এক সর্বজয়ীর কথা

ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুলব্যাক কে? এই জেনারেশানের ফুটবলমোদীদের কাছে এই প্রশ্নটা রাখলে প্রায় শতভাগের কাছ থেকেই উত্তর আসবে কাফু, রবার্তো কার্লোস, দানি আলভেস, ফিলিপ লাম, গ্যারি নেভিল, হাভিয়ের জানেত্তি, পল ব্রাইটনার, পাওলো মালদিনি (যিনি সেন্টারব্যাক হিসেবেও সমভাবে সফল) – দের কথা। কেউ কেউ একটু পিছিয়ে গিয়ে হয়তোবা টানতে পারেন জালমা সান্তোস, নিলটন সান্তোস কিংবা কার্লোস আলবার্তোদের কথাও। ফুটবল তাঁদের প্রত্যেককেই দু’হাত ভরে দিয়েছে – নাম, যশ, খ্যাতি।

কয়জন মনে রেখেছে একজন ফিলিপ জর্জ নিল এর কথা?

কি?

নামটা প্রথম শুনলেন, তাই ত?

অথচ ইংলিশ মিডিয়া যেভাবে ঐতিহ্যগতভাবে সবসময়েই নিজেদের ঢাকঢোল পেটায়, তাতে নামটা না শোনার কথা না আমাদের কারোরই। কিন্তু তাও দেশের ১০০ জন ফুটবল ভক্তকে জিজ্ঞেস করলে তাঁর মধ্যে অন্তত ৯৯ জন ফিল নিল কে, জিজ্ঞেস করলে চিনবেন না।

সারাজীবনই ফিল নিল ছিলেন এরকম নিভৃতচারী। অথচ নিজের যোগ্যতাবলেই তিনি লিভারপুলের মত ক্লাবের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন খেলোয়াড়। আশির দশকের সর্বজয়ী লিভারপুলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন তিনি। শুধু লিভারপুলই বা কেন হবে, ইংল্যান্ডের অন্য কোন খেলোয়াড়ই তাঁর থেকে বেশী কিছু জেতেন নি।

দানি আলভেস, কাফু বা কার্লোস – এদের মত চোখধাঁধানো আগ্রাসী সাহসী আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক কখনই ছিলেন না, কিন্তু লিভারপুল দলের “মিস্টার ডিপেন্ডেবল”, “মিস্টার কনসিস্টেন্সি” ছিলেন তিনিই – ডাকনামগুলো এমনি এমনিই আসেনি। দুই ফুলব্যাক পজিশানেই সমান স্বচ্ছন্দ এই ইংলিশম্যান শেষ পর্যন্ত রাইটব্যাক পজিশানটাকেই বেছে নেন নিজের হিসেবে। চতুর্থ বিভাগের দল নর্দাম্পটন টাউন থেকে তৎকালীন লিভারপুল ম্যানেজার বব পাইসলি যখন নিয়ে আসলেন, সবাই অত বেশী উচ্ছ্বসিত হননি তাঁর আগমনে – যেটা কিনা স্বাভাবিক, কোন সুপারস্টার ত তিনি ছিলেন না যে যার আসা নিয়ে মাতামাতি হবে! কিন্তু পাইসলি জানতেন তিনি কি এনেছেন, শুধু তাই-ই নয়, পাইসলি লিভারপুলের ম্যানেজার হবার প্রথম এই নিল কেই সই করিয়েছিলেন লিভারপুলের হয়। একজন ফুটবলারের প্রতিভা সম্বন্ধে কতটা নিঃসংশয় হলে এটা করা যায়? ম্যানেজার ত তাঁর প্রতিভা সম্বন্ধে অবগত ছিলেনই, সমর্থকেরাও তাঁর প্রতিভা সম্বন্ধে জানতে পারলেন তাঁর অভিষেক ম্যাচেই, নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী এভারটনের বিপক্ষে। হাজার হাজার চিৎকার করতে থাকা একই শহরের শত্রুভাবাপন্ন দুই ক্লাবের সমর্থকদের সামনে কি ঠান্ডা মাথাতেই না লিভারপুলের ডিফেন্সের ডানদিকটাকে সামলে রাখলেন তিনি!

প্রথমবার যখন বব পাইসলি ফিল নিল কে দেখার জন্য নর্দাম্পটন টাউনের একটা ম্যাচ দেখতে গেলেন, মিনিট বিশেক বোধহয় নিল খেলেছিলেন রাইটব্যাক হিসেবে। তারপর গোলরক্ষকের ইনজুরির কারণে হাতে গ্লাভস পরে সোজা নেমে গেলেন কিপিং করতে! ফিল নিলের বৈশিষ্ট্য ছিল এটাই। কি ডিফেন্স, কি মিডফিল্ড, কি কিপিং, সবজায়গাতেই সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি! লিভারপুলের তখনকার গোলরক্ষক, লিভারপুলের আরেক কিংবদন্তী রে ক্লেমেন্সের মতে, ফিল নিল তাঁর থেকেও ভালো গোলরক্ষক ছিলেন!

চাপ সহ্য করার অনবদ্য ক্ষমতা থাকার জন্যই পেনাল্টি নেওয়ার মত চরম স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্তগুলোর জন্য তাঁর উপরেই ভরসা করা হত বেশী। তাঁর এই এক পেনাল্টি কিকেই লিভারপুল জিতেছিল প্রথম ইউরোপীয় শিরোপা, এখন যেটা চ্যাম্পিয়নস লিগ নামে পরিচিত। যেই শিরোপাটা তিনি তাঁর ক্যারিয়ারে জিতেছেন আরো তিনবার। চার-চারবার ইউরোপীয় ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা জেতা এই খেলোয়াড়ের থেকে বেশী ইউরোপীয় শিরোপা আছে কেবলমাত্র রিয়াল মাদ্রিদের প্যাকো জেন্টো ও আলফ্রেডো ডি স্টেফানো, আর এসি মিলানের পাওলো মালদিনির। প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের প্রাক্কালে মহাগুরুত্বপূর্ণ সেই পেনাল্টিতে গোল করা ছাড়াও তাঁর আরেকটি গোলে লিভারপুল আরেকটি ইউরোপীয় শিরোপা লাভ করে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করার এই অভ্যাসের জন্য সতীর্থদের কাছে তাঁর ডাকনামই হয়ে গিয়েছিল “জিকো”, ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তীর নামে নাম!

 

লিভারপুলের হয়ে ৬৫০ ম্যাচ খেলে সর্বমোট ৫৯ গোল করা এই ডিফেন্ডার এককালে টানা ৪১৭ টা ম্যাচ খেলেছিলেন। জ্বি, ভুল পড়েননি। চারশ’ সতেরটি। তাও থামতে হত না যদি না ডার্বি কাউন্টির স্ট্রাইকার রজার ডেভিসের কনুই খেয়ে তিন ম্যাচের জন্য মাঠের বাইরে যেতে না হত। তারপর মাঠে ফিরেই আবার খেলেছেন টানা ১২৭টি ম্যাচ। এখনকার কোন খেলোয়াড়ের কি আছে এতটা স্ট্যামিনা? মনে হয় না!

লিভারপুলের হয়ে আটবার লিগ শিরোপা, চারবার লিগ কাপ, চারবার ইউরোপিয়ান কাপ (চ্যাম্পিয়নস লিগ), একবার ইউয়েফা কাপজয়ী এই সর্বজয়ী ডিফেন্ডারকে জন্মদিনে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

six + one =