কিউই রূপকথার পেছনের নায়ক

এমনিতেই ক্রিকেট খেলাটার ধাঁচই এমন যেখানে কোচ মিডিয়া ফোকাসটা খুবই কম পায় । ইউনাইটেডের স্বর্ণযুগের স্যার এলেক্স ফার্গুসনের নাম কোনভাবেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বা বেকহামের চাইতে কম আলোয় আসে নি , বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো প্রচারের আলোয় ছাড়িয়ে গেছেন এই মেগাস্টারদেরকেও । কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার হীরকযুগের রিকি পন্টিং আর ম্যাকগ্রাদের দলের কোচ জন বুকাননের নাম কয়জনেই বা জানেন ? তারপরেও ক্রিকেটে কোচদের নিয়ে যতোটা মাতামাতি আমাদের সাবকন্টিনেন্টে হয় , তার সিকিভাগও হয় না নিউজিল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় । একজন গ্রেগ চ্যাপেল বা একজন জেমি সিডন্স তবুও মিডিয়ার ফোকাসটা পান বাংলাদেশ বা ভারত বলে , কিন্তু একজন র্যা চেল ডমিঙ্গো (দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলের কোচ) অমন একটা দারুন দল গড়ে কতোটা আলোয় আসেন ? কম , খুবই কম ।
নিউজিল্যান্ড স্বাগতিক , বিশ্বকাপের আগে বেশ কিছু হোম সিরিজে দুর্দান্ত খেলেছে , দারুন কিছু প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় আছে কোরি এন্ডারসন বা ট্রেন্ট বোল্টের মতো , দলটা নিজেদের মাটিতে ঐতিহ্যগতভাবেই দুর্দান্ত- সবই ঠিক আছে , কিন্তু দলটা এমন ফাইনালে চলে আসবে ভেবেছিলেন ? তাও আবার একদম না হেরে ? আমি ভাবি নি । ভাবে নি বেশিরভাগ লোকই ।
তবে এই দলটির এতদূর আসার মাঠের কারিগরদের কথা তো সবাই জানে , পিছের লোকগুলোর কথা জানেন কয়জন ? বোলিং কোচটা তবু শেন বন্ডের মত একজন বলে মানুষের যা একটু আগ্রহ । কিন্তু হেড কোচ ? হেড কোচ মাইক হেসনের কথা জানেন কয়জন ?

nz_2499936b

হেসন সম্পর্কে কিছু বলা শুরু করার আগে যে কয়েকটি তথ্য না বললেই নয়ঃ
# ক্রিকেটার হেসন খেলতে পারেন নি ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটও । ওটাগোর ২য় বিভাগের দলের হয়ে খেলাই হেসনের খেলোয়াড়ি জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য ।
# ২০০৫-০৬ থেকে ২০১০-১১ পর্যন্ত হেসন কোচিং করিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ওটাগোকে । এ সময়টায় ছিলেন দেশটির এ দলের কোচও ।
# নিউজিল্যান্ডই হেসনের কোচিং করানো প্রথম আন্তর্জাতিক দল নয় । হেসন কোচিং করিয়েছেন কেনিয়া ক্রিকেট দল ও আর্জেন্টিনার ক্রিকেট দলকেও । কেনিয়ার চাকরি ছেড়ে দেন নিরাপত্তার অজুহাতে ।
হেসন দ্বায়িত্ব নেন এমন একটা সময়ে যখন নিউজিল্যান্ড জাতীয় দলটায় টিকছে না কোন কোচই । ২০০৮ সালে দীর্ঘদিন কোচিং করানোর পরে ব্রেসওয়েল দ্বায়িত্ব ছেড়ে দিলে এন্ডি মোলেস, মার্ক গ্রেটব্যাচ বা সাবেক ভারতীয় দলের কোচ জন রাইট দ্বায়িত্ব নিলেও বিভিন্ন কারণে থাকেন নি কেউই । মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ২০১২ সালের মাঝামাঝি দ্বায়িত্ব পান হেসন । চুক্তিটাও লম্বাই বলা যায় । ২০১৫ এর বিশ্বকাপ পর্যন্ত ।
তবে বয়সটা কোচের চাকরি বিচার করলে একটু বেশিই কম । তাই হয়তো দ্বায়িত্ব নেবার পরে দলের ঠান্ডা পরিবেশটা ধরে রাখতে পারেন নি । রস টেলরের সাথ বাগড়া বাঁধিয়ে ফেলেন প্রকাশ্যে । ব্রেন্ডন ম্যাককুলামের সাথে সখ্যতার কারণে ম্যাককুলামকে অধিনায়কের পদটা পাইয়ে দিয়েছেন এমন গুঞ্জন উঠেছে বারবার । মাঝে তো রস টেলর বিরক্ত হয়ে কিছুদিনের জন্যে নিজেকে রাখেন ক্রিকেটের বাইরে । টেস্ট-ওয়ানডে দুই ক্রিকেটেই দ্বায়িত্ব পেয়ে গেলেন ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম ।

ফাইনালে উঠার পরে দল নিয়ে মাঠ ছাড়ছেন
ফাইনালে উঠার পরে দল নিয়ে মাঠ ছাড়ছেন

তবে বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসতেই আস্তে আস্তে যেন ঠিক হয়ে যেতে থাকে সব । রস টেলরের সাথে পুরোনো হিসেবটা চুকিয়ে ফেলেন শান্তিপূর্ণভাবেই । ভারতের মত দলের সাথে হোম সিরিজ জেতার পাশাপাশি ব্ল্যাকক্যাপসরা পায় ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের সাথে এওয়ে সিরিজ জয়ের স্বাদ । তবে বাংলাদেশের সাথে এওয়ে সিরিজে দারুন একটি দল নিয়ে এসেও ভাঙতে পারেন নি বাংলাদেশ জুঁজুঁ । হোয়াইটওয়াশের স্বাদ পেয়েছেন আরেকবার ।
তবে পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে হেসনের আসল ক্রেডিটটা ছোট করে দেখা হবে । হেসনের কোচিং ক্যারিয়ারের মূল সাফল্য হল কিউই ক্রিকেটে নতুন একটা ভয়ডরবিহীন প্রজন্ম দাঁড় করানো । ডমেস্টিক লেভেল থেকে খুব ভালো কিছু ক্রিকেটার তুলে আনার মত সাফল্য হেসন দেখিয়েছেন যারা নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটকে পথে দেখাতে পারবেন অনেকদিন । কোরি এন্ডারসন অবশ্যই হেসনের সবচাইতে বড় আবিষ্কার যাকে ভাবা হয় নিউজিল্যান্ডের আগামীদিনের ক্রিস কেয়ার্নস । এডাম মিলনে শেন বন্ডের কথা মনে করিয়ে দেন বারবার । ম্যাট হেনরি , ম্যাকলেনাহানরা অতটা ফোকাসে না আসলেও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের ভক্তদের আশার আলো দেখাতে শুরু করেছেন এখন থেকেই । টম ল্যাথাম , ওয়াটলিং, জিমি নিশাম… আশাবাদী হবার তালিকাটা আরো বড়ই হতে পারে কেবল ।
৪০ বছর বয়সে মিসবাহ পাকিস্তানের দলটাকে লিড করলেন , সে-ই একই বয়সে হেসনের সামনে হাতছানি কোচ হিসেবে বিশ্বজয়ের হাতছানি । শত্রুশিবিরে ৪৫ বছর বয়সী ড্যারেন লেম্যান । দুই প্রতিবেশীর লড়াইয়ের সাথ সাথে বলতে পারেন দুই তরুণ কোচের লড়াই ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eighteen + 20 =