রবার্ট পিরেস – আর্সেনালের উড়ন্ত উইঙ্গার

আহসানুল হক –

ফ্রান্সের রাইমস শহরে ১৯৭৩ সালের ২৯ অক্টোবর পর্তুগিজ বাবা ও স্প্যানিশ মায়ের সংসারে জন্ম নেন রবার্ট ইম্যান্যুয়াল পিরেস। ফুটবল পাগল বাবার উৎসাহে ১৫ বছর বয়সে যোগ দেন রাইমস এর একাডেমি তে। প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে দেরি করেন নি। অচিরেই যোগ দেন আরেক ফ্রেঞ্চ ক্লাব ‘এফসি মেতজ’ এ।

পিরেস যখন মেতজে
পিরেস যখন মেতজে

১৯৯৩ সালে সিনিয়র দলে অভিষেক এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্রমাগত অসাধারন ভাবে পারফর্ম করেছেন দিনের পর দিন। ছয় মৌসুম ‘এফসি মেতজ’ এ থাকা কালে ১৬২ ম্যাচে ৪৩ গোল করেছেন। এর পর মার্সেই এ দুই মৌসুম কাটানোর পর যোগ দেন আর্সেনাল-এ..

 

আর্সেনাল সমর্থকরা মার্ক ওভারমার্স- এর বার্সেলোনা ট্রান্সফার এ ব্যথিত হয়েছিল। শূণ্যস্থান পূরনে ৬ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে পিরেস কে মার্সেই থেকে নিয়ে আসেন আর্সেন ওয়েঙ্গার।

মার্শেইয়ের পিরেস
মার্শেইয়ের পিরেস

ইংল্যান্ড এর গতিময় এবং শারীরিক ফুটবলে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছিল। এর পর প্রতিনিয়ত দর্শক সমর্থক দের মুগ্ধ করেছেন অবিশ্বাস্য সব গোলে। এই লেফট মিডফিল্ডার/উইংগার এর প্লেমেকিং ক্ষমতার সাথে তার স্ট্রাইকারসুলভ প্রবণতা তাকে ইউরোপ জোড়া ডিফেন্সের ত্রাস হিসেবে পরিচিত করেছিল। তার দৌড়ানোর ভঙ্গিমাও তাকে তার সময়ের অন্যান্য গ্রেট দের থেকে আলাদা করেছিল।

Football - Stock 04/05 , 20/11/04 Robert Pires - Arsenal Mandatory Credit: Action Images / David Jacobs

২০০০-০১ সিজনে চ্যাম্পিয়নস লীগে লাৎসিওর বিপক্ষে একক প্রচেষ্টায় দুর্দান্ত গোল আর এফ কাপের সেমিফাইনালে টটেনহ্যাম এর সাথে করা গোল গুলো ছিলো তার পরবর্তী মৌসুমের ফর্মের পুর্বাভাস মাত্র।

 

২০০১-০২ মৌসুমে তিনি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা একটি মৌসুম কাটান। অ্যাস্টন ভিলার সাথে একটি গোলকে তার পুরো মৌসুমের ফর্মের প্রতীক বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। ফ্রেডি লিউঙবার্গের লং বল রিসিভ করে আগুয়ান ডিফেন্ডার এর মাথার ওপর দিয়ে লব করে পরাস্ত করেন এরপর আরেকটা লব এ পরাস্ত করেন গোলকিপার পিটার স্মাইকেল কে। মৌসুম শেষে রবার্ট পিরেস লীগের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট দাতা, এফডব্লিউএ(FWA) ফুটবলার এবং আর্সেনাল এর সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন ইনজুরির কারনে মৌসুমের শেষ প্রায় তিন মাস খেলতে না পারার পরেও!! লীগ ট্রফি জেতা আর্সেনাল দলের সদস্যদের তার হাতে ট্রফি তুলে দেবার সময় অভিবাদন করার ধরন দেখেই বোঝা যায় দলে পিরেসের খেলার কতটা প্রভাব ছিলো।

2241191969

পরের মৌসুমের শুরুর তিন মাস খেলতে না পারলেও ২০ ম্যাচে ১৪ গোল করেন। এফএ কাপের শিরোপা নির্ধারনী গোলটাও আসে এই ফ্রেঞ্চ এর পা থেকে।

২০০৩-০৪ মৌসুমে আর্সেনাল এর ঐতিহাসিক “ইনভিন্সিবল” জেতা দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন পিরেস। অারেক ফ্রেঞ্চ অঁরির সাথে মিলে গড়ে তোলেন ‘ডেডলি ডুয়ো’.. দুইজনে মিলেই করেন ৫৭ গোল!! এর মধ্যে লিভারপুলের সাথে করা ওয়ান্ডার গোলটিও আছে। ওই মৌসুমের অন্যতম গুরুত্বপুর্ন ম্যাচটি ছিলো চেলসির সাথে যেখানে ক্লদ ম্যাকেলেলের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে জন টেরি এবং গালাস কে কাটিয়ে প্যাট্রিক ভিয়েরা কে অ্যাসিস্ট করেন রবার্ট পিরেস। ওই ম্যাচ জেতার পর আর্সেনাল পয়েন্ট টেবল এর প্রথম স্থানেই ছিলো মৌসুমের শেষ দিন পর্যন্ত। পিরেস ওই মৌসুম শেষ করে ১৪ গোল আর ৭ অ্যাসিস্ট নিয়ে..

সেই ডেডলি ডুও
সেই ডেডলি ডুও

পরের মৌসুমেও ১৪ গোল করে হন প্রিমিয়ার লীগের ৩য় সর্বোচ্চ গোলদাতা। দলের হয়ে জেতেন তিনটি এফএ কাপের শেষটি।

 

২০০৫-০৬ মৌসুমে দলে তার জায়গা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে হোসে আন্তোনিও রেয়েস এবং আলেক্সান্দার হ্লেব এর উত্থান এ। খেলায়ও পড়তে থাকে বয়সের ছাপ। তারপরেও চ্যাম্পিয়ন্স লীগে জুভেন্টাস এর সাথে অসাধারন ট্যাকল তার সাবেক অধিনায়ক ভিয়েরাকে পরাস্ত করে ফ্যাব্রিগাস এর গোলের আগে কি পাস টি অঁরিকে দেওয়ার দৃশ্য সকল আর্সেনাল সমর্থকের মনে থাকার কথা। ওই মৌসুমেই তিনি আর্সেনাল এর জার্সি গায়ে খেলেন তার শেষ ম্যাচ। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে আর্সেনাল গোলকিপার লেম্যান লাল কার্ড দেখার পর অ্যালমুনিয়া কে নামানোর জন্য বদলী করা হয় রবার্ট পিরেসকে। আর্সেনাল ও হেরে যায় বার্সেলোনার কাছে। ছয় মৌসুমের ২৮৪ ম্যাচের(এর মাঝে ৪৬ টি ম্যাচে বদলি হিসেবে) অার্সেনাল ক্যারিয়ারে ৮৪ টি গোল এবং অসংখ্য অসাধারন মুহুর্তের জন্ম দিয়েছেন তিনি।

আর্সেনাল-অভিযান শেষ করে পিরেস পাড়ি জমান ভিয়ারিয়ালে
আর্সেনাল-অভিযান শেষ করে পিরেস পাড়ি জমান ভিয়ারিয়ালে
পরে আবার আসেন তিনি প্রিমিয়ার লিগে, অ্যাস্টন ভিলার হয়ে
পরে আবার আসেন তিনি প্রিমিয়ার লিগে, অ্যাস্টন ভিলার হয়ে

২০০৮ সালের জরিপে আর্সেনাল সমর্থকরা তাকে ক্লাবের ইতিহাসে ৬ষ্ঠ সেরা ফুটবলার হিসেবে মনোনীত করে।২০০৬ এ যোগ দেন স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালে..চার বছর কাটিয়ে এক মৌসুমের জন্য আবার ইংল্যান্ডে ফেরেন অ্যাস্টন ভিলার হয়ে। এর পর বুট জোড়া তুলে রাখলেও সম্প্রতি ভারতের সুপার লীগে খেলতে এবং ভারতে ফুটবল প্রসারে এসেছেন।

গত মৌসুমে ভারতের আইএসএলে খেলে গেছেন এফসি গোয়ার হয়ে
গত মৌসুমে ভারতের আইএসএলে খেলে গেছেন এফসি গোয়ার হয়ে

জাতীয় দলের হয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে জিতেছেন বিশ্বকাপ, ইউরো, কনফেডারেশন কাপ। ৭৯ ম্যাচে করেছেন ১৪ গোল। ২০০১ এ কোরিয়া-জাপান কনফেডারেশন কাপে একই সাথে গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন শু জিতেছিলেন সময়ের সেরা এই লেফট মিডফিল্ডার।

 

এক নজরে তার ক্যারিয়ারের দলগত এবং ব্যাক্তিগত অর্জন গুলো:

 

Club: 

Metz – Coupe de la Ligue: 1995-96

Arsenal FA Premier League: 2001–02, 2003–04

FA Cup: 2001-02, 2002-03, 2004-05

FA Community Shield: 2002, 2004

 

International (France) 

FIFA World Cup: 1998

UEFA European Championship: 2000

FIFA Confederations Cup: 2001, 2003

 

Individual Ligue 1 Young Player of the Year: 1995–96

Chevalier (Knight) of the Légion d’honneur France’s highest decoration 1998

Football Writers’ Association’s Footballer of the Year: 2001–02

PFA Team of the Year: 2001–02, 2002–03, 2003–04

FA Premier League Player of the Month:           February 2003

FIFA Confederations Cup Golden Ball            2001

FIFA Confederations Cup Golden Shoe: 2 goals    2001

ক্ষণজন্মা এই উইঙ্গারের আজ জন্মদিন। শুভ জন্মদিন পিরেস!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fourteen − eleven =