রিয়াল মাদ্রিদ ট্যাকটিকসঃ উইথ এন্ড উইদাউট জেমস

সাধারনত ম্যানেজারদের সময় দেয়ার পক্ষপাতী আমি । তাদেরকে তাদের নিজস্ব ফরমেশন এবং ট্যাকটিকসে সেটলড হতে দেয়ার পক্ষে । যেই কারনে , সেই বার্ন্ড স্কাস্টার কিংবা ক্যাপেলো থেকে শুরু করে আজকের জিদান পর্যন্ত যেই কোচই যেই ফরমেশনই খেলাক না কেন , গা করিনাই । সবারই আলাদা স্টাইল আছে ( বেনিতেজের ৫-০-৫ ছাড়া ) ।
সব ম্যানেজারেরই নিজের “প্রিয়” ফর্মেশন আছে । নিদের প্রিয় একাদশ আছে । জিনেদিন জিদানও ব্যতিক্রম নন । তার প্রিয় একাদশ হচ্ছে , হচ্ছে মাদ্রিদের ডিফল্ট একাদশ উইথ বিবিসি আপফ্রন্ট । কিন্তু জিনেদিন জিদানের প্রিয় ফর্মেশন কি – সেটি প্রায় দেড় বছর পরে এসেও বোঝা মুশকিল ।
সাধারনত রিয়াল মাদ্রিদ খেলে থাকে একদম ফ্ল্যাট ৪-৩-৩ তে । মাঝেসাঝে শিফট করে ৪-৪-২ নাহয় ৪-১-৪-১ করে ফেলেন একটু আগপিছ করে ।
এর বাইরে বেশ কবার আমরা জিদান কে প্লট করতে দেখেছি , ৩-৫-২ এর মত ফরমেশন , যে রিয়াল মাদ্রিদের জন্য যথেষ্টই আনকোড়া একটি ফর্মেশন । দেল বস্ক থেকে শুরু করে বেনিতেজ , কেউই ৩-৫-২ ব্যবহার করেন নাই । রিয়াল মাদ্রিদ এমন একটি দল , যারা কখনোই মাঠে তিন নাম্বার সেন্টার ব্যাক ব্যবহার করতে পছন্দ করে না ।
কিন্তু কোন এক কারনে জিদান করেন । হয়তো তার জুভেন্টাস থাকাকালীন সময়ে এই ফরমেশনটি তার খুব প্রিয় ছিল ।
আরো ব্যাপার আছে । জিদানের ফরমেশনে কোন নাম্বার ১০ নাই । রিয়ালের মিডফিল্ড সাজানো , একজন এঙ্কর ( ক্যাসেমিরো ) , আর তার সামনে দুইজন বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার ( ক্রুস-মদ্রিচ) দিয়ে । তার মত একজন টিপিক্যাল নাম্বার টেন , নিজের একাদশে নাম্বার টেন রাখতে পছন্দ করবে না – এই জিনিসটা আমার বিশ্বাস হয়না । দুইটা ব্যাপার হতে পারে ,
হয় জিদানের “যেরকম” নাম্বার ১০ চান ,সেরকম নাম্বার ১০ মাদ্রিদে নাই
অথবা মাদ্রিদের নাম্বার ১০ রা সেভাবে পার্ফর্ম করতে পারে না ।
এখন , মাদ্রিদে নামবার ১০ কে কে খেলতে পারেন ?
১। জেমস
২। ইস্কো
৩। ক্রুস
৪। মদ্রিচ
৫। এসেন্সিও
ক্রুস-মদ্রিচের কম্প্যাক্ট মিডফিল্ড ডুয়ো ভাঙার কোন কারন নাই । তারা বাদ । তারা সেন্টারেই জুটি বাধবেন । একজন স্ক্রিনার লাগবেই , সেই হিসেবে ক্যাসেমিরো কে অফ করা যায়না । এইজন্যি জেমস কিংবা ইস্কো খেলার সুযোগ পান একদম মাঝেসাঝে । তাদের পার্ফমেন্স যে খারাপ – মোটেই তা না । জেমস – ইস্কো যখনই সুযোগ পান , একদম আপ টু দি মার্ক পার্ফর্ম করেন । কিন্তু হতে পারে জিদানের “টাইপ” অন্যরকম । জেমস কিন্তু আগে অনেকটা “সাপোর্টিভ স্ট্রাইকার” ছিল , কাকার মত – ট্র্যাক ব্যাক করত না । এখন কিন্তু সে ডিফেন্সে অনেক ইনপুট দেয় , ট্র্যাক ব্যাক করে ,চার্জ করে । অর্থাৎ , হি ইজ মোডিফায়িং হিমসেলফ । ইস্কোর ক্ষেত্রেও পরিবর্তন লক্ষনীয় । পুর্বে সে আজেবাজে ড্রিবলিং এটেম্পট করে বল হারাত । এখন তার আননেসেসারি ড্রিবলিং একদম নাই বললেই চলে , অপারেট করে অনেক ডিপ থেকে , থ্রু তে মনোযোগী বেশি – মডিফায়েড প্লেমেকার ।
বিভিন্ন হাবিজাবি নিউজ সোর্স মতে , জিনেদিন জিদান হাজার্ড কে চান আগামী মৌসুমে । কিছু কি আন্দাজ করতে পারি, এখান থেকে ?
আচ্ছা পরের মৌসুমের কথা বাদ । আমার মৌশুমের শুরু থেকেই যে জিনিসটি মনে হচ্ছিল , যে জেমসের মত প্রতিভাবান একজন প্লেমেকার কে জিদান ফালায় রাখবে সেটি সম্ভব না । খুব সম্ভবত জিদান তাকে মডিফাই করছে । মৌসুমের অর্ধেকের মত বাকি আছে । অনেক জায়গায় তাকে ব্যবহার করা সম্ভব ।
মাদ্রিদের প্লেয়িং স্টাইল নিয়ে যদি কথা বলি , কথা অনেক কম হয়ে যায় । ক্রস ক্রস ক্রস । অনেকেই খুবই বিরক্ত এই সিস্টেমের উপর । তবে সত্যি কথা হলো , রিয়ালের ফরোয়ার্ডদের উচ্চতা , রিয়ালের দুই আগ্রাসী ফুলব্যাক , এবং সেটপিসে তাদের খেলোয়াড়দের ভাল এরিয়াল এবিলিটি এবং হেডারের কথা চিন্তা করলে , ক্রসিং সিস্টেম খুবই ইফেক্টিভ একটা সিস্টেম রিয়াল মাদ্রিদের জন্য । এই মৌশুমে মোট ৭১ টি গোলের মধ্যে টোটাল ২০ টি গোল হয়েছে হেডার থেকে , ২১ টি সেট পিস থেকে । জিদানের বেসিক থিওরি হচ্ছে , আমাদের দলের সবচে ওয়াইডেস্ট প্লেয়ার হবে আমাদের দুই ফুলব্যাক , উইথ ক্রসিং এক্টিভেটেড । ২৫-৩০ টা ক্রস করলে এরমধ্যে ৪-৫ টা ক্রস হবে একদম পিনপয়েন্ট । গোল হবেই । হচ্ছেও । সাথে যোগ করেন টনি ক্রুস আর মদ্রিচের অসাধারণ সেটপিস । মাদ্রিদে মোটামুটি ভাবে আটকাচ্ছে না কোথাও । আর শেষদিকে মাদ্রিদ পিছিয়ে থেকেও যে বারবার জিতে ফিরে , এটা কিন্তু রহস্যময় কিছু না । একদম সায়েন্টিফিক । পিছিয়ে থাকলে কিংবা ম্যাচ লেভেল থাকলে মাদ্রিদের শেষ ১৫ মিনিটের খেলাটা ভালমত অবজার্ভ করেন । তারা ক্লোজ টু ২-৪-৪ রকমের ফর্মেশনে অল আউট এটাকে খেলে । শুধু ক্রস না, তখন বিল্ড আপ প্লে , ওপেন প্লে , থ্রু মিডল , লং রেঞ্জ , সলো রান – সব হয় ।
আর রামোস যে এভাবে সেটপিসে কন্টিয়াস গোল করে যাচ্ছে এটাও কাকতালীয় কিছু না । এটাও লজিক্যাল । বলের যারা গ্রেট হেডার , তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে বলের জন্য অপেক্ষা করে না । জায়গা করে নেয় , মার্কার থেকে ছুটে বলে কাছে যায় , ফ্লাইট বোঝে , জাম্প করে এবং এংগেলওয়াইজ টাচ করে । এর প্রতিটা কাজ রামোস নিখুতভাবে করে । রামোসের পজিশনিং খেয়ার করবেন কোন একটা কর্নারের বা সেটপিসের সময় । সে দাঁড়ায় জটলার একদম বাইরে , নিরীহ একটা জায়গায় – যেখানে সাধারনত একটা সেন্টার ব্যাক মারক করতেও যাবেনা । সেখানে থেকে দৌড়ে সে কভার করে বলের ফ্লাইট বুঝে , সেটাপ সে নিজেই করে । আসলে রামোসের অনেকগুলি গোল হওয়ার কথা ছিল ক্রিস্টিয়ানোর করা । কিন্তু গত দুই বছরে সেটপিসে ক্রিস্টিয়ানোর পজিশনিং ভালরকম ফল ডাউন করেছে , আর রামোসের টা করেছে ইম্প্রুভ । ক্রিস্টিয়ানো আজকাল জায়গায় দাড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে , বাকিটা জাম্পিং এ কাভার করতে চায় ।
তবে সমস্যা হলো , সবসময় আপনি ক্রসিং করে , প্রতিপক্ষের জমাট ডিফেন্স ভাঙতে পারবেন না । আনচেলোত্তিও ওই কমবেশি ক্রসিং ই করাত । তার সময়ে দলে একজন ন্যাচারাল ড্রিবলার ডি মারিয়া ছিল দেখে জিনিসটা বোঝা যেত না । আর পরের মৌশুমে ছিল জেমস , সেও ড্রিবল করে , সাথে তার থ্রু পাস খেলার প্রবনতাও অনেক বেশি । এইজন্য ক্রুস-মদ্রিচের সাথে মাঠে জেমস থাকলে খেলায় অনেকখানি ভ্যারিয়েশন আসে । মাদ্রিদ এইবারের সাথে ৪-১ এ জিতল , ওই ম্যাচে বোঝা গেছে , ক্রুস-মদ্রিচ-ক্যাসেমিরোর সাথে জেমস থাকলে গেমপ্লে টা কেমন হতে পারে । অনেক অনেক ক্রস সাথে অনেক অনেক থ্রু পাস ।

এখনও সময় আছে হাতে । জিদান ব্যবহার করবে কি না জানিনা । তবে একভাবেই এটি সম্ভব । জেমস কে সেন্টারে খেলানো । রোনালদো আর বেলের মাঝে । একদম ফ্ল্যাট ৪-৩-৩ , বেনজেমা/মোরাতার জায়গায় জেমস , ফলস নাইন হিসেবে অনেকটা ।

মাদ্রিদ যখন পজেশনে , তখন মাদ্রিদের সবচে ওয়াইডেস্ট প্লেয়ার হবে মার্সেলো আর কারভাহাল , দুই উইংব্যাক । তারা অলমোস্ট উইংগারের জায়গাতেই চলে আসে , ক্রুস আর মদ্রিচের প্যারালালি ।
ক্যাসেমিরো এইসময় ড্রপ ব্যাক করে রামোস আর পেপে/ভারান এর মাঝামাঝি কোন একটা জায়গায় ।

রোনালদো লেফট থেকে স্বাভাবিকভাবে এইসময় সেন্টারের দিকে কোনাকুনি রান নেয় স্ট্রাইকিং পজিশনে যেতে , আর বেল রাইট উইং থেকে ২০-২৫ গজ মিডলের দিকে এরকম একটা জায়গায় রোম করে , যাতে সেন্টারেও ঢুকতে পারে আবার ক্রসিং এও যেতে পারে ।

এই সময় মাঠে জেমস থাকলে ড্রপ ব্যাক করে , ক্রুস – মদ্রিচের সাথে রোনালদো বেলের লিঙ্ক আপ করে খেলবে , যেটা বেনজেমা/ মোরাতার থেকে সম্ভব না । সাথে এডিশোনালি , জেমস খুবই রেগুলার একজন গোলস্কোরার ।
জানিনা জিদানের কি প্ল্যান , তবে আমার ধারনা , কিছু কম্প্যাক্ট ডিফেন্সের বিরুদ্ধে সামনের ম্যাচগুলিতে এরকম কিছু করলেও করা যেতে পারে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

14 − fourteen =