পরিকল্পনাহীনতার খেসারত

goal bangladesh

২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপ/২০১৯ এএফসি এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ারে হোঁচট খেয়েছে বাংলাদেশ। নিজ দেশের মাটিতে ৩-১ গোলে হেরে গেছে কিরঘিজস্তানের কাছে।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংটা যে নিছক সংখ্যা ছাড়া কিছুই না সেটা বোঝা গেল ভালোমতই। র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৭৭ নম্বরে কিরগিজরা, বাংলাদেশ ১৬৬। কিন্তু র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসাব বড় অর্থহীন। কোন দেশের ফুটবল কত সুবিধা পায়, খেলোয়াড়দের মান কিরকম, খেলোয়াড়রা কোথায় খেলে, বিদেশের প্রতিযোগিতামূলক লিগে খেলে নাকি, না খেললে কেন খেলে না, নিজ দেশে লিগের অবস্থা কিরকম – এসব জিনিসগুলোর প্রতিফলন ঘটে না ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে। র‍্যাঙ্কিংয়ে বোঝা যায় শুধু ম্যাচের দিনের হিসাব। আজ সেটাই বোঝা গেল আরও ভালোভাবে। র‍্যাঙ্কিংয়ে পেছনে হলেও কিরঘিজদের ফুটবল যে বাংলাদেশের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে, মাঠের হাজারখানেক দর্শক দেখল তা-ই।

ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উপর একরকম ছড়ি ঘুরিয়েছে কিরঘিজস্তান। নিজেরা তিনটা গোল তো করলই, বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র গোলটিতেও ‘অবদান’ তাদের। সেটি যে আত্মঘাতী! কি শারীরিক গড়ন, কি ব্যক্তিগত স্কিল, কি বড় মঞ্চে মাথা ঠান্ডা রেখে আসল কাজটুকু করার ক্ষমতা, কি পেশাদারিত্ব – কিরঘিজরা আজকে তাই দেখিয়ে দিয়ে গেল।

ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ মূলতঃ ৪-৩-৩ ফর্মেশানে। একাদশে ছিলেন – রাসেল, নাসির, তপু, ইয়ামিন, ইয়াসিন, জামাল, মামুনুল, হেমন্ত, সোহেল রানা, এনামুল ও এমিলি।

আজকের বাংলাদেশের ফর্মেশান
আজকের বাংলাদেশের ফর্মেশান

ডেডবল সিচুয়েশানে আমাদের সমস্যা চিরন্তন। প্রথম গোলটাও এসেছে এই ফ্রি কিক থেকেই। জেমলিয়ানুখিন অ্যান্টনের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক গোলরক্ষক রাসেল মাহমুদকে বোকা বানাল। রাসেলেরও কপাল খারাপ বলতে হবে। তার হাতে লেগে বল বারে লেগে তারপর পোস্টে ঢুকে যায়। ২৭ মিনিটে বক্সের মধ্যে ভিক্টর মাইয়ারকে ইয়ামিন মুন্না ফাউল করলে পেনাল্টি পায় কিরগিজস্তান। পেনাল্টিটি কার্যকর করেন এডগার বার্নহার্ডট। এখানেও রাসেলের দুর্ভাগ্য বলতে হবে। এখানেও ঠিক দিকেই লাফ মেরেছিলেন তিনি, এখানেও হাতে বল লেগে তারপর বারে লেগে জালে জড়ায়!

তা দুর্ভাগ্য হোক আর যাই হোক, রাসেলের নিজের দোষও কম ছিল না। বলের ফ্লাইট ঠিকমত বুঝতে না পারার সমস্যাটা তাকে ভুগিয়েছে পুরো ম্যাচে। সেই আমিনুল-বিপ্লব কিংবদন্তী দুই গোলরক্ষকের পর বাংলাদেশের গোলকিপিং পজিশান নিয়ে যে মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা চলছে হিমেল নেহাল লিটন আর রাসেলের মধ্যে – প্রত্যেকেরই এই সমস্যা বিদ্যমান।

গোল খাওয়ার পরেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে একটু বাংলাদেশ। ৩১ মিনিটে আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে আনে বাংলাদেশ। মামুনুলের কর্নার সেই এডগার বার্নহার্ডট হেড করে বাঁচানোর মুহূর্তে তা নিজেদের গোলে প্রবেশ করে। গ্যালারীতে জীবন ফিরে আসে।

কিন্তু যথারীতি পুনরায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় কিরঘিজরা। ৪১ মিনিটে ভ্যালেরি কিচিন আবার ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। স্কোরলাইন হয় ৩-১।

"ওয়াচ ফুটবল বাংলাদেশ" এর ব্যানারে একদল বাংলাদেশীদের সপ্রতিভ উপস্থিতি ছিল আজকেও
“ওয়াচ ফুটবল বাংলাদেশ” এর ব্যানারে একদল বাংলাদেশীদের সপ্রতিভ উপস্থিতি ছিল আজকেও

জামাল ভুঁইয়া যে বাংলাদেশের মিডফিল্ডের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আরও ভালোভাবে বোঝা গেল আজকে। গোটা ম্যাচে তিনি ছিলেন নিষ্প্রভ। যার প্রভাব পড়েছে ম্যাচে। অধিনায়ক মামুনুল চেষ্টা করে গেছেন যথাসাধ্য। কিন্তু ফ্লপ জামাল আর হেমন্ত মামুনুলকে সাহচর্য দিতে পারেননি ভালোমত। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য মামুনুলের দুটি প্রচেষ্টা অল্পের জন্য ব্যর্থ হয়। এর মধ্যে একটি ছিল ফ্রি কিক। এনামুলের একটি শটও কিরগিজ পোস্টেও কিছুটা বাইরে দিয়ে চলে যায়।

এদিকে এনামুলকে উইংয়ে খেলানোর সিদ্ধান্তটা প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে। উইংয়ে জাহিদ হোসেনের অনুপস্থিতি ভালোই ভুগিয়েছে। এনামুল একজন আউট অ্যান্ড আউট স্ট্রাইকার, উইংএ তিনি নিরর্থক দৌড়েই বেড়িয়েছেন শুধু। জাহিদ হাসান এমিলি যথারীতি খেলেছেন বাজে। গোটা ম্যাচে একটাও ভালো সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। অ্যাটাকিং থার্ডের এই দুইজনের সাথে তাল মিলিয়ে জঘন্য খেলেছেন আরেক উইঙ্গার সোহেল রানাও। বহুবছর পরে বাংলাদেশের পাওয়া এই ট্যালেন্টেড স্কোয়াডের সাথে এমিলির মত স্লো স্ট্রাইকার কতদিন খেলতে পারেন এই ফর্ম নিয়ে সেটা দেখার বিষয়। পুরা ম্যাচে শুধু লং বলের উপর নির্ভর করে খেলাটা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লেগেছে। নিচ থেকে আস্তে আস্তে আক্রমণ করার কোন প্রবণতা দেখা যায়নি। খেলার পরিকল্পনা ছিল অনেকটা ডিফেন্স থেকে কোনরকমে বল বের করে মামুনুল বা জামালের পায়ে দাও, তারা লং বল আকাশে ভাসিয়ে হয় এনামুল বা এমিলি বা সোহেল রানার কাছে পাঠাবে ; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেসব বলগুলো ধরে আক্রমণ শাণাতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। ডিফেন্সে ছিল ভুল পাসের ছড়াছড়ি। সবমিলিয়ে সব দর্শকের মত কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফও ছিলেন যারপরনাই হতাশাগ্রস্থ, যার প্রতিফলন ম্যাচের শেষদিকে তার লালকার্ড খাওয়া!

তবে বাংলাদেশকে অযথাই দোষ দিয়েও লাভ নেই। গোটা কিরঘিজ দলের চারজন খেলেন জার্মানিতে, গোলদাতা অ্যান্টন খেলেন সার্বিয়ার প্রথম বিভাগে, মিডফিল্ডার আখিদিন ইজরাইলভ খেলেন বিশ্বখ্যাত ক্লাব ডায়নামো কিয়েভের যুবদলে। সে তুলনায় বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা সেভাবে বিদেশে গিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের সাথে নিজেকে পরিচিত করতে পারেন কই? মাঝে শোনা গেল জামাল মামুনুল থাইল্যান্ডে খেলার অফার পেয়েছেন, মামুনুলকে চাচ্ছে রিয়াল মায়োর্কার যুবদল, এফসি টোয়েন্টিতে ট্রায়াল দিয়ে এসেছিলেন হেমন্তও। তারমানে এটা মোটামুটি সন্দেহাতীত, যে দেশের ফুটবলে যথেষ্টই প্রতিভা আছে। শুধু দরকার সঠিক পরিচর্যা ও সুষ্ঠু পদক্ষেপ।

১৬ তারিখে এখন তাজিকিস্থানের সাথে আবারও আশায় বুক বাঁধা!

 

ছবি কৃতজ্ঞতা – গোলবাংলাদেশ ডটকম

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

18 + eight =