ঘূর্ণি + ঝড়= ক্যারিবিয় লজ্জা

‘আমি চিনেছি আমারে আজিকে
আমার ভাঙ্গিয়া গিয়াছে সব বাঁধ’
অনেক সময় এমন অনেক ঘটনা ঘটে, পৃথিবীর কোন ভাষার কোন শব্দেরই সাধ্য থাকেনা তার ‘পারফেক্ট টেন’ মানে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়ার। আজ সিডনিতে এবি ডি ভিলিয়ার্সের ভয়ংকর, বিধ্বংসী সুন্দর ইনিংসটি যেমন। ত্রিশ ওভার শেষে ১৫০ পার করা দলের কেউ কত রানের লক্ষ্য ধরতে পারেন? ৩০০- হ্যা তা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু ৪০৯? খেলা না দেখলে বা সংবাদ শিরোনাম না দেখলে আমাকে পাগল ঠাওরাতে পারেন কেউ কেউ। কিন্তু সত্য বড়ই কঠিন! পাকিস্তানকে নাকানি চুবানি খাওয়ানো দলটি আজ মাটিতে নেমে এলো এবি সাইক্লোন আর ইমরান তাহিরের ঘূর্ণিতে। এবির ৬৬ বলে ১৬২ আর ইমরান তাহিরের ৫ উইকেট শিকারে বারমুডার সাথে সবথেকে বড় ব্যবধানে হারের লজ্জায় ডুবেছে হোল্ডার বাহিনী।
এবি উইকেটে আসার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল সাবধানী ট্রেনের মতো, যার কাছে গতির চেয়ে বড় হল নিরাপত্তা। তবুও তারা বিপদে পড়েছিল ডি কককে প্রথমেই হারিয়ে। জেসন হোল্ডার আঁটসাঁট বোলিং করে ৫ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ৯। খুব কিপটে, তাইনা? তাহলে জেনে রাখুন, দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়কের মতো ইনিও কিন্তু শতক হাঁকিয়েছেন! তবে সেটা লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার মতো রেকর্ড। শেষ ৫ ওভারে ‘মাত্র’ ৯৫ রান দিয়ে তিনি রান বিলানোয় নিজেকে হাজী মুহম্মদ মুহসিনের সমতুল্য প্রমাণ করেছেন। বলা ভালো, সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের দর্শকদের বেসবলের স্বাদ দিয়ে এবি ডি ভিলিয়ার্স তার পকেট থেকে রান বের করেছেন!
প্রথম ৫০ করতে তার লাগলো ৩০ বল। এ সময় অনেকটাই সাবধানী ছিলেন তিনি, মাঝে মাঝে কভার ড্রাইভ খেলে পাখা মেলার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন মাত্র। তখন পাখা মেলেছিলেন আরেকজন। যিনি আসলে প্রথমে শুরু করেন পাল্টা আক্রমণ, গেইলের জোড়া আঘাতে আমলা আর ফাফ ফিরে যাওয়ার পর। রুশো বেশ কিছু ভালো শট খেলেছেন, কিন্তু লাফিয়ে উঠে মারা কাটটি চোখে লেগে আছে এখনও।

ক্রিকেট ইতিহাসের দ্রুততম দেড় শতক করার রেকর্ড এখন এবি'র হাতে
ক্রিকেট ইতিহাসের দ্রুততম দেড় শতক করার রেকর্ড এখন এবি’র হাতে

যত সময় গড়িয়েছে, ততই উত্তুঙ্গ হয়েছে এবির ব্যাট। ঝড়ে যেন এলোমেলো হয়ে গেলেন জেসন হোল্ডার। তার কাছে ঘূর্ণির অস্ত্র থাকতেও তিনি ব্যবহার করলেন না কেন, এটা অনেক বড় প্রশ্ন। তা না করে তিনি যা করলেন, তা জন্ম দিলো হাস্যরসের। অফ স্ট্যাম্পের বাইরে বল করলেই কভার ড্রাইভে বল সীমানার বাইরে যাচ্ছে দেখে তিনি চাইলেন রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে এবির পায়ে বল করতে, তথাস্তু! কিন্তু এরপর যা হল, সেটাকে তুলনা করা যায় সাইক্লোনের সাথে, পায়ের বদলে কোমর উচ্চতার ফুলটস দিলেন একের পর এক, আর এবিও আদর্শ বেসবল হিটারের মতো বল দর্শকের কাছে পাঠাতে লাগলেন। না জেনে ঢুকে পড়া কোন দর্শক ভাবতেও পারেন, এখানে বেসবল খেলা হচ্ছে নাকি? এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে ছিল হোল্ডারের নো বল। একটি সঠিক বল করেন তো একটি নো বল। এমন করে এক ওভার থেকেই এবির খাতায় ৩৪ রান। এর মধ্যে পেস বোলারদের অপমানের চূড়ান্ত করে তাদের বলে রিভার্স সুইপে ছক্কা হাঁকালেন। আরেকবার তো এক হাত দিয়ে সুইপ করে বল উড়িয়ে মাঠের বাইরে পাঠালেন। অফ স্ট্যাম্পের দুই হাত বাইরে এসে সুইপে ছক্কা মারা তার বাঁধভাঙ্গা ঝড়ের প্রতীক, যেখানে অসহায় ক্যারিবিয় বোলার, অসহায় সেনাপতি।

নিজের শেষ দু ওভারে ৬৬ রান - হোল্ডারের সময় না কাটতে চাওয়ারই কথা
নিজের শেষ দু ওভারে ৬৬ রান – হোল্ডারের সময় না কাটতে চাওয়ারই কথা

এর মধ্যে আবার ক্যাচও পড়েছে। গত ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বোলারদের দুঃস্বপ্ন উপহার দেওয়া গেইল আজ নিজেই সেটা উপহার পেয়েছেন। প্রথমে এবির ক্যাচ ফেলা, তারপর ব্যাট হাতে মাত্র তিন রনে কাইলি অ্যাবটের বলে উড়ে গেছে তার স্ট্যাম্পের বেল।

পারেননি গেইল এ যাত্রায় বোলারদের দুঃস্বপন উপহার দিতে
পারেননি গেইল এ যাত্রায় বোলারদের দুঃস্বপন উপহার দিতে

এতেই যা একটু আশা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের, তার সূর্য পশ্চিমে অস্ত গিয়েছে। স্যামুয়েলস টিভি দর্শকদের হাঁস দেখার সুযোগ দিয়ে ০ রানেই ফিরেছেন। এক সময় ইমরান তাহিরের ঘূর্ণিতে ৭১ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলা ক্যারিবিয়রা আরও বড় লজ্জা থেকে বেঁচেছে তাদের সেনাপতির চারটি ছক্কায় সাজানো অর্ধশতকের কল্যাণে।

উইন্ডিজের দুঃস্বপ্ন তাহির কেবল বাড়িয়েছেনই
উইন্ডিজের দুঃস্বপ্ন তাহির কেবল বাড়িয়েছেনই

স্টেইনের বলেই ছক্কাগুলো মারলেও শেষ পর্যন্ত তারই বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছেন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। ১৫১ রানে সব উইকেট হারিয়ে বারমুডার সাথে সবথেকে বড় ব্যবধানের হারের রেকর্ড ভাগাভাগি করলো তারা।

‘চার ছক্কা হই হই
বল হারাইয়া গেলো কই’
যে হারে চার ছক্কার বৃষ্টি হচ্ছে এই বিশ্বকাপে, তাতে ২০১১ না হয়ে এই গানটা এবারের থিম সং হলে মানাতো ভালো!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 × 5 =