সুইপার কিপারের সার্থক রূপকার

আমরা যখন ছোট ছিলাম, ফুটবল খেলার সময়ে একটা thumb rule অনুসরণ করতাম, আমার শোনামতে, অনেকেই সেটা করতেন। সেটা হল টিমের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান, নড়াচড়া করতে অনাগ্রহী ছেলেটাকে গোলকিপিং করতে দেওয়া।
এরপর আমরা বড় হই, আমাদের ধারণারও পরিবর্তন হয়। কালেভদ্রে একটা ভাল গোলকিপার পেলে সেই স্থায়ী হয়ে যেত। আর না হলে চটপটে রিফ্লেক্সের অধিকারী কেউ সেই দায়িত্বটা নিত।
আমি লিখে দিতে পারি, আজ থেকে দশ বছর পরে এই ক্রাইটেরিয়াটাও আর থাকবেনা। গলির খেলার সময় ও দেখা যাবে, তাকেই গোলকিপিং করতে দেওয়া হবে, যে শট ভাল ঠেকাতে পারে, আবার দৌড়ে এসে বল ক্লিয়ার করে বিপদ মুক্ত করতে পারে,  পায়ে বল আসলে উল্টাপাল্টা না মেরে একজন পাকা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার এর মত লম্বা পাস দিয়ে আক্রমণের সূচনা করতে পারে। স্ট্যান্ডার্ডের এই উন্নতি  এর কারণ – আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ম্যানুয়েল নয়্যারকে দেখে ফেলেছে।

আমার লেখা বিভিন্ন ফুটবলারের জন্মদিনের শুভেচ্ছায় অনেকেই একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেতে পারেন। সূচনায় কিছু কথা, এরপর তার ক্যারিয়ারের উপর আলোকপাত, সবশেষে তাকে মনে রাখার কারণ বলে শুভেচ্ছা জানানো। সূচনার কাজটা করে ফেলেছি, অন্যগুলো আজকে আর করব না। কারণ নয়্যার সম্পর্কে সবাই আমরা কম বেশি জানি। তিনি শালকে’র হয়ে খেলা শুরু করেছিলেন, মেসুত ওজিলের সাথে একই দলে বয়স ভিত্তিক পর্যায় থেকে খেলতেন, বায়ার্ন ও জার্মানির হয়ে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছেন – এসব তো আমাদের সামনেই ঘটে যাওয়া। আমরা নয়্যারের একটি অনন্য লিগ্যাসির দিকেই আজকে আলোকপাত করব।

শুরুতেই বলেছি, গোল কিপিংকে সাধারণ মানুষ কিভাবে দেখে, তার কথা। কিপার বেছে নেওয়ার সেই অদ্ভূত নিয়মের পিছে একটি ধারণাই চলে এসেছে – কিপারের কাজ বল জালে ঢুকতে দেওয়া, দৌড়ানো আগানো এসবের কোন দরকারই নেই। কথাটা আগের প্রেক্ষিতে ভুল নয়। ডিফেন্স, মিডফিল্ড, অ্যাটাকের মত এত ভ্যারিয়েশন কিপিংয়ে কখনোই ছিল না। বল ক্লিয়ার করে দেওয়া হাফ-ফুল ব্যাক থেকে শুরু করে অনবরত উইং দিয়ে উঠানামা করা উইং ব্যাক, দলের আক্রমণ এ ছায়া হয়ে যাওয়া সুইপার ব্যাক, লম্বা পাস দিয়ে আক্রমণের সূচনা করা বল প্লেয়িং সেন্টার ব্যাক – ডিফেন্সের পরিবর্তনের ধারাটা ছিল এমন। মিডফিল্ডের ক্ষেত্রে ত শেষই নেই- বক্স টু বক্স, ডেস্ট্রয়ার, রেজিস্তা বা ডিপ লাইং প্লেমেকার, ট্রেকোয়ার্তিস্তা বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার,  সাইড মিডফিল্ডার, হোল্ডিং মিডফিল্ডার ইত্যাদি। এমনকি আক্রমণেও আজকের যুগে শুধু ফরোয়ার্ড বলে কিছু নেই, চলে এসেছেন উইংগার, স্ট্রাইকার, সেকেন্ড স্ট্রাইকার, ফলস নাইন, উইং ফরোয়ার্ড, ইনভার্টেড উইংগাররা। ব্যতিক্রম ছিল গোলকিপিং, সেখানে ইম্প্রভাইজেশনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেউ করতেন না, দলকে বিপদে ফেলার ভয়ে। তাও এর মাঝে একজন রেনে হিগুইতা বের হয়ে আসতেন, যিনি বল পায়ে মিডফিল্ডে চলে যেতেন, সেটা করতে গিয়ে দলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ও করে দিয়েছিলেন।  বা রোজারিও চেনি, জোসে লুইস চিলাভার্টরা ছিলেন,  ফ্রি কিক বা পেনাল্টি থেকে গোল করে দল কে সাহায্য করতেন। কিন্তু ওপেন প্লে তে তাদের ভূমিকা ছিল শুধুমাত্র একটা ৫০-৫০ লং বল বা ভলিই,আর কিছু নয়। এই ধারা থেকে সব সময়ে দূরে থাকতে চেয়েছে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা, এই কারণেই তারা এত সমালোচনার পরেও বল পায়ে স্বচ্ছন্দ ভিক্টর ভালদেস কে খেলিয়েছে অনেক দিন, এই কাজ করতে গিয়ে এঞ্জেল ডি মারিয়ার পায়ে বল তুলে দিয়ে গোলও খেয়েছিলেন ভালদেস। ৯৭ এর দিকে এই কাজ করতে বার্সেলোনা এনেছিল জার্মান গোলরক্ষক রবার্ট এংকে কে,  যিনি এই পাহাড়সম দায়িত্বের চাপে মানসিক অবসন্নতায় ভুগতে শুরু করেন, যার দীর্ঘমেয়াদী রূপ তার আত্মহনন। এরপর আমরা এই রোলে বায়ার্ন এর ম্যানুয়েল নয়্যারকেকে দেখতে পাই।
বায়ার্নে পেপ গার্দিওলার অধীনে খেলার সময়েই বিভিন্ন ম্যাচে নয়্যারের পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে আক্রমণে সাহায্য করা, বা বল ক্লিয়ার করে বিপদ মুক্ত করা,  এসবের খবর ক্রীড়ামোদীরা জানতে শুরু করে। ইউপ হেইংকেসের সময়েও আমরা নয়্যারের আত্মবিশ্বাসের নিদর্শন দেখি, টাইব্রেকারে শট ঠেকিয়ে আবার নিজেই পেনাল্টি নিতে চলে আসার মাধ্যমে। কিন্তু এর চুড়ান্ত রূপ আমরা দেখি, ২০১৪ বিশ্বকাপে, আলজেরিয়ার সাথে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে

ক্ষুরধার, গতিশীল আলজেরিয়া, জার্মান রক্ষণভাগে অপেক্ষাকৃত শ্লথ গতির শকোদ্রান মুস্তাফি আর পার মার্টেস্যাকারকে পেয়ে হিংস্র বাঘ এর মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। জেরোম বোয়াতেং, বেনেডিক্ট হুভেডেসরাও তা ঠেকাতে বেসামাল হয়ে গেলে ত্রাণকর্তা হয়ে উঠেন ম্যানুয়েল নয়্যার। কতবার যে তিনি গোল পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে পেনাল্টি বক্স পার হয়ে বল ক্লিয়ার করে দলকে বিপদ মুক্ত করেছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। স্লাইড, হেড, লব, চেস্ট পাস – যত উপায়ে পারা যায়, তিনি সব ভাবেই আলজেরিয়ার আক্রমণ নস্যাৎ করে দেন। বিশ্ব সেদিন জানতে পারে, হাত দিয়ে বল না ঠেকিয়েও অন্যভাবে একজন গোল কিপার দলকে বাঁচাতে পারেন। এতেই ক্ষান্ত হননি, লম্বা বল বাড়িয়ে আক্রমণের সূচনা করে অ্যাসিস্টের কাছেও চলে গিয়েছিলেন তিনি। পায়ে বল পেলে কখনোই ভয় পান নি, মাথা ঠান্ডা রেখে বল বাড়ানো দেখে অনেকের ভ্রম হতে পারে যে সেদিন গোল পোস্ট এ মিডফিল্ডার টনি ক্রুস ছিলেন না তো!

এরপর সেই বছরেই বায়ার্ন এবং জার্মানির হাই লাইন ডিফেন্সে আমরা নয়্যারের কেরামতি দেখি। সাধারণ একজন গোল কিপারের মত গোল পোস্টের নিচে অবস্থান না নিয়ে হাফ লাইনের কাছে এসেও তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। প্রেস করতে ছুটে আসা বিপক্ষ অ্যাটাকারদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আক্রমণ সূচনা করায় তার দক্ষতা বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাবের একদম কাছে নিয়ে যায় তাকে। তাঁর দক্ষ গ্লাভসজোড়ার ভরসাতেই বায়ার্ন ও জার্মান দল এখন হাই লাইন ডিফেন্স নিয়ে খেলে, কারণ কোচেরা জানেন, বল বিপদ সীমানায় চলে এলেও পিছনে ফিরতে থাকা ডিফেন্ডারদের ভয় নেই, কারন ম্যানুয়েল নয়্যার তা ক্লিয়ার করে দিবেন ছুটে এসে। তার দেখান পথ ধরেই জার্মানি থেকে আজ মার্ক আন্দ্রে টের স্টেগেন, বার্ন্ড লেনো’র মত বল প্লেয়িং গোল কীপাররা লাইম লাইটে উঠে এসেছেন, হাই লাইন ডিফেন্সের সাথে খেলার জন্য উঠে এসেছে গোলকিপিং এর একটি নতুন রোল – ” সুইপার গোলকিপার”।

আর এই পজিশন বা ভূমিকার প্রথম সার্থক রূপদানকারী ম্যানুয়েল নয়্যারকে আজ আমরা জানাচ্ছি জন্মদিনের শুভেচ্ছা। তার আগে অনেক গোলকিপার এসেছেন, যারা দলকে এনে দিয়েছেন সাফল্য। নয়্যারের সবচেয়ে বড় লিগ্যাসি এখানেই, তিনি দলকে সাফল্য এনে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, ফুটবলে এনেছেন বিপ্লব, আক্রমণের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন গোলকিপারদের ভূমিকাও।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × two =