স্পেনের বিপক্ষে কন্তের ফ্লেক্সিবল ডিফেন্সিভ টেকনিকঃ

তর্কযোগ্য ভাবে গতরাতে এই ইউরোর কোন দলের সেরা পারফর্মেন্স ছিল যেখানে আন্তনিও কন্তের ইতালি স্পেনকে অনেকটা একতরফা ভাবেই ২-০ গোলে হারিয়েছে। এই ইউরোতে ইতালির ডিফেন্সিভ টেকনিক এমনিতেই খুব ভালো ছিল। যার সেরা প্রতিফলন ছিল গতকালের ম্যাচ এ। দেখা যাক এ ম্যাচ এ স্পেনকে হারানর জন্য কন্তে ডিফেন্সিভ কৌশল গুলোর কোন দিক গুলো বেশি ব্যাবহার করেছেন।

ফ্লেক্সিবল উইং ব্যাকঃ
কান্দ্রেভার ইঞ্জুরির জন্য কন্তে দুই উইং এ দি সিলিও আর ফ্লরেনযি কে খেলান যারা পুরো ম্যাচ এই ডিফেন্সের দিক সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণে অপনেন্ট এর দুই উইং কে যথেষ্ট প্রেশারে রেখেছিলেন। আক্রমণ এবং রক্ষনের উপর ভিত্তি করে অবশ্য তাদের ডিউটি চেঞ্জ হত। যখন ইতালি বল হারাত তখন তারা ৪-৪-২ ফরমেশনে চলে যেত।
এক্ষেত্রে দি সিলিও লেফট ব্যাক হিসেবে নিচে নেমে আসতো আর বনুচ্চি এবং চিএল্লিনি সেন্টারে সরে যেত আর বারজাগ্লি রাইট ব্যাক এ চলে আসতো। অন্য দিকে ফ্লরেনযি ডানপাশে অনেকটা ওল্ড ফ্যাশনড ওয়াইড মিডফিল্ডারের রোলটা প্লে করত। ফলে ইতালিয়ান মিডফিল্ড অনেকটা আগের ঘরানার ৪ মিডফিল্ডারের একটি সরলরেখার মত হয়ে যেত।
এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ দি রসির ডিফেন্সিভ ওয়ার্ক আর গিয়াচ্চেরিনির অমানুষিক পরিশ্রম স্পেনের স্ট্রাইকারদের সেন্ট্রালি পজিশন নিতে দেয়নি। যেহেতু স্পেনের খেলা ছোট পাসে মাঝখান দিয়ে ডিফেন্স ভেঙ্গে ঢোকা তাই এই কৌশল স্পেনের এটাক ঠেকানোর জন্য খুবই কার্যকরী ছিল। আর উইং বেস না খেলার জন্যও ইতালিয়ান উইং ব্যাকদের খুব একটা সমস্যায় পরতে হয়নি। আরেকটা কথা এই দুই ইতালিয়ান উইং ব্যাকই প্রচণ্ড ভারসাটাইল যে কারনে পুরো ম্যাচ এ আক্রমণ আর রক্ষণে সমানতালে অবদান রাখতে পেরেছেন যেটা অধিকাংশ উইং ব্যাকদের মধ্যে অনুপস্থিত।

প্রেসিং আর ডিসপজেশনিংঃ
যখন আপনি মিডফিল্ড ডমিন্যান্ট করে খেলা টীম(যেমন স্পেন) এর বিপক্ষে খেলবেন তখন তাদের থামানোর জন্য আপনার দুটি উপায় থাকে। এক, একটু নিচে নেমে বক্সের একটু উপরে জটলা করে স্ট্রাইকার আর প্লেমেকার কে জায়গা না দেয়া আর দুই প্রেসিং করে অপনেনট এর ডিফেন্ডারদের পাস খেলতে না দেয়া এবং মিডফিল্ডারদের আউট অফ পজিশন করে ফেলা যেটা বিশ্বকাপে স্পেনের সাথে চিলি করে দেখিয়েছিল। কন্তে ঠিক এই উপায়টাই বেছে নিয়েছেন স্পেনকে আটকানোর জন্য। খেলায় এজন্য দেখা গিয়েছিলো যে যখন ইতালি আউট অফ পজেশন ছিল তখন জিয়াচ্চেরিনি পিকের উপর, পেল্লে বুস্কেতস আর এদের রামোসের উপর সারাক্ষণই প্রেসিং করে গেছে যেটা নিচ থেকে স্পেনের ট্র্যাডিশনাল প্লে-বিলডআপ বন্ধ করে রেখেছিলো যেটা স্পেনকে অনেক বেশি লং-পাস খেলতে বাধ্য করেছে যেটাতে তারা খুব অভ্যস্ত নয়। যদি প্রেসিং আনসাক্সেসফুল হত তখন দুই উইং ব্যাক নিচে নেমে একটা ৫ জনের ডিপ ব্যাক লাইন তৈরি করত আর তার উপর থাকতো দি রসি আর মার্কো পারোলর ডিফেন্সিভ স্ক্রিনিং। ফলে ফরমেশনটা হয়ে যেত ৫-২-১-২ অথবা ৫-২-১-১-১! পুরাই ট্যাঁকটিকেল প্রিপারেশন, মাস্টারক্লাস 😮 😮 ।
সেকেন্ড হাফটাতে ইতালি অনেকটা ডিফেন্সিভ হয়ে যায় আর তাদের ফরমেশনটা হয়ে যায় অনেকটা ৫-৪-১(আবার চেঞ্জ!!!! 😮 😮 )। এজন্য এদের কে স্ত্রাইকিং পজিশন থেকে সুইচ করে প্রেসিং করার জন্য মিডফিল্ডে নেমে আসতে হয়েছিলো বেশির ভাগ সময়। ফলে কি দাঁড়াল? ৪ জনের মিডফিল্ড!!! নো ওয়ে, স্পেনের মিডফিল্ডের আর কিছুই করার থাকল না।

থামাও বুস্কেটস, থামাও স্পেনঃ
জাভি আর আলন্সো চলে যাওয়ার পর স্পেন মিডফিল্ডের একটা বড় অংশ হল বুস্ককেটস। তার পজিশনিং, পাসিং, টেক-অন এর উপর ভিত্তি করেই স্পেন এর খেলা তৈরি হয় ডিফেন্স থেকে সামনে। মূলত তার মত মাস্টারক্লাস মিডফিল্ডারের জন্যই স্পেন ফ্লুয়িডলি ডিফেন্স থেকে স্বচ্ছন্দে সিল্ভা, ইনিএস্তাদের কাছে বল নিয়ে যায়। যেহেতু পুরো ৯০ মিনিট পেল্লে বুস্কেটস কে মার্ক করে রেখেছিলো তাই দুই সেন্টার ব্যাক থেকে ফ্রিকুয়েনটলি বুস্কেটস এর কাছে বল যেতে পারে নি। আর মারকিং থাকার কারনে বাড়বারই তাকে পজিশন চেঞ্জ করতে হয়েছে যেটা তাকে তার স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে দেয় নি। ফলে ইনিএস্তা, সিল্ভারাও খেলা তৈরি করার সুযোগ কম পেয়েছে। আর ক্রমাগত লং-পাস খেলার কারনে পজেশন ধরে রেখে অভ্যস্ত স্পেন দ্রুত পজেশন হারিয়েছে যেটা সহজেই ম্যাচ থেকে তাদের ছিটকে দেয়।

কন্তের হোমওয়ার্কঃ
কন্তের প্র্যাকটিসে যথেষ্ট পরিমাণে হোমওয়ার্ক করে নেয়াকেই মূলত আমি তার সফল ট্যাঁকটিকস ইমপ্লিমেন্টেশন করতে সাহায্য করেছে বলে আমি মনে করি। পুরো ম্যাচেই ইতালি ফরমেশনের দিক দিয়ে বারবার ৩-৫-২ আর ৪-৪-২ এ ইন্টারচেঞ্জ করেছে। দলতা পুরোপুরি প্রিপেয়ারড ছিল সবধরনের পসিবল অ্যাটাক করা আর সামলানর জন্য যেটা কন্তে প্র্যাকটিসের মাধ্যমে দলের খেলায় আনতে পেরেছেন। এবং সৌভাগ্যক্রমে তিনি যা চেয়েছেন তাই হয়েছে মাঠে।

পরিশেষে আমি বলব কন্তের মাস্টারপ্ল্যানিং এর সফল প্রয়োগই স্পেন কে খেলা শুরু থেকেই ছিটকে দেয়। তাদের ফরমেশন শিফটিং এর মূল দুই কি-প্লেয়ার সিলিও আর ফ্লরেনযি অসাধারন ভারসাটালিটি আর অমানুষিক পরিশ্রম, অন্য প্লেয়ারদের হাই ওয়ার্ক-রেট আর কন্তের ম্যাচ এর জন্য কমপ্লিট প্রিপারেশন ইতালির এই ম্যাচ জেতার কি-ফ্যাক্টর বলে আমি মনে করি। এটা অনেক সময়ই বলা হয় যে একটা টীম তার কোঁচের চিন্তার প্রতিফলন। আর কন্তের ইতালি যেন এই কথারই বাস্তব উদাহরণ। এখন দেখার বিষয় কিভাবে কন্তে পাওয়ার হাউজ জার্মানিকে থামানোর জন্য নতুন কি প্লান তৈরি করেন। আর যদি সেই ম্যাচ ও স্পেন ম্যাচ এর মতই কোন কার্বন কপি হয় তাহলে ইউরোর আগে ফেভারিট এর তালিকায় না থাকা ইটালিকে থামানোর মত কোন দল যে আর নেই তা অনেকটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।

কষ্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ায় খেলা নিয়ে আর কিছু করতে ইচ্ছা হচ্ছিলনা। তা না হলে আরও আগেই দেয়ার ইচ্ছা ছিল। পড়ে ভাবলাম এটা করলে মনটা হয়ত ওইদিক থেকে একটু হলেও সরে যাবে। 🙂

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

12 + fifteen =