সাঙ্গাকারাঃ সবচেয়ে ভালো কিছুর মাপকাঠি

একটা সময় লারা ছিলো , এখন সাঙ্গাকারা আছে । শত সেঞ্চুরি আর কাড়ি কাড়ি রান নিজের নামের পাশে । এত কিছুর পরেও ক্রিকেটের ফলোয়িং বেইজের একটা বড় অংশ শচীনকে কখনো আধুনিক ক্রিকেটের অবিসংবাদী সেরা বলে নি , কিংবা বলতে পারেন ভারতের হেটার হয়েও সেই উদারতাটুকু দেখাতে পারে নাই । লারা থাকতে লারার সাথে শচীনের তুলনা হত, পেপারে দেখতাম শুক্রবারে ফিচারে পাশাপাশি দুজনের স্ট্যাট রেখে জোর বিশ্লেষণ চলত । শচিনের ব্যাপারে কেউ কেউ বলত, তার শতরানের ইনিংসগুলো তার দলের জন্য ঠিক সেই লেভেলে ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারে নি যতোটা পারত লারার ৭০ কংবা ৮০ রানের একটা চোখ জুড়ানো ইনিংস । লারা চলে যাবার পরে অনেকটা সময় শচীনের স্ট্যাট ঘেঁটে দেখার সাহস আর মানুষ করে নি । তবে আরেকজন যার কথা বললাম , সে যাবার সময় আবারও ধুলো ঝেড়ে নেড়েচেড়ে উঠছে সে সম্প্রদায় । আমি শচীনের দলেও না , সাঙ্গাকারার দলেও না । আমি সাঙ্গাকার চলে যাবার সময়ে শুধু তার গ্রেটনেস নিয়েই কথা বলার পক্ষে ।

kumar-sangakkara-record

বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭টা টেস্ট হান্ড্রেড , ৭টা ফিফটি আর টেস্ট এভারেজ ৯৬ এর মতো । ভুল হয়ে না থাকলে ২-৩টা বাদ দিয়ে হয়তো সবগুলো সেঞ্চুরিই টিভিতে বসে দেখা হয়েছে । কখনো উইকেটের পিছে ওর ক্যাচ ফেলে দেবার মাশুল আমাদের গুণতে হয়েছে সারাদিন মাথা কুঁটে উইকেটের জন্যে বল করে , আবার কখনো আমাদের সাহায্য ছাড়া সাকিবের বলটা বেরিয়ে এসে ডীপ মিড উইকেটে মুখস্থ শটে চার মেরে হান্ড্রেড করে ফেলেছে । সাঙ্গার ক্লাসের বিষ সহ্য করা বাংলাদেশিদের জন্যে নতুন কিছু নয় । তবে ছেড়ে যাবার আগে শচীনের ২০০ টেস্ট বা রিকি পন্টিং এর ১৭০ এর মত টেস্টের পাশে কুমার সাঙ্গাকার ১৩০ টেস্ট তো একটু কমই লাগে । আবার একই জায়গায় ২২ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেকটাও তো আপনার মনে হবে একটু দেরিই হয়ে গেছে আসলে ।

সাঙ্গাকারার ম্যাজিকটা হলো একদিনে তুড়ি মেরে আসলে এখানে আসেন নি । ভালো ইনিংস আসতে থাকলে মানুষ গিলক্রিস্টের পাশে উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে ওকেও এলিট লিস্টে রাখতে লাগলো। আরো কিছুদিন যাবার পরে মানুষ যখন আরো বড়সড় ইনিংস দেখলো , তখন মানুষ ভাবতে লাগলো উইকেট কিপার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ও-ই তো সবচেয়ে ভালো । গিলক্রিস্ট টর্নেডো হলে সাঙ্গাকারা চিত্ত জুড়িয়ে দেওয়া এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস । কিন্তু আরো পরে মানুষ আসলে ভালো মতো বুঝতে পারলো । সাঙ্গাকারার নামের পাশে আসলে উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান টার্মটা যোগ করলে আপনি অবশ্যই এবং অতি অবশ্যই এই লঙ্কানের ক্লাসটাকে অপমান করে বেড়াচ্ছেন ।

_53529410_ton

এভাবেই আসলে ভালো উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান থেকে সেরা উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান আর সেরা উইকেট কীপার ব্যাটসম্যান থেকে সবচেয়ে সেরা ব্যাটসম্যান । উইকেটকীপারের ট্যাগটা উঠিয়ে আপনাকে দিতেই হবে যদি ওকে আপনি শচীন , লারা কিংবা পন্টিংদের কাতারে নিয়ে কম্পেয়ার করতে চান ।

সাড়ে ১২ হাজার রান, ৩৮টা সেঞ্চুরি আর ৫২টা হাফ সেঞ্চুরি সাঙ্গাকারার ক্যারিয়ারের হাইলাইটস হলে আমি ১১টা ডাবল সেঞ্চুরিকে বলবো সাঙ্গার ক্যারিয়ারের বেস্ট পার্ট । আর সাথে মাহেলার সাথে ম্যারাথন জুটির ব্যাপারটা তো থাকবেই। কোন লিস্টে সাঙ্গাকারা টেস্ট হিস্ট্রিতে কত নাম্বারে আছে তার অনেক হিসাব নিকাশ দিন কয়েক পরে পেপারে গড়াগড়ি খাবে । আর ইন্টারনেটের যুগে আপনিই বা বসে কেন ? তবে সাঙ্গার যেই জিনিসটা দেখে জিভ চুকচুক করে “আমাদের যদি থাকতো !” টাইপের আফসোস করতাম তা হলো সেঞ্চুরি করার পরেও ল্যুজ বলে আউট হয়ে হেঁটে যাবার সময় মাথা নাড়তে নাড়তে হেঁটে যাওয়ার ব্যাপারটা । অরবিন্দ ডি সিলভাকে দেখেছি কম , জয়সুরিয়াকে দেখা হয়েছে অনেকটুকু , জয়াবর্ধনের দেখেছি সেরা সময়টাও । কিন্তু লঙ্কানদের মধ্যে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে আমি সাঙ্গাকারাকেই সেরা বলে ঘুমাতে যাবো । সময়মতো ক্যাপ্টেন্সি ছেড়ে আবার দলের দরকারে আবার হাল ধরাটাই আসলে স্পোর্টস্ম্যান হিসেবে সাঙ্গাকারার মহত্ত্বের আসল পরিচায়ক ।

সাঙ্গাকারা আসলে এলিট ক্লাসের …
যিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুটেড ব্যুটেড হয়ে এমসিসির স্পিরিট অফ ক্রিকেটের ভাষণও দিতে পারবেন …
আবার ক্যারিবীয়ানে বিশ্বকাপের ফাইনালে গিলির এক কীর্তিকে ম্লান করে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টাটাও মাঝে মাঝে করে যাবেন …
আবার কখনো ঢাকার মাঠে টি২০ বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে বুনো উল্লাসে মেতে উঠবেন ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 × three =