সেরা ১০ ইনিংসঃ বিশ্বকাপ ২০১৫

শেষ হয়ে গেলো লম্বা ক্রিকেট ফিয়েস্তা । ১৪ দেশের ১৪টি জাতীয় দল আর ৪৯ টি ম্যাচ । খেলাটা দিনকে দিন হয়ে যাচ্ছে ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি । সবাই চার আর ছক্কা দেখতে চায় । এখনকার না হয় উইকেট পাটা হয় , না হয় বাউন্ডারি খুব ছোট থাকে । এখানে ৪৯টা ম্যাচ থেকে সেরা ১০টি ইনিংস বেছে নেয়া চ্যালেঞ্জের আর রোমাঞ্চের । ৪৯টি ম্যাচের দিকে একবারে তাকালে গুলিয়ে যাবে মাথা । তাই সে ঝুঁকি নিচ্ছি না । স্টেজ বাই স্টেজ যাচ্ছি । প্রথমেই নক আউট স্টেইজের ৭টি ম্যাচের (৪টি কোয়ার্টার, ২টি সেমিফাইনাল আর একটা ফাইনাল) মধ্যে আমার সেরা দশে আসলে কোন কোন ইনিংসগুলো থাকবে সেটা বলে নেই ।

দুই সেমিতে ইলিয়ট আর স্মিথ- দুটো ইনিংসই নেবার ইচ্ছে ছিলো । শেষ পর্যন্ত যেতে হলো ইলিয়টের সাথেই ।
গ্রান্ট ইলিয়ট ৮৪ (৭৩)* (দক্ষিণ আফ্রিকা)

ক্রিকিনফো

সেঞ্চুরি আর ডাবল সেঞ্চুরির এই যুগে খালি রানের হিসাব করলে ইলিয়টের ৮০ প্লাস এই ইনিংসটি কিছুই না । তবে ইনিংসের গুরুত্ব বাড়ে যখন সেটা হয় কোন দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা ইনিংস। সাথে মাথায় রাখুন সিচুয়েশন । দেড়শোর আগেই ফোর ডাউন নিউজিল্যান্ড । ইলিয়ট আর কোরি ছাড়া নেই আর কেউই । তখন ঢের বাকি রেসের ফিনিশ পয়েন্ট । প্রথমে কোরিকে নিয়ে ইনিংসের মড়ক থামালেন, তারপর লুক রনকি আর ভেট্টোরিদের সাথে নিয়ে ভিডিও গেমের মতো নাটকীয় ফিনিশিংয়ে হাসালেন গোটা জাতিকে । শেষমেষ যখন ২ বলে ৫ রান দরকার , স্টেইনগানকে আঁছড়ে ফেললেন সীমানায় ।

মার্টিন গাপটিল ২৩৭ (১৬৩)* (ওয়েস্ট ইন্ডিজ )

Cricket World Cup

প্রথম কথা হলো , এতোটা ডমিনেটিং ব্যাটিং আগে গাপটিলকে করতে দেখি নি । ক্যালিপ্সোদের সব প্ল্যান বোধহয় ম্যাককুলামকে নিয়েই ছিলো । সেজন্যেই হয়তো গেইলের রেকর্ড গেইলের কাছ থেকে কেড়ে নিলেন গেইলের দলের সাথেই । ধুঁকতে থাকা ক্যালিপ্সোদের ওয়েলিংটনে সুযোগ যতোটুকুও ছিলো তাও মাটিচাপা দিয়ে দেয় গাপটিলের ২৪ টি চার আর ১১টি ছক্কার এই ইনিংস ।

এবার ৪২ টি গ্রুপ ম্যাচ থেকে বেছে নেবো সেরা ৮টি ইনিংস ।

ক্রিস গেইল ২১৫(১৪৭) (জিম্বাবুয়ে)

West Indies v Zimbabwe - 2015 ICC Cricket World Cup

ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ডাবল করতে পারে এমন লোকেদের শর্টলিস্টে তার নাম ঢুকে যেত অনায়াসে । তা আর হয় নি । তবে বিশ্বকাপের প্রথম ডাবলটা এল ক্রিস গেইলের ব্যাট থেকেই । সেঞ্চুরিটা পর্যন্ত হেঁটেছেন মোটামুটি ধীরেসুস্থে । অন্তত তার তুলনায় আস্তে । তবে সেঞ্চুরির পরের গেইল কতোটা নির্দয় আর নির্মম ছিলেন তা আপনি বুঝতে পারবেন একটা ছোট পরিসংখ্যান জানতে পারলেই । ঐ ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বোলিং এর শেষ ১১ ওভারের মধ্যে ১৫ এর কমে রান উঠেছে মোটে ৪টি ওভারে … আর বাকি ৭ ওভারেই উঠেছে ১৫ বা তার বেশি রান । একদিনে রেকর্ডবুকে সেদিন ক্রিস গেইলের কল্যাণে ইরেজার লেগেছে অনেক জায়গায় …

এবি ডি ভিলিয়ার্স ১৬২ (৬৬)*(ওয়েস্ট ইন্ডিজ )

????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????

বড় ইনিংসের ভিত্তিটা সেদিন পোঁতাই ছিলো । রান পেয়েছিলেন টপ অর্ডারের সবাই । তবে চারশটা সেখান থেকে দেখা যায় নি । দেখানোর দ্বায়িত্ব নিলেন সাহস আর শক্তিতে ভরা দক্ষিণ আফ্রিকা দলের অধিনায়ক আব্রাহাম বেঞ্জামিন ডি ভিলিয়ার্স । সিডনিতে সেদিন সবচাইতে বড় কোপটা যায় জেসন হোল্ডারের উপর দিয়ে । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন জমানার সাথে পরিচিতি ঘটে হোল্ডারের । ইনিংস শেষে হোল্ডারের ফিগার দাঁড়ায় ১০-২-১০৪-১। এর মধ্যে ভিলিয়ার্সকে করা ২১ বলে গুণেছেন ৭৬ রান ।

ডেভিড মিলার ১৩৮ (৯২)*(জিম্বাবুয়ে)

South Africa v Zimbabwe - 2015 ICC Cricket World Cup

আমলা, কক , ফ্যাফ, এবি … ভাবা যায় ? ম্যাচ ঘুরানো এই চারজনকেই ৮০ রানের মধ্যে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলো জিম্বাবুয়ে এ বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচেই । ১৯৯৯ এর মতো আরেকটি অঘটনের ভূত যখন হ্যামিল্টনে আসি আসি করছে, তখন তাকে মেরে ফেলার দ্বায়িত্বটা নিলেন কিলার মিলার আর জেপি দুমিনি । ৫ম উইকেট জুটিতে ২৫৬ রানের হার না মানা জুটি … যাতে সেদিন লিডরোলটা নিয়েছিলেন মিলারই । অঘটন থেকে দলকে বাঁচানো ইনিংস … বাকিদেরকে বার্তা দেওয়া ইনিংস , “দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচটা ঘুরিয়ে দিতে পারে যেকোন জায়গা থেকে /”

শিখর ধাওয়ান ১৩৭ (১৪৬)(দক্ষিণ আফ্রিকা)

Shikhar_Dhawan_vs_South_Africa

বিশ্বকাপের আগে সমালোচনা ধেয়ে আসছিলো চারদিক থেকে । তার জন্যে ! তার দলের জন্যেও । রান পেয়েছিলেন এডিলেডে পাকিস্তানের সাথে ১ম ম্যাচটাতেও । তবে ফেবারিট দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে এই শতরানের তো ধার আর ভারই আলাদা । জোরে বল করার লোকের অভাব ছিলো না দক্ষিণ আফ্রিকার । ভারতের বাইরে বেশিরভাগ সময়টাই দারুন স্ট্রাগল করতে হয়েছে ধাওয়ানকে । তাই ধাওয়ানের এই ইনিংসটা তো জবাব দেওয়া ইনিংস … ভারতীয় দলের জন্যে … তার নিজের জন্যেও ।

মাহমুদুল্লাহ ১০৩ (১৩৮) (ইংল্যান্ড)

208193.3

স্কোরকার্ডে তাকালে এ জমানার তুলনায় বড্ড স্লো হয়তো লাগবে রিয়াদের ইনিংসটা । তবে ইনিংসটাকে রাখতেই হবে দুটো কারণে । প্রথমত , এমন একটা সময়ে রিয়াদ নামলেন যখন জিমি এন্ডারসন বেশ সুইং পাচ্ছেন । ফিরিয়ে দিয়েছেন তামিম-কায়েসকে । প্রথমে সুইং সামলালেন আর তারপরে সৌম্যকে নিয়ে পালটা আক্রমণে বাংলাদেশকে ফেরালেন খেলায় । মুশফিকুর রহিম আসার পরে একপাশ আগলে রেখে মুশিকে দিলেন মেরে খেলার লাইসেন্স । আর ম্যাচশেষে হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচে বাংলাদেশ যখন জিতে ফেরে , তখন বেরিয়ে আসে ২য় কারণটি । রিয়াদের এই স্থিতিশীল ইনিংসটিই তো নিশ্চিত করে দিলো হামবড়া ব্রিটিশদের জন্যে এবারের বিশ্বকাপে তাদের ফিকচারের ম্যাচগুলোই থাকছে । খেলতে হচ্ছে না ২য় রাউন্ড । আর বাংলাদেশ উঠে গেলো কোয়ার্টারে । প্রথমবারের মতো নক আউট রাউন্ডে !

কুমার সাঙ্গাকারা ১১৭ (৮৬)*(ইংল্যান্ড)

CRICKET-WC-2015-ENG-SRI

ডমিনেশন ! জাস্ট পিউর ডমিনেশনের জন্যে রাখবো সাঙ্গার এই ইনিংসটিকে । ইনোভেটিভ ব্যাটিং এ ম্যাচ পালটানো দেখতে দেখতে মানুষ অভ্যস্তই ছিলো । কিন্তু সাঙ্গাকারা ইংল্যান্ডের সাথে ম্যাচটাতে ৩০০প্লাস টার্গেট চেইজ করতে নেমে অন্যপাশে থিরিকে রেখে দারুন সব শটে যেভাবে মনোবল চূর্ণ বিচূর্ণ করার নিষ্ঠুর কাজটা করলেন , তাতে নিরপেক্ষদের দিক থেকে বোলারের জন্যে থাকে না কোন সহানুভূতি । শুধু সাঙ্গার প্রতি মুগ্ধতা থাকে । ক্রিকেট গ্রামারে থেকেও এতোটা ডমিনেটিং ইনিংস এ বিশ্বকাপে এ রকম আরেকটা দেখি নি । বিশ্বকাপ আর দেখবে না সাঙ্গাকে । চোখের শান্তি দেওয়া সেদিনের দারুন সব পুল, স্কয়ার কাট আর কভার ড্রাইভ গুলো ইউটিউবে খুঁজে যতোবার দেখি মুখ থেকে একটাই শব্দ বেরোয় , “ওয়াও” !!

গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ১০২ (৫৩) (শ্রীলংকা)

Australia v Sri Lanka - 2015 ICC Cricket World Cup

যুগটাই এমন যেখানে ম্যাক্সওয়েলের মত ব্যাটসম্যানদের ম্যাচ ইম্প্যাক্ট দিনকে দিন বাড়ছেই ।তবে কেন জানি প্রথম ওয়ানডে হান্ড্রেডটা আসি আসি করেও আসছিলো না ম্যাক্সির । এসে গেলো ঐতিহ্যবাহী সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডেই । ম্যাক্সওয়েলের ব্যাপারে ভাঙা রেকর্ডটিই ঘুরিয়ে আবার বাজাতে হবে । ইনিংস ১০২ রানের, কিন্তু তাতে এমন এমন শট , সেগুলো ই এ স্পোর্টসের কোন কম্পিউটার গেমসে আনতে এখনো অনেক দেরি ।

মাহেলা জয়াবর্ধনে ১০০ (১২০)(আফগানিস্তান)

Sri Lanka v Afghanistan - 2015 ICC Cricket World Cup

৫১/৪ …ফিরে গেছেন সাঙ্গা, দিলশান আর থিরিমান্নের মতো ইনফর্ম ব্যাটারেরা । লঙ্কার স্কোরবোর্ডটা এমনই দাঁড়ায় আফগানদের মাঝারি টার্গেট তাড়া করতে নেমে । বাংলাদেশ ম্যাচের একটা সময়তক ভালো মতোই ম্যাচে ছিলো আফগানরা , এবার এশিয়ান সিংহদের সাথেও অনেক বড় কিছুর স্বপ্ন আফগানদের । তবে নিজের শেষ বিশ্বকাপে একটা ভালো ইনিংস না থাকলে ক্রিকেট বিধাতার দিক থেকে বড্ড নির্মমই লাগতো । তাইতো সোনায় সোহাগা করে মাহেলার ব্যাটে রান এলো সবচাইতে দরকারি সময়েই ।

আরো কিছু ইনিংস ছিলো ফিঞ্চের ইংলিশদের বিপক্ষে সেঞ্চুরিটা বা আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আমলার ইনিংসগুলো শর্টলিস্ট থেকে বাদ দেবার মতো ছিলো না । তবে কখনো ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব আর কখনো ম্যাচ ইম্প্যাক্টের কথা ভেবে বেছে নিয়েছি এই ১০টিকেই ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − ten =