ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিবর্তন : উইঙ্গার থেকে সেন্টার ফরোয়ার্ড

বয়স হয়ে গেছে বত্রিশ। গোলক্ষুধা ও জয়ের ইচ্ছা, ঠিক ১৫ বছর আগেও যেমন ছিল, এখনও সেই তেমনটাই আছে। বয়সের সাথে সাথে বরং আরও বেড়েছে ধার, আরও হয়েছেন ঋদ্ধ। কিংবা কে জানে, থিয়েরি অঁরির কথা মানলে, লিওনেল মেসির সাথে নিয়মিত প্রতিযোগিতার বিষয়টাই তাকে প্রতিমুহূর্তে নিয়ে যাচ্ছে নতুন সব উচ্চতায়। তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। রিয়াল মাদ্রিদের মেইন ম্যান, গত চার বছরের মধ্যে তিনবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা পর্তুগিজ রাজপুত্র।

কিন্তু কিভাবে ঘটছে তাঁর খেলার এই উন্নয়নটা? কিভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে খেলার ধার কমার বদলে আরও বেশী কার্যকরী হয়ে উঠছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো? বছরের পর বছর তাঁর খেলার স্টাইলে একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই হয়তোবা মিলবে এর উত্তর – কিভাবে ঘটছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিবর্তন!

রোনালদো প্রথমে যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিলেন, পছন্দের সাত নাম্বার জার্সিটা পাননি। কারণ তখনও রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তী রাউল গঞ্জালেসের দখলে ছিল সেই সাত নাম্বার জার্সিটা। ফলে নয় নাম্বার জার্সি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় রোনালদোকে। ভক্তদের প্রিয় “সিআর সেভেন” ঐ এক মৌসুমের জন্য হয়ে যান “সিআর নাইন”। বলা বাহুল্য, যুগ যুগ ধরে নয় নাম্বার জার্সি মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ডরাই পরে আসছেন। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার সময়ে অতি অবশ্যই রোনালদো সেন্টার ফরোয়ার্ড ছিলেন না। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কখনই তিনি প্রথাগত স্ট্রাইকার ছিলেন না। কিন্তু হয়তোবা কথাটা এখন পরিবর্তন করার সময় এসেছে। কারণ কখনো লেফট উইঙ্গার, কখনো অ্যাটাকিং মিডফিল্ডের বামদিকে খেলা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আস্তে আস্তে সেন্টার ফরোয়ার্ড হয়ে যাচ্ছেন বয়স বাড়ার সাথে সাথে, হয়ে যাচ্ছেন দলের আক্রমণের মূল ফোকাল পয়েন্ট।

স্পোর্টিং লিসবনের প্রাণবন্ত এক তরুণকে যখন রায়ান গিগসের উত্তরসূরি হিসেবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিয়ে আসলেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, রোনালদো তখন ছিলেন এক উঠতি উইঙ্গার। ৪-৪-২ ফর্মেশানে বাম বা ডান মিডফিল্ডের পজিশানটা বরাদ্দ থাকত রোনালদোর জন্য। বিপক্ষ দলের রাইটব্যাককে দুর্ধর্ষ গতি আর স্টেপওভার দিয়ে বোকা বানানো সেই রোনালদোর সেসব কারিকুরি গোলে রূপান্তরিত হত সামান্যই। পরে আস্তে আস্তে গোলের পরিমাণ বাড়তে থাকলেও মাঠে রোনালদোর অবস্থানগত পরিবর্তন কিন্তু সেরকম হয়নি। কেননা একবিংশ শতাব্দীর সেই বিখ্যাত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে ৪-৪-২ ফর্মেশানটা একরকম সমার্থকই হয়ে গিয়েছিল, যে ফর্মেশানে লেফট মিডফিল্ডার/উইঙ্গার হিসেবে খেলতেন রোনালদো। দুর্দান্ত গতিশীল, মাঝে মাঝে ভেতরে ঢুকে গোল করে আসা সেই চতুর উইঙ্গারের খেলা দেখেই মুগ্ধ হয়ে ২০০৯ সালে ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছিল রিয়াল মাদ্রিদ তখন।

প্রথমদিকে রিয়ালের রোনালদো : বিশ্বসেরা উইঙ্গার

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের শেষ বছর থেকে শুরু হয় তাঁর খেলার স্টাইলে পরিবর্তন। রিয়ালে আসার পর প্রিয় শত্রু লিওনেল মেসির উত্থান দেখে নিজের খেলার স্টাইলে প্রথমবারের মত পাকাপাকিভাবে পরিবর্তন আনলেন রোনালদো। প্রথাগত উইঙ্গারের ভূমিকাটার সাথে গোলক্ষুধাটা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে হয়ে গেলেন ইনসাইড ফরোয়ার্ড/ইনভার্টেড উইঙ্গার। মূল স্ট্রাইকারের সাথে লিঙ্ক-আপ করে নিজের গোল করার ক্ষমতারও উত্তরোত্তর বৃদ্ধিসাধন করতে থাকলেন। এই ভূমিকাতেই মূলত বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন রোনালদো।

কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোনালদোর উইঙ্গার হিসেবে খেলার প্রবণতাটা একেবারেই কমে যাচ্ছে। যত বয়স বাড়ছে, আক্রমণভাগের বামদিকে না থেকে একেবারে গোলমুখের সামনে থেকে গোল করার প্রবণতাটা বাড়ছে আরও। যা তাঁকে একটা আদর্শ সেন্টার ফরোয়ার্ডে রূপান্তরিত করছে আস্তে আস্তে। কোচ জিনেদিন জিদানের অধীনে রোনালদো সবসময় ৪-৩-৩ ফর্মেশানে সামনের তিনজনের বামদিকেই অবস্থান করেন। ডানদিকে থাকেন হয় গ্যারেথ বেল নাহয় ইসকো, আর সেন্টার ফরোয়ার্ড থাকেন করিম বেনজেমা। কিন্তু গত দুই মৌসুমে করিম বেনজেমা রিয়াল মাদ্রিদের সেন্টার ফরোয়ার্ড শুধু কাগজে-কলমেই আছেন। খেলা শুরু হলে দেখা যায় করিম বেনজেমার সাথে নিয়মিত পজিশান বদল করে মূল স্ট্রাইকার হয়ে যাচ্ছেন রোনালদো, আর বেনজেমা বামদিকের এসে ডিফেন্ডারদের ফাঁকে ফাঁকে জায়গা খুঁজে বের করে সুযোগ সৃষ্টি করছেন। আবার ডানদিকে যদি ইসকো খেলেন, তখন দেখা যায় কাগজে কলমে ৪-৩-৩ ফর্মেশানে মাঠে নামলেও পরে সুন্দরমত বেনজেমা আর রোনালদোকে সামনে রেখে ৪-৪-২ ফর্মেশানে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ, ওদিকে ইসকো ক্রুস-মডরিচ আর ক্যাসেমিরোর সাথে খেলছেন মিডফিল্ডে, ওয়াইড মিডফিল্ডার হিসেবে। পর্তুগালে বহুদিন ধরেই সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেই খেলেন রোনালদো, কিন্তু সেটা মূলত পর্তুগাল জাতীয় দলে রিয়াল মাদ্রিদের মত আক্রমণভাগে প্রতিভার আধিক্য না থাকার কারণে। আর এমনিতেও রোনালদোর নিজেরও ৪-৩-৩ ফর্মেশানের থেকে ৪-৪-২ ফর্মেশানে খেলতেই বেশী ভালো লাগে বলে! সেটা কি এই হুটহাট তাঁর স্ট্রাইকার হয়ে যাবার কারণে? বোধহয়! বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে শুটিং, পজিশনিং, মুভমেন্ট, অ্যাপ্রোচের উন্নতি সাধন করার মাধ্যমে তাই এখন রোনালদোর সাথে পাঁড় কোন নাম্বার নাইন স্ট্রাইকারের পার্থক্য নেই-ই বলা চলে।

গত চার মৌসুমে লীগে রোনালদোর খেলার পরিসংখ্যানের দিকে একটু লক্ষ্য করা যাক। ২০১৪/১৫ মৌসুমে যেখানে ম্যাচপ্রতি তাঁর গোলের পরিমাণ ছিল ১.৪টি, পরবর্তী দুই মৌসুমে সেটা কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ০.৯৯ ও ০.৮৯তে। কমেছে গোলসহায়তার পরিমাণও। ১৪/১৫ মৌসুমে যেখানে ম্যাচপ্রতি ০.৪৭টি করে গোলসহায়তা করতেন তিনি, পরবর্তী দুই মৌসুমে কমতে কমতে সেটা হয়েছে ০.৪১ ও ০.৩১। সতীর্থদের পাসও দিচ্ছেন আগের থেকে কম, ২০১৪/১৫ মৌসুমে যেখানে প্রতি নব্বই মিনিটে সতীর্থদের সাথে পাস আদানপ্রদান করতেন প্রায় ৩৪টি, সেটা কমতে কমতে এই মৌসুমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭টি কাছাকাছি। একজন উইঙ্গারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি কতটা ”টেইক অন” করতে পারছেন, গত মৌসুমেও যে টেইক অনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৬, এবার সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ এর মত। বোঝাই যাচ্ছে, মিডফিল্ড থেকে খেলা বানানোর ক্ষেত্রে এখন আর আগের মত এত পরিশ্রম করছেন না রোনালদো, অতটা মনসংযোগ দিচ্ছেন না খেলা গড়ে দেওয়ার প্রতি, বরং ডিবক্সের মধ্যে সুযোগসন্ধানী এক গতিশীল চিতাবাঘের মতই গোল করার দিকে তাঁর এখন সম্পূর্ণ মনোযোগ। কিভাবে বল ডিবক্সে যাবে সেটা ভাবার চেয়ে এখন রোনালদো ভাবেন কিভাবে ডিবক্সে আসা বলটা জালের সাথে জড়ানো যাবে। বল পায়ে রাখার চাইতে চতুরভাবে “অফ দ্য মুভমেন্ট” এর মাধ্যমে দৌড়ে গোল করার মত পজিশানে যাওয়ার দিকেই তাঁর আগ্রহ এখন। ড্রিবলিং এর থেকে ফিনিশিংয়েই তাঁর যত মনোযোগ। এবার চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে বায়ার্নের বিপক্ষে দুই লেগ মিলিয়ে তাঁর তিনটা গোল আরেকবার দেখুন, কিংবা গতকাল ফাইনালে জুভেন্টাসের সাথে করা তাঁর দুটো গোল দেখুন একটু। বুঝতে পারবেন, তাঁর পজিশনিং সেন্স ও ডিবক্সে তাঁর সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকার প্রবণতাটা কতখানি বেড়ে গেছে। কালকে দানি কারভাহালের সাথে হালকা ওয়ান-টু করে ডানপায়ের দুর্ধর্ষ এক শটে প্রথম গোলটা করার পর রোনালদোর উদযাপনেই বোঝা গেছে সেটা, গোল করার পর ক্যামেরার কাছে এসে বলেছেন – “ওয়ান চান্স, ব্যাং!” অর্থাৎ তাঁকে কেউ একটা মাত্র সুযোগ দিলেও তিনি তাতেই যা ক্ষতি করার করে দেবেন! জাত স্ট্রাইকারদের কাজ ত এটাই, তাই নয় কি?

বয়স বাড়ছে, সেটা বুঝছেন রোনালদো, তাই উইঙ্গারদের মত খাটাখাটনি করে নিজের স্ট্যামিনা কমানোর চাইতে নিজের খেলার স্টাইল ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে সেন্টার ফরোয়ার্ড হয়ে যাচ্ছেন, যাতে আরো বেশীদিন খেলতে পারেন, কম খাটনি করেও যেন পারফরম্যান্সটা সমান রাখা যায়।

উইঙ্গার এখন জাত স্ট্রাইকার

এই একটা মাত্র কারণেই হয়ত দুনিয়াজোড়া রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের শত বিরক্তির পরেও করিম বেনজেমাকে তথাকথিত মূল স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলিয়েই যাচ্ছেন জিদান। ইতিহাস বলে, বিশ্বের যে স্ট্রাইকার যখনই সেরাদের সেরা হয়েছেন, যেভাবেই হোক না কেন রিয়াল মাদ্রিদ তাদের দলে এনেছে। সেটা ব্রাজিলিয়ান রোনালদো হোক, কিংবা মাইকেল ওয়েন। সেটা রুড ভ্যান নিস্টলরয় হোক কিংবা রাউল গঞ্জালেস। ফেরেঙ্ক পুসকাস হোক বা হুগো স্যানচেজ। কিন্তু গত কয়েকবছরে বিশ্বে হ্যারি কেইন, রোমেলু লুকাকু, রবার্ট লেফান্ডোভস্কি, এডিনসন কাভানি, সার্জিও অ্যাগুয়েরো কিংবা পিয়েরে এমেরিক আউবামেয়াংদের উত্থান হলেও রিয়াল মাদ্রিদ কারোর দিকেই হাত বাড়ায়নি, আস্থা রেখেছে সেই করিম বেনজেমার উপরেই। কেন রেখেছে? কারণ এটাই। কেননা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নিজেই আস্তে আস্তে এমন এক সেন্টার ফরোয়ার্ডে রূপান্তরিত হচ্ছেন যার কারণে রিয়ালের আর সুপারস্টার কোন স্ট্রাইকারের দরকারই নেই আসলে। বরঞ্চ এই কয়েক মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের ট্রান্সফার টার্গেটগুলো দেখুন – ইডেন হ্যাজার্ড, কিলিয়ান এমবাপে ; তাঁরা বেছে বেছে তাদেরকেই টার্গেট করছে যাদেরকে রোনালদোর পাশে খেলানো যায় ইনভার্টেড উইঙ্গার বা ইনসাইড ফরোয়ার্ড হিসেবে – যে ভূমিকায় রোনালদো আগে খেলতেন আরকি!

রোনালদো নিজেকে এভাবে পাকাপাকিভাবে রূপান্তরিত করে স্ট্রাইকার হয়ে গেলে আমাদের মত ফুটবলমোদীদেরই লাভ, খাটনি ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ফলে আমরা তাঁকে আরো বেশী সময়ের জন্য পাবো! আর তাতে বিশ্ব ফুটবলেরই মঙ্গল!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

20 − 6 =