ছোট হচ্ছি অন্যখানে

২০১৬ এর জুন থেকে এক ধাক্কায় চলে যাবো ৬ বছর আগে । ২০১০ এর ফুটবল বিশ্বকাপের সময়কার কথা । দক্ষিণ আফ্রিকা ওয়ার্ল্ড কাপে ব্রাজিল তাদের প্রথম ম্যাচ খেলে এশিয়ার উত্তর কোরিয়ার সাথে । ম্যাচটা ২-১ গোলে জেতে ব্রাজিল । গোলমুখ খুলতে সময় লেগেছিলো ৫৫ মিনিট আর মাইকনের অসাধারণ এক দুরূহ এঙ্গেলের শট । ম্যাচে এলানোর গোলের পরে ব্রাজিল ২-০ করে ফেললেও জি উন-নাম ম্যাচের শেষ বাঁশির ১ মিনিট আগে গোল দিয়ে ম্যাচের স্কোরলাইন বানিয়ে দেন ২-১। আর খেলা শেষ হয় ওভাবেই । তবে আজ ২০১৬ তে বসে মাইকনের গোল বা ২-১ গোলের জয় কোনোটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আমার স্মৃতিতে ধরা দিচ্ছে না ।

যেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এই অধমের স্মৃতিতে ধরা দিচ্ছে সেটা হলো ম্যাচের পরের দিন কোন একটা বাংলা পত্রিকায় ব্রাজিলকে এমন চাপে ফেলে দেওয়া উত্তর কোরিয়ার কোচকে নিয়ে করা একটা ফিচার । ফিচারটাতে আসলে কি ছিলো ? নাহ ! তাতে নর্থ কোরিয়ানদের নিয়ে পত্রিকাওয়ালাদের অত্যুক্তি ছিলো না … আবার ডিফেন্সিভ খেলা তখনকার কোচ দুঙ্গার মুন্ডূপাতও ছিলো না । তবে নর্থ কোরিয়া কোচ কিম জং হানের একটা কোটেশন ছিলো । সেটা আজ ৬ বছর পরেও আমার মাথাতে সঁটকে আছে ভালোমতো । হুবহু তুলে দিচ্ছি ।

‘গোলের পর আমাকে আনন্দিতই দেখে থাকবেন। কারণ আমরা দেখাতে পেরেছি ব্রাজিলিয়ানদের বিপক্ষেও গোল করার সামর্থ্য আমাদের আছে এবং এটা অবশ্যই গর্বের।’
এসব কোটেশন পড়লেই ব্রাজিল সাপোর্টার হিসেবে ভিতর থেকে ফিলিংসটা অন্যরকম হত । ভাবুন একবার ! আজ থেকে ৬ বছর আগেও বিশ্বকাপ খেলতে আসা নর্থ কোরিয়ান কোচদেরও ব্রাজিলের সাথে হারার পরেও একটা গোল করতে পারলে সেটা নিয়ে গর্ব করত আলাদাভাবে । সেই দিনগুলোতেও ব্রাজিলের সাথে গোল করাটা আলাদা কোয়ালিফিকেশন ছিলো ।

কারণটা হচ্ছে আমাদের হলুদ-সবুজ ব্রাজিল ফ্ল্যাগ ফুটবলের আলাদা একটা ব্র্যান্ড ছিলো । ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলতে পারাই ছিলো মিডিওকোর দলগুলোর জন্যে আলাদা কিছু। ২০০৬ বিশ্বকাপে ইকুয়েডরকে হলুদ জার্সি পরে খেলতে দেখলে মানুষ মনে মনে বলত, ফুটবলে এ রংটা অন্য কারো জন্যে আলাদা করা ! এ রংটা ইকুয়েডরের জন্যে না । সেই যুগটাতেও ডীডো নামের ফুটবল কোচ বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচিং করাতে আসলে আমাদের সাংবাদিকরা তাকে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে প্ল্যান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা না করে পেলে, রোনালদো আর জিকোকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে। আর ডিডোরা এসে গর্ব করে বলত আমি পেলে আর রোনালদোর দেশ থেকে এসেছি। আমি ব্রাজিল থেকে এসেছি !

আর আজ ছয় বছর পরের পরিস্থিতি ভাবুন একবার ! ইকুয়েডরের সাথে ড্র করে ব্রাজিলের কোচ-ক্যাপ্টেন নিজেদের ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেন। “আমরা বেশি সুযোগ সৃষ্টি করেছিলাম”-এই টাইপের কুটনৈতিক কথাবার্তা বলে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন । পানামা-হাইতির সাথে ম্যাচের আগে অনেক সতর্ক হয়ে কথা বলেন । দুঙ্গার কাছে ব্রাজিল ফুটবলের সাফল্যের সাথে জলাঞ্জলি যাচ্ছে মান সম্মান । ম্যাচ হারছি-ড্র করছি-কষ্ট করে জিতছি । কিন্তু ধারে ভারে ৫ তারার জার্সি যে দিনকে দিন ধুলোয় লুটাচ্ছে অগোচরে, সে খবর কি রাখি ? আমি বিশ্বাস করি, ট্যালেন্ট গ্যাপ আমাদের কোন জেনারেশনেই ছিলো না। ১৯৭০ এর পরে ব্রাজিল ওয়ার্ল্ড কাপ জেতে ১৯৯৪ তে । ২৪ বছরের গ্যাপ । কিন্তু মাঝের ২৪ বছরে আমাদের ট্যালেন্ট গ্যাপ নিয়ে কেউ কোন শব্দ উচ্চারণ করার সাহস পায় নি । কারণ ৮২ এর দলটা ছিলো জেনারেশনের সবচেয়ে সুন্দর খেলা দল । আর ব্র্যান্ডিংটা নিজেদের মধ্যে রেখেছিলো বলেই বিশ্বকাপ না জেতাতে পারলেও ৩৫ বছর পরে এসেও আমরা জিকো-সক্রেটিসদের নিয়ে কথা বলি ।
হারজিতের প্রশ্ন অনেক পরে ।
আমরা হারার চাইতে পাশে পাশে হেরে যাচ্ছি অনেক জায়গায় !
সত্যি বলছি, সাত গোলের হার কষ্ট দেয় না … দুঙ্গার এসব মিনোস মার্কা সিলেকশন আর কমেন্ট কষ্টের সাথে লজ্জ্বাও দিয়ে দেয় ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × 2 =