ভালভার্দের ৪-৩-৩ : সেমেদোর ছোঁয়ায় রাকিটিচের ফেরা

গত দশকের প্রায় পুরোটা সময় ধরেই ৪-৩-৩ ফর্মেশানেই খেলছে বার্সেলোনা। ইয়োহান ক্রুইফের মতাদর্শে দীক্ষিত পেপ গার্দিওলা, টিটো ভিয়ানোভা ও সর্বশেষ লুইস এনরিকে এই ৪-৩-৩ ফর্মেশানেই বার্সেলোনাকে গত এক দশকে বানিয়ে তুলেছিলেন সর্বজয়ী এক ক্লাব হিসেবে। গত মৌসুম শেষে লুইস এনরিকের চলে যাওয়ার পর বার্সেলোনার ম্যানেজার হিসেবে আর্নেস্তো ভালভার্দে চলে আসার পর প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল নিজের ম্যানেজ করা অন্যান্য ক্লাবের মতই (অ্যাথলেটিক বিলবাও, ভ্যালেন্সিয়া, ভিয়ারিয়াল ইত্যাদি) বার্সেলোনাকেও খেলাবেন ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে। কিন্তু আস্তে আস্তে বোঝা যাচ্ছে ৪-২-৩-১ নয়, গার্দিওলা-এনরিকের মত ক্রুইফের আরেক শিষ্য ভালভার্দেও বার্সেলোনাকে সেই চিরাচরিত ৪-৩-৩ ফর্মেশানেই খেলাবেন, তবে সেটা গার্দিওলা বা ভিয়ানোভার ৪-৩-৩ নয়, এটা আর্নেস্তো ভালভার্দের নিজস্ব ৪-৩-৩।

কালকে শহর প্রতিদ্বন্দ্বী এসপ্যানিওলকে মেসির হ্যাটট্রিকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করার মাধ্যমে বার্সা সমর্থকদের মনে একটু হলেও আশার আলো জ্বলেছে। সেটা নিজের দলের খেলার স্টাইল দেখে, দলে নতুন আগত খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স দেখে। নেইমার চলে যাওয়ার পর ও দুর্নীতিগ্রস্থ বোর্ডের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে যে আশাটা একেবারেই নিভে গিয়েছিল প্রায়। নেইমার চলে গেছেন, সামনের জানুয়ারিতে ইনিয়েস্তাও চলে যাবেন, দলবদলের বাজারে অনেক জোর গুঞ্জন এখন এটা। আসলেই অনেক অনেক দিন পর যেন বার্সা ঠিক বার্সার মতই খেলল, আর সেটার জন্য নেইমারের প্রয়োজন হয়নি! এবং এটাই খুব সম্ভবত বার্সার জয়ের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।

ভালভার্দের ৪-৩-৩ ফর্মেশানে কালকে সামনে খেলেছেন যথারীতি মেসি আর সুয়ারেজ, আরেকজন ছিলেন জেরার্ড ডিলোফেউ। মেসি ছিলেন বাম উইংয়ে, ডানদিকে ডিলোফেউ, আর মাঝে খেলেছেন সুয়ারেজ। তবে ভালভার্দের এই ফর্মেশানের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল মেসি ও সুয়ারেজের মধ্যে ক্রমাগত পজিশন পরিবর্তন। প্রায়ই উইং ছেড়ে মাঝখানে চলে আসছিলেন মেসি, নেমে যাচ্ছিলেন মাঝমাঠেও, আর মেসির ফেলে আসা জায়গাটা কভার দেওয়ার জন্য বামে চলে আসতে হচ্ছিলো সুয়ারেজকে। তবে এই সিস্টেমে সবচেয়ে বেশী কালকে আলো ছড়িয়েছেন বার্সার নতুন পর্তুগিজ রাইটব্যাক নেলসন সেমেদো আর ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডার ইভান রাকিটিচ। একটা আদর্শ রাইটব্যাক – দানি আলভেসের ফর্ম পড়ার পর থেকে গত দুই বছর বার্সার স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল এই পজিশনটাতেই। গত দুই বছরের বিভিন্ন ম্যাচে অ্যালেক্স ভিদাল, ডগলাস, সার্জি রবার্তো – সবাইকেই এই পজিশানে খেলানো হলেও কেউই সেরকম কার্যকারিতা দেখাতে পারেননি। কিন্তু কালকে নেলসন সেমেদো যা খেললেন, এই ফর্ম যদি তিনি তাঁর বার্সা ক্যারিয়ারে বজায় রাখতে পারেন, তাহলে বলেই দেওয়া যায় দানি আলভেসের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গিয়েছে বার্সেলোনা। একটা আদর্শ রাইটব্যাক খেলার কারণে ৪-৩-৩ ফর্মেশানে বার্সার তিন মিডফিল্ডারের মধ্যে যে মিডফিল্ডার একটু ডানে খেলে (মূলত ইভান রাকিটিচ) তাঁকে আর পিছনে গিয়ে ডিফেন্সকে সহায়তা করার বা উপরে উঠে রাইট উইঙ্গারকে সহায়তা করা – এসব কাজগুলো করতে হয়নি। যে কাজটা ইভান রাকিটিচকে গত মৌসুমে প্রায়ই করতে হয়েছিল। সার্জি রবার্তো মূলত একজন মিডফিল্ডার হবার কারণে তিনি যখন রাইটব্যাকে খেলতেন তাঁকে রক্ষণের দিক দিয়ে সহায়তা করার জন্য মিডফিল্ডের একেবারে ডানদিকে সরে যেতে হত। আর লিওনেল মেসি গত মৌসুমে যখনই রাইট উইঙ্গার হিসেবে খেলতেন তাঁর মাঝে সেন্টার ফরোয়ার্ডের জায়গায় চলে যাওয়ার প্রবণতার কারণে তাকেও ঐ ডানদিক থেকেই ডিফেন্স থেকে আক্রমণের একটা সংযোগ ঘটাতে হত। কিন্তু আদতে ইভান রাকিটিচ একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, সেভিয়া বা শালকে ০৪ এর হয়ে খেলার সময় খেলতেন নাম্বার ১০ হিসেবে, একদম মাঝমাঠে বা স্ট্রাইকারের পেছনে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে। তাই তাঁকে যখন রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতে বলা হত তিনি সেভাবে ভালো খেলতে পারতেন না, তাই গত মৌসুমে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে তাঁকে সবাই ফ্লপই বলেছিলেন। কিন্তু একজন আদর্শ রাইটব্যাকের সাথে খেলতে গিয়েই কালকে দেখা গেল ইভান রাকিটিচের আসল রূপ। বহুদিন পর কালকে যেন জ্বলে উঠলেন তিনি। তাঁর উপরে কালকে রাইট উইঙ্গার হিসেবে খেলেছেন প্রথমে জেরার্ড ডিলোফেউ, শেষদিকে খেলেছেন নতুন খেলোয়াড় ওসমানে ডেম্বেলে। দুইজনই আদর্শ উইঙ্গার, আক্রমণভাগের একেবারে ডানদিকটা অনেক ভালোভাবে সামলাতে পারেন দুইজনই। ফলে উপরে ও নিচে দুই ক্ষেত্রেই ডানদিকটা সামাল দেওয়ার ব্যাপারে ইভান রাকিটিচকে চিন্তা করতে হয়নি মোটেও, সেমেদো আর ডেম্বেলে/ডিলোফেউ সে দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে নিয়ে নিয়েছিলেন, চিন্তাহীনভাবে রাকিটিচ খেলে গেছেন মাঝমাঠে, মেসি-সুয়ারেজের সাথে লিঙ্ক করতে পেরেছেন ভালোমত। এমনকি শেষদিকে এসে অনেকটা বুসকেটসের জায়গায় এসেও খেলতে পেরেছিলেন কিছুক্ষণ।

রাকিটিচ বহুদিন পর খেলেছেন স্বাধীনভাবে

তবে গত মৌসুমের রাকিটিচ-সমস্যায় এবার বেশ ভালোভাবে ভুগছেন বার্সার গত এক দশকের জাদুকর অ্যান্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ফর্ম তো পড়তির দিকে আছেই, সাথে বুসকেটস না থাকলে যেন আজকাল একেবারেই খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। প্রায়ই ভুল পাস দেন, লিঙ্ক আপ করতে পারেন না। উপরে সুয়ারেজ বামদিক থেকে প্রায়ই মাঝখানে চলে যাওয়ার কারণে বার্সার বামদিকের দায়িত্বটা ছিল পুরোপুরি লেফটব্যাক জর্ডি অ্যালবা আর ইনিয়েস্তার উপরে। আর ইনিয়েস্তা এই রোলে খেলতে গেলে প্রায়ই আজকাল সমস্যায় পড়ে যান, প্রতিপক্ষের চাপে ভেঙ্গে পড়ে ভুল পাস দেন। ভালভার্দের এই ফলস নাইন ৪-৩-৩ ফর্মেশানে ইনিয়েস্তার ভূমিকাটা ছিল মিডফিল্ডের তিনজনের মধ্যে বামদিকে খেলার, যে কিনা একজন ফলস উইঙ্গার হিসেবেও কাজ করবেন, সাথে মাঝমাঠ থেকে খেলা বানিয়েও দিতে পারবেন। কিন্তু পড়তি ফর্মের ইনিয়েস্তা ভালভার্দের এই প্ল্যানটা বাস্তবায়িত করতে পারছেন সামান্যই।

সবশেষে বলতে হয় ওসমানে ডেম্বেলের কথা। বার্সার এই নতুন উইঙ্গারের মধ্যে যে একজন বার্সা লিজেন্ড হবার সব গুণাবলি রয়েছে, সেটার ঝলক তিনি কালকে তাঁর অভিষেক ম্যাচেই দেখিয়ে দিয়েছেন। দুই পায়েই সমানভাবে ভালো খেলতে পারা এই উইঙ্গার যেমন বার্সার ডান উইঙ্গে একজন আদর্শ উইঙ্গারের মত আক্রমণভাগের একেবারে ডানদিকটা সামাল দিতে পারেন, প্রতিপক্ষের লেফটব্যাককে ব্যতিব্যস্ত রেখে মাঝে মেসি-সুয়ারেজদের জন্য জায়গা সৃষ্টি করতে পারেন, সাথে তিনি নিজেও মাঝখানে এসে খেলা বানিয়ে দিতে পারেন, যেটার নমুনা তিনি দেখিয়েছেন ম্যাচের শেষদিকে সুয়ারেজের গোলে সহায়তা করার মাধ্যমে।

ভালভার্দের এই সিস্টেম কদ্দুর কার্যকর হতে পারে, দেখার বিষয় এখন সেটাই।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × one =