বাংলার ক্রিকেটের সুপারম্যান-১

মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে,
লাল সবুজের জয়গান গাই, ব্যাট-বলের সুরে সুরে
তিনি বিশ্বে বাংলার ক্রিকেট কে এনে দিয়েছেন সব থেকে বেশি পরিচিতি। বাংলার ক্রিকেটের বিশ্বদূত বলা যায় তাকে। তার প্রভাব বোঝা যায় দেশের বাইরে গেলে। আল্লাহর রহমতে সে সৌভাগ্য আমার হয়েছে বলেই বলতে পারি, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনুসের থেকে তার জনপ্রিয়তা কোন অংশে কম নয়, বরং অনেক জায়গাতেই- বাংলাদেশ মানেই যেন সাকিব আল হাসান!

এই যা, নামটা বলেই ফেললাম! ইচ্ছা ছিল আরও কিছু লেখার পর তার নাম বলি। কিন্তু নাম বলি আর না বলি, প্রথম ছড়াটা পড়ার পরই পাঠক বুঝে যাবেন মানুষটি কে। আগামীকাল শ্রীলঙ্কার সাথে এক দিনের ম্যাচের সিরিজ শুরু। আজ সাকিবকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটু টাইম ট্র্যাভেল করাতে চাই আপনাদের।

সাল ২০০৮, স্থান- মিরপুর শের ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। উপলক্ষ- ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ওঠা। যে পথ ছিল মসৃণ, সেটাকেই পাহাড়ি পথের মতো বন্ধুর করেছে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ের কাছে হেরে। শ্রীলঙ্কার সাথে জিততে হবে, তাও আবার বোনাস পয়েন্ট নিয়ে! প্রথমে বল করে অভিষিক্ত রুবেলের আগুন ঝরানো বোলিঙে লঙ্কান দের ১৪৭ রানে আটকে দেওয়া গেলেও জিততে হবে ২৪.৫ ওভারের মধ্যে, তবেই পাওয়া যাবে ফাইনালের টিকিট! সে ম্যাচে পরিমিত ঝুঁকি আর অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে তরুণ সাকিব ৬১ বলে ৯২ রান করে ২৩.৫ ওভারেই দলকে পৌঁছে দিলেন জয়ের বন্দরে। অনেকের মতে ঐ ইনিংসটিই সাকিবের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেদিন তার কভার ড্রাইভ, স্কয়ার কাট, আপার কাট- সবই ছিল মুগ্ধকর, তবে সব থেকে বেশি চোখে লাগছিলো ফুটে বের হওয়া আত্মবিশ্বাস, আর সুপার স্কুপ। মনে রাখবেন, সালটা ২০০৮। তখন একজন বাঙালি ক্রিকেটার এমন আত্মবিশ্বাস দেখাবেন- এটা ছিল অনেকটাই সিনেমার চিত্রনাট্য। ওপার বাংলার সৌরভ গাঙ্গুলি দেখিয়েছেন বটে, কিন্তু এপারে সাকিব বাংলার ক্রিকেটের যুগ-বদলের প্রতীক।
সাকিব দেখিয়ে দিলেন- আমরাও পারি!!
আমাদের ছোট বেলায় ইন্টারনেট ছিল না, ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময় প্রাণ জুস কিনলে স্তিকার দিত। সবই ছিল বিদেশি ক্রিকেটার দের। আমি ভাবতাম, কবে আমাদের দেশে এমন একজন তারকা আসবে, যাকে নিয়ে স্তিকার হবে, সিনেমা হবে, বই লেখা হবে! সাকিব আল হাসান প্রথম সেই আশা পূর্ণ করেছেন। আমাদের সময়ের কাউকে প্রিয় ক্রিকেটারের নাম বলতে বললে স্তিভ ওয়াহ, তেন্দুলকার, সৌরভ, ওয়াসিম আকরাম, এমনকি মোটকু ইঞ্জামামের নাম বলতো। এখনকার একটা স্কুল গামী ছেলেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, কার মতো ক্রিকেটার হতে চাও? বেশিরভাগ ছেলের কাছে উত্তর পাবেন,
সাকিব আল হাসান
আমি মনে করি সাকিবের সব থেকে বড় অর্জন এটাই। বাংলাদেশের একটা ছেলে যে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার হতে পারে, সেটা তিনি দেখিয়েছেন। অনেকে বলতে পারেন আশরাফুলের কথা। আমি আশরাফুলের সব অর্জন মেনে নিলাম, কিন্তু তাকে বিদেশি ভাষ্যকাররা যে ঠাট্টা করে বলতো, Consistently Inconsistent- সেটা মনে আছে? সাকিবের সার্থকতা তার ধারাবাহিকতায়। ব্যাট হাতে ৩০-৪০ করবেন, বল হাতে ২-৩ টি উইকেট নেবেন, আহামরি কিছু না এক ম্যাচে করলে। এই কাজটিই যখন ম্যাচের পর ম্যাচ একটা মানুষ করে যান, তখন তাকে সুপারম্যান বলাটাই মানায় সবথেকে বেশি! তার মানসিক শক্তির কথাটা উল্লেখ করতেই হয়। সাকিব ঘাবড়ে গেছেন এমন কোন পরিস্থিতির কথা মনে করতে পারেন? পারবেন না। কারণ তার আত্মবিশ্বাস আর মনের জোর অন্য পর্যায়ের।
ভালো মন্দ যাই আসুক, সাকিব সহজে মেনে নিতে পারেন।

বিশ্ববাসী তাকে দুবার মাত্র ক্রিকেট মাঠে চোখের পানি ফেলতে দেখেছে। ২০১১ বিশ্বকাপে ইংলিশদের বিপক্ষে মাস্টার দা সূর্যসেনের শহরে রিয়াদ সফিউলের বীরত্বে ম্যাচ জেতার পর আনন্দে কেঁদেছিলেন, আর ২০১২ এশিয়া কাপে সেই দুই রানের দুঃখে কাদেনি এমন কেউ ছিলোনা।

তার অনেক সাফল্যের কথা বলা যায়। ক্যারিবিয়ানে টেস্ট সিরিজ জয়, সেই অপরাজিত ৯৬! ২০১০ এ প্রায় এক হাতেই কিউই দের ওয়ানডে সিরিজে হারিয়ে দেওয়া, প্রথম কোন বড় দল কে বাংলা ধোলাই! শততম টেস্টে সেঞ্চুরি, কিউইদের বিপক্ষে তাদের দুর্গে গিয়ে দ্বি-শতক হাঁকানো। এসব তো বহু বার মানুষ শুনেছে।

তবে আমার আক্ষেপ অন্য জায়গায়- অধিনায়ক সাকিব কে আমার মনে হত আদর্শ অন-ফিল্ড ক্যাপ্টেন। অফ দ্য ফিল্ড সে অনেক অন্তর্মুখী হতে পারে। তার অধিনায়কত্ব মিস করি টেস্টে। আমার প্রিয় অধিনায়ক স্তিভ ওয়াহ, ভারতের মহেন্দ্র সিং- এদের মতো সাকিবেরও আছে উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস, নতুন কিছু করে চমকে দেবার সাহস, প্রথা ভেঙ্গে কাজ করার সাহস। ওয়ানডেতে ম্যাশ আছেন, তিনিই বস! তার পর কে?- আমার উত্তর- সাকিব! আর টেস্টে এখনই সাকিবকে দায়িত্ব দেওয়া যায়। আক্রমণাত্মক অধিনায়ক পেলে আমাদের দল আরও ভালো করবে সাদা পোশাকে- তার জন্য সাকিব আদর্শ।

এত কীর্তির পরও তাকে সবথেকে কমন কথা যেটা শুনতে হয়, “বেয়াদব”। আমি বলবো এই লোকটা মোটেই বেয়াদব না, তার একটা ব্যক্তিত্ব আছে। তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে মনের সুখ করেন অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ! গালি না দিয়ে তার মতো পরিশ্রম করে বিশ্বে নিজের ছাপ রেখে যাবার চেষ্টা করলে দেশের উন্নতির গতি আরও বাড়ত।

সুখী হন, সাকিব আল হাসান! ইংলিশদের দর্প চূর্ণ করার পথে বেন স্তোকস কে দেওয়া আপনার স্যালুটের মতো আপনাকেও স্যালুট জানাই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

19 − 10 =