ট্যাকল করে চুক্তি আদায়ের এক গপ্পো

ট্রেনিং গ্রাউন্ডে আর দশটা দিনের মতই ট্রেনিং করতে নেমে পড়েছেন টোনি অ্যাডামস, থিয়েরি অঁরি কিংবা ডেনিস বার্গক্যাম্পরা। আছেন অ্যাশলি কোল, সল ক্যাম্পবেল আর প্যাট্রিক ভিয়েরাও। মাত্র শেষ হওয়া মৌসুমে লিগে রানার্সআপ হয়েছে আর্সেনাল, একটুর জন্য লিগ জেতা হয়নি। তাই সেই সাতানব্বই-আটানব্বই মৌসুমের পর এই মৌসুমেই আবার লিগ জিততে বদ্ধপরিকর আর্সেন ওয়েঙ্গার, আর্সেনালের কোচ। সেই উদ্দেশ্যেই মার্টিন কিওন আর টোনি অ্যাডামসের সাথে ডিফেন্সের শক্তি বাড়ানোর জন্য শত্রুশিবির টটেনহ্যাম হটস্পার থেকে ফ্রি ট্র্যান্সফারে আর্সেনালে নিয়ে আসা হয়েছে ইংলিশ ডিফেন্ডার সল ক্যাম্পবেলকে। ক্যাম্পবেল ইংলিশ সুপারস্টার ডিফেন্ডার, আর একেবারে টটেনহ্যাম থেকে আনার ফলে মিডিয়াতে হইচইও হচ্ছে এটা নিয়ে বেশ।

ক্যাম্পবেলের সাথে রাইটব্যাক লি ডিক্সনের ব্যাকআপ হিসেবে দলে আনা হল একজনকে। আইভোরি কোস্টের চ্যাম্পিয়ন দল এএসইসি মিমোসাসের এই ছেলেটা আবার ডিফেন্সিভ মিডেও খেলতে পারে ভালোই, তারমানে চাইলে ভিয়েরা-এডু দের বদলেও খেলানো যাবে আরকি। আজকে ট্রেনিংয়ে সে ছেলেটাকে আনা হয়েছে। ট্রায়াল দিয়ে দেখুক, ভালো হলে দলে নেওয়া যাবে – ভাবলেন ওয়েঙ্গার।

২০০০ সাল থেকেই মোটামুটি আইভোরি কোস্টের জাতীয় দলে খেলছে এই বিশ বছর বয়সী ছেলেটা, নিশ্চয়ই ভালো কেউ-ই হবে।

ত সবার সাথে ট্রেনিং করতে নেমে গেল ছেলেটা। দূর থেকে দাঁড়িয়ে রে পার্লার আর জিওভানি ভ্যান ব্রঙ্কহর্স্টরা দেখতে লাগলেন কালো করে ছেলেটা মাঠময় ট্যাকল দিয়ে বেড়াচ্ছে, কি আজব! বলটা গড়াতে গড়াতে থিয়েরি অঁরির পায়ে গেল, তর্কযোগ্যভাবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্ট্রাইকার তখন অঁরি, কথা নাও বার্তা নাই কোত্থেকে পেছন থেকে এসে দুম করে দুই পা দিয়ে স্লাইডিং ট্যাকল করে অঁরিকে ফেলে দিল ছেলেটা!

প্রতিযোগিতামূলক যেকোন ম্যাচ হলে এইরকম ট্যাকল করলে লালকার্ড নিশ্চিত ছিল। ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন তখন অঁরি। সাইডলাইন থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন ওয়েঙ্গার – “এই ছেলে! কি করছ এসব তুমি! এরপর থেকে আর এরকম ট্যাকল করবেনা!”

কিন্তু কে শোনে কার কথা! ছেলেটার মাথায় তখন যে করেই হোক একটা ইমপ্রেশন ক্রিয়েট করার ভূত চেপেছে, তাতে যদি আর্সেনালের হয়ে চুক্তিটা নিশ্চিত করা যায়!

এরপর, বল গেল ডেনিস বার্গক্যাম্পের পায়ে, অঁরির স্ট্রাইক পার্টনার। কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তের দেজাভুঁ হল যেন আবার। আবার একইরকম ভাবে বার্গক্যাম্পকে এবার ট্যাকল করে ফেলে দিল ছেলেটা! আবারো চেঁচিয়ে উঠলেন ওয়েঙ্গার – “এই ছেলে তোমাকে না মানা করলাম এরকম রাফ ট্যাকেল না করার জন্য? কথা কানে যায় না? আর একটাও ট্যাকল করবেনা তুমি!”

বলে মনেহয় যেন ভুলই করলেন ওয়েঙ্গার, একটু পরে বল ওয়েঙ্গারের পায়ের কাছে আসল, আর আসার সাথে সাথেই…

হ্যাঁ! ঠিক ধরেছেন!

কিছুক্ষণ পর দেখা গেল স্ট্রেচারে করে একটা বয়স্ক লোককে ট্রেনিং গ্রাউণ্ডের বাইরে মেডিক্যাল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাড়াতাড়ি, ক্রমাগত চেঁচিয়ে যাচ্ছে বয়স্ক লোকটা!

কোচকে দেখতে মেডিক্যাল সেন্টারে ছুটে গেলেন রে পার্লাররা “আমার মনেহয় ছেলেটা ইচ্ছা করে করেনি এসব। নতুন ছেলে, এক্সাইটমেন্টে হয়ে গিয়েছে আরকি” কোচকে বললেন পার্লার।

ওদিকে ট্রেনিং গ্রাউণ্ডে এতক্ষণে ছেলেটার হুঁশ হয়েছে কি পাগলামিটাই না করেছে সে, ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে বাচ্চা শিশুর মত কাঁদা শুরু করে দিয়েছে সে। এতবড় একতা সুযোগ সে এভাবে হেলায় হারালো? কোভকে ইঞ্জুরড বানিয়ে দিল? নিজের স্বপ্নগুলোকে চোখের সামনে এভাবে আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যেতে দেখলো ছেলেটা।

“আমারো সেটাই মনে হয়, ও ইচ্ছা করে করেনি। আমরা ছেলেটাকে কালকেই দলে নিচ্ছি। মিমোসাসের সাথে ট্রান্সফারের সকল কাগজপত্র রেডি করতে বল। ছেলেটার ইচ্ছেশক্তি পছন্দ হয়েছে আমার” বললেন ওয়েঙ্গার।

পরেরদিনই আর্সেনালের মূল দলে যুক্ত হল আরেকটি নাম। পরের আট বছরে দুই শতাধিক ম্যাচ খেলে আর্সেনালের হয়ে লিগ, কাপ – প্রায় সবকিছুই জয় করল সে।

আজ সেই পাগলাটে আইভোরিয়ান ছেলেটার জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, কোলো ট্যুরে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

9 − eight =