কিংবদন্তীর কথা বলতে এসেছি

সমালোচকের তোপের মুখে, পড়েছি হাজারবার
ব্যাট আর বলে, মাঠে দিয়েছি কঠোর জবাব তার।

বাপ্পা মজুমদারের গানের এই দুটি লাইন যেন তার জন্যই লেখা। পান থেকে চুন খসলেই আমরা আমাদের গালিসাহিত্যে পাণ্ডিত্যের প্রমাণ দেই তাকে উদ্দেশ্য করে। তিনি কিন্তু ভিন্ন ধাতুতে গড়া, ফিরে আসেন আবার। ব্যাট তার হাতে তলোয়ার হয়ে যায়, বল দিয়ে ঘূর্ণি মায়ার জাল বিস্তার করে ব্যাটসম্যানদের নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেলেন। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বসেরা সব্যসাচী হয়ে দেখিয়ে দেন, “আমরাও পারি”

সেটা কিন্তু আজ থেকে নয়, সেই ২০০৮ থেকেই ঝলক দেখাচ্ছেন সাকিব আল হাসান। বিশ্বের বুকে বাংলার ক্রিকেটের সবথেকে বড় দূত তিনি। অনেক বিদেশি তার নামেই বাংলাদেশ কে চেনে, যেমন চেনে আর্জেন্টিনাকে মেসি বা মারাদোনার নামে, পেলের নামে পরিচিত হয় ব্রাজিল। একথা শুনে অনেকের চোখ কপালে উঠবে। বলবেন, সাকিব কি করেছে যে তাকে কিংবদন্তী বলতে হবে?- যে বিষয়টা অকল্পনীয়, সেটাই এখানে হয়েছে, কিছু স্বঘোষিত সাকিব- হ্যাঁটার আছে এদেশে। বাঙালীর সবথেকে বড় শত্রু বাঙালি- এমন কথা সত্যজিৎ রায় বলে গেছেন, সেটা ফলে যাচ্ছে এখানে। তবে এইসব অকর্মা হ্যাঁটার থেকে তার ভক্তের সংখ্যা অনেক বেশি।

কেন সাকিব কিংবদন্তী?- এক কথায় উত্তর দিতে গেলে তার ধারাবাহিকতার জন্য। ১১ বছরের ক্যারিয়ারের এমন কোন সময় আসেনি যে তিনি দলে অটোমেটিক চয়েস ছিলেন না। ২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬১ বলে ৯২ রান করে নিজের আগমনী বার্তা ঘোষণা করলেন, এই ২০০৮ এ-ই, কিউইদের বিপক্ষে বিশ্ব প্রথম দেখল তার ঘূর্ণিজাদুর ঝলক, যাতে আর একটু হলেই কিউইরা হেরে গিয়েছিলো! সাথে ব্যাট হাতেও সাকিব ছিলেন সমান কার্যকর। ঐ ম্যাচে কোচ এর কথাকে সত্যি প্রমাণ করে টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিং করেন সাকিব, মাত্র ৩৬ রানে নেন ৭ উইকেট। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের দুঃখ হয়ে থাকা সেই ম্যাচে তামিম মুশফিক এর সাথে তার নাম টাও উচ্চারন করতে হবে ৫১ রান করার জন্য।

ইমরান খান, স্যার ইয়ান বোথাম এর মতো বিখ্যাত মানুষের পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন সাকিব এক টেস্টে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট নিয়ে। আজকে নিজেকে স্যার রিচার্ড হ্যাডলির পাশে বসালেন অসিদের বিপক্ষে টেস্টে একসাথে ১০ উইকেট ও অর্ধশতক করে- যে পারফরম্যান্স ছিল ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারক। টেস্ট খেলুড়ে ৯ টি দেশের বিপক্ষেই ইনিংসে ৫ উইকেট পাবার কীর্তি আছে যাদের, সাকিব তাদের একজন এবং মাত্র ৫০ টি টেস্ট খেলে কেউ এই কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি, তাদের এই কীর্তি গড়তে খেলতে হয়েছে অনেক বেশি। দেশের ১০০ তম টেস্টে তার দুর্দান্ত শতকের কল্যাণেই শ্রীলঙ্কাকে কুপোকাত করে বাঘ বাহিনী। এক কথায় তিনি এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রাণভোমরা এবং একই সাথে পথপ্রদর্শক। কারণ তিনিই দেখিয়েছেন, আমরা কারো থেকে ছোট নই, চেষ্টা করলে আমরাও পারি শীর্ষে যেতে।
মনে করে যেন বিদেশ ঘুরে,
লাল সবুজের জয়গান গাই, ব্যাট আর বলের সুরে সুরে।

বিদেশি ব্যবসায়িক ক্রিকেট, মানে ফ্রাঞ্চাইজি লিগেও বাংলাদেশের একমাত্র ধারাবাহিক খেলোয়াড় সাকিব। সিপিএলের প্রথম আসরেই তার ৬ রান দিয়ে ৬ উইকেট শিকার- ক্রিকেট রুপকথার অংশ হয়ে গেছে। বিগ ব্যাশ লিগেও প্রায় নিয়মিতই খেলেন, একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবেই।

অধিনায়ক সাকিবকে আমার সব সময়ই মনে হয় মাঠে বাংলাদেশের সেরা, মাশরাফির একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মানুষকে আগলে রাখার, যেটা আসলে অভিজ্ঞতা থেকে হয়। সাকিব ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত সময়ে অধিনায়ক ছিলেন বাংলাদেশের। এই সময়ে ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরে বাংলাওয়াশ শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিলো তার কল্যানেই। দ্বিতীয় টেস্টে কেমার রোচের আগুন ঝরানো বোলিঙের বিপক্ষে অপরাজিত ৯৬ রান আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের, রুপকথার- অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার বিশ্বাস, এখন দায়িত্ব পেলে তিনি আগের থেকে আরও ভালো করবেন।

বল আর ব্যাট দুটো হাতেই তিনি ধারাবাহিক, তাও আবার ১১ বছর ধরে। তিনি বিশ্বসেরা সব্যসাচী, তার মূল শক্তি উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস এবং ঠাণ্ডা মাথায় চাপ মোকাবেলা করা, তাই তিনি কিংবদন্তী, বাংলার ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তী।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fifteen + eight =