এ ট্রিবিউট টু রোনালদো

১২ জুলাই,১৯৯৮

বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ০-৩ গোলে বিধ্বস্ত হলো ব্রাজিল,রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই হতাশায় মাঠে শুয়ে পড়লো ২২ বছর বয়সের এক যুবক।এই সেই যুবক যে পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ খেলে দলকে তুলেছিলেন ফাইনালে।কিন্তু বিধাতার কি নির্মম পরিহাস,ঠিক ফাইনালের আগেই পড়লেন এক রহস্যময় ইনজুরিতে,ইনজুরি নিয়েই ফাইনাল খেললেন কিন্তু লাভ হলো না,দল হেরে গেলো ৩-০ তে।ফুল ফিট না হয়েও কেনো তিনি খেললেন এই প্রশ্নের বাণে জর্জরিত হলেন তিনি। সেদিন মাথা নিচু করে স্টেডিয়াম ছাড়ার সময়ে সে যুবক প্রতিজ্ঞা করলো যে করেই হউক সে দলকে বিশ্বকাপ এনে দিবেই…..

চার বছর পর

বিশ্বকাপের দামামা বেজে উঠলো,সবাই প্রস্তুত নিজেদের সেরাটা দেওয়ার জন্য কিন্তু সেই যুবক তো ২০০০ সাল থেকেই ইনজুরির সাথে লড়ছে!!! এমন এক ইনজুরিতে সে পড়েছে যেখান থেকে কামব্যাক করাও খুব টাফ।এই ইনজুরির জন্য সে ব্রাজিলের হয়ে বাছাইপর্বের এক ম্যাচও খেলতে পারে নি।অনেকেই ভেবেছিলো স্কলারি হয়তো তাকে দলে রাখবে না কিন্তু বহু নাটকের পর সেই যুবক ঠিকই দলে জায়গা পেয়ে গেলো!! সেসময়ে তুখোড় ফর্মে থাকা রোমারিওকে বাদ দিয়ে তাকে নেওয়ায় উঠে সমালোচনার ঝড়।সবাই বলতে থাকে একটাই কথা,এত্তবড় ইনজুরি থেকে ফিরে বড়কিছু করা অসম্ভব।সে মুখে কিছুই বলে নি,হয়তো মাঠেই জবাব দেওয়ার অপেক্ষায় ছিল।

বিশ্বকাপ শুরু হলো,ব্রাজিল প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হলো তুরস্কের কিন্তু প্রথমেই গোল খেয়ে ব্যাকফুটে ব্রাজিল!!!তখুনি সেই যুবক অসাধারণ ফিনিশিং এ গোল করে দলকে সমতায় ফেরালেন।পরে রিভোর গোলে ব্রাজিল ২-১ এর জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে।এতেও অবশ্য সমালোচকরা তেমন পাত্তা দিলো না,মাত্র এক গোলে কি আসে যায় ? সবাই তখন ওয়েন,বাতিগোলদের নিয়েই ব্যস্ত।এরপর চীনের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের ৪-০ গোলের জয়েও করলেন এক গোল।গ্রুপ পর্বের শেষম্যাচে কোস্টারিকার বিরুদ্ধে করলেন জোড়া গোল।এবার সমালোচকদের ভ্রু কিছুটা কুঁচকালো,তবে কি সে সেই আগের চিরচেনা ছন্দে ফেরত আসছে???

এরপর বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে প্রি কোয়ার্টারে যখন ব্রাজিল ১-০ গোলের লিড নিয়েও স্বস্তিতে ছিল না তখুনি নিঁখুত ফিনিশিং এ গোল করে নিশ্চিত করলেন দলের জয় আর টানা চার ম্যাচে গোল করে বুঝিয়ে দিলেন তিনি ফুরিয়ে যান নি,চার বছর আগের সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই তিনি এসেছেন।তবে কোয়ার্টারে তিনি আর সুবিধা করতে পারলো না কিন্তু ব্রাজিল ঠিকই ২-১ গোলের জয়ে চলে গেলো সেমিতে…..সেমিতে যখন কিছুতেই ব্রাজিল তুরস্কের ডিফেন্স ভাঙ্গতে পারছিলো না তখন একাধিক তুর্কি ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল করে ব্রাজিলকে ফাইনালের পথে একধাপ এগিয়ে নিলেন।এই একগোলেই ব্রাজিল পায় ফাইনালের টিকিট আর ৬ ম্যাচে ৬ গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে ওই সর্বনাশা ইনজুরি থেকে ফিরে এসেও তার সামর্থ্য এতটুকু কমে যায়নি …..

৩০ শে জুন,২০০২

ইয়াকোহামায় ব্রাজিল জার্মানির মহারণ,আর সেই যুবকের সামনে চার বছর আগের অপমানের শোধ তোলার অপূর্ব সুযোগ ? কিন্তু প্রথমার্ধে বেশকিছু সহজ সুযোগ মিস করায় সবাই ভাবতে লাগলো ফাইনালে হিরো হওয়া তারজন্য বুঝি অধরাই রয়ে গেলো।কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের জন্য যিনি চার বছর ধরে নিজেকে তৈরি করছেন সে কি এত্ত সহজে হাল ছাড়ে?? ৬৭ মিনিটে তার গোলেই লিড পায় ব্রাজিল।আর ৭৯ মিনিটে তিনি যখন বল জালে জড়ালেন তার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায় চার বছর আগের পাপের শাপমোচন।শেষবাঁশি বাজার সাথে সাথে পতাকা গায়ে জড়িয়ে হাসতে হাসতে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করেন সে,চার বছর আগের সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করায় চোখেমুখে ছিল আনন্দের ঝিলিক। ছয় ম্যাচে আট গোল করে পান গোল্ডেন বুট কিন্তু ফাইনালের আগেই গোল্ডেন বলের প্লেয়ার সিলেক্ট করায় টুর্নামেন্ট এর সেরা খেলোয়াড় হয়েও গোল্ডেন বল হাতে উঠে নি তার।তাতে কি,হুইল চেয়ার থেকে ফিরে এসে রাজকীয়ভাবে বিশ্বকাপ জিতেছেন,নিয়েছেন চার বছর আগের অপমানের শোধ এরচেয়ে বড় পুরস্কার আর কি হতে পারে???

তিনি আর কেউ নন,ইতিহাসের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও ডি লিমা ? ইনজুরি থেকে ফিরে এসেও এভাবে রূপকথার সৃষ্টি করে যে বিশ্বকাপ জেতা যায় সেই রূপকথার নায়ক রোনালদো।যেখানে অনেক লিজেন্ডকে বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে মাঠে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না সেখানে রোনালদো একাই সেমিফাইনাল আর ফাইনালে গোল করে দলকে এনে দিয়েছেন বিশ্বকাপ।রূপকথার সুপারহিরোর কাছেও যেটা অসম্ভব সেটাই রোনালদো করেছিলো ২০০২ সালে।সর্বকালের সেরা হওয়ার সমস্ত গুণ নিয়েই তিনি এসেছিলেন কিন্তু ইনজুরির জন্য তা আর হয়ে উঠে নি কিন্তু তারপরও যা পেয়েছেন সেটাই বা কম কিসের??? একটা বিশ্বকাপ জয়ের রূপকথার নায়ক হওয়ার সামর্থ্য কয়জনের কপালে জুটে???
শুভ জন্মদিন রোনালদো,আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড়ের জায়গাটা সারাজীবনের জন্যই আপনার জন্য বরাদ্দ কারণ আপনার জন্যই ব্রাজিল ফুটবল দলের ফ্যান হওয়া,আপনার জন্যই ফুটবলকে পাগলের মত ভালবাসা…..

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × 5 =