে ৩-১ গোলে। একটা লিগ শিরোপা না জেতার দীর্ঘ কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি অনন্ত দীর্ঘশ্বাস। তারপরও কারও প্রতি কোনো অনুযোগ-অভিযোগ নেই জেরার্ডের। এরকম মহৎ না হলে তিনি তো আর গ্রেট হতে পারতে না। জেরার্ডরা যুগে যুগে আসে না। লিভারপুল ভক্তরা সেটা জানেন। আর সেজন্যই তাদের কষ্টের মাত্রাটাও অনেক বেশি। বছরের পর বছর শিরোপাহীন একটা ক্লাবের জন্য অন্তহীন ভালবাসা তৈরি হয় একজন স্টিভেন জেরার্ডের জন্যই। সেই জায়গাটা কি আর কখনো পূরণ করতে পারবেন, আর কোনো অলরেড? সংশয় আছে।

জেরার্ডের কাছে চিরঋণী থাকবে লিভারপুল এফসি। কিন্তু ম্যাচ শেষে আবেগে থরোথরো জেরার্ড জানালেন, লিভারপুল তাকে যা দিয়েছে, সেই ঋণ কখনো ফুরাবার নয়। বিশেষ ধন্যবাদ দিয়েছেন সতীর্থ আর ভক্তদের। ম্যাচ শুরুর ঘণ্টাখানেক আগেই অ্যানফিল্ডের গ্যালারি ভরিয়ে তোলে অলরেড ভক্তরা। তাদের প্রাণপ্রিয় অধিনায়ককে যে যথাযোগ্য সম্মানে বিদায় জানাতে হবে। জেরার্ডকে যোগ্য সম্মান দিতে কার্পণ্য করেনি ক্লাব কর্তৃপক্ষও। নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখবেন, সেই পণ করে নামলেও চোখে-মুখে কান্নার ছাপ স্পষ্ট। জীবনে অনেক পুরস্কারই পেয়েছেন লিভারপুল অধিনায়ক। তবে ক্ষুদে ভক্তের কাছ থেকে পাওয়া উপহার গোল্ডেন বুটটি নিশ্চয়ই আবেগী করেছে জেরার্ডকে।

28C05FAE00000578-0-image-a-139_1431795168809

আগামী সপ্তাহে স্টোক সিটির বিপক্ষে লিভারপুলের হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলবেন জেরার্ড। পরের মৌসুমে এলএ গ্যালাক্সিতে যোগ দিতে যাওয়া ৩৪ বছর বয়সী মিডফিল্ডার স্পষ্টই জানিয়েছেন, খেলোয়াড় হিসাবে অ্যানফিল্ডে আর কখনোই ফিরবেন না তিনি। আগের দিনই বলেছিলেন, তিনি কাঁদবেন না। শেষ পর্যন্ত কান্না ঠেকাতে পেরেছেন। তবে অতৃপ্তি আর হাহাকার থাকবেই। ইস্তানবুলে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে রূপকথার নায়ক হয়েছিলেন। কিন্তু ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগটা অধরাই থেকে গেছে। গত বছর খুবই কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পাওয়া হয়নি। আর নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা! চেলসির সঙ্গে ম্যাচে জেরার্ড পা পিছলে পড়াতেই গোল হজম করে লিভারপুল। ওই ম্যাচে হারটাই ডুবিয়েছে লিভারপুলকে। সেই সঙ্গে অ্যানফিল্ডে শেষ ম্যাচে হার…জেরার্ড সত্যই ট্র্যাজেডির নায়ক। শেক্সপিয়রের মতো ট্র্যাজেডি লেখকও বোধ হয় এমন ট্র্যাজেডি কল্পনা করতে পারতেন না।

28C018D100000578-0-image-a-134_1431795141561

জেরার্ডের অ্যানফিল্ড অধ্যায় ট্র্যাজিকভাবে শেষ হলেও, বর্তমান-পুরনো সতীর্থদের ভালবাসা পেয়েছেন প্রত্যাশামতোই। মারিও বালোতেল্লি প্রিয় স্টিভিকে চিঠি লিখে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছেন। দুজনের পুরনো একটা ছবি পোস্ট করেছেন ডেভিড ব্যাকহাম। বাদ যাননি লিভারপুল ফ্যান ডেনিস টেনিস তারকা ক্যারোলিন ওযনিয়াকিও।

আর টুইটারে জেরার্ড নিয়ে ভালবাসার অক্ষরে পাখির ডাকাডাকি হয়েছে অসংখ্য। নায়ক ট্যাজেডির হোক বা সহজে সব পেয়ে যাওয়া কেউ…মানুষের ভালবাসা পান। তবে ট্র্যাজিক নায়করাই অমর হন বেশি। স্টিভেন জর্জ জেরার্ড সেই ট্র্যাজিক নায়কদের একজন।

 

মূল লেখা – স্পোর্টস অলটাইমে প্রকাশিত

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × 5 =