বাংলাওয়াশ= বৈশাখী উপহার এবং পাকিস্তানি ক্রিকেটের মৃত্যু

‘পাকিস্তানের ক্রিকেট, ২২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে ঢাকার মিরপুরে মৃত্যুবরণ করেছে এবং এটার দেহাবশেষ বাংলাদেশেই রাখা হয়েছে’ হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাচ্ছে, তাইনা? অ্যাশেজ সিরিজের মহাকাব্যের ভিত কিন্তু এরকম একটা এপিটাফের সূত্রেই রচিত হয়েছিলো। এখন পাকিস্তানি পত্রিকা সেটির অনুকরণ করলেও দলের সেটা না করার সম্ভবনাই বেশি। কে হায় ইচ্ছা করে ধোলাই হতে ভালবাসে!?
তিনটি ম্যাচেই বিজয় নিশান উড়েছে আমাদের। সেটা যদি বড় খবর হয় তাহলে তার থেকেও বড় খবর হচ্ছে জেতার ধরন। আমি এর আগে বলেছিলাম, খেলা দেখে আমার অস্ট্রেলিয়ার কথা মনে হচ্ছে, সেই ধারণা শেষ ম্যাচে আরও প্রবল হয়েছে তামিম সৌম্যার ওপেনিং জুটির ধুন্ধুমার শুরু আর সৌম্যার হার না মানা একটা দুর্দান্ত শতকে। তার একেকটা বিশাল শট আছড়ে পড়েছে গ্যালারীতে আর আমার মনে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সেই বিখ্যাত ওপেনিং জুটি হেইডেন আর গিলির কথা। হেইডেন এর মতোই দীর্ঘদেহী সৌম্য যখন বলকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন, সে বল সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো অনায়াসে। বোলারদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে, ভিভ এর স্টাইলে তাদের আত্মবিশ্বাস দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে ছক্কা মেরে শতক পূর্ণ করেছেন, তারপর অপরাজিত ছিলেন তরী তীরে ভেড়া পর্যন্ত।
ভাবতে পারেন, পর পর তিন ম্যাচে আমাদের বোলারদের ব্যাট হাতে নামতেই হয়নি। শেষ দুই ম্যাচে তো নাসির সাব্বিরদেরও দরকার হয়নি ব্যাট হাতে নামার। তারা দর্শকের মতো উপভোগ করেছেন তামিম মুশির ব্যাটিং। এই কাজটা আমাদের বিপক্ষে আগে অন্যরা করতো। সত্যি, আমাদের দলটা বদলে গেছে অনেক। সব থেকে বড় কৃতিত্ব অবশ্যই আমাদের যোগ্য সেনাপতির। তিনি কখনই হাল ছেড়ে দেননি নিজের জীবনেও, আবার দল চালাতে গিয়েও। শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবার ক্ষমতা, সতীর্থদের চাঙ্গা রাখার ইচ্ছা আর বিনা যুদ্ধে একটু জায়গাও না দেবার মানসিকতাই তার অস্ত্র। তার এই অস্ট্রেলিয়ান মানসিকতার ছোঁয়াতেই বদলে গেছে দলটা। মুশি অঙ্কে ভালো ব্যাটসম্যান, কিন্তু সবাই তো সব পারেনা, তেমনি তিনি অধিনায়ক হিসেবেও ঐ মানের না। একজন স্টিভ ওয়াহ যেমন তরুণ একটি দলকে নিয়ে বিশ্বজয় করেছিলেন, দলটিকে প্রায় অজেয় দলে পরিণত করেছিলেন, তেমনি আমাদের নড়াইল এক্সপ্রেস আমাদের দলকে পাল্টে দিয়েছেন। এখন দলটা হারার আগেই হেরে বসে থাকেনা, রক্ষনাত্মক খেলেনা।
‘আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্নিশ’ এই ধারণা নিয়ে একটা দল যখন খেলে তখন কি হতে পারে সেটা দেখতে চাইলে ৯৬ বিশ্বকাপের শ্রীলঙ্কাকে দেখতে পারেন। কোন গলি থেকে উঠে এসে বিশ্বসেরা হয়ে উঠলো রানাতুঙ্গা বাহিনী। আমাদের তামিম এবার সব সমালোচনার জবাব দিলেন ব্যাট দিয়ে। দুই সেঞ্চুরি আর এক অর্ধশতকে এই সিরিজের সেরা ব্যাটসম্যান তামিম। আর আমাদের মুশফিক হচ্ছেন ধারাবাহিক দ্য গ্রেট! চাইলে মারতেও পারেন, ছাড়তেও পারেন। মারলে বল ফিল্ডারের হাতে না গিয়ে দর্শকের হাতে যায়! আর ব্যাটের একটুকু ছোঁয়া দিলেই সীমানা পার হয় বল গড়িয়ে গড়িয়ে। সব মিলিয়ে তিনি আমাদের মাহেলা।
শেষ ওয়ানডেতে পাকিস্তানের স্কোর এক পর্যায়ে ছিল দুই উইকেটে ১৮৪। মনে হচ্ছিলো ৩০০ হল বলে। শেষ পর্যন্ত তাদের দৌড় থামল ২৫০ তে।এ যে নতুন বাংলাদেশ! আমাদের ফিল্ডিং যতটাই ভালো ছিল, ওদেরটা ছিল পাড়ার দলের চেয়েও খারাপ! একের পর এক ক্যাচ তাদের মাখন মাখা হাত গলে বের হয়েছে আর হাসিতে ফেটে পড়েছে বাংলাদেশ! অভিনন্দন বাংলাদেশ! পাকিদের বৈশাখী উপহার দেবার জন্য!
দেখুক সারা দুনিয়াটা,
আমরাও পারি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

14 + twelve =