বিভিন্ন ক্লাবের সোশ্যাল মিডিয়াপ্রীতি, জার্সি ধরে ছবি তোলার দিন শেষ!

আদিকাল ধরে যারা ক্লাব ফুটবল অনুসরণ করে আসছি, তারা সবাই দেখছি, দলবদলের বাজারে কোন ক্লাবে একটা নতুন খেলোয়াড় আসলে ঐ নতুন ক্লাবের জার্সি হাতে ধরিয়ে দিয়ে, কাঁধে বা হাতে ঐ ক্লাবের স্কার্ফ ধরিয়ে দিয়ে সেই খেলোয়াড়ের ফটোসেশান করা হয়। নতুন নতুন তোলা সেইসব ছবি দেখে ফুটবল ভক্তরা বোঝেন যে হ্যাঁ, এই নতুন ক্লাবে এই নতুন খেলোয়াড়কে আনা হল। ক্লাব তাঁর নিজেদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে খেলোয়াড়ের হাসিমাখা (আপনি যদি ইংলিশ উইঙ্গার অ্যারন লেনন না হয়ে থাকেন আরকি, ভদ্রলোক টটেনহ্যাম থেকে এভারটনে যোগ দেওয়ার সময় এমন মুখ করে রেখেছিলেন যেন ক্যামেরার পিছনে বিশাল বড় ডাস্টবিন আছে অথবা চ্যাপা শুটকি রান্না করা হচ্ছে, আর উনাকে ঐ অবস্থায় নতুন ক্লাবের জার্সি পরিয়ে ফটোসেশান করা হচ্ছে) ছবি পোস্ট করে বিশ্বব্যাপী সকল ফুটবলানুরাগীদের জানানো হয় যে হ্যাঁ, এই নতুন খেলোয়াড়কে আনা হয়েছে দলে। খেলোয়াড়ের সেই ফটোসেশানে কখনো কখনো যোগ দেন দলের কোচ, কিংবা দলের প্রেসিডেন্ট। হাত মিলিয়ে ক্যামেরার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ছবি তুলার প্রচলনটাও আছে।

কিন্তু এখন যুগ বদলেছে। ক্লাবের ওয়েবসাইটের সাথে সাথে এসে জুটেছে হাজারো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম – বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার – আরও কত কি! ক্লাবগুলোর সাথে সমর্থকদের যোগাযোগের সবচাইতে সহজতর ও কার্যকরী মাধ্যম এখন এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। ক্লাবের অফিসিয়াল পেইজ বা অ্যাকাউন্টের পোস্টগুলোর নিচে হাজারো কমেন্ট করে সমর্থকরা (কিংবা শত্রুরাও!) তাদের মতামত জানিয়ে দেন – খেলা কেমন হল, কাকে তারা দলে চান কাকে চান না, কে ভালো করছে কে নয় – ইত্যাদি ইত্যাদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সাহায্যে অতি সহজে এরকম সমর্থকদের সাথে যুক্ত থাকা যায় এ কথা জেনেই ক্লাবগুলো সেসব সমর্থকদের কথা মাথায় রেখে এখন তাদের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টের কার্যাবলীও গুরুত্বের সাথে সম্পাদন করছে। কি পোস্ট যাবে, কিভাবে পোস্ট যাবে, কোন ধরণের ক্রিয়েটিভের সাহায্যে পোস্ট টা যাবে। যে পোস্টটা যাবে সেটা সমর্থকদের মধ্যে সাড়া ফেলতে পারবে কি না – ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই সব চিন্তাভাবনার পরিক্রমাতেই এখন ক্লাবে নতুন কোন খেলোয়াড় আসলে সেই খেলোয়াড়কে অভিনব উপায়ে সমর্থকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। শুধু নতুন ক্লাবের জার্সি বা স্কার্ফ ধরে নতুন ক্লাবের জার্সি গায়ে দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে ক্যামেরার সামনে পোজ? সেই দিন শেষ জনাব! এই ট্রেন্ডটা শুরু হয়েছে গত কয়েক মৌসুম ধরে। তবে এবার যেন মোটামুটি সব ক্লাবই বিষয়টাকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে।

মিশরীয় উইঙ্গার মোহামেদ সালাহ এর কথাই ধরুন। ভদ্রলোক এই মৌসুমে ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমা থেকে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলে যোগ দিয়েছেন ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে। বহুদিন ধরেই লিভারপুলে আসব আসব করছিলেন সালাহ, অবশেষে মাস দুয়েকের জল্পনা-কল্পনা শেষে রোমা থেকে লিভারপুলে নাম লিখিয়েছেন তিনি। এবং নাম লেখানোর পরেই লিভারপুলের অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট এক অভিনব উপায়ে সালাহ এর আগমনী বার্তা প্রকাশ করে। একটা ছোট ভিডিও পোস্ট করে তারা, যেখানে দেখা যায় সালাহ নিজের স্মার্টফোনের সাহায্যে টুইটার ব্রাউজ করে #AnnounceSalah হ্যাশট্যাগে ক্লিক করে দেখে নিচ্ছেন বিশ্বব্যাপী সকল লিভারপুল সমর্থকেরা কিরকম উদগ্রীব তাকে দলে দেখার জন্য। হোমপেইজ কিছুক্ষণ স্ক্রল করার পর এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে লিভারপুলের জার্সি পরা সালাহ হাসিমুখে বলে ওঠেন, “Salah announced!” অর্থাৎ সালাহ এর আসার বিষয়টা ঘোষণা দেওয়া হয়ে গেছে! অদ্ভুত, তাই না? নিজেই দেখে নিন!

এরপর সালাহ যে ক্লাব থেকে লিভারপুলে যোগ দিয়েছেন, সেই এএস রোমাও কিন্তু এরকম অভিনব উপায়ে খেলোয়াড় আসার ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই মোটেও! কিছুদিন আগে আরেক ইতালিয়ান ক্লাব সাসসুয়োলো থেকে রোমাতে যোগ দিয়েছেন তরুণ উদীয়মান ইতালিয়ান মিডফিল্ডার লরেঞ্জো পেলেগ্রিনি। তিনি যে দলে এসেছেন, সেই ঘোষণা রোমা দিয়েছে একটা ছোট অডিও ভিজ্যুয়াল টুইটারে পোস্ট করে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একজন ফিফা ১৭ খেলছে – রোমার হয়ে রোমার বিপক্ষে। কিছুক্ষন পর দেখা গেল সেই খেলায় একজন গোল দিল, দেখা গেল গোলফাতার নাম লরেঞ্জো পেলেগ্রিনি, আর এতক্ষণ তাকে নিয়ে ফিফাও খেলছিলেন লরেঞ্জো পেলেগ্রিনি নিজেই! নিজেই দেখে নিন –

অভিনব কায়দায় খেলোয়াড় আগমনের ঘোষণা দিয়েছে ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব অ্যাস্টন ভিলাও। কিংবদন্তী চেলসি ডিফেন্ডার জন টেরি আজকে যোগ দিয়েছেন অ্যাস্টন ভিলায়, আর তাঁর আগমনের খবরটা অ্যাস্টন ভিলা ঘোষণা দিয়েছে এরকমই একটা ভিডিও বানিয়ে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটা হোয়াটসঅ্যাপ কনভার্সেশানে অ্যাস্টন ভিলার চেয়ারম্যান টনি জিয়া কোচ স্টিভ ব্রুসের সাথে কথা বলছেন যেখানে ব্রুস বারবার জানতে চাচ্ছেন জন টেরিকে কি দল নিয়ে এসেছে কি না। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল সেই হোয়াটসঅ্যাপ কনভার্সেশানে টনি জিয়া জন টেরিকে অ্যাড করে দিলেন!

গতবার যেমন, জুভেন্টাস থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফরাসী মিডফিল্ডার পল পগবা যোগ দেবেন দেখে টুইটারেই পগবার নিজস্ব একটা ইমোজি সৃষ্টি করা হয়ে গেল! এই ইমোজি সৃষ্টি করাটা যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা জুভেন্টাসের কারোর আইডিয়া না, তা-ই বা কে বলছে?

ক্লাবগুলোর এইসব অসাধারণ অভিনব আইডিয়াগুলো কিন্তু অবশ্যই ক্লাবের ভেতর থেকে আসেনা। প্রত্যেকটা ক্লাবের সোশ্যাল মিডিয়ার এসব অ্যাকাউন্টগুলোর দায়িত্বে থাকে বিভিন্ন মার্কেটিং অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি, মূলত তাদের কন্টেন্ট টিম এর মাথা থেকেই এসব অভিনব আইডিয়া বের হচ্ছে। ভেবে দেখুন, একেকটা এরকম অভিনব আইডিয়া বের করতে এসব এজেন্সিগুলোর কিরকম ব্রেইনস্টর্মিং করতে হচ্ছে, কিরকম চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে! আমার ত মনে হয় খেলোয়াড়রা যে এসব ক্লাবে আসবেন, সেটা বেশ আগেই দুই ক্লাব আর খেলোয়াড় নিজেদের মধ্যে নিশ্চিত করে ফেলছেন এইবার। কিন্তু ক্লাবগুলো অ্যানাউন্সমেন্ট করতে দেরি করছে, কেবলমাত্র এরকম অভিনব উপায়ে ঘোষণাটা করা হবে সে কথাটা চিন্তা করেই। কোনভাবে কিভাবে ঘোষণা করবে, কিভাবে ঘোষণা করলে অন্য ক্লাবের থেকে একটু আলাদা প্রমাণ করা যাবে নিজেদের, এ কথা ক্লাবগুলো কর্তৃক নিযুক্ত এজেন্সিগুলো চিন্তা করতে করতেই দেরি করে ফেলছে ঘোষণা করতে যে হ্যাঁ, ক্লাবে নতুন কেউ এসেছেন! নাহলে সালাহ এর লিভারপুলে আসতে এরকম দুই মাসেরও বেশী সময় লাগে?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five − 1 =