পাবলো এস্কোবার ও নার্কো ফুটবল- ১ম পর্ব

১৯৮৯ সালের ফোর্বস ম্যাগাজিনের ধনকুবদের তালিকায় সপ্তম নাম্বারে ছিলেন অপ্রমেয় ক্ষমতার মালিক পাবলো এমিলিও এস্কোবার গারিবিয়া।তিনি যথেষ্ট কুখ্যাতিপূর্ণভাবে ২০ বছর ধরে পরিচালনা করেছিলেন “মেদেলীন” ড্রাগ কার্টেল।চোরাচালান,ঘুস,হত্যা নিজের কার্য সাধনে মানে কিং অফ কিংস হতে কোনো কিছুই বাদ রাখেননি এস্কোবার।মৃত্যুর এতবছর পরেও পাবলো এস্কোবার হয়ে আছেন ড্রাগ-বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত ক্ষৌণীশদের একজন।


১৯৫০ এর দশক ছিলো কলম্বিয়ান ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনজক এবং হিংসাত্নক সময়।যেটিকে বলা হত ‘লা ভায়োলেন্সিয়া এরা’।এরই অল্প আগে শিক্ষক এবং কৃষক বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন পাবলো এস্কোবার। অন্যসব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোনই ছিলো এস্কোবার পরিবার। মাঝে আর্থিক দৈন্যদশায় পড়লে এস্কোবার ও তার ভাইকে মেদেলীন শহরে দাদীর কাছে পাঠিয়ে দেন তাদের বাবা।মেদেলীন হচ্ছে কলম্বিয়ার দ্বিতীয় জনবহুল শহর।এই মেদেলীনই পরবর্তীতে যে পাবলো এস্কোবারের নিজের সর্গ হয়ে উঠবে সেটা খোদ এস্কোবারই ভাবেনি। ‘ইউনিভার্সিটি অফ আন্তিওকুইয়া’ তে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকান এস্কোবার।যদিও খুব অল্পসময়ই ছিলেন সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ যোগাতে না পারাই যার একমাত্র কারণ। টাকাপয়সার প্রতি তীব্র ঝোঁক এবং নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত ক্ষমতা এস্কোবারকে অর্গানাইজড ক্রাইমের দিকে প্রচন্ড টানতে লাগলো।যার ফলশ্রুতিতেই ১৯৭০ সালে অন্য মাদক-পাচারকারীদের নিয়ে গঠন করলেন মেদেলীন কার্টেল।১৯৮০ সালে আমেরিকানদের বিনোদনের উৎস হয়ে উঠা কোকেইনই এস্কোবারসহ বাকীদের পকেটে পুরে দিতে লাগলেন অগনিত মার্কিন ডলার।সর্বত্র আকাশচুম্বী চাহিদা ঠিকঠাক মতোন পূরণ করেই মেদেলীন কার্টেল হয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ড্রাগকার্টেল।সারাবিশ্বের প্রায় ৮০% কোকেইনের বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছিলো এই কার্টেলের হাতে।


গতানুগতিক মাদক সাম্রাজ্যের রাজাদের মতোন সুবৃহৎ অট্টালিকায় বসবাস,জাঁকজমক পার্টিতে মেতে থাকার পাশাপাশি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানাও ছিলো এস্কোবারের।শ্রমিকশ্রেনীর প্রতি তার দানশীলতা কলম্বিয়ার সবমানুষের মন জয় করেছিল।কোকেইন ব্যবসায় কামানো টাকা দিয়ে দরিদ্র মেদেলীনবাসীর জন্যে এস্কোবার বানিয়েছেন বাসস্থান,স্কুল,চার্চ,পার্ক এবং ফুটবল গ্রাউন্ডও।প্রায় বাকীসব দক্ষিণ আমেরিকান দেশের মতোন ফুটবল কলম্বিয়ানদের জীবনেও বহন করে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।কারণ দরিদ্রের শিকল থেকে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মুক্তি মিলে এই ফুটবলেই। কলম্বিয়ান ফুটবলের অনেক মেধাবী খেলোয়াড়ই উঠে এসেছে এস্কোবারের বানানো ফুটবল মাঠ থেকে। এমনকি অনেক নামীদামী ফুটবলারদের সাথেও ছিল এস্কোবারের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক।তাদেরকে নিজের র্যা ঞ্চে আমন্ত্রণ জানাতেন প্রীতি ফুটবল ম্যাচ খেলার জন্যে এবং সেই ম্যাচগুলোতে এস্কোবার ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী ‘কালি কার্টেল’ এর মিগুয়েল রদ্রিগেজ ওরেহুয়েলা ম্যাচের ফলাফল নিয়ে ধরতেন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বাজি।এটা ছিল এস্কোবারের কলম্বিয়ান ফুটবলে ফুটবলার না হয়েও অভিষেক।স্রোতের মতোন আসতে থাকা অবৈধ টাকাকে বৈধ করার জন্যে ফুটবলের থেকে ভালো বিকল্প কী আর হতে পারে!ম্যাচ টিকেট বিক্রি,খেলোয়াড়দের ট্রান্সফার এবং ক্লাবের প্রায় অন্যান্য সব সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছেন পাবলো এস্কোবার,মানি লন্ডারিংই ছিল যার মূল অভিপ্রায়।

১৯৮০ সালে কলম্বিয়ান ঘরোয়া লিগে হঠাৎ করেই মেদেলীন শহরের ক্লাব ‘অ্যাটলেটিকো ন্যাসিওনাল’ এর গাগনিক উত্থান শুরু হয়।ক্লাবে এস্কোবারের অঢেল বিনিয়োগই যার হেতু।স্পৃহণীয় কোচকে আনা এবং ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ মেধাবী খেলোয়াড়দের টাকার অভাবে যাতে ক্লাব ছাড়তে না হয় এসব কোনো কিছুই এড়ায়নি এস্কোবারের চোখ।১৯৮৯ সালে অ্যাটলেটিকো ন্যাসিওনাল বিখ্যাত কলম্বিয়ান কোচ ফ্রান্সিসকো মাতুরানার অধীনে প্রথমবারের মতোন জিতেন দক্ষিণ আমেরিকান ক্লাব ফুটবলের মহত্তম পুরস্কার কোপা লিবার্তোদোরেস।রেনে হিগুইতা,আন্দ্রেস এস্কোবার এবং লেওনেল আলভারেজের মতোন তারকাখচিত দল নিয়ে এই কীর্তি অর্জন করেন কোচ ফ্রান্সিসকো।এই ফ্রান্সিসকো মাতুরানাই পরবর্তীতে ২০০১ সালে কলম্বিয়াকে প্রথমবারের মতোন জেতান কোপা আমেরিকা।লিবার্তোদোরেস ফাইনালে প্যারাগুয়ের ক্লাব অলিম্পিয়াকে টাইব্রেকারে পরাজিত করে ন্যাসিওনাল।চারটি পেনাল্টিকিক তো রুখে দিয়েছিলেনই স্পট থেকে নিজের কিকটিও জালে জড়াতে ভুল করেননি গোলরক্ষক হিগুইতা।এই অর্জনকে আরো রাঙিয়ে দেয়ার জন্যে পুরো ন্যাসিওনাল দলকে নিজের র্যা ঞ্চে আমন্ত্রণ জানান পাবলো এস্কোবার।ফুটবলার এবং ক্লাব স্টাফ সবাইকে দেন বিভিন্ন আকারে আর্থিক বোনাস।পাবলো এস্কোবারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্যান্য ড্রাগলর্ডরাও কলম্বিয়ান ফুটবলে নিজেদের ছাপ স্পষ্ট করানোতে খুঁজে পেলেন পরিতৃপ্তি।‘এল মেক্সিকানো’ জোসে গঞ্জালো রদ্রিগেজের ছিলো মিলোনারিওস এবং কালি কার্টেলের ‘এল সিনিওর’ মিগুয়েল রদ্রিগেজ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন “আমেরিকা দি কালি” এর।প্রভাবশালী ড্রাগলর্ডদের স্পর্শে কলম্বিয়ান ফুটবলের যেন জাঁকালো উত্থান।ফুটবল ইতিহাসে জন্ম নিলো নতুন অধ্যায়, “নার্কো-ফুটবল”।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × 5 =