সুপার পিপ্পোর কথা

আমার পছন্দের সেরা পাঁচ জন স্ট্রাইকারের নামের লিস্ট যদি কেউ করতে বলেন, আমি অবশ্যই অবশ্যই এই ভদ্রলোকের নাম রাখবো।
যদি জিজ্ঞাসা করেন কেন?
তাহলে আমি বলবো, তার মতো গোলক্ষুধা আমি খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখেছি। যদিও আমার জ্ঞানটা খুবই সীমিত! কিন্তু তবুও আমি হলফ করে বলতে পারি, আমার মতের বিরোধিতা করার মানুষ কমই থাকবেন।

একদম তরুণ বয়সে যখন স্ট্রাইকার হিসেবে ইতালিয়ান নিম্ন বিভাগে ক্যারিয়ার শুরু করলেন, তখন থেকেই তাকে নিয়ে কানাকানি শুরু হয়ে গেলো। সেই বয়সেই তার গোলস্কোরিং এবিলিটি দেখে অনেকে মন্তব্যও করে ফেললেন, এই ছেলে আগামী দিনের গ্রেট হতে এসেছে।
তাকে নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করা মানুষদের তিনি ভুল প্রমাণ করেন নি। ঠিকই গ্রেট হয়েছেন!
আজ ক্যারিয়ার শেষে তার অর্জনগুলোর দিকে তাকালেই সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়।

বিশ্বকাপ,
দুটো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ,
ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ,
লিগ শিরোপা,
আরো কতো ট্রফির সম্মান তার ঝুলিতে। আর নিজেই বা কম ছিলেন কীসে? ৭০ গোল করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অনার্স বোর্ডে সর্বকালের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া যেনতেন ব্যাপার নয়। মানতেই হবে।

পারমার হয়ে ১৯৯৫ সালে সিরি আ তে অভিষেক। প্রথম সিজনে মনে রাখার মতো তেমন কিছুই ছিলো না। কিন্তু পরের সিজনেই আটলান্টায় যেয়ে হলেন সিরি আর সর্বোচ্চ গোলদাতা। ১৯৯৭-৯৮ সালে জুভেন্টাসে পাড়ি জমালেন। সেখানে যেয়েও সাফল্যের গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখীই থাকলো। আর ধীরে ধীরে হতে লাগলেন প্রতিপক্ষের ত্রাস!
জুভে থাকা অবস্থাতেই তার উপর নজর দিলো এসি মিলান।
আর তার নিজেরও ইচ্ছা ছিলো ইউরোপের অন্যতম সফল কোন ক্লাবে খেলা। এমন ত্রাসসঞ্চারী স্ট্রাইকারকে কে না নিজের দলে নিতে চায়?
ব্যাস!
দুইয়ে দুইয়ে চার মিলতে সময় লাগলো না। ২০০১-০২ মৌসুমেই ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে সান সিরোতে আসলেন তিনি। তার অন্যতম আইডল মার্ক ফন বাস্তেনের প্রিয় ক্লাবে। রোজোনেরীদের লাল-কালো জার্সিতে প্রতিনিয়তই নিজেকে ছাড়াতে লাগলেন। যার সুবাদে জিতে নিলেন ২০০২ আর ২০০৭ এর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ০৭ এরটা আবার তার কাছে বেশী স্পেশাল। হবার কথাও তাই। ফাইনালে জোড়া গোল করে দলকে জেতাতে পারে কয়জন? সেই ছোট্ট লিস্টে ঢুকে পড়ার ম্যাচটা প্রিয় হবারই কথা।

স্ট্রাইকারের কোন গুণ ছিলো না তার ভিতরে?
দারুণ পজিশনিং সেন্স,
চোখ ধাধানো ড্রিবলিং ক্ষমতা,
চমৎকার হেড করার দক্ষতা,
দুর্দান্ত শুটিং এবিলিটি,
নিখুঁত ফিনিশিং,
অবিশ্বাস্য বল কন্ট্রোলিংয়ের যোগ্যতা,
আর তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ততা দিয়ে তার সময়ের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারের তকমা যোগ্যতার সাথেই নিজের করে নিয়েছেন। আর হয়েছেন কোচের অন্যতম ভরসার পাত্র।
মিলানে আসার পর শেভচেঙ্কোর সাথে তার গড়া অসাধারণ জুটিটা মিলানের ইতিহাসে অন্যতম সেরা স্ট্রাইকিং জুটি। আর ০৩ থেকে ০৭ পর্যন্ত মিলানের যে ড্রিমটিম বিবেচনা করা হয়, সেখানেও তার অপরিহার্যতা বর্ণনাতীত।

বলে হয়ে থাকে, ফুটবলে তার জায়গা ছিল অফসাইড পজিশন। ফারগুসন তো একবার মন্তব্যই করেছেন, “অফসাইড বোধহয় তার বসবাসের জায়গা!”
কথাটা মিথ্যে না। সেই সময়ে তার থেকে বেশী অফসাইড পজিশিনে আর কেউ থাকতো না। কিন্তু এটা দিয়ে তাকে যাচাই করা ভুল হবে। ডিবক্সের ভিতর তার মতো ডেডলি ফিনিশার খুব কমই দেখা গেছে। ডিবক্সের ভিতর তার কাছে বল মানেই গোল, ব্যাপারটা এরকমই হয়ে গেছিলো।

মিলানের জার্সিতে ৩০০ ম্যাচে ১২৬ গোল লিজেন্ডের কাতারেই ফেলেছে তাকে।
কিন্তু সেটা শুধু মাত্রই খেলোয়াড় হিসেবে।
২০১৩ তে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা এই লিজেন্ড অবশ্য এখনো অতোটা সফল হতে পারেন নি। প্রথম মৌসুমে এসি মিলানের হয়ে ৩৯ ম্যাচে ডাগআউটে দাড়িয়েছেন, কিন্তু জয়ের হাসি মুখে নিয়ে ফিরেছেন মাত্র ১৪ ম্যাচে। মাত্র ৩৫.৯০ শতাংশ ম্যাচ জয়ের হার তাই মেনে নিতে পারেনি বোর্ড এবং সমর্থকরা। যে কারণে সিজন শেষেই মিলান বসের পদ ছাড়তে হয়েছে তাকে।

এরজন্যে তার প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা কমেনি ভক্তদের। লম্বাচুলের এই সুদর্শন ব্যক্তিটি এখনো সেই দুর্দান্ত ফিনিশার হিসেবেই মানুষের স্মৃতিতে আছে। থাকবেও তাই…।

অনেক ধৈর্য নিয়ে পোস্ট পড়ার পর মানুষটার নাম জানার অধিকার অবশ্যই আছে। যদিও ছবি দেখে সবারই চিনে ফেলার কথা। তবুও বলি, আমার এই পোস্টের উল্লেখকৃত ব্যক্তিটি ফিলিপ্পো ইনজাগি। যাকে আদর করে ভক্তরা ডাকে “সুপার পিপ্পো” নামে।
এবার আমার এতো বড় পোস্ট লেখার কারণটা বলা যাক! এটাও অনেক ফুটবলপ্রেমীর জানার কথা।
জন্মদিন।
আজ পিপ্পোর ৪৬ তম জন্মদিন।
সুদর্শন এই মানুষটা তার খেলোয়াড়ি জীবনের মতো কোচিং ক্যারিয়ারেও সফল হোক, তার জন্মদিনে এটাই আমার চাওয়া।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twelve − 1 =