দ্বিতীয় হয়েই দম ফুরালো – ১

 

দীর্ঘ পঁচিশ বছর, পঁচিশটা বছর লিগ শিরোপা না জিতে এখনো ইংল্যান্ডের ‘সেরা’ ক্লাবগুলোর কাতারে আছে লিভারপুল। এখন এই দাবিটাকে কেউ যদি বুলিসর্বস্ব বলে উড়িয়ে দেয়, কিছু বলার থাকবে না। কেন থাকবে? কোন তথাকথিত সেরা ক্লাব এতদিন লিগ শিরোপাশূণ্য থেকেছে? এককালের মাঝটেবিলের ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পরাশক্তি হয়ে লিভারপুলের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা এই সময়েই। এই সময়ের মধ্যেই নিজেদের পঞ্চাশ বছরের শিরোপাশূণ্যতা ঘুচিয়ে ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাবের তকমা গায়ে লাগিয়েছে চেলসি। আর্সেনাল হয়েছে ‘ইনভিন্সিবল’, তেলের টাকা গায়ে মেখে গর্ত থেকে মাথা তুলে উঠেছে ম্যানচেস্টার সিটির মত ক্লাবও। কিন্তু লিভারপুল? লিভারপুলই থেকে গেছে। অব্যবস্থাপনা, ট্রান্সফার মার্কেটে ক্রমাগত ব্যর্থতা, সিদ্ধান্তহীনতা, উচ্চাশার অভাব, সঠিক নেতার অভাব – সব মিলিয়ে লিভারপুল এখন এক নামসর্বস্ব দৈত্য। পঁচিশ বছর আগের গৌরব আর ২০০৫ চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের গৌরবই এখনো ম্যানেজমেন্টের কাছে যথেষ্ট মনে হয় ক্লাবের জন্য।

এই পঁচিশ বছরে লিভারপুল যে লিগ জয়ের কাছাকাছি যায়নি, সেটা বলা যায়না। আমি যতদিন থেকে ফুটবল দেখছি, ততটুকু সময়ের কথা হিসাব করলে এই সহস্রাব্দ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোটমাট তিনবার লিগে দ্বিতীয় হয়েছে তারা, মানে শিরোপা জয়ের কাছাকাছি গেছে। ২০০১-০২ মৌসুমে, ২০০৮-০৯ মৌসুমে, আর কিছুদিন আগে এই ২০১৩-১৪ মৌসুমে। অন্যান্য ক্লাবের জন্য মৌসুমে দ্বিতীয় হওয়া মানে পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হবার প্রথম সোপান। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, এই তিনবার নিজেদের দ্বিতীয় হওয়াটাকে কাজে লাগিয়ে লিভারপুল পরের মৌসুমে কিছুই করতে পারেনি। ২০০২-০৩ মৌসুমে হয়েছিল পঞ্চম, ২০০৯-১০ এ সপ্তম, আর এই মৌসুম এখনো শেষ না হলেও মেরেকেটে পঞ্চম হবার বেশী যেতে পারবে না তারা, একথা বলেই দেওয়া যায়।

মাত্র দুই পয়েন্টের জন্য গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি লিভারপুল
মাত্র দুই পয়েন্টের জন্য গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি লিভারপুল

প্রত্যেকবার ক্লাব একটা ভালো কিছুর পথে এগোয়, ট্রান্সফার কমিটির ব্যর্থতা, মালিকপক্ষ ও কোচের অদূরদর্শিতার জন্য ক্লাব পরের মৌসুমেই যেন পিছিয়ে যায় আরও দশ বছর। এই মৌসুমের কথাই চিন্তা করুন, লুইস সুয়ারেজ-ড্যানিয়েল স্টারিজ-রাহিম স্টার্লিং এর সাফল্যবিধৌত হয়ে গতবার দ্বিতীয় হয়ে শেষ করার পর এই মৌসুমে যথারীতি নিজেকে হারিয়ে খুঁজছে তারা। লুইস সুয়ারেজ নামক আইফোন বার্সেলোনার কাছে বেচে দিয়ে ”স্কোয়াড ডেপথ” বাড়ানোর নামে কিনেছে মারিও বালোতেলি, রিকি ল্যাম্বার্ট, লাজার মার্কোভিচ, অ্যাডাম লালানা, দেয়ান লভরেন নামের একগাদা নোকিয়া ১১০০ কে। গতমৌসুমে যে ভুলটা করেছিল টটেনহ্যাম, গ্যারেথ বেল কে বেচে দিয়ে একগাদা খেলোয়াড় কিনে এনে অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট করেছিল – একই কাজ করেছেন ব্রেন্ডান রজার্স ; শেখেননি টটেনহ্যামের ভুলগুলো থেকে।

অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট...
অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট…

দেখে নেওয়া যাক কোন তিন বার লিভারপুল এরকম দ্বিতীয় হবার পরের মৌসুমে আবারও হারিয়ে গেছে যথারীতি….

  •  ২০০২-০৩

আগের মৌসুমে দ্বিতীয় হয়েছিল লিভারপুল, প্রথম ছিল সেই বিখ্যাত ‘ইনভিন্সিবল’ আর্সেনাল। জিতেছিল ইউয়েফা সুপারকাপও। স্টিভেন জেরার্ড-মাইকেল ওয়েন-নিকোলাস আনেলকা-জন আর্ন রিসা’র মত একগাদা তরুণ সুপারস্টারদের ভেলায় চড়ে নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্নই দেখছিল লিভারপুল।

লিভারপুলে ধারে যোগদানকালে আনেলকা (ডানে), বাঁয়ে মিলান বারোস
লিভারপুলে ধারে যোগদানকালে আনেলকা (ডানে), বাঁয়ে মিলান বারোস

কিন্তু না, পরের মৌসুমে সেই যা কার তাই। কোচ জেরার্ড হুলিয়ারের হার্টের ব্যামো হল। সেই ব্যামোতেই কিনা তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে ক্লাব থেকে ছেড়ে দিলেন আগের মৌসুমের সুপারস্টার নিকলাস আনেলকাকে!

জেরার্ড হুলিয়ার
জেরার্ড হুলিয়ার

আগের মৌসুমে পিএসজি থেকে ধারে আসা যেই আনেলকা ২০০১-০২ মৌসুমের শেষ ১৫ ম্যাচে ১৩ জয় ও ১ ড্র অর্জন করাতে রেখেছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, করেছিলেন পাঁচ গোল। হুলিয়ার কি ভাবলেন কে জানে, আনেলকাকে পাকাপাকিভাবে অ্যানফিল্ডে আনলেন না তিনি, তিনি লিভারপুলের ভবিষ্যত দেখলেন ২০০২ বিশ্বকাপের সারপ্রাইজ প্যাকেজ সেনেগালের কান্ডারি এল হাজি দিউফের পায়ে।

লিগে দিউফের এরকম উচ্ছ্বাস লিভারপুল সমর্থকের দেখেছেন সাকল্যে তিনবার!
লিগে দিউফের এরকম উচ্ছ্বাস লিভারপুল সমর্থকের দেখেছেন সাকল্যে তিনবার!

পরে এই আনেলকা ম্যানচেস্টার সিটি, বোল্টন ওয়ান্ডারার্স, চেলসিতে গিয়ে নিজেকে প্রিমিয়ার লিগের লিজেন্ডের আসনে বসিয়েছেন। আর লিভারপুলের স্ট্রাইকার হয়ে ডিফেন্ডারদের থেকেও জঘন্য গোলস্কোরিং রেকর্ড নিয়ে ইতিহাসের পাতায় জ্বাজল্যমান রয়েছেন এল হাজি দিউফ (৫৫ ম্যাচে ৩ গোল)। লিভারপুল ইতিহাসের তিনিই বোধহয় একমাত্র স্ট্রাইকার যিনি কিনা পুরো একটা মৌসুম কোন গোল না করেই কাটিয়ে দিয়েছেন (২০০৩-০৪), ভাবা যায় তাঁর অসাধারণ এই কৃতিত্বের কথা?

... ওদিকে চেলসি-বোল্টনকে এরকম আনন্দে ভাসিয়েছেন আনেলকা নিয়মিতই!
… ওদিকে চেলসি-বোল্টনকে এরকম আনন্দে ভাসিয়েছেন আনেলকা নিয়মিতই!

এই মৌসুমে লিভারপুলের ট্রান্সফার ব্যর্থতা শুধুমাত্র দিউফেই সীমাবদ্ধ নয়, ক্লাবে এই মৌসুমে এসেছিলেন আরেক সেনেগালিজ সালিফ দিয়াও ও ফরাসী ত্রিরত্ন ব্রুনো শেইরু-প্যাট্রিস লুজি-আলু দিয়ারা। হুলিয়ার কয় পেগ ফ্রেঞ্চ হুইস্কি টেনে শেইরু আর দিয়াও কে নিয়েছিলেন দলে কে জানে, শেইরুকে নাম দিয়েছিলেন ‘নতুন জিদান’, আর দিয়াওকে নাম দিয়েছিলেন ‘নতুন প্যাট্রিক ভিয়েরা’।

সালিফ দিয়াও!
সালিফ দিয়াও!

আরও পিলে চমকানো তথ্য, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর ড্যামিয়েন ডাফকে সাইন করার সুযোগ হেলায় হারিয়ে তিনি কিনেছিলেন এই দুইজনকে। মানে ট্রান্সফার-বিদ্যার মায়েরেবাপ!

 ড্যামিয়েন ডাফ
ড্যামিয়েন ডাফ

নতুন জিদান আর ভিয়েরা লিভারপুলের হয়ে কি কি অমর কীর্তি করেছেন আর রোনালদো ডাফরাই বা প্রিমিয়ার লীগে কি কি করেছেন সেটা বিজ্ঞ পাঠকদের অজানা নয় আশা করা যায়…

(চলবে)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

ten − one =