সমস্যাটা হচ্ছে কোথায় আর্জেন্টিনার?

মেসি, মারিয়া, মাশচেরানো, ইকার্দি, আগুয়েরো, ডিবালা, ওটামেন্দি- ইউরোপিয়ান লীগ কাঁপানো একেকজন বড় তারকার নাম। সবাই যদি এক টিমে খেলে প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরে যাওয়ার কথা, সেটা যে দলই হোক না কেন।
অথচ বারবার হোঁচট খাচ্ছে আর্জেন্টিনা। এদেরকে নিয়েও! কেন?
সেটাই একটু বিশ্লেষণ করবার চেষ্টায় যাচ্ছি।

প্রথমেই বলে নিই, আমি সেলেকাও সাপোর্টার। আর্জেন্টিনার এই দুরবস্থা দেখে আমার খুশিই হওয়া উচিত। কিন্তু সবার ঊর্ধ্বে আমি একজন ফুটবল ফ্যান। তাই সুন্দর ফুটবলের পূজারি দেশ কিংবা ক্লাবের এমন বেহাল অবস্থা দেখলে আমার বরং খারাপ লাগে, সে যতই রাইভাল হোক না কেন!

আলোচনায় ফিরি।
ফুটবলে আমার আগ্রহের একটা বড় বিষয় হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট। এটা গত ৫-৬ বছর ধরেই, যখন ফুটবলটা খুব গভীরভাবে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই। যেই আগ্রহ থেকে মোবাইল থেকে কম্পিউটারে মোটামুটি নাম জানা অনলাইন-অফলাইনে ফুটবল ম্যানেজার রিলেটেড সব গেমই খেলা হয়ে গেছে। সবথেকে বেশী ভালো শিখেছি যে গেইম থেকে সেটার নাম ফুটবল ম্যানেজার।

আর্জেন্টিনার গত কয়েক ম্যাচের ট্যাকটিক্স নিয়ে বসেছিলাম। সাম্পাওলি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকের ম্যাচগুলো নিয়ে দেখছিলাম। ট্যাকটিকালি সাম্পাওলি দারুণ অভিজ্ঞ একজন কোচ। আর্জেন্টিনার খারাপ সময়ে সাম্পাওলি এবং সিমিওনে ছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার মত আর কেউ ছিলো না। আর্জেন্টাইন বোর্ড সাম্পাওলিকেই বেছে নিয়েছে। যে আবার চিলিকে আর্জেন্টিনার বিপক্ষেই কোপা আমেরিকা জিতিয়েছিলো।
বেশ ভালো! সাম্পাওলি এসে হিগুয়েনকে একটু ব্যাকফুটে ঠেলে দলে আনলেন ডিবালা আর ইকার্দিকে। আলবিসেলেস্তে সমর্থকরা বেশ হা-হুতাশই করছিলেন যে ক্লাবে এত দারুণ খেলবার পরেও কেন তরুণ এই দুই ফরোয়ার্ডকে ডাকা হচ্ছে না! তাদের মন রক্ষা হলো। কিন্তু সাম্পাওলি কোন ফল পেলেন না এদের দিয়ে।
অদ্ভুত অদ্ভুত সব মিস করে গোলশুন্যই থাকলেন দুইজন আর আর্জেন্টিনাও বিশ্বকাপে যাওয়ার পুলসিরাতে নড়বড়ে অবস্থানে আছে।
পয়েন্ট আউট করা যাক এর কারণগুলো-

টিম কেমিস্ট্রি-
এটার বাংলা হচ্ছে- বোঝাপড়া। সব টিম মেম্বারদের মধ্যে একটা টেলিপ্যাথি কানেকশন থাকা। যেটা এই আর্জেন্টিনায় নেই বললেই চলে। দলের বেশীর ভাগ খেলোয়াড়ই ভিন্ন ভিন্ন ক্লাবে খেলে। এবং অনেকে আবার রাইভালও বলা যায়। যেমন ইকার্দি ইন্টারের, ডিবালা জুভেন্তাসের। এই ব্যাপারগুলো হওয়াতে এরা যখন মাত্র কয়েকদিনের জন্যে একসাথে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে আসে এদের মধ্যের কেমিস্ট্রিতে ঘাটতি থেকে যায়। আপনি বলতে পারেন, অন্যদলগুলোতেও এমনভাবে বিভিন্ন ক্লাবে খেলা প্লেয়াররা থাকে তাদের কেন সমস্যা হয় না? এর উত্তরটা হচ্ছে, অন্য সব দলে এতগুলো স্টার প্লেয়াররা বিভিন্ন ক্লাব থেকে আসে না। তাছাড়া যেহেতু সবাই নিজ নিজ ক্লাবে স্টারের মর্যাদা পায়, জাতীয় দলে এসেও নিজেদের ওপর ফোকাস নেওয়ার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাদের থাকতে পারে। যেকারণে টিম কেমিস্ট্রিটা ঠিক জমছে না।

সেলফিশনেস-
স্বার্থপরতা। এই ব্যাপারটাকে টিম কেমিস্ট্রির মধ্যেই রাখতে পারতাম। কিন্তু আর্জেন্টিনা দলে এটা আমি এতোটাই প্রকট দেখলাম, যে আলাদা ভাবে পয়েন্ট আউট না করে পারলাম না। যেখানে ফাঁকায় দাঁড়ানো একটা প্লেয়ারকে থ্রু-পাস দেওয়া যায়, সেখানে নিজে নিজে শট নেয় মিডফিল্ডাররা। উইং থেকে ক্রস না করে গোলে শট নেওয়ার মত ব্যাপারও দেখলাম হাইলাইটসয়ে। খুবই দৃষ্টিকটু ব্যাপার। কোন টিমপ্লে নেই। কোন টিমওয়ার্ক নেই। সবাই যেন নিজের ওপরে লাইমলাইট আনতে চায়, এমন একটা টেন্ডেন্সি।
যেমন ভেনিজুয়েলা ম্যাচের শুরুর দিকে ডি মারিয়া লেফট উইংয়ে একা একা ড্রিবলিং করে কাট ইন করার ট্রাই করতেছে। তার আশেপাশে কোন সাপোর্টিভ প্লেয়ার নেই, যার কাছে একটা পাস দিয়ে সামনে থাকা প্লেয়ার দুইটাকে একটু ছিটকে ফেলতে পারে। কেউই ছিলো না। মারিয়া তার স্কিলের জন্যে ওই যাত্রায় কাট ইন করে ঢুকতে পারলো। ফুটবলের মত একটা টিম গেইমের জন্যে খুবই বেমানান।

মিডফিল্ড-
এতক্ষণ মানসিক ব্যাপার নিয়ে ছিলাম, এবার একটু মাঠের ব্যাপারে খেয়াল করা যাক। আর্জেন্টিনার একটা জাতীয় সমস্যা এটা। যেকোন দলেই অন্তত একটা মিডফিল্ড এঞ্জিন দরকার। যে কি না মাকড়সার মত তার পাসের জাল বুনবে মাঠজুড়ে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মেসিকে নেমে আসতে হয় নীচে। বল বানিয়ে উপরে উঠতে হয়। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে- মেসি স্বভাবজাত মিডফিল্ডার না। তাছাড়া মেসির চারদিকে যে পরিমাণ মার্কিং থাকে, তাতে ওর পক্ষে মিডফিল্ডের এই সুতো বোনার ব্যাপারটা সম্ভব না।
বানেগা কিংবা বিলিয়ার বয়স বেড়ে গেছে, তাছাড়া এরা দুইজন কোনভাবেই ইফেক্টিভ মিড না। সমস্ত দায়িত্বটা মেসিকে দিয়ে সামলানো সম্ভব না।

ডিফেন্স-
ওটামেন্দি, মাসচেরানো, ফ্যাজিও- লাস্ট ম্যাচে খেলেছে এই তিনজন। ফোকাস করা যাক এদের উপরে।
মাসচেরানোর সমস্যা হচ্ছে ওর এরিয়াল এবিলিটি কম। মানে হাইট কম হওয়াতে হেডিং কিংবা হাইটের বলগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ ওর থেকে এক্সট্রা এডভান্টেজ পায়। তাছাড়া বয়স হওয়াতে ক্ষীপ্রতা কমেছে ওর।
ফ্যাজিও হচ্ছে স্লো। স্পিড কম। কাউন্টারের এটাক সামলানো ওর জন্যে কঠিন হবার কথা।
ওটামেন্দিকে আমার কখনোই ডিফেন্সিভ লিডার মনে হয় না। সিটিতে ওটামেন্দির পারফরম্যান্স কিন্তু আহামরি কিছু না। গত সিজনে সিটি ক্লিনশিট রাখতেই পারে নি বলা চলে। সেই ডিফেন্সিভ লাইনের একজন ওটামেন্দিই।
মোদ্দা কথা, ডিফেন্স নিয়ে আর্জেন্টিনার কান্না বহুদিনেরই।

আপাতত এই কয়টাই আমার চোখে মেজর সমস্যা মনে হয়। তাদের খোদ ফেডারেশনের পক্ষ থেকেই এখন কোন উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে আমার মনে হয়। তাছাড়া আর্জেন্টাইন লীগে খেলা খেলোয়াড়দেরও একটু নার্সারিং করা উচিত। নইলে এই একটা প্রজন্ম পার হলে আর্জেন্টিনাকে খুব বড় একটা ঘাটতিতে পড়তে হবে।

আর আমার মতে টিম কেমিস্ট্রি আর টিম ওয়ার্ক যদি না জমে, এত স্টার প্লেয়ার নিয়েও আর্জেন্টিনাকে হয়তো বা বিশ্বকাপের বাইরে থাকতে হবে। যেটা আমাদের মত ফুটবল ভক্তদের জন্যে বেশীই মন খারাপের। আমি ব্রাজিল ফ্যান হবার পরেও যেটা প্রার্থনা করবো না কখনও।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

19 + 19 =