স্যানচেজ মিখিতারিয়ান অদল-বদল : কে বেশী লাভবান হল দুই দলের মধ্যে?

স্যানচেজ মিখিতারিয়ান অদল-বদল : কে বেশী লাভবান হল দুই দলের মধ্যে?

এবারের ইউরোপিয়ান ফুটবলের শীতকালীন দলবদল একটা অনন্য ঘটনার সাক্ষী হল। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দুই জায়ান্ট এর আগে কখনও তাদের স্কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় অদল বদল করেছে কি? সে ঘটনাটাই এবার ঘটালো আর্সেনাল আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আর্সেনাল থেকে চিলির সুপারস্টার উইঙ্গার অ্যালেক্সিস স্যানচেজ যোগ দিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে, আর তাঁর বিনিময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে আর্মেনিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হেনরিখ মিখিতারিয়ান কে দলে পেল আর্সেনাল। কিন্তু এই দুই দলবদলে কে বেশী লাভবান হল? আর্সেনাল, না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড?

অ্যালেক্সিস স্যানচেজ। চিলির এই সুপারস্টার ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা থেকে ২০১৪ সালে যোগ দিয়েছিলেন আর্সেনালে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত মোটমাট ১২২ টা লিগ ম্যাচ খেলে ৬০ গোল আর ২৭ বার গোলসহায়তা করেছেন তিনি। অবিসংবাদিতভাবে থিয়েরি অঁরি পরবর্তী যুগের শ্রেষ্ঠ আর্সেনাল খেলোয়াড় বলা যেতে পারে তাঁকে। কিন্তু এই চার বছরে এটাও বুঝেছেন ইংলিশ লিগে আর্সেনালের হয়ে খেললে সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুই জেতা যাবেনা। যে খেলোয়াড় নিজেকে অন্তত মেসি-রোনালদোর সমান মনে করে তাঁর জন্য এটা একরকম সম্মানহানিকরই বটে। ইংলিশ লিগে এসে চোখের সামনে দেখে গেছেন চেলসি, লেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডদের বড় বড় শিরোপাগুলো জিততে, যেখানে আর্সেনাল এফএ কাপ ছাড়া কিছুই যেতেনি। স্যানচেজ এর মত উচ্চাভিলাষী খেলোয়াড় এত অল্পতে সন্তুষ্ট থাকবেন কেন? এ কারণেই বোধকরি আর্সেনালের সাথে চুক্তি বাড়াতে চাননি আর স্যানচেজ। আর্সেনাল হাজারো চেষ্টা করেও গত দেড় বছর ধরে স্যানচেজ কে নতুন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করাতে পারেনি। ফলে আর ছয়মাস পরেই আর্সেনালের সাথে স্যানচেজের বর্তমান চুক্তি শেষ হয়ে যেত, ফলে ছয়মাস পর চুক্তিসমাপ্তির পরে স্যানচেজ ফ্রি তে অন্য কোন ক্লাবে যোগ দিতে পারতেন। আর স্যানচেজের মত সামর্থ্যের খেলোয়াড়কে যে কোন বড় দলই বলামাত্রই নিতে চাইবে, এটা জানা কথা।

আর্সেনালও সেটা বুঝতে পেরেছিল। তাই চুক্তির শেষ বছর থেকে (গত গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সময় থেকে) আগ্রহী ক্লাবগুলোর কাছে স্যানচেজ কে বিক্রি করে দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করে তারা। কারণ, স্যানচেজ এর মত খেলোয়াড়কে ফ্রি তে ছেড়ে দিতে হবে, এতে আর্সেনালের কোন লাভ নেই। যেখানে একটা খেলোয়াড় চলেই যেতে চাচ্ছে, তার জন্য সামান্যতম ট্রান্সফার ফি ও যদি পাওয়া যায়, তাতেই লাভ। সে সময় স্যানচেজ কে দলে পাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী আগ্রহী ছিল পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি। তখন ২৮ বছর বয়সী অ্যালেক্সিস স্যানচেজকে পাওয়ার জন্য মোটামুটি ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ডও দিতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর্সেনাল বেঁকে বসে (স্যানচেজের পরিবর্ত হিসেবে যাকে ভাবা হয়েছিল, সেই মোনাকোর উইঙ্গার থমাস লেমারকে মোনাকো ছাড়তে চায়নি)। ফলে স্যানচেজ এর দলবদল হয়নি আর।

ছয়মাস পর এবার আসলো শীতকালীন দলবদলের সময়, স্যানচেজের চুক্তির মেয়াদ এখন কমে দাঁড়িয়েছে ছয় মাসে। এবারও আগ্রহী ম্যানচেস্টার সিটি, কিন্তু আর্সেনালকে এবার ট্রান্সফার ফি হিসেবে তারা দিতে চাইলো ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের মত, যেখানে আর্সেনাল ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একপয়সা কম নিতে রাজী নয়। এদিকে ২৯ বছর বয়সী এক উইঙ্গার যার চুক্তির আর মাত্র ছয়মাস বাকী আছে, তাঁর জন্য ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড দিতে চাইলো না ম্যানচেস্টার সিটি। ফলে স্যানচেজ কে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিল সিটি।

সিটি গেল, এলো ইউনাইটেড। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বলতে গেলে এক ঝটকাতেই স্যানচেজ এর বেতন ভাতা সম্পর্কে কথাবার্তা পাকা করে ফেলল। ইউনাইটেডে থাকাকালীন সময়ে সাপ্তাহিক ২৯০,০০০ পাউন্ড করে কামাবেন তিনি, যা তাঁকে মোটামুটি ইউনাইটেডের শীর্ষ আয় করা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। বাকী ছিল আর্সেনালের সাথে ট্রান্সফার ফি আলোচনা করার বিষয়টা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডের জায়গায় তাদের ২৯ বছর বয়সী আর্মেনিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হেনরিখ মিখিতারিয়ান কে দিতে চাইলো। যে মিখিতারিয়ানের সাথে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চুক্তির মোটামুটি দেড়বছরের মত বাকী আছে। আর্সেনালও রাজী হয়ে গেল!

এদিকে হেনরিখ মিখিতারিয়ান ২০১৬ সালের গ্রীষ্মে জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসলেও সেরকম নিজেকে স্কোয়াডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কখনই প্রমাণ করতে পারেননি। অন্তত প্রিমিয়ার লিগে। সেটা গতবছর মিখিতারিয়ানকে দলে আনার পরেই আস্তে আস্তে ইউনাইটেড কোচ মরিনহো বুঝতে পারেন যে, তাঁর স্টাইলের সাথে মিখিতারিয়ানের খেলার স্টাইল ঠিক মেলে না। মোটামুটি এ যুগের অলস জাদুকর বলতে যা বোঝায়, মিখিতারিয়ান সেটাই। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দ্রুততার সাথে মানিয়ে নিতে তাঁর যথেষ্টই কষ্ট হয়েছে, অন্তত মরিনহোর স্টাইলে। বল পায়ে ঘন ঘন ট্যাকলের শিকার হতে পছন্দ করেন না, অপেক্ষাকৃত বেশী সময় ধরে বল পায়ে রেখে খেলাটা গড়তে চান। নিচে নেমে এসে ডিফেন্ড করে যেতে অনীহা, যেটা মরিনহোর স্টাইলের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। মরিনহোর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের হতে হয় আরও বেশী সতর্ক, আরও বেশী বল কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে সচেতন, আরও বেশী পরিশ্রমী, বল কেড়ে নেওয়ার আগ্রহ থাকতে হয় অনেক বেশী যাতে আক্রমণভাগ থেকেই বলের দখল তাদের কাছে থাকে। এই কাজে মিখিতারিয়ান অতটা পটু না। যে কারণে গত দেড় বছরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের থেকে ইউরোপা লিগে মিখিতারিয়ান ছিলেন বেশী সফল। কারণ ইউরোপা লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যেসকল দলের সাথে খেলেছিল তারা কেউই প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর মত এতটা দ্রুত নয়। গায়ের জোরে অতটা খেলতে অভ্যস্ত নয়, ফলে মিখিতারিয়ান বল পায়ে যথেষ্ট সময় পেয়েছেন আক্রমণ রচনা করার জন্য, গোল করতে-করাতে পেরেছেন বেশী। যার উলটো চিত্র দেখা গেছে ইংলিশ লিগে। তাই মিখিতারিয়ান ইংলিশ লিগে সেভাবে সফল হতে পারেননি।

ওদিকে স্যানচেজ এর খেলার স্টাইল মিখিতারিয়ানের মত অতটা ধীর নয়। ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময়গুলোতে দ্রুতগতির উইঙ্গার হিসেবে খেলেছেন তাই তাঁর গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার একদম অবকাশ নেই। বল ছাড়া থাকতে পারেন না মোটেও, তাই প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা তাঁর পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে গেলেও বল ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের তটস্থ করে রাখেন, প্রচণ্ড খেটে নিজেই নিজের-সতীর্থের জন্য সুযোগ তৈরি করেন। যে কাজটা মিখিতারিয়ান পারেন না। আর গত চার বছরে ইংলিশ লিগে খেলার ফলে স্যানচেজ এর এই গুণটা যে ভালোই রপ্ত হয়েছে সেটা আর্সেনালের হয়ে তাঁর পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়।

ওদিকে ওয়েঙ্গার, মরিনহোর মত কখনই অত রক্ষণাত্মক খেলতে পছন্দ করেননি। তাঁর খেলার স্টাইলে মিখিতারিয়ানদের মত অলস জাদুকরদের বেশ ভালোই জায়গা আছে – মেসুত ওজিলের কথাই চিন্তা করে দেখুন! কিংবা সেস ফ্যাব্রিগাস!

খোলা চোখে হিসাব করে দেখলে এই খেলোয়াড় অদল বদলে অবশ্যই লাভবান হচ্ছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকে এমন একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে পাচ্ছে তারা যার কোয়ালিটি বর্তমানে ইউনাইটেডের যেকোন খেলোয়াড় থেকে বেশী (গোলরক্ষক ডেভিড ডা হেয়া ছাড়া), এবং বিনিময়ে এমন এক খেলোয়াড়কে তারা প্রতিদ্বন্দ্বীকে দিচ্ছে যার সেরকম উপযোগিতা তাদের নেই আর।

ওদিকে আর্সেনালের কথা চিন্তা করলে বলা যায় মিখিতারিয়ানের মধ্যে সেরকম রেডিমেড সুপারস্টার না পেলেও এমন এক খেলোয়াড়কে পাচ্ছে তারা যে কোচ ওয়েঙ্গারের স্টাইলের সাথে মিলে যায়। যদিও মিখিতারিয়ান ও মেসুত ওজিল, দুজন একই স্টাইলের খেলোয়াড় কিভাবে একইসাথে আর্সেনালের হয়ে খেলবেন সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার ওদিকে ওজিলের চুক্তিরও বাকী আছে মাত্র ছয়মাস, তাই ওজিল চলে গেলেও আর্সেনাল মিখিতারিয়ানের মধ্যেই তাঁর পরিবর্ত পেয়ে যাচ্ছে। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে স্ট্রাইকার পিয়েরে এমেরিক অবামেয়াং এর আর্সেনালে আসার কথা, তিনি আসলে মিখিতারিয়ান পরিচিত এক স্ট্রাইকার পাবেন, যার সাথে একসাথে ডর্টমুন্ডের দিনগুলোতে একটা সফল যুগলবন্দী গড়েছিলেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 + nine =