বিনোদনের এক ফেরিওয়ালা – রোনালদো ফেনোমেনন!

যার কথা বলছি, সেই লোক ক্রুজেইরো থেকে পিএসভিতে যখন যোগ দিলেন , তখন তিনি ধন্যবাদ জানালেন দেশের আরেক লেজেন্ড রোমারিওকে – তিনিই পরামর্শ দিয়েছিলেন পিএসভিতে আসার । সময়টা ৯৪ বিশ্বকাপের পরপর , কাজেই রোমারিও তখন আন্তর্জাতিক নায়ক ।

ইউরোপের এসে প্রথম মৌসুমেই বাজিমাত । ৩০ লীগ গোল । ছিপছিপে গড়ন , ঝাড়া ছ’ফিট লম্বা , নিখুঁত ফিনিশিং , দুর্দান্ত গতি আর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং । এরকম একজন স্ট্রাইকারই তো গোলবারের সামনে চায় মানুষ । তাও বয়স মাত্র ১৮ ! পরের মৌসুমে ইনজুরিতে পড়লেও , ১২ ম্যাচে ১৩ গোল । জিতলেন ডাচ কাপ । নজরে পড়লেন বারসেলোনার ।

রোনালদো নামের পিএসভি আইন্দহেভেনের এই ব্রাজিলিয়ান যখন বারসেলোনা তে যোগ দিলেন , ১৯৯৬-৯৭ মৌসুম কেবল শুরু হচ্ছে তখন । সে বছরই জিতলেন সবচে কমবয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ফিফা প্ল্যেয়ার অব দা ইয়ার এওয়ার্ড । খেয়াল করবেন , এটা কিন্তু পিএসভির খেলার হিসেবে । তার বয়স তখন ২০ । ২০ ! খুব সম্ভবত মার্কো এসেন্সিওর বয়স ২০ হবে !

৯৬-৯৭ মৌসুমে রোনালদো যেটা করলেন , সেটা ইউরোপ এর আগে দেখেনি অনেকদিন । ৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল । লিগে ৩৭ ম্যাচে ৩৪ গোল । শুধু গোলের হিসেব দিয়ে সেই মৌসুমের মাহাত্য বোঝানো যাবেনা । ওই সময় টাতে , শারীরিক দিক থেকে , ফিটনেসের দিক থেকে রোনালদো ছিলেন তার পুরো ক্যারিয়ারের সবচাইতে ভাল অবস্থায় । সেই মৌসুম টাতেই বোধকরি রোনালদো ঠিক রোনালদো হয়ে উঠলেন । সেইম সিচুয়েশনে একজন নিখাদ স্ট্রাইকার অনেক ভাবে ফিনিশ করতে পারেন । কেও ট্যাপ ইন করে , কেও ফিনেস , কেও চিপ , কেও হয়তো ডিবক্সেও পাওয়ার্ড শট নেন । রোনালদো দেখালেন ওয়ান অন ওয়ান ফিনিশিং এ সাহস আর দক্ষতার চূড়ান্ত মিশেল । হয়তো দুজনকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকেছেন , ওয়ান অন ওয়ানে গোলকিপারকে একা , হঠাতই ধীরলয়ের হয়ে গেলেন , আচমকা স্টেপওভার দিয়ে কোন একদিকে মোড় নিলেন , ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ল কিপার আলতো টোকায় ফিনিশিং টাচ রোনালদোর – এই হচ্ছে রোনালদোর ট্রেডমার্ক । টাইপ করে যার থ্রিল বোঝানো আমার সাধ্যে নেই ।

পরের মৌসুমে জিতলেন ব্যালন ডি অর । বার্সায় চুক্তি রিলেটেড কি একটা ঝামেলা হওয়ায় জয়েন করলেন ইন্টার মিলানে । বিশ্বের সেরা তারকা হয়ে খেলতে গেলেন ৯৮ বিশ্বকাপে । কেমন খেললেন ?

লিওনার্দো-রিভালদোর সাথে এটাকিং থার্ডে যে বোঝাপড়ায় তিনি ভার্সাটাইল যে স্ট্রাইকিং রোল টা খেললেন , সেটা ওর আগে একজন নিখাদ নাম্বার নাইনের কাছ থেকে দেখেনি বিশ্ব । বাম প্রান্ত- ডান প্রান্ত কিংবা মধ্যমাঠ দিয়ে বুলেট গতির সব সলো রান , কাট ইনসাইড করে সেন্টারে এসে আলতো করে রিভালদো বা লিওনারদোর কাছে বল্ লিভ করা , আবার বক্সে ঢোকা , রিভালদো বা লিওনারদোর বাড়ানো বলে ফিনিশ করা – একটা ট্রেডমার্ক মুভ ৯৮ বিশ্বকাপের । এই পুরো প্রক্রিয়ার টুকুর মধ্যে , থাকত গ্যারেথ বেলের গতি , রোনালদিনহোর কৌশল , জিদানের বুদ্ধিমত্তা , আর একেবারে নিজস্ব “রোনালদোর ফিনিশিং” । পুরো টুর্নামেন্ট নামের পাশে ৪ গোল আর ৩ এসিস্ট । ফাইনাল টা অসুস্থতার কারনে ঠিকমত খেলতে পারেন নি , আফসোস ! ( ওই স্পন্সর দের চাপে পরে নামানো হয়েছিল ওইটুকু নাহয় বাদই দিলাম )
ফাইনালের আগ পর্যন্ত এরকম খেললেন প্রায় প্রতি ম্যাচেই , এইবার আপনিই বলেন – সেই প্লেয়ারটা যদি ফাইনালে ভাল নাও খেলে , সেই কি ওই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় না ।

এবং সেটাই হলো । জিতলেন গোল্ডেন বল ।

ওই সময় টিভিতে লা লিগা দেখাত না । তাই পেপার পড়েই মোটামুটী সবাই রোনালদোর ৪৭ গোলের কীর্তির কথা জেনেছিলেন ।

আর সামনে থেকে দেখলেন একটা শো । একটা ম্যাজিক শো । বাস্তব ম্যাজিক । অবাস্তব না । একজন স্ট্রাইকারের , একইসাথে ফুটবলের সকল রকম কৌশল দেখানোর একটা শো – যেটা রোনালদো নিখুত দক্ষতায় করে দেখিয়েছেন ।

তো কথা হলো , রোনালদোকে ভালবেসে ফেলার জন্য , ঠিক ৯৮ পরবরতী ওই মুহূর্তে আপনার মাথায় কোন জিনিসটি আসবে ?

খেলোয়াড়ি দক্ষতা, মানে তার কৌশল , গতি , ড্রিবলিং ? নাকি কয়টি গোল করেছেন সেটা ? নাকি বিশ্বকাপ শিরোপা ?

উত্তরঃ খেলোয়াড়ি দক্ষতা ।

এবং এই সেন্সেই বেশিরভাগ মানুষ , “কে সেরা” সেই রেটিং টুকু করে ।

রোনালদো পরের বিশ্বকাপে ৮ গোল করে বিশ্বকাপ জিতলেন । কিন্তু ০২ এর রোনালদো গোল্ডেন বল পেলনা কেন ?

সিম্পল ।

৯৮ তে যে খেলোয়াড়ী দক্ষতা সে দেখিয়েছে , সেটা ০২ তে নাই ।

তার মানে , গোল কিংবা “পরিসংখ্যান” এর চাইতে , বিচারক সহ সব মানুষ কিন্তু “ম্যাজিক শো”র ব্যাপারটাই বেশি মনে রাখে , সেটাই কিন্তু একটা খেলার প্রধান কাজ , “মানুষকে বিনোদিত করা”।

যার খেলায় মানুষ যত বিনোদন পায় , তাকে তত ভাল মনে হয় , তার “পরিসংখ্যান” যেরকমই হোক ।

এই কারনেই , রোমারিও ভুড়ি ভুড়ি গোল করলেও তাকে কিন্তু কেও “ফেনোমেনন” বলে না । বলে রোনালদো কে ।

ফেনোমেনন রোনালদো আমাদের “ম্যাজিক শো” উপহার দিয়েছেন ৯৬,৯৭,৯৮,৯৯ সাল এই চার বছর ধরে । সেই ম্যাজিক শো তে খুত বলতে কিছু ছিল না । একজন পেশাদার ফুটবলার যা যা করতে পারেন বা না পারেন , তার সবই তিনি করেছেন ওই চার বছরে ।

তাই এর পরের রোনালদো কি করলো বা না করল , সেটা নিয়ে কেও মাথা ঘামায় না । একবাক্যে রোনালদো কে সর্বকালের সেরা “নাম্বার নাইন” বলে ,

কারন “রোনালদো ৯= একজন দুর্দান্ত পারফেক্ট ৯+ একজন পারফেক্ট নাম্বার ১০ এর স্কিলস + একজন নাম্বার ৭/১১ এর গতি ”

শুভ জন্মদিন রোনালদো !

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

12 + 9 =