আমার দেখা শ্রেষ্ঠ এক যান্ত্রিক ফুটবলার

ফুটবলের সাথে আমার পরিচয় অনেক আগে থেকে হলেও, ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ আমার কাছে অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তার অন্যতম একটা কারণ, এর আগের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ঠিকভাবে বুঝেশুনে দেখার সুযোগ পেতাম না। বয়স কম থাকায় স্টার প্লেয়ারদের নাম আর কোন দল জিতলো, এসব ছাড়া খুব একটা বুঝতাম না বিশ্বকাপে। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকে বিভিন্ন পত্রিকাতে দলগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিতো, আমি মন দিয়ে পড়তাম। এক নিঃশ্বাসে শেষ করে উঠতাম। কোন দলের খেলার কৌশল কী, স্টার প্লেয়ার কে, কার সম্ভাবনা কতখানি- এসব পড়ে বিশ্বকাপের জন্য আগ্রহ অনেক বেড়ে গিয়েছিলো। জার্মানি নিয়ে যে আর্টিকেলটা পড়েছিলাম, তাতে বালাক, ক্লোসাদের নাম ছিলো স্টার প্লেয়ার হিসেবে। প্রথম ম্যাচটা যখন দেখতে বসলাম, স্বভাবতই নজর ছিলো ক্লোসা, বালাকের ওপর। আমি তখন নতুন ফুটবল দর্শক, সব খেলোয়ারের নামও জানি না। ম্যাচ শুরুর মাত্র ছয় মিনিটে যে ছোটখাটো গড়নের প্লেয়ারটি গোল দিয়েছিলো, তার নাম ঠিকভাবে বুঝতে আমার আরো দুই মিনিট লেগেছিলো। কমেন্টটর উত্তেজিত হয়ে কী নাম যে বলছিলো, মাথায় ঢুকতেছিলো না। লাম…লাম, বলে চিল্লাছিলো। আমি রাতের বেলা টিভির সামনে বসে মাথা চুলকাচ্ছি আর ভাবতেছি, একজন মানুষের নাম আরবি হরফের নামে কীভাবে হয়! রিপ্লে দেখানো শেষে যখন ইএসপিএনের স্ক্রিনে গোলস্কোরারের নাম দেখালো, নামটা তখন নিশ্চিত হলাম। ফিলিপ লাম! বিশ্বকাপের প্রথম গোল করা এই প্লেয়ারকে কীভাবে ভুলি আর। দিন যায়, আমার বয়স বাড়ে, সাথে সাথে বাড়ে জানার পরিধি। জানলাম, ফিলিপ লাম নামের খেলোয়াড়টি মূলত রাইট ব্যাক। জার্মান মেশিন ফুটবলের এক কার্যকরী খেলোয়াড়। এতোটাই কার্যকরী যে আমার মনে নেই, অবসর নেয়ার আগে লাম ছাড়া কবে দেখেছি জার্মানিকে খেলতে। জার্মানি, রাফ এন্ড টাফ ফুটবল খেলে যারা, ফুটবল যে শিল্প সেটাকে দূরে ঠেলে যান্ত্রিক ফুটবল খেলে যারা, ইমোশনের ধারে-কাছে যারা কম যায়, সেই জার্মানির হয়ে খেলতে নেমে একবারের জন্যেও লাল কার্ড খান নি। এই অবাক করা ব্যাপারটা যখন জানি, মুখ হা করে ছিলাম পাক্কা এক মিনিট। সেই সময় আরো বেড়েছিলো যখন জেনেছিলাম, রাইটব্যাক হবার পরেও তাঁর পুরো ক্যারিয়ারেই কোন লাল কার্ড নেই। সেদিন বিশ্বাস হয়েছিলো, ফিলিপ লাম জার্মানি নামক ফুটবল যন্ত্রের এক নিখুঁত কর্মদক্ষতার রাইট ইঞ্জিনের নাম। শুধু জার্মানি বলছি বারবার, বায়ার্নের নাম বলতে ভুলে যাচ্ছি এখানে। অন্য দেশের ক্ষেত্রে যেমন কয়েকটা ক্লাব প্রভাব ফেলে জাতীয় দলে, জার্মানির ক্ষেত্রে এমনটা না। জার্মানি যা, বায়ার্ন মিউনিখও তা- এমন কথাটা প্রবাদের মত চালানো যায়। জার্মানির প্লেইং স্টাইল থেকে মূল দলের খেলোয়াড় সবখানেই থাকে বায়ার্নের ছায়া। বায়ার্নেও এই খেলোয়াড় ছিলেন জাতীয় দলের মত সমানভাবে সফল। লিগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা সবকিছুর মেডেলই আছে তাঁর। আছে খেলোয়াড়ি জীবনের স্বপ্ন- বিশ্বকাপ ছোঁয়ার মুহূর্ত। তাও আবার কাপ্তান হিসেবে। বিশ্বকাপ নিয়ে দেশে ফেরবার পর যখন জানলাম, আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ছেন, রাগ হয়েছিলো খুব। কী এমন বয়স! যে এখনি ন্যাশনাল টিম ছাড়তে হবে! তাও সান্ত্বনা দিতাম, এখনও ক্লাবে তো খেলতেছে। সমস্যা নেই। আজকের পর থেকে এই ভাবনাটাও অতীত। জার্মান বা বায়ার্ন ফুটবল টিমের তেমন সাপোর্টার নই আমি, একজন ফুটবল ফ্যান হিসেবেই মিস করবো তাঁকে। দারুণ মার্কিংয়ে পারদর্শী, ধীরে ধীরে উপরে উঠে এটাক করা, স্ট্যান্ড ট্যাকলিংয়ে অন্যতম সেরা, ফুটবল বিশ্বের একজন আনসাং হিরো ছোটখাটো গড়নের ফিলিপ লাম, যাকে মনে রাখবো আমার দেখা একজন শ্রেষ্ঠ যান্ত্রিক ফুটবলার হিসেবে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × 2 =