সঠিক সময়টা জানা সবচেয়ে দরকারি

খেলার বাইরের একটা ছোট্ট ফ্যাক্টস দিয়ে লেখা শুরু করি । বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী চিত্রনায়িকা সুচিত্রা সেন নাকি কোন এওয়ার্ড বা ফাংশনে কখনো যেতেন না তার ক্যারিয়ার শেষ করার পরে । এমনকি পেপারে নাকি তার ছবিও আসুক এটাও তিনি চাইতেন না । কারণ একটাই , তিনি চাইতেন না যে তার যে ভক্তসমাজ তার কুঁচকানো চামড়া আর বার্ধক্যে ভরা রূপটা দেখুক । না বলেকয়ে হঠাৎ নায়িকা নায়কের গপ্পো কেন ??
বলছি । খুলে বলছি ।
একদম আমাদের হাতের সামনে দুটো উদাহরণ । দুই খেলার দুই জগতের । একজন হলেন ক্রিকেটার কুমার সাঙ্গাকারা আর আরেকজন হলেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াস । সাঙ্গাকারা আর ক্যাসিয়াস দুইজনই যার যার খেলাতে লিজেন্ড । ইকার ক্যাসিয়াস তার ক্যারিয়ারে কি জেতেন নি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ? মুকুটকে সমৃদ্ধ করেছে স্পেইনের হয়ে অধিনায়ক হিসেবে জেতা মহা আরাধ্য বিশ্বকাপটি । আর অন্যদিকে কুমার সাঙ্গাকারা খেলাটার সবচাইতে ধ্রুপদী শিল্পী আর মনোযোগী ছাত্রদের মধ্যে একজন । তবে একটা জায়গায় দুজনের মধ্যে ফাড়াকটা আকাশ পাতাল । সাঙ্গাকারা যখন বিদায় নিলেন, তখন কোন কানাঘুষা নেই । ৩৭ বছর বয়সে খেলা ছাড়ার পরেও মানুষ বলছে, “আরো কিছুদিন খেলে যেতে পারতেন…”
সাঙ্গা যাদের চোখে শান্তি দিতেন , তারা বলছেন , “ওমা ! শেষ ???”

২০১৫ বিশ্বকাপে সাঙ্গাকারার ইনিংসগুলো দেখার কিছুদিন পরেই তাকে অবসর নিতে দেখে ওর ক্যারিয়ারকে অনেক মজাদার চিপসের প্যাকেট মনে হতেই পারে । যেখানে প্যাকেটটা শেষ হয়ে গেলেও আপনি প্যাকেটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দেন ভিতরে আরো একটু আছে কিনা চেক করার জন্যে । একটা কথা আগেও বারবার বলেছি এই বয়সে সাঙ্গাকারার রিফ্লেক্সটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করে ছেড়েছে। শট ওর হাতে আগেও ছিলো । কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্যাটসম্যান হলে রিফ্লেক্সটাই কমতে শুরু করে সবার আগে । তবে এই যে আফসোস , এই আফসোসটা যেসব ক্রিকেটাররের বিদায়ের সময়ে থেকে যায় , তারাই আসলে প্রকৃত এলিট । এই আফসোসেরও আবার রকমফের আছে । আমি সাঙ্গাকারা কিংবা শচীনের ভক্ত , ও অবসর নিচ্ছে , ওর খেলা আর কখনো দেখতে পারবো না , ওকে আর মাঠে পাবো না এটা এক রকমের আফসোস । আবার আরেকরকমের আফসোস থেকে যায় এমন, “ওর জীবনের সেরাটা হয়তো আমরা দেখতে পারি নি । আরো কিছুদিন হতেই পারত …”

এবার আসি আরেকজনের কথায় । ইকার ক্যাসিয়াস । সাঙ্গাকারা যেখানে খেলেছেন , তার চাইতে অনেক বেশি প্রফেশনাল আর আরো খুলে বলতে গেলে অনেক বেশী প্রফেশনাল । ইকারকে মরিনিও যখন বেঞ্চ করে দেন , তখন ইকার অনেকের কাছ থেকে সমবেদনা পেয়েছেন । মরিনিওর মুন্ডুপাত করা লোকের সংখ্যাও কম ছিলো না । যাদের অধিকাংশই পাঁড় মাদ্রিদ সমর্থক । তারপর ক্যাসিয়াস চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন । রিয়াল মাদ্রিদ জিতেছে তাদের অনেক সাধনার লা ডেসিমা । কিন্তু ক্যাসিয়াসকে মুদ্রার আসল উল্টোপিঠটা দেখতে হয়েছে গেল সিজনে । মাদ্রিদের সমর্থকেরা ক্যাসিয়াসকে দুয়ো দিয়েছে । দর্শকদের দোষগুণ নিয়ে কথা বলা আমার সাধ্যের বাইরে । দুনিয়ায় কোটি মানুষ , কোটি রকমের ফুটবলের দর্শক । তবে ক্যাসিয়াসের দিক থেকে তার বিদায় বলার সময়টা তার বোঝা দরকার ছিলো আগেই । ক্যাসিয়াস মাদ্রিদ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন ভিনদেশে । মাদ্রিদকে যারা নিজেদের মধ্যে রাখেন , ক্যাসিয়াসকে ছাড়া রিয়ালের খেলা দেখতে তাদের কষ্ট হবে । তবে আমার দিকে থেকে আমি মাদ্রিদিস্তা না হয়েও আরামসে বলে দিতে পারি, ক্যাসিয়াসের সেরাটা দেখার জন্যে আফসোস ছিলো না কারোর মধ্যেই । আরো খুলে বলতে চাইলে বলা যেতে পারে , সবার মুখে এক রা , “ক্যাসিয়াস তো ওর সেরা সময়টা পার করে এসেছে …”

সেজন্যেই একটা কথা ৩০ পার হয়ে গেলে সব এথলেটেরই মাথায় রাখা দরকার । তার সিক্সথ সেন্স দিয়ে তার বোঝা উচিত , আমার সোনায় মোড়া ক্যারিয়ার ঢুকে পড়ছে ক্রান্তিকাল নামের এক লম্বা অধ্যায়ের দিকে । এই ওয়ার্নিং বেলটা পেয়ে যাবার পরেই আস্তে আস্তে গোঁটানোর দিকে মন দেওয়া দরকার । কারণ সময় বড় নিষ্ঠুর আর প্রফেশনালিজম বড্ড কঠিন জায়গা । যেখানে ক্লাবের হয়ে ২০ বছর খেলার ব্যাপারটা গৌণ । যেখানে “আপনি কি এই দলকে অন্যদের চাইতে ভালো রেজাল্ট এনে দেওয়ার জন্যে ফিট ???” – এই প্রশ্নের উত্তরটাই অনেক বড় হয়ে উঠে । আবার একটা সময় শরীর বা মন কোনটাই লড়াই করার জন্যে সায় দেয় না । সেই মরা ফেইজটাতে কোন লিজেন্ড না প্রবেশ করুক ।

ভক্তের মনে লিজেন্ড লিজেন্ড হয়ে থাকুক ।
সমর্থকের মনে বোঝা হয়ে উঠার খারাপ দিনটা না আসুক ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 + five =